জলের রাজা

মেহেদী হাসান রোমেল
অক্টোবর ১২, ২০১৬
কিংবদন্তী সাতারু ব্রজেন দাশ কিংবদন্তী সাতারু ব্রজেন দাশ

 ‘১৯৬৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কলিকাতাতে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের বিয়ে হয়। পছন্দের বিয়ে। বিয়ের পর আমি বিক্রমপুরে মাত্র দুইবার গেছি। কিন্তু রাতে থাকি নাই। আমি ছন্দা দাশ কলিকাতা তিন নম্বর আলবার্ট রোডে থাকি। আমাদের দুই সন্তান। বড় মেয়ে সঙ্গীতা পাল ও ছেলে সমজিত দাশ। মেয়ের বিয়ে হয়েছে, স্বামী ড. সঞ্জয় পাল, ময়মনসিংহের ছেলে কলিকাতায় থাকেন। গবেষণার বিষয় হিউম্যান জেনেটিকস। সমজিত দাশ সাভার বিকেএসপিতে অধ্যয়ন করেছেন। খেলাধুলার পাশাপাশি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। বর্তমানে ভারতের ভূপালে চাকুরী করছেন।’

 

জীবনসঙ্গী দেহত্যাগের পর অধুনালুপ্ত ‘আমাদের বিক্রমপুর’ দৈনিকে এক সাক্ষাত্কারে এ কথাগুলো বলেছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী মধু ছন্দা দাশ, ব্রজেন দাশের স্ত্রী।

মধু ছন্দার নাম রেখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তার বাবা প্রদ্যুত বোস ছিলেন বিদ্রোহী কবি ও কিংবদন্তি সুরকার কমল দাশগুপ্তের বেশ কাছের লোক। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মধু ছন্দার শিল্পী মনের মধ্যে বিকাশ ঘটেছিল সরস কৌতুকবোধ। ‘ছেলেমেয়েরা কেন বাবার পথে হাঁটেনি’ প্রশ্নের জবাব তার তৈরিই থাকত, ‘জানেন তো, ময়রার ছেলে সন্দেশ খায় না।’

কিন্তু ব্রজেন দাশ সন্দেশ বানাতেন না। এমনও নয় যে, জন্মেছিলেন মুদি-ময়রাদের ঘরে। তার বাবা হরেন্দ্র কুমার দাশ বিক্রমপুরে সিরাজদীখান থানার কুচিয়ামোড় গ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। সেনাবাহিনীতে সাপ্লাই দিতেন। ১৯২৭ সালের ৯ ডিসেম্বর কুচিয়ামোড় গ্রামেই ব্রজেনের জন্ম। হরেন্দ্র দাশ খুব সাধ করে সন্তানের নাম রেখেছিলেন ব্রজেন, অর্থাত্ ‘স্বর্গের রাজা’। রাজত্ব তিনি কায়েম করেছিলেন বটে, সেটা জলে।  ধলেশ্বরী থেকে বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে বাস্তবের ব্রজেন হয়ে উঠেছিলেন ‘ইংলিশ চ্যানেলের রাজা’।

সন্তানরা যেহেতু বাবার পথে হাঁটেনি, ‘সন্দেশ’ সূচক মধু ছন্দার সেই সরস বক্রোক্তি কি তাহলে প্রচ্ছন্ন অভিমান থেকেও? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়ার সময় ফুরিয়েছে। ১৯৮৬ সালে ব্রজেনকে ‘কিং অব চ্যানেল’ তকমায় ভূষিত করেছিল চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশন। তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সম্মানসূচক লেটোনো ট্রফি। এ ট্রফি, তকমা সবই সর্বোচ্চ সংখ্যকবার সাঁতরে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ৩৪ বার চ্যানেল পাড়ি দেয়া কেভিন মার্ফি বর্তমানে সেই ট্রফি আর তকমার মালিক।

