লর্ডসের সেই ক্ষুদে মুশফিক

উদয় সিনা
মে ২৬, ২০১৭
  পুরো ইংলিশ মিডিয়া তখন মেতে উঠে এই ক্রিকেটারের বন্দনায়।  পুরো ইংলিশ মিডিয়া তখন মেতে উঠে এই ক্রিকেটারের বন্দনায়।

সময়টা ২০০৫। প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলতে বিমানে চড়েছে বাংলাদেশ। সেই বিমানে বাংলাদেশ দলের সঙ্গী হয়েছেন মাত্র ১৬ বছর বয়সী একজন উইকেট-কিপার ব্যাটসম্যান। আর ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর কয়েকদিনের মধ্যেই রীতিমত ব্রিটিশ গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হয়ে যান প্রথমবারের মত বাংলাদেশ দলে সুযোগ পাওয়া এই ক্রিকেটার।

সফরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মূল সিরিজ শুরু হওয়ার আগে তিনদিনের তিনটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। ব্রিটিশ ইউনিভার্সিটির সাথে প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচটা ড্র করে তাঁরা। দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে সাসেক্সের বিপক্ষে ইনিংস ও ২২৬ রানের বিশাল ব্যবধানে হার বাংলাদেশের। এ ম্যাচে সেই ১৬ বছর বয়সী তরুণকে বাজিয়ে দেখার জন্য  বাংলাদেশ দলে সুযোগ দেন কোচ ডেভ হোয়াটমোর। ম্যাচে বাংলাদেশ যখন ফলো অনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে তখন তিনি খেলে ফেলেন ৯৮ বলে ৬৩ রানের একটি ইনিংস।

সুবাদে তৃতীয় প্রস্তুতি ম্যাচেও খেলার সুযোগ হয় তাঁর। আর এ ম্যাচেই নিজের সামর্থ্যের সবটুকু জানান দেন এই তরুণ। ব্যাট হাতে খেলেন ১৬৭ বলে অপরাজিত ১১৫ রানের একটি অবিশ্বাস্য ইনিংস। অবিশ্বাস্য বলছি কারণ প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধ কন্ডিশনে গিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক তরুণ এরকম একটি ম্যাচিউরড ইনিংস খেলবেন তা আসলে কারো কল্পনাতেও ছিলো না। এতে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছিলো ইংলিশ মিডিয়া।

তাই পুরো ইংলিশ মিডিয়া তখন মেতে উঠে এই ক্রিকেটারের বন্দনায়। ম্যাচে শটস, ড্রাইভ ও বিশেষকরে এই অল্প বয়সে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলা দেখে তাঁরা তাঁর উজ্জ্বল ভবিষ্যত প্রসঙ্গেও আগে থেকেই একপ্রকার ভবিষ্যতবাণী করে রাখেন। প্রস্তুতি ম্যাচে অসম্ভব ভালো করার পুরস্কারটাও তিনি পেয়ে যান খুব দ্রুত। ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচেই অভিষেক ঘটে তাঁর। সেই শুরু থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আজ তাঁর এক যুগ পূর্ণ হলো। ১২ বছর আগের ১৬ বছর বয়সী সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ বর্তমান বাংলাদেশ দলের টেস্ট  অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম মিতু।

মুশফিকুর রহিমের চোখেমুখে তখনো কৈশোরের ছাপ। মুখে পবিত্র হাসিতে যেন একটি নিষ্পাপ চেহারা দোল খায়। ঠিক এই সময়ে ইতিহাসের নবম সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর। অভিষেকটা অবশ্য রাঙ্গাতে পারেননি বগুড়ার এই ব্যাটসম্যান। দুই ইনিংস মিলিয়ে তিনি করেন মোটে ২২ রান। দুর্ভাগ্যবশত গোড়ালির চোটের কারণে সিরিজের শেষ টেস্টটিও খেলা হয়নি তাঁর।

ছোটবেলা থেকেই  মুশফিক অত্যন্ত জেদি। ব্যাট যখন তাঁর উচ্চতার চেয়ে বড় তখন থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ মুশির। নিজের উচ্চতার চেয়েও বড় ব্যাট নিয়েই তখন মাঠে  ছুটে যেতেন তিনি। কিন্তু ছোট হওয়ায় খেলার সুযোগ পেতেন না।

তারপর যখন তাঁর উচ্চতা ব্যাটের চেয়ে একটু বেশি হয় তখন বড়রা খেলায় না নিতে চাইলেও ব্যাট হাতে জেদ করে ক্রিজে দাঁড়িয়ে থাকতেন মুশি। আশ্চর্যজনকভাবে ঠিকমত ব্যাট ধরতে না পারা মুশিকে সহজে আউটও করতে পারতেন না বাকিরা। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি এই আগ্রহ দেখে বাবা মাহবুব হামিদ ছেলেকে বাংলাদেশ ক্রিড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তি করিয়ে দেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের খেলোয়াড় তৈরির সেই প্রতিষ্ঠানেই তিলে তিলে গড়ে উঠেন আজকের মুশফিকুর রহিম।

মানুষটা ছোটখাটো গড়নের হলেও বরাবরই দায়িত্ব নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন মুশফিক। এ কারণে মুশফিকের গায়ে 'মি. ডিপেন্ডেবল' তকমাটা সেটে গেছে আরো অনেক বছর আগেই। দায়িত্ব নিয়ে খেলাটা যেন মুশফিকুর রহিমের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য। সেটা আমরা দেখেছি তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুতেই।

