ফুটবলের বর্বর পুর্বপুরুষ

মেহেদী হাসান রোমেল
অক্টোবর ৪, ২০১৬
ফুটবলের বর্বর পুর্বপুরুষ ফুটবলের বর্বর পুর্বপুরুষ

হাজারখানেক ইউরোপীয় চিত্রকরের পা পড়েছে শহরটিতে। কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যাও নেহায়েৎ কম নয়। এদের বেশির ভাগই জীবনের নির্দিষ্ট একটা সময় এ শহরে কাটিয়ে, অন্য কোথাও পাড়ি জমান। অনেকে আবার থেকে গেছেন চিরকালের মতো। যেমন— মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, ম্যাকিয়াভেলি, বুয়োনারিত্তি, গ্যালিলিও গ্যালিলিও, গুইলার্মো মার্কনি। ফ্লোরেন্স শহরের হূকোরক বরাবর ঐতিহাসিক নিদর্শন পিয়াজ্জা সান্তা ক্রোচ ; সেখানকার ব্যাসিলিকা অব সান্তা ক্রোচ গির্জার ‘সিক্সটিন চ্যাপেল’-এ ঘুমোচ্ছেন ইতালির সোনার ছেলেরা। সিক্সটিন চ্যাপেলকে স্থানীয়রা তাই বলে থাকেন, ‘টেম্পল অব ইতালিয়ান গ্লোরিজ।’

ফ্রানি্সসকান সময়ের এ গির্জার সামনে আয়তাকার বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। চত্বর বলাই শ্রেয়। বছরের অন্যান্য সময় এখানে তেমন ভিড় থাকে না। পর্যটকের সংখ্যাও হাতেগোনা। কিন্তু জুন এলে রক্ষে নেই। সাজ সাজ রব পড়ে যায়। পায়ের গোড়ালি আন্দাজ বালি ফেলা হয় চত্বরে। মাঝ বরাবর আড়াআড়ি রেখা টেনে জায়গাটিকে ফুটবল মাঠের আকৃতি দেয়া হয়। দুই প্রান্তে বসানো হয় ক্ষুদ্রাকৃতির অস্থায়ী গোলপোস্ট। এর পর জুনের নির্দিষ্ট একটি দিনে চত্বরটিতে সবাই ভিড় জমায়। সেসব উত্সাহী মুখের মধ্যে প্রচুর বিদেশী পর্যটক। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ‘ক্যালসিও এসতোরিকো’।

খটমটে এ নামটা আসলে একটা ‘খেলা’। বাংলা অর্থ ‘ঐতিহাসিক ফুটবল’। ইতালিয়ান ভাষায় ‘ক্যালসিও’ শব্দের অর্থও ফুটবল। কিন্তু খেলাটা মোটেও ‘খেলা নয়’,  ফুটবল তো নয়ই।

আপনি লিওনেল মেসির ভক্ত। প্রিয় তারকাটি মাঠে ফাউলের শিকার হলে আপনার খারাপ লাগে। ফাউলের মধ্যে আবার রকমফের আছে। মৃদু আঘাত, জার্সি ধরে টান, কনুই চালানো কিংবা পায়ের কড়া ট্যাকল। এসব সহ্য হয়। কিন্তু মেসি বড় কোনো আঘাত পেলে! ‘ব্যতিক্রম’দের সারণি বাদ রেখে বলছি, আপনি সর্বোচ্চ আসন থেকে উঠে দাঁড়াবেন। তার পর বিস্ফোরিত নেত্র আর তিরিক্ষি মেজাজের সম্মিলনে কয়েক দফা হাত-পা ছুঁড়ে আবারো খেলা দেখতে বসবেন গালে হাত দিয়ে। মেসির নানা জাতের ভক্তকুল বিবেচনায় বলতে হয়, সমর্থকদের এ তালিকায় আপনার স্থানটা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো ব্যাপার। এখন আপনার মতো কোনো নিপাট ভদ্রলোক যদি, মেসিকে  দেখেন ক্যালসিও এসতোরিকোর ময়দানে ? তখন! থাক দেখে কাজ নেই। কেন নেই, সেটাই বলছি—

