আবারো কার্ডিফ, আবারো ইতিহাসের ডাক

উদয় সিনা
জুন ৭, ২০১৭
  এই কার্ডিফেই নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।  এই কার্ডিফেই নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সের নাম শুনলেই বাংলাদেশি ক্রিকেটভক্তদের স্মৃতির মণিকোঠায় ২০০৫ সালে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া বধের দৃশ্য ভেসে উঠাটা স্বাভাবিক। অস্ট্রেলিয়াকে একমাত্র ওয়ানডে ম্যাচে হারানোর দিনে ওই ম্যাচে বাংলাদেশ  জয় পায় ৫ উইকেটে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক সেই জয়ের স্মৃতিতে এখন মরিচা পড়ে গেছে।

তাই সেই মরিচা কাটাতে সমর্থকদের এরকম আরেকটি ঐতিহাসিক জয় উপহার দেয়া ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা নেই মাশরাফিদের সামনে।  কাকতালীয়ভাবে এর জন্য মঞ্চটা তৈরি করে রেখেছে সেই কার্ডিফই। কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে আবারো ইতিহাস হাত বাড়িয়ে ডাকছে বাংলাদেশকে। কারণ চলমান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারলেই যে প্রথমবারের মত এই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলার সুযোগ অনেকটা বেড়ে যাবে বাংলাদেশের!

১১ বছর পর আবারও কার্ডিফে বাংলাদেশ। কার্ডিফে পা রাখার পর  ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়া বধের স্মৃতি কিছুটা হলেও হয়ত মনে নাড়া দিচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। যদিও মাশরাফি বাদে বর্তমান দলের কেউই খেলেননি ওই ম্যাচে।

মাশরাফি তো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গত ম্যাচের আগের দিন প্রেস কনফারেন্সে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে ওই ম্যাচের কিছু স্মৃতিও রমন্থন করে ফেলেন। ম্যাচের শুরুতেই গিলক্রিস্টকে আউট করা ও ম্যাচ শেষে রাতে ড্রাইভে গিয়ে জয় উদযাপন করার কথাগুলো আনন্দের সাথেই মাশরাফি গলা থেকে বের হয়।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির বাংলাদেশ দলের বাকি ১৪ জনের মধ্যে কেউই ওই ম্যাচে খেলতে না পারলেও সিংহভাগই সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিলেন টিভি পর্দার মাধ্যমে। এখন পয়া ভেন্যু সেই কার্ডিফেই আবারো ইতিহাস গড়ার হাতছানি বাংলাদেশের সামনে। সেই ইতিহাস রচনার জন্য তাদের পথের কাটা অস্ট্রেলিয়ার মতই তাসমান পারের আরেক ক্রিকেটীয় পরাশক্তি নিউজিল্যান্ড।

বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ডের শুক্রবারের ম্যাচটি হতে পারত বাংলাদেশের জন্য নিয়মরক্ষার ম্যাচ। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারার পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও নিশ্চিত হারতে যাওয়া ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ায় খাদের কিনারা থেকে উঠে আসে বাংলাদেশ। খাদের কিনারা থেকে উঠে আসলেও পিঠ কিন্তু দেয়ালেই ঠেকে আছে তাদের।

এখন পর্যন্ত খেলা ২ ম্যাচের একটিতে হার ও অপরটি পরিত্যক্ত হওয়ায় মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশের অবস্থান। তাই টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই তাদের সামনে। নিউজিল্যান্ডেরও একই দশা। একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত ও একটি হারে বাংলাদেশের সমান এক পয়েন্ট নিয়েও রান রেটে পিছিয়ে থেকে তাদের অবস্থান গ্রুপের তলানিতে। তাই তাদের জন্যও এটি বাঁচা-মরার লড়াই।

এবারের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শুরুতেই টিম কম্বিনেশন নিয়ে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৮ ব্যাটসম্যান ও মাত্র ৪ জন স্বীকৃত বোলার খেলিয়ে বেশ বির্তকের সম্মুখীন হয় টিম ম্যানেজমেন্ট। পরের ম্যাচে আবার মিরাজকে ইনক্লুড করে একাদশে ৫ম বোলারের ঘাটতি পূরণ করে টিম ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু পূরণ হয় না দলের জয় পাওয়ার আশা।

