বিসিবি কর্তার একটি বাজে জনসংযোগ

আজাদ মজুমদার
এপ্রিল ৮, ২০১৭
 নাজমুল হাসানের আরও ভালভাবে সবকিছু সামলানো উচিত ছিল। নাজমুল হাসানের আরও ভালভাবে সবকিছু সামলানো উচিত ছিল।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসানকে আসলে একটা বড় ধন্যবাদ দেয়া উচিত। গোটা শ্রীলঙ্কা সফর জুড়েই বাংলাদেশ দলের সাথে থাকার জন্য এটুকু ধন্যবাদ তো তার প্রাপ্যই।  

নাজমুল হাসান একজন সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরও। এতসব দায়িত্ব সামলেও যে তিনি জাতীয় দলের শ্রীলঙ্কা সফরের জন্য সময় বের করতে পেরেছেন, এটা তো কম কথা নয়!

শ্রীলঙ্কা সফরে তিনি যতটা সময় কাটিয়েছেন ততটা সময় তিনি তার গোটা সংসদ সদস্য থাকাকালীন মেয়াদে সংসদে কাটিয়েছেন কিনা, এটাও একটা প্রশ্ন বটে। তিনি নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত মানুষ, ব্যস্ত নাহলে কেনই বা তিনি নিজের কর্পোরেট অফিস কিংবা বাসার নিচের পার্কিংয়ে বেশিরভাগ সংবাদ সম্মেলন ডাকবেন!

তিনি এতই ব্যস্ত মানুষ যে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলাকালে তিনি বিসিবি অফিসে আসতে পারেন না। কর্মকর্তাদের তখন তার কর্পোরেট অফিস, বেক্সিমকো হেডকোয়ার্টার্সে ছুটে যেতে হয় তার অনুমতি আনার জন্য। এতে আসলে দোষের কিছু নেই। ক্রিকেটের বাইরেও নাজমুল হাসানকে এত দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি সামলাতে হয় যে প্রেস, খেলোয়াড় ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বেক্সিমকো অফিসে ডেকে পাঠানোর জন্য আসলে তাকে খুব বেশি দোষও দেয়া যায় না।

তার সকল ব্যবসা ও ব্যস্ততা একপাশে ফেলে রেখে তিনি টাইগারদের চিয়ার আপ করার জন্য শ্রীলঙ্কা গেছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, এবং তার উপস্থিতিতে খেলোয়াড়েরাও সবসময় উদ্বুদ্ধ অনুভব করতে পারে। তার উপস্থিতিতে হিতে বিপরীত হয় কিনা সেটা নিয়ে একটা সন্দেহ অবশ্য ছিল, কিন্তু খেলোয়াড়েরা নিশ্চয়ই এতদিনে এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

গর্ডন গ্রিনিজ একবার নাজমুলের পূর্বসূরি সাবের হোসেন চৌধুরীকে ড্রেসিংরুম থেকে বের করে দিয়েছিলেন, এবং এর ফলস্বরূপ ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের স্মরণীয় জয়ের একদিন আগে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত হতে হয় গ্রিনিজকে।

দলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত নাক গলানো সত্ত্বেও চান্দিকা হাতুরুসিংহে নাজমুল হাসানের সাথেও একই কাজ করবেন এমনটা অবশ্য আশা করা বাড়াবাড়ি। নাজমুলের উপস্থিতি বরং হাতুরুর জন্য স্বস্তিদায়ক, অন্তত তার কথা সমর্থন করার জন্য কেউ তো একজন থাকেন।

গোটা সফরে বাংলাদেশ থেকে অনেক মিডিয়া কর্মী গিয়েছেন, কিন্তু বাংলাদেশ দলে কোন মিডিয়া ম্যানেজার ছিল না। তবে সেই দায়িত্বটা নাজমুল হাসানই সুন্দরভাবে পালন করে দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ যা কিছু ঘটেছে তার বেশিরভাগই সাংবাদিকেরা জেনেছেন নাজমুল হাসানের মুখ থেকে। এটিও আরেকটি প্রশংসনীয় কাজ। কোন কাজই ফেলনা নয়, বরং বিদেশের মাটিতে পিআর এর কাজের দায়িত্ব নেয়াটা একটু স্পেশালই বটে।

কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় শুক্রবার বাংলাদেশ দল ঢাকা ফেরার পরে। নাজমুল নিজের পিআর এর কাজের একটা খারাপ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন বিমানবন্দরে, যখন তিনি দাবি করেন মাশরাফি টি-টোয়েন্টি না, শুধু টি-টোয়েন্টি’র অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন।

মাশরাফি নিজে যেখানে শ্রীলঙ্কায় থাকতে তার বক্তব্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন, সেখানে নাজমুলের এমন বক্তব্য সত্যিই বিভ্রান্তিকর। সাথে সাথেই দেশব্যাপী আলোচিত হয়ে উঠে নাজমুলের বক্তব্য, সব মিডিয়ার ফোকাসেও পরিণত হয়। কোন কোন সংবাদপত্র তো এটাকে প্রথম পাতার হেডলাইনই করেছে, বাকি পত্রিকাগুলোও কার্টুন একে খবরটাকে উপস্থাপন করেছে।

সকলের আলোচনার বিষয় একটাই হয়ে উঠে, কেন নাজমুল হাসান এমন সাংঘর্ষিক বক্তব্য দিলেন? মাশরাফি যদি দলে থাকার জন্য বিবেচিতই হবেন, তাহলে তাকে অধিনায়কত্ব ছাড়তে হবে কেন? পর্দার পেছন থেকে কি কেউ কলকাঠি নাড়ছেন? বিসিবি প্রেসিডেন্টকেও কি সরকারের উচ্চমহল থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে? কারণ যাই হয়ে থাকুক না কেন, ঘটনাটা বিসিবি এবং নাজমুল হাসান দুই পক্ষেরই ইমেজের ক্ষতি করছে।

২০১৪ সালে নাজমুল নিজেই মাশরাফিকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক বানিয়েছিলেন। সিদ্ধান্তটা বাংলাদেশ ক্রিকেটকেই বদলে দেয়ার মত এক সিদ্ধান্ত ছিল। নাজমুলের অধীনে একটি সিদ্ধান্ত যদি তাকে বেছে নিতে বলা হয় যা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, তাহলে সেটি অবশ্যই এই সিদ্ধান্তটি। নাজমুল হাসানের প্রো-অ্যাক্টিভ সিদ্ধান্ত ছাড়া হয়তো বাংলাদেশ আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছাত না। এই কারণেই মাশরাফির এই ঘটনাটা নাজমুলের আরও সতর্কতার সাথে সামলানো উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি তা করতে পারেননি।

যা কিছুই তাকে প্রভাবিত করে থাকুক না কেন, মাশরাফি সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন, এবং বিসিবির উচিত ছিল সিদ্ধান্তটাকে সম্মান জানানো। বদলে নাজমুল হাসান একের পর এক বক্তব্য দিয়ে গেছেন, যা কেবল জলঘোলাই করেছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে মাশরাফিকে একটা ছোট্ট ধন্যবাদ জ্ঞাপনই সব নাটকের অবসান করে দিতে পারত, কিন্তু বিসিবির ব্যাপারটা ঠিকভাবে সামলাতে না পারার কারণে এখন এটা বিতর্কিত এক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নাজমুল হাসানের আরও ভালভাবে সবকিছু সামলানো উচিত ছিল।

--------------

- মূল লেখাটি When BCB boss makes a bad PR শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয় www. cricwizz.com-এ। অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় পার্থ।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post