ম্যাচের স্থায়িত্ব ৫০ মিনিট। দুই দলে ২৭ জন করে খেলোয়াড়। একেক দলে চারজন গোলরক্ষক, তিনজন ফুলব্যাক, পাঁচজন হাফব্যাক আর ১৫ জন স্ট্রাইকার। অধিনায়ক থাকেন গোলপোস্টের কাছাকাছি। তিনি খেলেন না; খেলান। দলকে সংহত রাখেন কিংবা মাঝে মধ্যে রেফারির ভূমিকায় ঝগড়াঝাঁটি মিটিয়ে দেন অধিনায়ক। তবে মূল রেফারি ছাড়াও ছয়জন লাইন্সম্যান ও বিচারকের পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন কমিশনার উপস্থিত থাকেন  খেলায়। হয়তো ভাবছেন, সামান্য একটা ফুটবল ম্যাচের জন্য এমন এলাহি কান্ড ? আসলে খেলার কায়দা-কানুনেই যত ভজঘট। ক্যালসিও এসতোরিকোতে প্রতিপক্ষকে হারাতে সব চলে। সব ! শুধু পা দিয়ে মাথায় আঘাত করা যাবে না। কিন্তু হাত চলতে পারে, সঙ্গে বাকিসব তো থাকছেই ; কুংফু, কারাতে, কিল-ঘুষি, জুডোর প্যাঁচসহ শারীরিক শক্তির নানা প্রায়োগিক দিক! সেবা-শুশ্রূষার জন্য ডাক্তার পাওয়া যাবে মাঠেই। কিন্তু কেউ আহত হয়ে মাঠের বাইরে গেলে বদলি খেলোয়াড়ের বিধান নেই। হাতে কিংবা পায়ে যেকোনোভাবে বল প্রতিপক্ষের জালে পাঠাতে পারলে এখানে কেউ গোল বলে চিত্কার করে না। ‘ক্যাসিও’—শব্দটাই আসলে সেখানে গোলের প্রতিশব্দ। প্রতিপক্ষের শেষ দাগ পেরিয়ে বল পাঠাতে পারলে মেলে পয়েন্ট। তবে গোলপোস্টের ওপর দিয়ে বল পাঠালে হাফ পয়েন্ট পেনাল্টি, অর্থাত্ প্রতিপক্ষ দলের স্কোরশিটে যোগ হয় হাফ পয়েন্ট।

 

১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৫৩০।

 

এদিন ব্যাসিলিকা সান্তা ক্রোচের সামনের এ চত্বরে ক্যালসিও এসতোরিকো খেলায় অংশ নেন ‘ফ্লোরেন্তিনেস’রা (ফ্লোরেনে্সর স্থানীয়দের মুখের ভাষা)। শহরটি তখন শত্রুপক্ষ দ্বারা ঘেরাও ছিল। পনেরো শতকের শুরুতেই উদ্ভব ঘটেছে এমন জনশ্রুতি থাকলেও ইতিহাসে এ ঘটনাই ক্যালসিও এসতোরিকোর আনুষ্ঠানিক জন্মসনদ। তার পর থেকে প্রতি বছরের জুনের তৃতীয় সপ্তাহে এ গির্জা চত্বরে তিনটি করে ক্যালসিও এসতোরিকো ম্যাচ আয়োজনের প্রথা চলে আসছে। শত্রুপক্ষের কামানের গর্জনকে স্মরণ করে আজ পর্যন্ত কামান দাগিয়েই খেলা শুরু করা হয়। কখনো এর অন্যথা ঘটেনি। এ মরণ খেলায় কখনো কেউ মারাও যায়নি!

কিন্তু বিশুদ্ধবাদীদের কাছে এ খেলা ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সংস্করণ। আধুনিক মানুষের গোড়াতে যেমন আদিম বর্বরতা, তেমনি ক্যালসিও এসতোরিকোও অনেকের চোখে ফুটবলের বর্বর পূর্বপুরুষ। সতেরো শতকের দিকে এর প্রতি মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এর দুই শতাব্দী পর ১৯৩০ সালে ক্যালসিও এসতোরিকোকে ‘কিংডম অব ইতালি’র খেলার মর্যাদায় অধিভুক্ত করেছিলেন স্বয়ং ‘বন্দুকের নল ক্ষমতার উত্স’—রায় দেয়া বেনিতো মুসোলিনি।