ওপেন ওয়াটার সুইমিংয়ে ব্রজেন দাশ তাই সেই সময়ের বিশ্বসেরা। এজন্য ওপেন ওয়াটার সুইমিংকে খানিকটা জেনে নেয়াও জরুরি। ১৮১০ সালের ৩ মে বেশ কয়েক মাইল সাঁতরে দার্দেনেলিস প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করেছিলেন ব্রিটেনের অন্যতম সেরা কবি লর্ড বায়রন। এ ঘটনাকে ধরা হয় ওপেন ওয়াটার সুইমিংয়ে আধুনিক যুগের শুরু হিসেবে। ৮৬ বছর পর আধুনিক অলিম্পিকের প্রথম আসরে সাঁতারের ইভেন্টগুলো আয়োজিত হয় ওপেন ওয়াটারে। সেখানে ছিল না দূরপাল্লার কোন ইভেন্ট। এর ১১২ বছর পর বেইজিং আসরে (২০০৮) ওপেন ওয়াটার সুইমিংয়ের (১০ মাইল) অভিষেক ঘটে অলিম্পিকে।

অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্তি আর বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগে সত্তরের দশক শুরুর অগ্রভাগ পর্যন্ত ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার প্রতিযোগিতাই ছিল দূরপাল্লার সাঁতারে বিশ্বের সবচেয়ে জমকালো ইভেন্ট। কলকাতার দৈনিক বর্তমানকে (৮-৪-১৯৮৫) ব্রজেন দাশ নিজেই বলেছিলেন, ‘১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীর উন্নতমানের সাঁতারুরা এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন এবং এ প্রতিযোগিতার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতেন ইংল্যান্ডের এক বিশিষ্ট হোটেল ব্যবসায়ী। এত উত্তেজনা, এত শিহরণ বোধহয় পৃথিবীর আর কোনো প্রতিযোগিতায় লক্ষ করা সম্ভবপর হয়নি।’

সেই উত্তেজনা আর শিহরণের আরেক পিঠে ঝুঁকিও ছিল। চ্যানেল সাঁতারকে বলা হয় ‘এভারেস্ট অব সুইমিং’। বিশ্বের খ্যাতনামা ক্রীড়া সাময়িকী ষ্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডকে (৬ মে ১৯৬৮ সংখ্যা) ইংলিশ চ্যানেল সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের রিটায়ার্ড অনারারি সেক্রেটারি জন উড একবার বলেছিলেন, ‘চ্যানেল আপনার ইচ্ছাশক্তি আর সহ্যক্ষমতা কেড়ে নেবে। যেসব সাঁতারু ভুগতে ভালোবাসেন, শাস্তির লোভে তারা চলে যান চ্যানেলে। বরফশীতল ঠাণ্ডা পানি আর বিরতিহীন ঢেউয়ের সঙ্গে কমপক্ষে ২০ ঘণ্টা জুঝতে হয় সাঁতারুদের। সেটা গ্রিসের জিরাগানোস, তোমাদের (যুক্তরাষ্ট্র) চ্যাডউইক কিংবা পাকিস্তানের ব্রজেন দাশের পক্ষে সম্ভব।’

ষ্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেডে সম্ভবত আর কোনো বাঙালি ক্রীড়াবিদকে নিয়ে এভাবে লেখা হয়নি। উডের সেই প্রশংসাটুকু ব্রজেন অর্জন করতে পেরেছিলেন ১৯৫৮ সালে প্রথম চেষ্টাতেই এশিয়ার প্রথম সাঁতারু হিসেবে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার অসামান্য কীর্তি গড়ে। বিলি বুলেটিন চ্যানেল ক্রসিং নামের সেই প্রতিযোগিতায় ২৩টি দেশের মোট ৩৯ জন সাঁতারু অংশ নেন,এ দলে ছয়জন মেয়ে সাঁতারুও ছিলেন। ব্রজেন দাশ ছেলেদের মধ্যে প্রথম!