বাংলাদেশ দলের বর্তমান অবস্থা অনেকটা সেই কাথার মত যেটা দিয়ে পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যায় আবার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে থাকে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের কল্যাণে বাংলাদেশ ৩০৫ রান করেও বোলারদের ব্যর্থতায় ম্যাচ হেরে বসে। আবার এর পরের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশ বোর্ডে জমা করে মাত্র ১৮২ রান।

বর্তমানে দলের ব্যাটিং, বোলিং কোন বিভাগই ছন্দে নেই বলা চলে। বোলিং বিভাগে মাশরাফি, সাকিব, রুবেল,মুস্তাফিজ পুরো ব্যর্থ। ব্যাটিং বিভাগেও ব্যর্থ দলের সিংহভাগ ব্যাটসম্যান। গত দুই সিরিজে নিজেকে হারিয়ে আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সবশেষ ত্রিদেশীয় সিরিজে নিজেকে ফিরে পাওয়া ওপেনার সৌম্য সরকার আবারো ছন্দ হারিয়েছেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে এসে, দু'ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ মাত্র ৩১ রান।

সেইসাথে ছন্দে নেই ইমরুল, সাকিব, রিয়াদ ও সাব্বির । বলতে গেলে টুর্নামেন্টে তামিম ও মুশফিক বাদে টপ অর্ডার থেকে টেইল এন্ডার পর্যন্ত বাংলাদেশের সকল ব্যাটসম্যান ব্যর্থ এখন অবধি।

বাংলাদেশ দলের অবস্থা অনেকটা নড়বড়ে। দলের ব্যাটসম্যান, বোলাররা কোনভাবেই একসাথে ক্লিক করতে পারছেন না। তবে বেশিরভাগ ক্রিকেটারের ব্যর্থতার মিছিল থেকে দূরে আছেন দলের দুই সিনিয়র ক্রিকেটার তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম। গত কয়েক সিরিজ থেকেই তামিমের ব্যাট থেকে ছুটছে রানের ফোয়ারা।

সবশেষ শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রেখেছেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও। প্রথম দুই ম্যাচেই প্রায় মিলে গিয়েছিলো দুটি সেঞ্চুরি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিজের অভিষেক ম্যাচে ১২৮ করার পর  অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৫ রানের জন্য টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি মিস করেন তিনি।

এদিক থেকে তামিমের ধারে কাছে নেই কোন ব্যাটসম্যান। ২২৩ রান করে টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রান সংগ্রাহক তামিম ইকবাল। মুশফিকুর রহিমের ব্যাটও থেমে নেই। আয়ারল্যান্ডে ব্যাট হাতে একটি সফল সিরিজ শেষ করে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরু করেছেন ৭২ বলে ৭৯ রানের নজরকারা ইনিংস দিয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে অবশ্য মাত্র ৯ রান করে তাকে ফিরে যেতে হয় আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের বলি হয়ে।

অন্যদিকে দলের বোলিংয়ের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় উইকেট টেকিং অপশনের অভাবে ভুগছে বাংলাদেশ। কন্ডিশন এবং পিচ থেকে খুব বেশি সাহায্য পাচ্ছেন না বোলাররা তা ঠিক কিন্তু নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ম্যাচে যে তাঁরা খেলতে পারছেন না তাও বলতে হবে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত দলের প্রতিটি বোলারই বেশ খরুচে বোলিং করেছেন।

তবে দলের অন্যতম বেশি দুশ্চিন্তার কারণ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের বাজে ফর্ম। কোনভাবেই যেন ব্যাডপ্যাচ কাটছে না তাঁর। আয়ারল্যান্ড সিরিজ থেকেই বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান, অব্যাহত রয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও। শেষ পাঁচ ম্যাচে ব্যাট হাতে ৬৪ রান সংগ্রহ করার পাশাপাশি উইকেট নিয়েছেন মাত্র তিনটি।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে দুই ম্যাচ খেলে করেছেন মোটে ৩৯ রান এবং প্রথম ম্যাচে ৮ ওভার বল করে ৬২ রান দিয়ে পাননি কোন উইকেট। তবে তিনি সাকিব আল হাসান বলেই সকলের ভরসার জায়গাটা দখল করে আছেন। সাধারণত এমন বাজে সময়ের মধ্যে তাকে আমরা খুব বেশি পড়তে দেখি না বা বাজে সময় থেকে বের হতে খুব বেশি সময়ও নেন না তিনি।