প্রতি বছরের মতো গতবারও ব্যাসিলিকা ডি সান্তা ক্রোচের সামনে ক্যালসিও এসতোরিকোর জমজমাট লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রদ্রিগো নানার সঙ্গে পরিচয় ঘটে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক স্যাম বোরডেনের। রদ্রিগো ক্যামেরুন বংশোদ্ভূত ইতালিয়ান। ক্যালসিও এসতোরিকোতে ‘সান্তো ষ্পিরিতো’র খেলোয়াড়। বলে রাখা ভালো, খেলাটি শুধু ফ্লোরেনে্সই অনুষ্ঠিত হয়। শহরটিকে চার ভাগে ভাগ করে গির্জাকেন্দ্রিক এলাকাগুলোর নাম— সান্তা ক্রোচ (আজ্জুরি/নীল), সান্তা মারিয়া ন্যুভেলা (রসি/লাল), সান্তো ষ্পিরিতো (বিয়াঞ্চি/সাদা), সান জিওভান্নি (ভার্দি/সবুজ)। এসব দল একে অন্যের বিপক্ষে লড়াই করে থাকে।

ক্যালসিও এসতোরিকো মাঠে গড়ানোর আগের দিন রদ্রিগো নানার সঙ্গে আলাপচারিতা হয় বোরডেনের। রদ্রিগো বেশ কৌতুকপ্রিয় মানুষ। ভ্রুর ওপর বেশ বড় একটা কাটা চিহ্ন দেখিয়ে বোরডেনকে সে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি জানো আমি কিসে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই? বোরডেনের জানার কথা নয়। রদ্রিগোও তার জবাবের অপেক্ষা না করে ফিসফিস করে বলে, যেন কোনো রহস্য ভাঙছে—আমার গোসল করতেই যত ভয়!

 

রদ্রিগোর এমন কুহেলিকার গোমর ফাঁস হয় ২৪ ঘণ্টা পর।

 

সেদিন ক্যালসিও এসতোরিকোর ময়দানে রদ্রিগোকে ভীষণ বেকায়দা অবস্থায় আবিষ্কার করেন স্যাম বোরডেন। প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় পরিবেষ্টিত হয়ে সে ভূপাতিত! কিন্তু লড়াইয়ে ক্লান্তি নেই। এর নাকের মধ্যে আঙুল ঠেসে দিচ্ছে তো ওর কাঁধে কনুই দিয়ে গুঁতোচ্ছে! আরেকজনকে ল্যাং মারছে। একসময় লড়াই শেষ হয়।সর্বাঙ্গে কাটাছেঁড়া নিয়ে ম্লান মুখে রদ্রিগো কোর্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তার সতীর্থদের মুখেও হাসি নেই। ফাইনালের আগে অনুশীলনটা ভালো হয়নি। সবার মুখ ভার। এ খেলায় আহত হওয়া নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

রদ্রিগোর এক সতীর্থের মুখ থেকে বোরডেন জানতে পারেন, একবার এক খেলোয়াড়ের পা ভেঙে চার টুকরো হয়ে গিয়েছিল ! আরেকজন মাথার পেছনে আঘাত পেয়ে মাঠ থেকে কোমায়! প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়ের কামড়ে কান বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও একেবারে কম নয়। কিন্তু এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। ফ্লোরেনে্স ক্যালসিও এসতোরিকো বড়দিনের থেকেও প্রতীক্ষিত! সান্তা ক্রোচের খেলোয়াড় আলেসান্দ্রো গিওর্গিনির কাছে বোরডেন জানতে পারেন, ‘ক্যালসিও এসতোরিকোতে সাহস বলতে কোনো শব্দ নেই। মুখে প্রকাশ না করলেও সবাই ভীত থাকে। কিন্তু  একবার কোর্টের ভেতর পা রাখলে উত্তেজনায় ভানুমতির খেলে সব ভীতি উধাও।’ ম্যাচ শেষে তাই ভীতিটাও ব্যাখ্যা করে রদ্রিগো, ‘খেলা শেষে গোসল করার সময় মনে হয় গোটা শরীরে কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে!’