পরবর্তী তিন বছরে টানা পাঁচবার চ্যানেল পাড়ি দেন ব্রজেন। সেই পথে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে গড়েন ন্যূনতম চারবার সাঁতরে চ্যানেল পাড়ি দেয়ার কীর্তি। সব মিলিয়ে ছয়বার, যা সেই সময়ের রেকর্ড। শেষবার (১৯৬১) পাড়ি দেয়ার পথে ভেঙে ফেলেন দ্রুততম সময়ে চ্যানেল পাড়ি দেয়ার ১১ বছরের পুরনো বিশ্বরেকর্ড (১০ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট)। সর্বোচ্চ ছয়বার ও সবচেয়ে কম সময়ে পাড়ি দেয়ার দুটি কীর্তি জায়গা পেয়েছিল গিনেস বুকে।

১৯৫৮ সালেই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এক বছরে তিনটি দূরপাল্লার সাঁতারে অংশ নেয়ার বিশ্বরেকর্ডও গড়েছিলেন ব্রজেন। ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড ও ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্স চ্যানেল সাঁতারে অংশ নেয়ার পাশাপাশি কাপরি থেকে নেপলস (৩৩ কিমি) সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ব্রজেন দাশ। তার আগে এক বছরে তিনটি লং ডিস্ট্যান্স সুইমিংয়ে নামেননি পৃথিবীর আর কোনো সাঁতারু। আর কেউই তার মতো পাননি রানী এলিজাবেথের সরস শুভেচ্ছাবার্তা, ‘মি. দাশ, আপনি তো ইংলিশ চ্যানেলকে নিজের গোসলখানায় (বাথটাব) পরিণত করেছেন।’

ব্রজেন দাশ কোন মাপের সাঁতারু ছিলেন, তা বলে গেছেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট’খ্যাত মোহাম্মদ আলী। রিংয়ের এ ‘প্রজাপতি’ একবার বলেছিলেন, ‘তুমি চ্যানেলের রাজা, আমি বক্সিংয়ের। কিন্তু আমার কাছে তোমার অর্জনই সেরা।’ সেই হোটেল ব্যবসায়ী ও তত্কালীন আয়োজক কমিটির সভাপতি বিলি বাটলিন সোজাসাপ্টাই বলেছিলেন, ‘প্রথম এশিয়ান হিসেবে চ্যানেল পাড়ি দেয়া, প্রথম স্থান অর্জন প্রথমবার অংশগ্রহণেই! ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল।’

ব্রজেনের কাছে চ্যানেলে সাঁতার স্রেফ প্রতিযোগিতা হয়ে থাকেনি। ওই ঠাণ্ডা জল তার জীবনতৃষ্ণা মেটাত। ১৯৮৪ সালে কলকাতার দৈনিক বর্তমানের প্রতিবেদক হিমাংশু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় ব্রজেন খুলে বলেছিলেন তার মনের ইচ্ছা, ‘আমার যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী, ইহকাল, পরকালকে ইংলিশ চ্যানেল আজো হাতছানি দিয়ে ডাকে। মনে মনে ছুটে যাই চ্যানেলের কালো মিশমিশে জলের রাজপ্রাসাদে, যেখানে সদাসর্বদা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করছে অগুনতি জেলি ফিশ আর নাম না জানা সামুদিক প্রাণীরা।’

মজার ব্যাপার, বিরল ঘরানার এ সাঁতারুকে শৈশবে সাঁতার শেখাতে বাধ্য করেছিল একটা শোল মাছ ! ১৯৯১ সালে পাক্ষিক অনন্যায় (১৬-৩১ ডিসেম্বর সংখ্যা) গোমর ফাঁস করেছিলেন ব্রজেন, ‘তখন বাবা থাকেন ঢাকা শহরে। আমি ও মা দেশের বাড়িতে। বাড়িতে যে কাজের ছেলেটি থাকে, সে প্রতিদিনই কাজের ফাঁকে ছিপ ফেলত পুকুরঘাটে। একদিন ও খেতে গেলে আমিই চুপি চুপি ছিপ ফেললাম। কিছু সময় কাটল। হঠাত্ ছিপ হাত ছেড়ে চলে যেতে চায়, আমিও নাছোড়। কিন্তু বড় বেশি টান, জলে পড়লাম, ছিপ তখনো হাতে। ছিপ ছাড়ব কেন? হয়তো চিত্কার করেছিলাম। মা ছুটে এসে আমার চেয়েও বেশি হইচই বাধিয়ে জল থেকে আমাকে তুলে আনলেন। ছিপ তখনো আমার হাতে এবং ছিপের সুতোয় গাঁথা ইয়া বড় এক শোল মাছ। জলে বিপদ সেই প্রথম টের পেলাম এবং বিপদের মোকাবেলায় সেই সাঁতার শুরু।’