হয়ত সামনের ম্যাচেই স্বরূপে ফিরতে যাচ্ছেন তিনি। এই মুহূর্তে দলে সেই পুরনো সাকিবকে খুব দরকার। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিতে প্রথমবারের মত খেলার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে যে পুরো বাংলাদেশ!

শুক্রবারের ম্যাচ নিয়ে হয়ত বাংলাদেশিদের মধ্যে  কোন উত্তেজনা কাজ করত না। নিয়মরক্ষার ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনা কাজ করার কথাও না। কিন্তু বৃষ্টির কল্যাণে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়তে পড়তে গিয়েও বাংলাদেশের বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরো ভেস্তে যায়। এবারের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মত ২০১৫ বিশ্বকাপেও বৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য সুফল বয়ে এনেছিলো।

সেখানেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ বাতিল হওয়ায় প্রাপ্ত ১ পয়েন্ট পরবর্তীতে বাংলাদেশকে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে সাহায্য করে। এবারও কী তাহলে বাংলাদেশের জন্য এমন ভালো কিছুরই বার্তা নিয়ে আসলো বৃষ্টি? হয়ত তাই!

কিন্তু এ সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে দলের খেলোয়াড়দের। কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনা আরো জোরদার করতে মাঠে সেরা খেলাটা খেলতে হবে খেলোয়াড়দেরই।

২০০৫ সালে ঘরে বসে কার্ডিফে বাংলাদেশের ইতিহাস গড়ার সাক্ষী হওয়া মুশফিক সাকিবদের সামনে এবার সুযোগ নিজেরা কার্ডিফে খেলে আরেকটি ইতিহাস রচনা করার। তবে প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বসে থাকলে চলবে না।

চোখ রাখতে হবে এ গ্রুপের শেষ ম্যাচ ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়ার দিকেও। ওই ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতলেই প্রথমবারের মত সেমিতে বাংলাদেশ। কিন্তু সেটা পরের হিসাব। তার আগে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে হবে তো!

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে নিউজিল্যান্ড। তবে তাদের পারফরম্যান্স আহামরি কিছু না! অস্ট্রেলিয়ার সাথে পরিত্যক্ত হওয়া ম্যাচে ভালো খেললেও দ্বিতীয় ম্যাচে পাত্তা পায়নি ইংল্যান্ডের কাছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বেশ চেনা প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।

তাদেরকে একাধিকবার ধবলধোলাই করার সুখস্মৃতিও আছে। তাছাড়া কয়েকদিন আগে  এই নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলতে এসেছে বাংলাদেশ। তবে সেই নিউজিল্যান্ডের চেয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির নিউজিল্যান্ড বেশি শক্তিশালী। তাই গত দুইম্যাচের সবকিছু ভুলে দলের সবাইকে রিচার্জড হয়ে তাদের বিপক্ষে মাঠে নামতে হবে এবং নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হবে।

সাথে কার্ডিফের স্মৃতি হয়ত বাড়তি শক্তি যোগাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের।নিউজিল্যান্ডকে হারাতে হলে তিন বিভাগেই দলের সবাইকে একসাথে জ্বলে উঠতে হবে। প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিতে খেলার সুযোগ নিশ্চয়ই তাঁরা হারাতে চাইবেন না।

এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে দলের অধিনায়ক মাশরাফিকে বরাবরেই মতই একটি গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। এমন একটি ম্যাচে ভালো করতে হলে পূর্বের সব ভূলভ্রান্তি ভুলে আত্মবিশ্বাসের সাথে চাঙ্গা হয়ে  মাঠে নামতে হবে প্রত্যেককে। আর সাজঘরে সকলের মধ্যে সাহস যুগিয়ে সবাইকে চাঙ্গা রাখার কাজটা মাশরাফির চেয়ে ভালো আর কে পারে!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post