সাকিব চাইলে সবই পারেন

উদয় সিনা
জুন ১০, ২০১৭
  সুপারম্যানের ফিরে আসা  সুপারম্যানের ফিরে আসা

একটু উল্টো পথে হাঁটি, শেষ থেকেই শুরু করি। ট্রেন্ট বোল্টের একটা ফুলার সাকিবের ব্যাটকে ফাকি দিয়ে সোজা আঘাত হানে স্ট্যাম্পে। সাকিবের মুখে হতাশার ছাপ। মাথা বাঁদিক-ডানদিক নাড়াতে নাড়াতে চলে যাচ্ছেন মাঠের বাইরে। তখন যদি এই ম্যাচে প্রথমবারের মত কেউ টিভি সেটের সামনে গিয়ে বসেন তাহলে সাকিব যে গত কয়েকটি ইনিংসের মতই আজও ব্যর্থ তা ধরে নিতে বাধ্য হবেন।

কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। সাকিবের সেই হতাশা কেবল শেষ মুহূর্তে মাঠে থেকে ম্যাচটা শেষ করে আসতে না পারায়। কারণ ম্যাচে তিনি যেভাবে খেলেছেন তাতে ম্যাচ শেষ করে মাঠ ছাড়ার যোগ্য দাবিদার ছিলেন। তবে এই হতাশার পূর্বে তিনি ব্যাট হাতে যে গল্প রচনা করে গিয়েছেন তা ততক্ষণে কার্ডিফের সীমানা পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। কীভাবে সেটা একটু পরেই বলি।

৬,০,১৯,১০,২৯ এইগুলো গত পাঁচ ইনিংসে সাকিব আল হাসানের রানসংখ্যা। বোলিংয়ে তো আরো বাজে পারফরম্যান্স। শেষ পাঁচ ম্যাচে উইকেট পেয়েছেন মাত্র ৩টি। এই পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে ২টি ছিল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মত বড় একটি টুর্নামেন্টে যেখানে কিনা বাংলাদেশ দীর্ঘ ১১ বছর পর খেলার সুযোগ পেয়েছে। সাকিব আল হাসান দলের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার।

তাই এই পারফরম্যান্সে টুর্নামেন্টের প্রথম দুই ম্যাচে সাকিবের অভাবটা দল হারে হারে টের পায়। সাকিব সাধারণত এতটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যান না। খারাপ সময় থেকে বের হয়ে আসতে বেশি সময়ও নেন না। কিন্তু এবার কিছুটা ব্যতিক্রমই ঘটলো। কোনভাবেই যেন ব্যর্থতার বেড়াজাল ভেদ করে বের হয়ে আসতে পারছিলেন না তিনি।

তাই ইতোমধ্যে তাঁর পারফরম্যান্সে হতাশ বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ও অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু এক সাক্ষাৎকারে সাকিবের বিকল্প এখন থেকেই খোঁজার ব্যাপারে নিজের মত প্রকাশ করেন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না সাকিব আল হাসান একজন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার, একজন চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটার। তাই একটু দেরি করে হলেও তাঁর প্রত্যাবর্তনটা হলো একজন চ্যাম্পিয়নের মতই।

গত ৬ ইনিংসে একটি ফিফটির মুখও দেখতে না পাওয়া সাকিব আল হাসান শুক্রবার সেঞ্চুরি করে তবেই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ঘুচালেন । শুধু তাই নয়। দীর্ঘ ৩৮ ইনিংস পর পাওয়া সাকিবের এই সেঞ্চুরিটি দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি জিততে সাহায্য করে।

ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ের সাথে ম্যাচ রিডিংকে ক্রিকেটের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের আয়নায় এই মানদন্ডের ক্রিকেটার হিসেবে কেবল একজনকেই দেখা যায়। তিনি সাকিব আল হাসান। আর তিনি কেন সকলের মধ্যে একজন তা গতকাল আরেকটিবারের মত প্রমাণ করে দিলেন।

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রথম ম্যাচের পর দ্বিতীয় ম্যাচেও প্রায় হেরেই গিয়েছিল বাংলাদেশ। টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের বিদায়ঘন্টা যখন বাজবে বাজবে বলে মনে হচ্ছিলো ঠিক তখনই স্বস্তি বয়ে আনে বৃষ্টি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রায় হেরে যাওয়া ম্যাচ পরিত্যাক্ত হওয়ায় এক পয়েন্ট পায় বাংলাদেশ যা টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে সাহায্য করে তাদের।

