এই সাকিবকেই দরকার

রিমন ইসলাম
ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০১৭
  সাকিবকে তাঁর মতই খেলতে দিন।  সাকিবকে তাঁর মতই খেলতে দিন।

অভিযোগটা তাঁর বিপক্ষে ছিল অনেক আগে থেকেই। তবে ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই সেটা দিন দিন যেন তীব্র আকার ধারণ করছে। ইংল্যান্ড সিরিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিউজিল্যান্ড এবং ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টেও বেশ কয়েকবার বিপদের সময় দলের হাল ধরার পরিবর্তে আত্নঘাতী ব্যাটিংয়ে নিজের উইকেট বিসর্জন দিয়ে দলকে ঠেলে দিয়েছেন আরো বিপদের মুখে।

কখনো আবার হটাৎই তেড়েফুঁড়ে খেলতে গিয়ে অপমৃত্য ঘটিয়েছেন অপার সম্ভাবনাময় ইনিংসের। ফলশ্রুতিতে বারবার সমালোচনার ঝড় উঠছে এবং প্রতিবারই বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি এভাবে আউট হওয়া নিয়ে কোনরকমের অনুশোচনায় ভুগতে রাজি নন। কারণ সাকিবের বিশ্বাস তিনি এভাবে খেলেই আজকের ‘সাকিব’ হয়ে উঠেছেন এবং এ পর্যায়ে এসে ব্যাটিংয়ের ধরন বদলে ফেললে তিনি আর আগের সাকিব থাকবেননা। বেশ যুক্তিপূর্ণ কথা।

সাকিব যেহেতু বারবার একই কথা বলে যাচ্ছেন তাই বোঝাই যাচ্ছে নিজের শক্তিমত্তা এবং দুর্বলতা সমন্ধে জেনেবুঝেই তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। সমালোচনায় নিজেকে বদলানোর পাত্র তিনি নন। তাই প্রশ্নটা উঠছে আমরা কি সাকিবের তিন ফরমেটেই একই মাইন্ডসেটে ব্যাটিং মেনে নিবো নাকি নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকাকে সমালোচনার নতুন এক উপলক্ষ খুঁজবো? একটু খতিয়ে দেখা যাক।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই সাকিব যদি একটু সচেতনভাৰ ব্যাট চালাতেন তাহলেই ইংল্যান্ডের সাথে ওয়ানডে এবং সিরিজ বাংলাদেশ জিতে যেত। নিউজিল্যান্ডের সাথে প্রথম টেস্ট ড্র করতে পারতো এবং ভারতের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে দলীয় সংগ্রহটা আরেকটু ভারী হত যা খেলার ফলাফলে ভূমিকা রাখতেও পারত। সবাই যেখানে খারাপ খেলে সমালোচনার মুখে পড়েন, সেখানে প্রতিটি ম্যাচেই ব্যাট কিংবা বল হাতে ধারাবাহিকভাবে পারফর্মেন্স করেও সাকিব একই পরিণতি ভোগ করছেন।

নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের একজন ব্যাটসম্যান ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন, বিরল এই অর্জনে সাকিবময় কাব্য রচনা হওয়ার বদলে সাকিব সর্বমহলে নিন্দিত হলেন দ্বিতীয় ইনিংসে উচ্ছাভিলাসী শট খেলতে গিয়ে শূন্য রানে আউট হওয়ার অপরাধে। প্রথম ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যান হিসেবে হোক কিংবা ম্যাচের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হোক, সাকিবের ওভাবে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসাটা ছিল ভীষণ দৃষ্টিকটু। সাকিব উইকেটে কিছুক্ষন টিকে গেলেই বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ম্যাচটা ড্র করতে পারতো। সাকিব পারেননি, পারেনি বাংলাদেশও।