সাঁতার শেখার পর বিক্রমপুরে ব্রজেনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল ধলেশ্বরী। কলা গাছ নামিয়ে সাঁতার কাটতেন। ঢাকার ফরাশগঞ্জে চলে আসার পর তার সঙ্গে মিতালী হয় বুড়িগঙ্গার। ব্রজেনের ভেতরকার ছাই চাপা আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গটুকু দেখেছে এ নদী। বুড়িগঙ্গাই ব্রজেনকে বানিয়েছে বড় সাঁতারু। ১৯৯২ সালে কলকাতার ‘আলোকপাত বিশেষ’ কাগজে লিখেছিলেন ব্রজেন দাশেরই বাল্যকালের বন্ধু দিব্যেন্দু গুহ, ‘শ্রাবণের ভরা বর্ষায় ছুটির দিনে আমরা দলবেঁধে বুড়িগঙ্গায় সাঁতার কাটতে এসেছি। বুড়িগঙ্গার উথাল-পাথাল ঢেউ দেখে আমরা পাঁচ-ছয়জন হয়তো আধঘণ্টা পরই উঠে এসেছি। কিন্তু ব্রজেন সেই ভরা নদীতে ততক্ষণে ওপার পাওয়ার পথে! আমরা ওর কাণ্ড দেখে চিত্্কার করে ডেকেছি, লাড্ডু ফিরা আয়, আইজ ওপারে যাইস না। নদীর অবস্থা আজ ভালো না। লা-ড্ডু ফিরা আয়। কিন্তু লাড্ডু মানে আমাদের ব্রজেন ফেরেনি। সে ওপারে উঠেই ছেড়েছে। মাঝেমধ্যে আমরাও ওর সঙ্গে সাঁতরে ওপারে গিয়ে ফেরিতে ফিরে এসেছি। ব্রজেন ওপারে দু-চার মিনিট দম নিয়ে সাঁতরেই এপারে ফিরেছে।’

১৯৪৪ সালে ঢাকায় একবার এক সাঁতার প্রদর্শনীতে এলেন অবিভক্ত দুই বাংলার প্রখ্যাত সাঁতারু প্রফুল্ল ঘোষ। ব্রজেনদের বাড়ির সামনে বিশাল পুকুরে আয়োজন করা হয় সেই প্রতিযোগিতা। সবশেষে প্রদর্শনী সাঁতারে প্রফুল্ল ঘোষের ঘাম ছুটে যায় ১৩ বছর বয়সী ব্রজেনের কাছে! দিব্যেন্দু গুহর মতে, পুকুরের অন্য পাড় ছুঁয়ে ব্রজেনই হয়তো আগে ফিরে এসেছিল। প্রফুল্ল ঘোষের জহুরি চোখ, তিনি ব্রজেনকে কলকাতায় গিয়ে বিধিবদ্ধভাবে অনুশীলনের পরামর্শ দেন। গুরুর আদেশ পালনে ব্রজেনের দেরি হয় ম্যাট্রিক পাস পর্যন্ত। দিব্যেন্দু গুহ লিখেছেন, ব্রজেন কলকাতা গিয়েছিলেন ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে। তার কলেজ জীবন কলকাতার বিদ্যাসাগরে, পুলের জীবন কেটেছে প্রফুল্ল ঘোষের আখড়া সেন্ট্রাল সুইমিং ক্লাবে। সাঁতারের আরো খোলনলচে জানতে যেতেন শ্যামাপদ গোস্বামীর কাছেও।

