আইপিএলকে স্টার্কের না, শুনছেন কি মুস্তাফিজ!

রিমন ইসলাম
ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৭
  বড় বিপদে পড়বেন না তো মুস্তাফিজ!  বড় বিপদে পড়বেন না তো মুস্তাফিজ!

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) খেলোয়াড় নিলামের ঠিক আগেরদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার তারকা পেসার মিচেল স্টার্ক জানিয়ে দেন এবারের আসরে তিনি রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর হয়ে খেলবেননা। আসন্ন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি এবং অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট খেলার জন্য নিজেকে বাড়তি বিশ্রাম দেয়ার জন্যই তার এই সিদ্ধান্ত।

এতে তিনি হারিয়েছেন বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আট কোটি টাকা। এই টি-টোয়েন্টির যুগে এসে দেশ এবং টেস্ট ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে আইপিএল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন এই বাঁ-হাতি পেস সেনসেশন।

একজন খেলোয়াড়ের স্বাভাবিকভাবেই তার দেশকে আগে প্রাধান্য দেয়ার কথা থাকলেও এই অধুনা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যুগে খেলোয়াড়রা প্রায়শই ফ্র্যাঞ্জাইজি ক্রিকেটকেই এগিয়ে রাখেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিকাংশ তারকা ক্রিকেটাররা কেন্দ্রীয় চুক্তিতে সাক্ষর করেননা বিশ্বব্যাপী এই ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে খেলার জন্য।

শ্রীলঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা তো বছরখানেক আগে টেস্ট ক্রিকেটকেই বিদায় জানিয়ে দেন আইপিএল খেলার জন্য নিজেকে ফিট রাখতে। সাম্প্রতিক সময়েই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়ে টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেকে সাময়িকভাবে বিরত রেখে আইপিএলে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দক্ষিণ আফিকার মারকুটে ব্যাটম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স।

এসবের ভিড়ে দেশের কথা ভেবে নিজেকে আইপিএল থেকে সরিয়ে নিয়ে স্টার্ক যেন নতুন করে বুঝিয়ে দিলেন টাকাটাই সব নয়। দেশপ্রেম এবং পেশাদারিত্বের সাম্য বজায় রেখে এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সাধুবাদ পেতেই পারেন স্টার্ক।

স্টার্কের গুনকীর্তন করতে গিয়েই মনে পরে গেল আমাদের এক সোনার ডিম পাঁড়া হাঁসের কথা যাকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মোতাবেক ব্যবহার না করে আমরা ইতোমধ্যেই অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছি। তাতে অবশ্য তাঁর দোষটাও কম নয়।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। বলা হচ্ছে আমাদের মুস্তাফিজুর রহমানের কথা। ২০১৫ সালে অনেকটা ধূমকেতুর মত আগমনের পর থেকেই যিনি প্রতিনিয়ত আমাদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন বল হাতে যাদুর ছোঁয়ায়। তবে একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ২০১৬ সাল জুড়েই ইনজুরিতে ভুগে তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশ দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো ম্যাচ মিস করেছেন মুস্তাফিজ।

এর মধ্যে রয়েছে এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সিংহভাগ ম্যাচ, আফগানিস্তান ও ইংল্যান্ড সিরিজ। অনেকটা আনফিট অবস্থাতেই নিউজিল্যান্ডে গিয়ে প্রথম ওয়ানডেতে তাকে নামিয়ে দিলেও ফিটনেসের ঘাটতির কারণে আর একটি ওয়ানডে এবং দুটি টি-টোয়েন্টিতে সীমাবদ্ধ ছিল মুস্তাফিজের উপস্থিতি।

বল হাতেও ছিলেন না ততটা কার্যকর। একই কারণে বাদ পরেন ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টেও। শ্রীলংকা সফরে দলে থাকলেও মুস্তাফিজের ফিটনেস এবং লম্বা ইনজুরির ধকল সামলে মানসকিকভাবে নিজেকে ফিরে পাওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়।

চোট আঘাতে জর্জরিত ২০১৬ সালে বাংলাদেশ দল মুস্তাফিজের সাভির্স সেভাবে না পেলেও মুস্তাফিজের আইপিএলের দল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ একটি ম্যাচ বাদে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই খেলিয়েছিল তাকে। সানরাইজার্সের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মুস্তাফিজ।

আইপিএল শেষে আফগানিস্তান ও ইংল্যান্ড সিরিজের আগে বেশ ভাল একটা সময় বিশ্রামে কাটানোর কথা ছিল মুস্তাফিজের। তা না করে অনেকটা দ্বিধাদ্বন্দে থেকে শেষমেশ ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্ট খেলতে ইংল্যান্ড পাড়ি জমান তিনি।

কিন্তু লিকলিকে এই শরীরে টানা খেলার ভার সামলাতে না পেরে মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচেই মুস্তাফিজ পড়লেন কাঁধের ইনজুরিতে। ডাক্তারদের পরামর্শ মোতাবেক অস্ত্রোপচার করানো হল এবং তাতে প্রায় ছয় মাসের জন্য মাঠের বাইরে ছিটকে গেলেন তিনি।

ছয় মাস পেরিয়ে মুস্তাফিজ মাঠে ফিরলেও নিজেকে পুরোপুরি ফিরে পাওয়ার লড়াইটা এখনো দৃশ্যমান। এমতাবস্তায় শ্রীলংকা সফরেই বোঝা যাবে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য মানসিক এবং শারীরিকভাবে কতটা প্রস্তুত তিনি।

তবে, এখানে মূল আলোচ্য বিষয় এই সফরের পরপরই মুস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহন। বাংলাদেশ দলে যেমন মুস্তাফিজকে ফিটনেস, ইনজুরির কথা ভেবে বেঁছে বেঁছে খেলানো হয় সেটা কিন্তু সানরাইজার্সে হবে না। তাঁরা চেষ্টা করবে গতবারের মত এবারো তাকে সবগুলো ম্যাচেই খেলাতে।

আর এটাই বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্তদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এমনিতেই এই বছর বাংলাদেশ দলের সামনে রয়েছে ব্যস্ত ক্রিকেটসূচি। তাই দলের অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে বাংলাদেশ দল চাইবে মুস্তাফিজ যেন সারা বছরই সম্পূর্ণ ফিট অবস্থায় থাকেন।

কিন্তু, সদ্য ইনজুরি ফেরত মুস্তাফিজের আইপিএলে অংশগ্রহন সেই পরিকল্পনাটাকে কি আদৌ সফল হতে দেবে? দিনশেষে ক্রিকেট বোর্ড, ভক্ত-সমর্থকরা যত যাই বলুন না কেন, নিজের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নিতে হবে মুস্তাফিজকেই।

যেহেতু, তিনি এবারও আইপিএলে খেলার জন্য সম্মতি জানিয়েছেন। আমরা শুধু এটুকুই আশা করতে পারি তিনি যেন টুর্নামেন্ট শেষে সুস্থভাবে ফিরতে পারেন। আর বাংলাদেশ দলের হয়ে আগামী দিনগুলোতে অবদান রাখতে পারেন।

তবে, ভবিষ্যতে ক্লাব ক্রিকেটে খেলার ব্যাপারে দেশের হয়ে খেলাটাকে আগে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি স্টার্ককে অনুসরণ করলে সেটা তার এবং বাংলাদেশ দল উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। কেননা আজ থেকে ২০ বছর পর লোকে মুস্তাফিজকে স্মরণ করবে বাংলাদেশ দলের হয়ে তাঁর কীর্তিগাথা দিয়ে, আইপিএল-বিপিএল-সিপিএল দিয়ে নয়।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post