এক পয়েন্ট পেয়ে টুর্নামেন্টে টিকে থাকলেও দেয়ালে ঠিকই পিঠ ঠেকে গিয়েছিলো বাংলাদেশের। তাই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ছাড়া কোন বিকল্প ছিলো না তাদের সামনে। ঠিক এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারটি জ্বলে উঠলেন লাল সবুজের জার্সি গায়ে।

সাকিব আল হাসানের অফফর্ম নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা কাজ করছিলো দেশের ক্রিকেটপ্রেমিদের মধ্যে। তবে মুদ্রার অন্যপিঠে ছিলো সাকিবের প্রতি তাদের অগাধ আস্থা। সেই আস্থার প্রতিদান তিনি আজ দিলেন মাঠে। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে ব্যাট হাতে দলের জয়ে অসামান্য ভূমিকা রাখেন তিনি। বোলিংয়ে ছিলেন সাদামাটা।

১০ ওভারের স্পেলে ৫২ রান খরচায় পাননি কোন উইকেট। টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ২৬৬ রান। আপাতদৃষ্টিতে টার্গেটটা খুব বড় মনে না হলেও একটা সময় তা হয়ে যায় পাহাড়সম যখন বাংলাদেশ মাত্র ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বসে।

লক্ষ্য তাড়া করতে নেমেই কিউই পেসারদের শিকারে পরিণত হন একে একে তামিম, সাব্বির, সৌম্য ও মুশফিকের মত নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানরা। তখন ম্যাচের ভাগ্যটা নিউজিল্যান্ডের দিকেই হেলে পড়ছিলো। কিন্তু ক্রিকেট যে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা সেটিই যেন আরেকটিবারের মত প্রমাণ করতে মাঠে নামেন সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

শুরুতেই পিচ থেকে ভালো সিম মুভমেন্ট পাচ্ছিলেন টিম সাউদি। তাঁর সাথে ট্রেন্ট বোল্ট গতি ও বাউন্সারকে পুঁজি করে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের চেপে ধরেন। সাউদি একাই তুলে নেন বাংলাদেশের প্রথম ৩ উইকেট। তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যায় বাংলাদেশের টপ অর্ডার। ১২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুকতে থাকা বাংলাদেশ ৩৩ রানের মাথায় ৪র্থ উইকেট হারিয়ে পুরো বিপাকে পড়ে যায়।

তখন দলের হাল ধরেন সাকিব আল হাসান ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেয়ায় ছিলো তাদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা। এদিন দেখা মেলে এক ভিন্ন সাকিবের। তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে আউট হওয়া বা ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট বিলিয়ে দেয়ায় গত কয়েকমাসে কম সমালোচনার মুখোমুখি হয়তে হয়নি তাকে। কিন্তু আজ তিনি সে ভুলগুলো করেননি। ঠান্ডা মাথায় দলের দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিয়ে শুরু করেন ইনিংস।

পিচ থেকে প্রথমদিকে বোলাররা সাহায্য পাওয়ায় সমীহ করে খেলা শুরু করেন সাকিব। সাউদির সুইং, বোল্টের বাউন্স ও মিল্নের গতির নীলবিষ দমাতে পারেনি সাকিবকে। উইকেট ধরে রাখতে তিনি ধীর গতিতে ইনিংস বিল্ড আপ করতে থাকেন। অন্যপাশে মাহমুদুল্লাহও যোগ্য সঙ্গ দিতে থাকেন সাকিবকে। প্রথম পাওয়ারপ্লে শেষ হলে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলা শুরু করেন এই দুইজন ব্যাটসম্যান। এসময় ভালো বলকে সমীহ করে খারাপ বলকে সীমানাছাড়া করে খেলতে শুরু করেন সাকিব।