১৯৪৭ থেকে ’৫২ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রথম নয় তো দ্বিতীয়, সেন্ট্রাল সুইমিং ক্লাবের ব্রজেন। ১৯৫২ সালে গোটা পশ্চিমবঙ্গে ১০০ মিটার সাঁতার প্রতিযোগিতা জেতার পর ব্রজেনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। দেশে ফিরে ১৯৫৩ থেকে ’৫৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) ১০০, ২০০, ৪০০ ও ১৫০০ মিটার ফ্রিস্টাইল সাঁতারে তাকে কেউ হারাতে পারেনি। ১৯৫৫ পাকিস্তান অলিম্পিকে (জাতীয় অ্যাথলেটিকস আসর) ১০০ ও ৪০০ মিটার সাঁতার জেতার পর ব্রজেনের মনে দৃঢ়বিশ্বাস জন্মায়, পাকিস্তান সাঁতার দলের প্রধান সদস্য হিসেবে ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত।

কিন্তু মেলবোর্ন অলিম্পিক দলে ব্রজেন নয়, সেনাবাহিনীর চার সাঁতারুকে নিয়েছিল তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তান। বাকি ঘটনা আশি-নব্বইয়ের দশকে ডাকসাইটে সাময়িকী ‘ক্রীড়া জগত’-এ ‘আমার কথা’ শীর্ষক লেখা থেকে তার ভাষ্য তুলে ধরা হলো, ‘পুরো পাকিস্তান সাঁতারে আমি “একমেবাদ্বিতীয়ম”। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আমাকে দলভুক্ত করা হলো না। এর পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তান সাঁতারুদের নেয়া হলো। আমার মন ভেঙে যায়। তথাপি কিছু করার বা বলার নেই। কিন্তু আমার মনে দারুণ জেদ চাপল। কিছু একটা করার প্রবল ইচ্ছা হলো। সাঁতারে চমকপ্রদ এমন কিছু করতে হবে, যেন পশ্চিম পাকিস্তানের টনক নড়ে।’

‘...একদিন রোজকার মতোই খবরের কাগজ পড়ছিলাম। কলকাতার কোনো এক পত্রিকা। পড়তে পড়তে হঠাত্ এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। কোনো এক সাঁতারু চারবার চেষ্টা করেও চ্যানেল অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ তাকে নিয়ে ঢালাওভাবে লেখা হয়েছে। ঘটনাটি আমার মনে দাগ কাটে। তাছাড়া চ্যানেলের কথা আগে কখনো শুনিনি। ভাবলাম, চ্যানেল অতিক্রম করতে পারলে বোধহয় কিছু একটা করা যাবে। তাত্ক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে চ্যানেল অতিক্রম করতেই হবে।’

ব্রজেন দাশের অলিম্পিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না পাওয়ার ব্যাপারে তথ্য বিভ্রাট আছে। কোনো কোনো জায়গায় বলা হয়েছে, ঢাকায় একটি দুর্ঘটনায় ব্রজেন দাশের হাত ভেঙে যায়। এ কারণে তিনি পাকিস্তান অলিম্পিক দলে সুযোগ পাননি। ডেইলি স্টারের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘স্টার’-এর ২ জানুয়ারি ২০০৯ সংখ্যায় এক ফিচারে এ কথা জানিয়েছেন লেখক ইজাজ চৌধুরী। সে যা-ই হোক, ১৯৫৭ সালের জুলাইয়ে পুলে একনাগাড়ে ১২ ঘণ্টা সাঁতার কেটে চ্যানেল টপকানোর প্রস্তুতি শুরু করেন ব্রজেন। এর পর পুলে আরো ২৬ মাইল সাঁতারের পর ব্রজেন সিদ্ধান্ত নেন, একনাগাড়ে ৪৮ ঘণ্টা সাঁতার কাটবেন। এছাড়াও অংশ নিয়েছিলেন ঢাকা-চাঁদপুর দূরপাল্লার সাঁতারে। অলিম্পিক দলে সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট তত দিনে ব্রজেনকে খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। দ্রুততম সাঁতারু হিসেবে যার ক্যারিয়ার শুরু, মাঝপথে সেই ব্রজেনই হয়ে ওঠেন দূরপাল্লার সাঁতারু!