তবে আউট হওয়ার ধরণ নিয়ে সাকিবকে কাঠগড়া দাঁড় করানো গেলেও পরাজয়ের জন্য সাকিবকে দোষারোপ দেয়াটা হবে অন্যায়। মনে রাখতে হবে প্রচণ্ড চাপের মুখে সাকিবের করা ডাবল সেঞ্চুরির কল্যানেই লড়াই করে হারার জায়গা থেকে বেরিয়ে কিউইদের বিপক্ষে টেস্টে ড্র করার স্বপ্ন দেখতে পেরেছিল বাংলাদেশ এবং পৌঁছেও গিয়েছিল অনেকদূর। সাকিবই আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছন আবার সাকিবই স্বপ্নভঙ্গের কারন হয়েছেন।

সাকিবের বিরুদ্ধে আরো একটি অভিযোগ তিনি স্বার্থপর এবং দলের কথা ভেবে খেলেননা। তব তিনি যে স্বার্থপর নন, নিজের জন্য খেলেননা তার উৎকৃষ্ট প্রমান তার টেস্ট পরিসংখ্যান। সাকিবের নামের পাশে মাত্র চারটি শতক খুবই বেমানান। তবে সাকিব যদি একটু নিজের কথাও ভেবে খেলতেন, তাহলেই শতকের সংখ্যাটা আজ দুই অংকের ঘরে থাকত তাঁর।

৮০ থেকে ৯৭ রানের মাঝেই সাকিব আউট হয়েছেন ৯ বার। একটু আলোকপাত করলেই দেখা যাবে অধিকাংশ ইনিংসগুলোর অপমৃত্য ঘটেছে কোন উচ্চাভিলাসী শট খেলতে গিয়েই। শচীনের মত ব্যাটসম্যানও ডজনখানেকবার আউট হয়েছেন নার্ভাস নাইন্টিসের শিকার হয়ে। শতরানের দোড়গোড়ায় গিয়ে অধিকাংশ ব্যাটসম্যানই একটু সাবধানী হয়ে খেলেন। সিংসেল ডাবলসেই একটু একটু করে মাইলস্টোনের দিকে এগিয়ে যান।

তবে, এর ব্যাতিক্রম ভারতের সাবেক মারকুটে ব্যাস্টম্যান বীরেন্দ্র শেবাগ। ২৯৫ রান থেকে ছক্কা মেরে ৩০১ রানে পৌঁছানোর সাহস এবং সামর্থ্য কেবল তারই ছিল। দানিশ কানেরিয়ার যে বলটিতে শেবাগ বলটিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, টাইমিংয়ের গড়বড়ে সেটি ক্যাচেও পরিণত হতে পারতো। যদি হত তাহলে একযোগে সবাই শেবাগের মুণ্ডুপাত করতেন এবং আফসোসও করতেন। তবে শেবাগ কিন্তু আফসোস করতেননা।

খারাপ লাগতো তার অবশ্যই, তবে সেটি হত টাইমিং ঠিকঠাকমত না করার জন্য, ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলার জন্য নয়। এবার একটু মিলিয়ে দেখুন, আমাদের সাকিবও কিন্তু আফসোস করছেন, তবে সেটা শুধুমাত্র অসময়ে আউট হওয়ার জন্য, আউট হওয়ার ধরন নিয়ে নয়। বলছিনা শেবাগের সাথে সাকিবের তুলনা করতে হবে, তবে দুজনই নিজ নিজ ব্যাটিং স্টাইলে বিশ্বাসী এবং এটাই তাদের সাফল্যের মূলমন্ত্র।

এভাবে খেলেই তাঁরা একেকজন শেবাগ, সাকিব হয়েছেন এবং তারা এভাবেই খেলেই তারা দলের জন্য অবদান রাখবেন। এখানে পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী তাদের খেলার ধরণ বদলানোর কোন সুযোগ নেই।

