২০০১ থেকে ২০১৭: ম্যাজিকাল মাশরাফি

উদয় সিনা
এপ্রিল ৮, ২০১৭
তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গত ১৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে এই লিস্টটি তৈরি করা হয়েছে। তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গত ১৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে এই লিস্টটি তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে তাঁর অবসরের খবরটি শুধু ধাক্কা হিসেবেই আসেনি বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের সামনে, সেই সাথে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভাগ্য প্রসঙ্গেও তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।

গত চার এপ্রিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আগে মাশরাফি ক্রিকেটের এই ক্ষুদ্র সংস্করণ থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচের মধ্য দিয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের যাত্রা শুরু ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’-এর। তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের গত ১৫ বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে এই লিস্টটি তৈরি করা হয়েছে।

২০০১

নভেম্বর ৮, ঢাকায় মাশরাফি ক্যারিয়ারের অভিষেক ম্যাচটি খেলেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ম্যাচটি ড্র হলেও ৩.৩১ ইকোনমি রেটে প্রথম ইনিংসে মাশরাফি নিজের ঝুলিতে যোগ করেন ৪ উইকেট। তাঁর প্রথম শিকার ছিল গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার। এই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে মাশরাফির ব্যাট থেকে আসে ৮ রান।

২০০২

ডান হাটুতে মাশরাফির প্রথম অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তাঁর হাটুতে সমস্যাটা দেখা দেয় ২০০১ সালের নিউজিল্যান্ড সফরে। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচটিতে পিঠের বা পাশের পেশিতে চোট থাকা সত্ত্বেও মাশরাফিকে একাদশে রাখে টিম ম্যানেজমেন্ট। এই চোটের জন্য একাদশে তাকে রাখা হবে না বলে ম্যাচের আগে ধারনা করা হয়েছিল। কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে এক প্রকার বাধ্য হয়ে সার্জিক্যাল টেপ পেচানো চোটাগ্রস্থ পা নিয়েই ম্যাচে খেলতে হয়েছিল মাশরাফিকে। সেইসাথে নিউজিল্যান্ড সফরের পর ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে ডান পায়ে আরো একটি চোট পান তিনি। পরে ভারতে চিকিৎসার জন্য গেলে চিকিৎসক তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন।

২০০৩

এটা ছিল মাশরাফির ইঞ্জুরিময় আরেকটি বছর। এ কারণেই মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচটি খেলতে পারেননি যেখানে বাংলাদেশ মাত্র এক রানের যন্ত্রণাদায়ক পরাজয় বরণ করে। এরপর দুর্ভাগা মাশরাফি দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বকাপের মাঝপথে আবারো ইঞ্জুরির শিকার হন। বাংলাদেশ ওই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের দেয়াল টপকাতে ব্যর্থ হয়। মাশরাফি সেখানে দুই ম্যাচ খেলে নিয়েছিলেন দুটি উইকেট। একই বছরের অক্টোবরে ২ টেস্ট ও ৩ ওয়ানডে খেলার জন্য বাংলাদেশে পা রাখে ইংল্যান্ড। ওই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে বোলিং করে ফলো থ্রু থেকে ছিটকে গিয়ে বল ঠেকাতে গেলে মাশরাফির হাঁটু মোচড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। এই ইনজুরির আগে অবশ্য ক্যারিয়ার সেরা ৬০ রানে ৪ উইকেট তুলে নেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

২০০৪

ইনজুরির কারণে প্রায় পুরো বছরই মাঠের বাইরে থাকতে হয় মাশরাফিকে। কিন্তু ৯-২-৩৬-২ এর ম্যাজিক্যাল বোলিং ফিগার দিয়ে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ফেরেন তিনি। ব্যাট হাতে ওই ম্যাচে খেলেছিলেন ৩৯ বলে ৩১ রানের কার্যকরী একটি ইনিংস। ম্যাচে বাংলাদেশ ভারতকে পরাজিত করে এবং ম্যাচ সেরার পুরস্কার পান মাশরাফি বিন মুর্তজা।

২০০৫

জানুয়ারিতে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়েকে টেস্ট ম্যাচে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত কোন টেস্ট ম্যাচ ও টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ গ্রহণ করে। দুই ম্যাচে ৯ উইকেট এবং ৯৩ রান করে বাংলাদেশের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মাশরাফি। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ব্যাট হাতে মাশরাফি খেলেছিলেন ৪৮ রানের একটি ইনিংস যে ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পায় ২২৬ রানে। সেইসাথে একই বছর আশরাফুলের সেঞ্চুরিতে কার্ডিফে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক যে জয়টি পায় সেই জয়ে মাশরাফির ১০-২-৩৩-১ বোলিং স্পেলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

২০০৬

২৭ ওয়ানডেতে ৪৯ উইকেট সংগ্রহ করে ২০০৬ সালে সকল বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির মালিক হন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