চ্যানেল সাঁতারে অংশ নেয়ার এক মাস আগে ইতালি-কাপরি ৩৩ মাইল সাঁতারে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় হন ব্রজেন। ডোভারে থাকাকালীন তৃতীয় শ্রেণীর লজিংয়ে অত্যন্ত কৃচ্ছ্রতা সাধন করে চলতে হয়েছে ব্রজেন, ম্যানেজার মহসিন ও কোচ মোহাম্মদ আলীকে। চ্যানেলের ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে যুঝতে গায়ে গ্রিজ মেখে অনুশীলন করতেন ব্রজেন। প্রয়াত খ্যাতিমান সাংবাদিক এবিএম মূসা ক্রীড়া জগতে লিখেছিলেন, ‘বিলাত পৌঁছে কোনো এক বিকালে আমি ডোভার গেলাম ব্রজেনের সঙ্গে দেখা করতে। সারা দিন ব্রজেনের অনুশীলন দেখলাম। গায়ে গ্রিজ মেখে সে পানিতে নামত, সারা দিন পানি দাবড়ে বিকালে উঠে পড়ত। আবার রাতে খাওয়ার পর পানিতে, মধ্যরাতে পানি ছেড়ে পাড়ে। সেই মে মাসেও দেখলাম চ্যানেলের পানি ভীষণ ঠাণ্ডা।’

ক্রীড়া জগতে ‘আমার কথা’ শীর্ষক (অনুলিখন দুলাল মাহমুদ) লেখা ও দিব্যেন্দু গুহের কাছে ঐতিহাসিক সেই সাঁতারের বর্ণনা দিয়েছেন ব্রজেন, ‘১৯৫৮ সালের ৮ আগস্ট। রাত পৌনে দুটো। গভীর অন্ধকার। সামান্য দূরের জিনিসও দেখা যায় না। কুয়াশার আবরণে ঢাকা। কনকনে ঠাণ্ডা পানি। ঢেউয়ের পর ঢেউ। এর মধেই সাঁতার শুরু হলো। ছেলেমেয়ে সমেত বেশ কজন। ২১ মাইল দীর্ঘ পথ সামনে। তবে জোয়ার-ভাটার কারণে ৩৫ মাইল পাড়ি দিতে হবে। বিধাতাকে স্মরণ করে সাঁতরাতে লাগলাম। বোটে চ্যানেল কমিটির পর্যবেক্ষক দল। সাঁতরাতে গিয়ে অনুভব করলাম চ্যানেল কী জিনিস! তবে আমার ভাগ্য অনুকূল ছিল। কারণ ওইদিনের আবহাওয়া ছিল বেশ শান্ত। কিন্তু ঘণ্টা দেড়েক পর দেখি আমাকে যে ডিঙি নৌকাটা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটা চোখের সামনে নেই ! পথ হারানোয় টানা ৪৫ মিনিট দিগ্ভ্রান্ত হয়ে আমি ডিঙিটিকে এদিক-ওদিক খুঁজেছি। পথ না হারালে ফলাফল আরো ভালো হতো।’

সাঁতারু ব্রজেন দাশ সাফল্যের কাঙাল হলেও সিনেমাপ্রেমিক তেমন ছিলেন না। সাঁতার আর মধু ছন্দার পর সিনেমা ব্রজেন দাশের তৃতীয় প্রেম। কয়েকটি ছবি প্রযোজনার পাশাপাশি ‘গোপাল ভাঁড়’ সিনেমায় অভিনয়ও করেছিলেন ব্রজেন। তার প্রযোজিত উত্তম-সুপ্রিয়া জুটির ‘স্ত্রী’ সিনেমাটি সেই সময়ে সুপারহিট হয় এবং সিনেমাটির আবেদন আজ পর্যন্ত একই রকম। এ ছবি প্রযোজনার বছর দশেক পর ব্রজেন দাশের প্রথম হার্ট অ্যাটাক হয়। ছয় বছর পর দ্বিতীয় স্ট্রোক এবং ’৯১তে তার বুকে চলে ওপেন হার্ট সার্জারি। এর মধ্যে ক্যান্সারও হানা দেয় শরীরে। তার পর আর পারেননি। ১৯৯৮ সালের ১ জুন কলকাতায় লোকান্তর ঘটে কুচিয়ামোড়ার ‘লাড্ডু’ তথা জলের রাজা ব্রজেন দাশের।