বলা হচ্ছে বোলার সাকিব আল হাসান দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলেও ব্যাট হাতে তিনি ততটা নির্ভরতার প্রতীক নন। আসলেই কি তাই? একজন আদর্শ অলরাউন্ডারের দলে ব্যাটসম্যান এবং বোলার উভয় ভূমিকাতেই আলাদাভাবে দলে থাকার যে যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন তা সাকিবের খুব ভালোভাবেই আছে। অভিজ্ঞতা এবং কার্যকারিতার দিক থেকে বোলার হিসাবে সাকিবই টেস্টে দলের সেরা বোলার। অন্যদিকে প্রায়শই বাজে শট খেলে আউট হলেও ব্যাটম্যান হিসেবে তিনি দলের অন্যতম সেরা।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ দলে খেলছেন শুধুমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে যিনি ১১ ইনিংস পর হায়দ্রাবাদ টেস্টে  হাফসেঞ্চুরির দেখা পেলেন। বর্তমান টেস্ট দলে তামিম, মুমিনুল এবং মুশফিকের পর সাকিবই দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকারী ব্যাটসম্যান। বিদেশের মাটিতে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে চতুর্থ ইনিংসে একমাত্র ম্যাচ জেতানো ইনিংসটি এসেছিল এই সাকিবের ব্যাটে চড়েই।

২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ৬৭ রানে ৪ উইকেট পতনের পর নেমে সাকিব খেলেছিলেন ৯৬ বলের অপরাজিত ৯৭ রানের নায়োকোচিত একটি ইনিংস যা সেদিন কোন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান পারেননি। সেদিনও কিন্তু জয় পরাজয়ের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থাতেও সাকিব তার স্বভাবসুলভ আক্রমনাত্বক ভঙ্গিতেই ব্যাট করে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। টেস্টে ব্যাট হাতে গত ৪ বছরে দলের অন্যান্যদের পারফর্মেন্স পর্যবেক্ষন করলেই দেখা যাবে অনায়াসে কেবল ব্যাটসম্যান হিসেবেই টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার দাবিদার সাকিব আল হাসান।

এবার আসা যাক বর্তমান টেস্ট অলরাউন্ডার র‌্যাংকিংয়ে এক নাম্বারে থাকা ভারতের রবীচন্দন অশ্বিনের সাথে সাকিবের তুলনা প্রসঙ্গে। পরিসংখ্যান বলছে ব্যাটে বলে সাকিবকে টেক্কা দিয়েই এক শীর্ষস্থান দখল করেছেন অশ্বিন। একজন ব্যাট করছেন পাঁচে, অন্যজন ছয় থেকে আটে। ব্যাটসম্যান হিসেবে বাংলাদেশ দলে সাকিবের ভূমিকা স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের মতোই। অন্যদিকে বিরাট কোহলির পাঁচ বোলার খেলানোর সুবিধার্থে অশ্বিন ব্যাট করছেন ওপরের দিকে এবং নিজের ব্যাটিং প্রতিভার সাক্ষর রেখে তিনি ব্যাট হাতেও বেশ কার্যকারী হয়ে উঠছেন।

ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপে ব্যাট হাতে অশ্বিনের ভূমিকা হল স্বীকৃত ব্যাটসম্যানদের সাথে সাপোর্টিভ রোলে খেলা এবং লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে ইনিংস বড় করা কিংবা ইনিংস মেরামতের কাজ করা। আর এখানেই সাকিবের সাথে অশ্বিনের পার্থক্য। সাকিবের কাজ একজন স্বীকৃত ব্যাটসম্যানের মত দলের বিপর্যয়ে হাল ধরা এবং বড় ইনিংস খেলে দলীয় সংগ্রহ সমৃদ্ধ করা যে কাজটি তিনি সফলতার সাথেই করে যাচ্ছেন।

এখানে সাকিবের আউট হওয়ার ধরনের চেয়ে মূল বিষয়বস্তু তিনি দলের চাহিদা মোতাবেক দায়িত্ব পালন করতে পারছেন কি না। অশ্বিন যোগ্যতাবলেই শীর্ষে, তবে এর মানে এই নয় যে তিনি খেলোয়াড় হিসেবেও সাকিবকে ছাড়িয়ে গেছেন।

ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের স্বভাভসুলভ আক্রমনাত্ত্বক ব্যাটিং বদলে রক্ষনাত্ত্বক ব্যাটিং করার জন্য দক্ষিণ আফিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স সবার কাছেই এক অনুকরণীয় আদর্শ। এই কারণেই তার অনেক দুর্ধষ ইনিংসের চেয়েও দর্শকদের মনে বেশি গেথে আছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তার সেই ২২০ বলে ৩৩ রানের ইনিংসটির কথা।

কিংবা বলা যেতে পারে ভারতের তারকা ব্যাস্টম্যান বিরাট কোহলির কথা। চারটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন, অথচ তাতে ছয়ের মার ছিল মাত্র একটি যা তার মত আক্রমনাত্ত্বক একজন ব্যাটসম্যানের কাছে থেকে অপ্রত্যাশিতই। নিজেদের কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে অসাধারণ সব ইনিংস খেলতে পারেন বলেই সময়ের অন্যতম সেরা দুইজন ব্যাটসম্যান তারা। এক্ষেত্রে সাকিবের প্রসঙ্গ আসতেই পারে যে তার পারলে সাকিব কেন নয়?

আমাদের দেখতে হবে ভিলিয়ার্স এবং কোহলির দলগত অবস্থান এবং বাংলাদেশ দলে সাকিবের অবস্থান। উভয়েই নিজ নিজ দলের সেরা ব্যাটসম্যান হওয়া স্বত্তেও তাদের শক্তিশালী ব্যাটিং অর্ডার তাদের খেলার ধরন বদলাতে সাহায্য করে। ভিলিয়ার্স সেই ইনিংস মাটি কামড়ে পরে থাকেলও ওপর প্রান্তে ডিফেন্ড করেও দুর্দান্ত এক শতক হাঁকিয়ে তার চাপটা কমিয়েছিলেন ডু প্লেসিস। ফলে ভিলিয়ার্সের জন্য কাজটা কিছুটা হলেও সহজ হয়ে গিয়েছিল।

আবার কোহলির চারটি ডাবল সেঞ্চুরিতে মাত্র একটি ছক্কা থাকার মানে এই নয় যে তিনি একেবারে রক্ষনাত্ত্বক ভঙ্গিতে ব্যাট করেই রানগুলো করেছেন। কোহলির আক্রমণের ধরনটাই আলাদা। তিনি সিঙ্গেলস, ডাবলস নিয়েও আক্রমানাত্ত্বক ক্রিকেট খেলতে পারেন। দুই রানকে তিন রানে পরিণত করে তিনি প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করেন.মানসিকভাবে। তাই ছক্কা না মারা স্বত্তেও তার ইনিংসগুলো রক্ষনাত্বক হয়ে যায়নি।

এবার একটু সাকিবের দিকে চোখ ফেরানো যাক। মুশফিক ছাড়া মিডল অর্ডারে আর কেউ নেই যিনি একপ্রান্ত আগলে রেখে রান বের করে নিতে পারেন। মাহমুদল্লাহ রিয়াদ ভুগছেন আধারাবাহিকতায়। সাব্বির, সৌম্য, লিটন, সোহান, মিরাজরা এখনো পরিণত হয়ে ওঠেননি। এমতাবস্থায় তামিম, ইমরুল, মুমিনুলের উইকেট পতনের পর ধরে খেলা এবং রানের চাকা সচল রাখা দুটোরই দায়িত্ব বর্তায় সাকিব এবং মুশফিকের ওপর।

মুশফিক টেস্ট মেজাজে ব্যাট করে একপ্রান্ত ধরে খেললেও সাকিবের ফর্মুলা থাকে রানের চাকা সচল রেখে জুটিটিকে মজবুত করা। ২০০ বলের একটি জুটি থেকে ৫০ রান এবং ১২০ রান সংগ্রহের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। জুটিটির স্থায়িত্ব সমান হলেও ৭০ রানের ব্যবধানটি ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিতে সক্ষম।