ছেলে-বুড়োর বালাই নেই। সব বয়সের মানুষই এ খেলায় অংশ নিয়ে থাকে। দিনটিকে সামনে রেখে মাস চারেকের প্রস্তুতি নিতে হয়। রদ্রিগো স্মৃতিচারণ করে বলে, ‘প্রথমবার খেলার সময় ভীষণ উত্তেজিত ছিলাম। মনে হচ্ছিল, এখন আমি সত্যিকারের পুরুষ মানুষ।’ ক্যালসিও এসতোরিকোতে একসময় ডাক্তারের দায়িত্ব পালন করতেন লুসিও আরতুসি। কার কাছ থেকে বোরডেন জানতে পারেন, প্রতিটি দলের আট থেকে ১০ জন খেলোয়াড় গোটা ম্যাচ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। বাকিদের আহত হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগেরই ঠিকানা হয় স্থানীয় হাসপাতাল।

রদ্রিগোকে কিন্তু হাসপাতালে যেতে হয়নি। ফাইনালে বিজয়ী তার অঞ্চল। বিজিত দলের মারিকো গিল্লি বোরডেনকে বলেন,‘কোনো খেলোয়াড়ই তার পরিবারকে এখানে আনতে রাজি হয় না। আমি নিজেও এ মতের সমর্থক। কখনো নিজের মা-বাবা কিংবা স্ত্রী-সন্তানাদির সামনে লড়াই করিনি। কারণ আমি চাই না, ওরা বসে বসে আমার রক্তক্ষরণ দেখুক। কিন্তু বিজয়ী হয়ে মাঠ ছাড়ার আনন্দটা স্বর্গীয়। কোর্টের বাইরের জীবনে অবশ্য আমি ভীষণ সংসারী মানুষ।’

রদ্রিগো জানায়, বিদেশী পর্যটকরা প্রথমবার এসে ভেবে নেয়, এ খেলায় হয়তো প্রচুর অর্থকড়ি কামাই হয়। নইলে জেনে-বুঝে কে নামত এ মরণ খেলায়! ভুল। রেসলিং কিংবা মুষ্টিযুদ্ধের মতো বিপদজ্জনক খেলায় হাজার কোটি টাকা বাজি চলে। খেলোয়াড়দের আয়-রোজগারও ঈর্ষণীয়। কিন্তু ক্যালসিও এসতোরিকোতে চ্যাম্পিয়ন দলের পুরস্কার কী— এ প্রশের জবাব শুনলে আপনাকে মাথা চুলকাতে হবেই। খেলোয়াড়দের কোনো আর্থিক পারিশ্রমিক নেই, নেই কোনো স্মারক ট্রফি কিংবা পদক দেয়ার রীতি। কিছুদিন আগ পর্যন্তও চ্যাম্পিয়ন দলের হাতে তুলে দেয়া হতো তুসকান অঞ্চলের জবাইকৃত একটি বাছুর আর মস্ত বড় একটা রুটি! পনেরো শতকের এ রীতিতে এখন অবশ্য কিছুটা আধুনিকতার ছাপ লেগেছে। এখন ম্যাচ শেষে চ্যাম্পিয়ন দলকে একবেলা ডিনার করানো হয়।পয়সা থাকলে নয় মনকে বুঝ দেয়া যেত। বাছুর ও রুটি দিয়ে তো আর ক্ষত সারানো যায় না। তাহলে সামান্য একবেলা ডিনারের জন্যই কি এই মরণ খেলা? রদ্রিগো জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘না। এটা আসলে যুদ্ধ। টাকাপয়সা নিয়ে কেউ ভাবে না। আপনি এ খেলায় অংশ নিচ্ছেন কারণ তাগিদটা আসছে মনের ভেতর থেকে। একবার জয়ী হয়ে কোর্টের বাইরে আসতে পারলেই গর্ব কি, এটা বুঝতে পারি। তখন সবার সঙ্গে প্রচুর পান করা যায়। সমীহ মিশে থাকে সবার চোখে। আপনি তখন আপনার এলাকার (দল) একজন সম্মানিত প্রতিনিধি। আসলে একবার কোর্টের ভেতর ঢুকলে সবাই কেমন পাল্টে যায়। ফ্লোরেনে্সর হাজার বছরের ঐতিহ্য আর নিজ নিজ অঞ্চলের সম্মান রক্ষার্থে জান বাজি রাখতেও কেউ দ্বিধা করে না। এটাই ক্যালসিও এসতোরিকোর মূল প্রেরণা।’

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post