যুক্তরাষ্ট্র অলিম্পিক সুইমিং দলের অ্যাডভাইজার হিসেবে ১৯৬৪ সালে দেশটি সফরের সরকারি আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছিলেন ব্রজেন দাশ। সেখানে মাসব্যাপী সফরে ২৫টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য সফর করেন তিনি। তার টোটকা নিয়েই টোকিও অলিম্পিকের প্রস্তুতি নিয়েছিল মার্কিন সাঁতারু দল। ব্রজেন দাশ নিজেও বেশ ভালো সাড়া ফেলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ফ্লোরিডার গণমাধ্যম ‘টাম্পা ট্রিবিউন’ তাকে ‘বিশ্বের সেরা দূরপাল্লার সাঁতারু’ হিসেবে অভিহিত করে। সেই প্রতিবেদনের শুরুতে ট্রিবিউনের স্টাফ রাইটার চার্লস হেনরিক লেখেন, ‘সাঁতরে সর্বোচ্চ সংখ্যকবার ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া মি. দাশ ভীষণ মিশুক মানুষ। ব্রজেন নামের অর্থ জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, স্বর্গের রাজা।’

স্বর্গ না হোক, অন্তত পুলের সেই রাজা তার বক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন? ‘আমাদের বিক্রমপুর’ কাগজে দেয়া সেই সাক্ষাত্কারে মধু ছন্দা দাশ তার জীবনসঙ্গী প্রসঙ্গে সামান্য ধারণা দিয়েছিলেন, ‘তিনি আসলে চারপাশের মানুষের মধ্যে থেকেও একা ছিলেন। বড় নিঃসঙ্গ। শোষন-বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। মুখ ফুটে বলতে পারেননি। ওই সময় ইংলিশ চ্যানেল কমিটির একটা রেকর্ড ছিল, ৬৫ বছর বয়সে কেউ চ্যানেল সাঁতরে পাড়ি দিতে পারেনি। তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেকে প্রস্তুত করতে গিয়ে আর পারলেন না। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার ফলেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। একাত্তরের পর বাংলাদেশ সরকার আট কাঠা জায়গা অ্যালট দিয়েছিল মতিঝিলে। পাশে একজনের জায়গা ছিল, সে প্রস্তাব করল, বেশি জায়গা পেলে একটা সিনেমা হল বানাবে। চাপের মুখে ব্রজেন পানির দামে সেই জমি বিক্রি করে দেন। আজ সেই সিনেমা হলের নাম মধুমিতা। শুনেছি, জহরলাল নেহরু প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সুইমিং পুল আর বাড়ি-গাড়ি করে দেয়ার প্রস্তাব। বিনিময়ে তরুণদের সাঁতার শেখাতে হবে। বেশ লোভনীয় ছিল সেই প্রস্তাব। ব্রজেন দাশ আমাকে বলেছিলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও নাকি তাকে অনুরূপ প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রাওয়ালপিন্ডিতে রেখে দেয়ার। সুইমিং পুল, বাড়ি-গাড়ি সব দেবে। কিন্তু তিনি মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন দেশে।’

দেশের মাটিকে কামড়ে থাকার বিনিময়ে ব্রজেনকে তার জন্মভূমি কী দিয়েছে? দেশের কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির প্রসঙ্গ আজ তোলা থাক, কিন্তু আরেকজন ব্রজেন দাশকে তো এখনও দেখা গেল না ? কেউ তো তার মতো বলতে পারল না, ‘ষাইটের পর আরেকবার চ্যানেল পার হইতে পারলে ভালোই লাগত।’

মেহেদী হাসান রোমেল

তথ্যসূত্র

ব্রজেন দাশ (কিং অব চ্যানেল) ওয়েবসাইট

ডেইলি স্টার, উইকএন্ড ম্যাগাজিন

চ্যানেল সুইমিং এসোসিয়েশন ওয়েবসাইট

স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড ম্যাগাজিন

 

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post