২০০৭

এটা ছিল সেই বছর যখন বিশ্বকাপের আগে খুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিজের প্রিয় বন্ধু এবং জাতীয় দলের সতীর্থ মানজারুল ইসলাম রানাকে হারায় মাশরাফি। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ভারতকে পাঁচ উইকেটে হারানোর ম্যাচের ঠিক আগের দিন ১৬ মার্চ সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন মানজারুল ইসলাম রানা। এই দুঃসংবাদটি শুনার পর মাশরাফি খুব শোকাহত ছিলেন এবং তৎকালিন কোচ ডেভ হোয়াটমোরের প্রেরণায় ভারতের বিপক্ষে মাঠে খেলতে নামেন তিনি। মাঠে নেমে মাশরাফির ৯.৩-২-৩৮-৪ এর বিধ্বংসী বোলিং স্পেলে ভারতের শক্তিশালি ব্যাটিং লাইন আপ ধসে অলআউট হয়ে যায় মাত্র ১৯১ রানে।

২০০৮

পরিবার এবং বন্ধুদের কাছে ‘কৌশিক’ নামে পরিচিত মাশরাফি বিন মুর্তজা এ বছরই প্রথম জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। ঘরের মাঠে ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মত ওয়ানডে জয়ের পরপরই এই দায়িত্ব পান তিনি। শীঘ্রই অধিনায়ক হতে যাওয়া মাশরাফি বরাবরের মতই দুর্দান্ত বোলিং করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন এই ম্যাচে। ম্যাচে তাঁর বোলিং ফিগারটি ছিল ১০-৩-৪৪-৪।

২০০৯

আইসিসির র‌্যাংকিংয়ে সেরা দশ বোলারের একজন হয়ে যান ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে যেখানে ইনজুরির জন্য শুধু প্রথম টেস্ট ম্যাচটি খেলতে পেরেছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে ওই সিরিজটি জিতেছিল যেটা ছিল বিদেশের মাটিতে তাদের প্রথম কোন টেস্ট সিরিজ জয়।

২০১০

গত বছর পায়ের ইনজুরিতে ভোগা মাশরাফি  থেমে থাকেননি। ইঞ্জুরি থেকে ফিরে পুনরায় অধিনায়কের দায়িত্ব পান তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে প্রথমবারের মত তাদের মাটিতে ওয়ানডে ম্যাচে পরাজিত করে। এই ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচও নির্বাচিত হন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৪-০ তে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ায় সবকটি ম্যাচ খেলা হয়নি মাশরাফির। মাশরাফির নেতৃত্বেই সিরিজের প্রথম ম্যাচটিতে জয় পায় বাংলাদেশ।

২০১১

মাশরাফির জীবনের সবচেয়ে কষ্টদায়ক সময় ছিল এটা। এটি কারণ ইনজুরির কারণে এ বছরই ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি তিনি। সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে খেলতে নেমে সেবার প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ।

২০১২

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সর্বপ্রথম ‘পোস্টার বয়’ মাশরাফি বিন মুর্তজা এ বছর এশিয়া কাপের মাধ্যমে আবারো খেলায় ফিরেছিলেন তবে, অধিনায়ক হিসেবে নন। হাটুতে পরপর দুটি অস্ত্রোপচারের কারণে দীর্ঘ এক বছর মাঠের বাইরে থাকার পর খেলায় ফিরেছিলেন তিনি।

২০১৩

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সকে ২০১২ ও ২০১৩ মৌসুমের শিরোপা জিতিয়ে অধিনায়ক হিসেবে আবারো নিজেকে প্রমাণ করেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। কিন্তু তারপর আবার তিনি গোড়ালির ইনজুরিতে আক্রান্ত হন।

২০১৪

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্বের ভার পুনরায় বর্তায় মাশরাফির ওপর। তবে, সেই অধিনায়কত্ব কেবলই সীমিত ওভারের ক্রিকেটে। আর দায়িত্ব নিয়েই তিনি জিম্বাবুয়েকে দুই ফরম্যাট মিলিয়ে ৮-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করেন।

২০১৫

মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত কোন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়।  পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্বে এবং নবাগত পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের অসাধারণ বোলিং নৈপুণ্যে ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ জয় করে বাংলাদেশ। 

২০১৬

বাঁ-হাতি স্পিনার আরাফাত সানি ও ডান হাতি পেসার তাসকিন আহমেদকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালে অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের কারণে নিষিদ্ধ করা হলে পুরো দেশের মত শোকাহত হন মাশরাফি বিন মুর্তজা। তখন একের পর এক হারের বৃত্ত থেকে দলকে বের করার জন্য একটি জয়ের অনুসন্ধান করছিলো মাশরাফি। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে প্রায় জিতেও গিয়েছিল কিন্তু শেষ তিন বলে একটি রানও নিতে না পারায় বাংলাদেশকে ম্যাচটি হারতে হয় মাত্র এক রানে। শেষ তিন বলে টানা তিন উইকেট হারিয়ে জয়ের এই মুখ্যম সুযোগটি হাতছাড়া করে বাংলাদেশ।

২০১৭

দলে নবাগতদের সুযোগ করে দেয়ার জন্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে বিদায় জানান বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। আর তার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলছে তোলপাড়।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post