সময়ের সাথে সাথে বল একটু পুরনো হলে পিচটাও ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক হয়ে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রান তুলতে থাকেন সাকিব ও রিয়াদ। প্রথম ১০ ওভারে বাংলাদেশের রান যখন ৩ উইকেট হারিয়ে মাত্র ২৪, ২০ ওভার পরে সেটি দাঁড়ায় ৪ উইকেট হারিয়ে ৮৪ তে। ততক্ষণে পিচে থিতু হয়ে যান এই দুই ব্যাটসম্যান। খুব বেশি ডট বল না খেলে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলার পাশাপাশি মাঝেমাঝে বাউন্ডারি বের করতে থাকায় স্কোরবোর্ড প্রেসারটা কখনোই নিজেদের ওপর পড়তে দেননি সাকিব-রিয়াদ। ৬২ বলে নিজের অর্ধশত তুলে নেন সাকিব।

ফিফটি করার পরও বোলারদের ওপর চড়াও হননি সাকিব আল হাসান। ধীরে ধীরে ইনিংস আরো বড় করতে থাকেন। সাকিবের শটস সিলেকশন ছিলো দেখার মত, প্লেসমেন্টগুলো ছিল পারফেক্ট। কোনপ্রকার ঝুকি না নিয়ে গ্রাউন্ড শটেই মনোনিবেশ ছিলো তাঁর। গত কয়েকম্যাচে পেসারদের পাতা বাউন্সারের ফাদে পা দিলেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খুব সাবধানতার সাথে তিনি পুল খেলেছেন। এভাবে সেন্সিবল ক্রিকেট খেলে একসময় পৌঁছে যান ৯৯ রানে।

আর তখনই সাকিব আকাশে ভাসিয়ে বল পাঠিয়ে দেন সোজা গ্যালারিতে। পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সপ্তম সেঞ্চুরি। এই সময় দলও পৌঁছে যায় জয়ের কাছাকাছি। এর জন্য অবশ্য সাকিবের পাশাপাশি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকেও কৃতীত্ব দিতে হবে।

দুজনেই পঞ্চম উইকেট জুটিতে যোগ করেন ২২৪ রান যা বাংলাদেশের হয়ে যেকোন উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় এই রেকর্ড পরিমাণ জুটি গড়ার সময় দুজন কেউ কারো সাথে বেশি কথা বলেননি, পরামর্শও করেননি খুব বেশি। দুজনেরই লক্ষ্য ছিল শুধু খেলে যাওয়া যা ম্যাচ শেষে সাকিব, রিয়াদের কন্ঠে শোনা যায়। এভাবেই নীরবে খেলতে খেলতে একসময় দলকে কাঙ্ক্ষিত জয়ের বন্দরে ভেড়ান এই দুই ব্যাটসম্যান। সেইসাথে এমন একটি ম্যাচে চাপের মধ্যে নেমেও সাকিব আল হাসান ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ যে দুটি দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে দলকে ম্যাচ জেতান তা দাগ কাটে দেশি-বিদেশি অগণিত ক্রিকেটভক্তদের মনে।

লেখার শুরুতেই ট্রেন্ট বোল্টের বলে সাকিবের বোল্ড হবার যে কথা বলেছিলাম তা ঘটার আগে ১১ চার ও ১ ছয়ে সাকিব করে ফেলেন ১১৫ বলে ১১৪ রান। সবচেয়ে বড় কথা হলো এই ১১৪ রানের ইনিংসে সাকিবকে কখনোই তাঁর মনোঃসংযোগ হারাতে দেখা যায়নি যার জন্য বিগত দিনগুলোতে তিনি বেশকয়েকবার সমালোচিত হয়েছেন।

এই সাকিবই কয়েকদিন আগেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বড় শট খেলতে গিয়ে বার বার আউট হয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে বলতেন, এটা তাঁর স্বভাবসুলভ খেলা। তিনি এভাবেই খেলেন। কিন্তু তিনি যেভাবে আগ্রাসী হয়ে ডমিনেট করে খেলার চেষ্টা করেন সবসময় তা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দেখা যায়নি।

আসলে দলের প্রয়োজনে সাকিব দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে নিজের স্বভাবসুলভ খেলার বাইরে গিয়েও তিনি ম্যাচ বের করে আনতে পারেন। কথায় বলে না, ‘মানুষ চাইলে সবই পারে।’ আজ এটাকে একটু পরিবর্তন করে বলতে চাই, ‘সাকিব চাইলে সবই পারেন।’

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post