২০০৫ সালে সাসেক্সের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে ফলো অনে পড়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে যখন একের পর এক উইকেট খোয়াচ্ছিল তখন মুশফিকই দায়িত্বের সাথে ৬৩ রানের একটি ইনিংস খেলে এক প্রান্ত আগলে রাখেন। দলে শুধু যে মুশফিকই দায়িত্ব নিয়ে খেলেন এমনটিও আবার নয়। দলের ১১ জনই দলের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে মাঠে নামেন।

তবে বাকি ১০ জনের চেয়ে মুশফিকের দায়িত্বটা একটু ভিন্ন। একজন ব্যাটসম্যানকে ব্যাটিংয়ে, বোলারকে বোলিংয়ে এবং অলরাউন্ডারকে ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হয়। কিন্তু মুশফিককে খেলতে হয় অধিনায়কত্ব, ব্যাটিং ও  উইকেটের পেছনে বিশ্বস্ত প্রহরীর দায়িত্ব নিয়ে। মাঠে ম্যাচের একটা সময় অন্যরা যখন শুধু বোলিংয়ের দায়িত্ব নেন তখন মুশফিককে একই সাথে উইকেট কিপিং ও অধিনায়কত্বের দায়িত্ব নিতে হয়।

কথায় আছে, দুই নৌকায় এক সাথে পা দেওয়া যায় না। কিন্তু মুশফিকের ক্ষেত্রে তাদের এ যু্ক্তিটা খাটে না। কারণ তিনি যে সফলতার সাথেই একসাথে নিজের দায়িত্বগুলো পালন করে যাচ্ছেন বহু বছর ধরে!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে যদি একটি পাঠশালা হিসেবে কল্পনা করা হয় তাহলে সে পাঠশালার সবচেয়ে পরিশ্রমী ছাত্র মুশফিকুর রহিম। নেটে বা মাঠে সূচী আনুযায়ী অনুশীলনের পাশাপাশি ঐচ্ছিক অনুশীলনের দিনগুলোতেও অনুশীলন মিস করেননা তিনি। আর এই পরিশ্রমের ফল তিনি পান মাঠে যা দলকে নির্ভার রাখতে অনেকটাই সাহায্য করে।

কঠোর পরিশ্রমের ফলে তাঁর ব্যাটে ছোটে রানের ফোয়ারা যা সাফ্যলের জোয়ারে ভাসায় দলকে। কিন্তু জীবন-নদীর প্রতিচ্ছবিতে ক্রিকেটেও তো জোয়ার ভাটার নিত্য উপস্থিতি। যে কারণে কালেভদ্রে খেই হারিয়ে ফেলেন মুশফিকুর রহিম। দলের অন্যান্যদের চেয়ে তিনি একটু বেশিই আবেগি যা ব্যাট হাতে তাঁর খারাপ সময় ব্যাক অব মাইন্ডে একটু বেশি কাজ করে।

কিন্তু মুদ্রার উল্টোপিঠে আছে মুশফিকের জেদ। ছোটবেলা থেকেই প্রবল জেদি মুশফিক খারাপ সময় থেকে নিজেকে বের করে আনতে দ্বিগুণ উদ্যমে অনুশীলনে নেমে পড়েন। খারাপ সময়ে নিজেকে ফিরে পাওয়ার যে জেদ মুশফিকের মাঝে কাজ করে তা আজকের এই মুশফিককে পেতে আমাদের সাহায্য করেছে।

দেখতে দেখতে আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক যুগ পূর্ণ হয়ে গেলো মুশফিকুর রহিমের। সেই ১৬ বছর বয়সী মুশফিক আজ একজন পরিণত ক্রিকেটার। মুশফিকের যোগ্যতা, সামর্থ্য নিয়ে আলাদা করে বলার কিছুই নেই। কারণ যোগ্যতা বা সামর্থ্য না থাকলে একজন ক্রিকেটার কখনোই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক যুগ পার করতে পারেন না।

এই বারোটি বছর মুশফিক দেশকে দিয়েছেন অনেক কিছু, নিজের ঝুলিও করেছেন সমৃদ্ধ। এই সময়টাতে তাঁর সঙ্গী হয়েছে অসংখ্য অর্জন। দাপটের সাথে ক্রিকেটের তিন সংস্করণে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করেছেন তিনি, বাংলাদেশ প্রথমবারের মত এশিয়া কাপে রানার্স আপ হয় তাঁরই নেতৃত্বে, ব্যাট হাতে বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দেশকে জয় উপহার দিয়েছেন, প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে দ্বিশতক হাকিয়েছেন, টেস্টে প্রথম কোন বড় দল হিসেবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এবং দেশের শততম টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে যে ঐতিহাসিক জয়গুলো পায় বাংলাদেশ তাও ছিল অধিনায়ক মুশফিকের নেতৃত্বেই।

দলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য প্রশংসার পাশাপাশি এই বারো বছরে অনেক সমালোচনারও সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। দল সাফল্য না পাওয়ায় একসময় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন, অধিনায়কত্ব ও কিপিং নিয়ে অনেকবার প্রশ্নের সম্মুখীনও হয়েছেন মুশফিক। কিন্তু আমাদের মুশফিক মাঠে পারফরম্যান্স করে বার বার এসব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। মুশফিকের ক্রিকেট ক্যারিয়ার এখন মধ্যগগনে।

এই ক্যারিয়ারে তাঁর ব্যক্তিগত কিছু লক্ষ্যের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের হয়ে যেকোন বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট জেতা। হোক সেটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মধ্যে যেকোন একটি। দরজায় এখন কড়া নাড়ছে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি যা মুশির এই লক্ষ্য পূরণের একটি সুবিশাল প্ল্যাটফর্ম। তবে সে লক্ষ্য পূরণ করতে হলে দলের বাকিদের পাশাপাশি লাল সবুজের জার্সি গায়ে তাকেও যে নিয়মিত জ্বলে উঠতে হবে তা বলাই বাহুল্য।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post