অন্যদিকে মুশফিকের পর যারা ব্যাট করতে নামেন তাদের সাথে নিয়ে আরো ৪০-৫০ ওভার মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কাছে সাকিবের কাছে শ্রেয়তর মনে হয় ১০-১৫ ওভার খেলে ৭০-৮০ রান করা। যেহেতু আক্রমণই সাকিবের মূলমন্ত্র, সেক্ষেত্রে ডিফেন্সিভ খেলতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে আউট হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশেই বেড়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকিটা না নিয়ে সাকিব নিজের মত খেলেই দলের জন্য অবদান রাখতে চান।

ম্যাচ বাঁচানোর সময়ও হিসেবটা একই। চারিদিকে ঘিরে ধরা ফিল্ডারদের মাঝে রক সলিড ডিফেন্সের পরীক্ষা না দিয়ে সাকিব চান পাল্টা আক্রমণ করে প্রতিপক্ষের গেম প্ল্যান পরিবর্তনে বাধ্য করতে। তাতে তিনি সফল হলে রক্ষণের কাজটাও হয় এবং প্রতিপক্ষও কিছুটাও রক্ষনাত্বক হতে বাধ্য হয়। কিন্তু ব্যর্থ হলেই দল পড়বে ঘোর বিপদে এবং তিনি সমালোচিত হবেন অবিবেচকের মত আউট হওয়ার অপরাধে। তবে খেয়াল রাখতে হবে সাকিবের খেলার ধরণের কিন্তু কোন পার্থক্য নেই।

অশ্বিন কিভাবে দলে অবদান রাখছেন, ভিলিয়ার্স-কোহলিরা কিভাবে নিজেদের ধরন বদলে খেলেন এসব দিয়ে ব্যাটসম্যান তথা অলরাউন্ডার সাকিবের মুল্যায়ন করাটা হবে একেবারেই অনুচিত। ১০ বছর ধরে এভাবে খেলেই সাকিব আজকের সাকিব হয়েছেন, তাই তিনি খুব ভাল করেই জানেন কিভাবে খেললে তিনি সেরাটা দিতে পারবেন এবং দলের জন্য অবদান রাখতে পারবেন।

সাকিবের যেহেতু নিজের অপর বিশ্বাসটা আছে, তাই আমাদেরও উচিত তার ওপর ভরসা রাখা। দলীয় চরম বিপদের মুহূর্তে নামবেন, সমর্থকদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে প্রতিটি বলেই শট খেলবেন এবং পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করবেন, এটাই সাকিব আল হাসান। ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যায় সাকিবের খেলার ধরন হয়ত প্রশবিদ্ধ থেকেই যাবে, কিন্তু আমাদের সেই মানুষটার ওপর ভরসা রাখতে হবে যিনি সাধারণের মাঝেও হয়ে উঠেছেন অসাধারণ।

মনে রাখবেন, বাংলাদেশ দল যদি কখনো টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে কখনো ৫০-৬০ ওভারে ৩০০ রান তাড়া করে জিতে যায়, তবে সেটা সম্ভব হবে সাকিবের কল্যানেই। আবার ম্যাচ বাঁচানোর জন্য ব্যাট করতে হলে সেটাও সাকিব পড়বেন, তবে সেটা সাকিবীয় স্টাইলেই, ভিলিয়ার্স-কোহলি স্টাইলে নয়।

সাকিব যেহেতু নিজের খেলার ধরণ বদলাবেন না, সেক্ষেত্রে তিনি ব্যাটিং অর্ডারে একধাপ নিচে নেমে ব্যাট করলে তা দলের এবং সাকিবের উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। এক্ষেত্রে অশ্বিন নয়, সাকিবের সাথে তুলনা চলতে পারে ইংলিশ অলরাউন্ডার বেন স্টোকসের। গত বছর দক্কিন আফ্রিকার বিপক্ষে ছয় নম্বরে ব্যাট করতে নেমে তার ১৯৮ বলে ২৫৮ রানের ইনিংসটি ওয়ানডে ক্রিকেট হিসেবেও ছিল দুর্ধষ।

সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ডিফেন্সটাও বেশ মজবুত হয়েছে এবং স্পিনে উন্নতির ছোয়ায় স্টোকস ক্রমশ হয়ে উঠছেন ইংল্যান্ডের ট্রাম্প কার্ড। একদিকে দলের পঞ্চম বোলার হিসেবে খেলার পর ব্যাট করতে নামার আগে বিশ্রামটাও পাচ্ছেন একটু বেশি, অন্যদিকে ছয়ে নেমে আক্রমণ-রক্ষণের মিশেলে খেলতে পারছেন নিজের খেলাটাও।

ফলে স্টোকসকে নিজের খেলার ধরণে তেমন পরিবর্তন করতে হচ্ছেনা এবং ব্যাটিং অর্ডারে তার উপস্থিতি দলকে যোগাচ্ছে বাড়তি শক্তি। সাকিবের বেলায়ও এমনটা সম্ভব যদি ব্যাটিং অর্ডারে কিছুটা অদলবদল করা যায়। কিপিং ছেড়ে মুশফিক ব্যাট করবেন চারে, রিয়াদ পাঁচে এবং সাকিব ছয়ে। মুশফিক এবং সাকিবের মাঝে রিয়াদের উপস্থিতি এই দুজনকে তাদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে সাহায্য করবে এবং পাশাপাশি ব্যাটিং লাইনআপটাও হবে ব্যালান্সড।

সাকিব আল হাসানের ভুলে দল ভুক্তভোগী হলে হতাশায় তিনি নিজেই ভুগবেন আমাদের চেয়েও কয়েকগুন বেশি যা আমরা কখনোই বাইরে থেকে উপলদ্ধি করতে পারবোনা। সাকিব বাংলাদেশ দলের অন্যতম সেরা প্রফেশনাল ক্রিকেটার যিনি মাঠে এবং মাঠের বাইরে আবেগের কোন জায়গায় দেননা। আর দেননা বলেই তার সমসাময়িক অনেক প্রতিভাবানদের পেছনে ফেলে তিনি আজ ধরাছোয়ার বাইরে।

তাই বাজে শট খেলে আউট হওয়ার পরও সাকিবকে স্বাভাবিক দেখে ভাবার কোন কারন নেই তিনি বিচলিত নন। নিজের ভুল-ত্রুটি নিয়ে তিনি অবশ্যই অবগত থাকেন এবং সে অনুযায়ী তিনি কোচিং স্টাফের সাথে আলোচনা করে তা শুধরেও নেয়ার চেষ্টাও করেন। তাই এমনটা ভাবার কোন কারন নেই সাকিব ইচ্ছামত ফ্রি লাইসেন্স খেলেন এবং তিনি টিম ম্যানেজমেন্ট কিংবা কোচ কারোরই তোয়াক্কা করেননা।

যেহেতু সাকিব বারবার একই ভুল করার পরও নিজের মত করেই খেলে যাচ্ছেন, তাতে এটা অন্তত নিশ্চিত হওয়া যায় দলের পক্ষ থেকে তাকে সেই স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। সবাই দলের জন্যই খেলেন, সাকিবও তার ব্যতিক্রম নন। সাকিব সেভাবেই দলের জন্য অবদান রাখবেন যেভাবে তিনি দীর্ঘ দশ বছর ধরে অবদান রাখছেন। কাজেই সাকিব দলের কথা ভেবে খেলেননা, তিনি স্বার্থপর, এইসব অভিযোগ আর ধোপে টেকেনা।

সাকিবকে তাই তার মতোই খেলতে দিন। প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এই খেলোয়াড়ের অন্তত নিজের খেলা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ববোধ অবশ্যই রয়েছে এবং আমরা আশা করবো তিনি ভুল-ত্রুটি থেকে নিজেকে শুধরে নিবেন, তবে অবশ্যই নিজেকে বদলে নয়। কারন আমদের যে এই সাকিবকেই দরকার।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post