‘আমি নিশ্চিত করছি যে আমি আরো ক্ষুধার্ত থাকবো’

সাম্য দাশগুপ্ত
মার্চ ২৫, ২০১৭
 তামিম ইকবালের বিশেষ সাক্ষাৎকার। তামিম ইকবালের বিশেষ সাক্ষাৎকার।

ডাম্বুলায় বাংলাদেশের ৯০ রানের জয়ে তামিমের অবদানটাই সবচেয়ে বেশি। এই ম্যাচেই তিনি পেয়েছেন ওয়ানডেতে নিজের অষ্টম সেঞ্চুরি। আর সেটাই তাঁকে এনে দিয়েছে ম্যাচ সেরার পুরস্কার। আর এই ম্যাচ খেলতে নামার ক’দিন আগেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নিজের ১০ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন তামিম। লম্বা এই ক্যারিয়ারের নানা দিক নিয়ে তামিম মুখোমুখি হয়েছিলেন লম্বা এক সাক্ষাৎকারে।

রোমাঞ্চকর অথচ নিরুদ্বেগ স্ট্রোকপ্লেয়ার থেকে দায়িত্বশীল সিনিয়র ব্যাটসম্যান। এই দশ বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার এই ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে কিছু বলুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হলো, যখন আমি শুরু করেছিলাম, কেউ আমার কাছে তেমন কিছু প্রত্যাশা করেনি। আমি শুধু একভাবেই ব্যাটিং করতে জানতাম, আমি সেটাই করেছিলাম আর তাতে কেউ কিছু মনে করেছে বলেও মনে হয়নি।  তখন আমার হাতে দু-একটা শট ছিলো, ঘুরেফিরে সেগুলোই খেলতাম। কিন্তু, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনাকে উন্নতি করে যেতে হবে, সময়ের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, আরো নতুন নতুন সব শট শিখতে হবে।  যখন খেলা শুরু করেছিলাম, আমাকে কেউ চিনতোও না; যখন ভালো খেলতে শুরু করলাম, সবার চোখে পড়লাম তখনই।  আমি তখন শুধু আমার জোনে থাকা বলগুলো খেলতে পারতাম, তাই বোলাররা এমন জায়গায় বল করতে শুরু করলো যেখানে আমি স্বচ্ছন্দ্য নই। ফলে আস্তে আস্তে হাতে শট বাড়ালাম, দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করতে হলো। কিছু কিছু জায়গায় ঠিক হলো, কিছু হলো না।  সিনিয়র প্লেয়ার হিসেবে সবাই আমার থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করতে শুরু করলো।  এজন্য এবার খেলার ধরণটা বদলে ফেললাম। প্রতি বলেই মারতে যাওয়াতে মজাটা বেশি, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে রান করতে হলে সেটা বদলাতেই হবে। আমি এখনো পারফেক্ট নই, তবে বেশ খাটছি।  মানুষ যখন আমার থেকে আরো ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে, আরো বেশি রান প্রত্যাশা করে, আমাকে স্মার্টও হতে হবে কিছুটা।

কোন জায়গাটাতে অস্বচ্ছন্দ্য ছিলেন? শরীরের দিকে ধেয়ে আসা বলগুলোতে?

আমি বরাবরই অফসাইডে খেলতে পছন্দ করতাম, লেগে নয়। বরাবরই কিছুটা জায়গা খুঁজতাম, ব্যাট ঘুরানোর জন্য কিছুটা জায়গা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর শ্রীলংকা সফরে গেলে ওরাই প্রথম এ দূর্বলতাটা খুঁজে বের করে আমার। তাঁরা আমার লেগসাইডে বোলিং করতে থাকলো, আর আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম না। সব কোচেরাই ওখানে ছিলেন, তাঁরা আমাকে বললেন খেলাতে উন্নতি আনতে হবে। এরপর এটা নিয়ে বেশ কথা হলো, তাঁরা বললেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আয়েশ করার সুযোগ নেই। আমার উন্নতি করতেই হতো। আর এখন লেগসাইডে খেলাটা আমার শক্তিশালী দিকগুলোর মধ্যে একটা।

গত ১৭ মার্চ ছিলো সেই ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো সেই ম্যাচের দশ বছর পূর্তি।  পোর্ট অফ স্পেনে আপনি যেভাবে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসে জহির খানকে উড়িয়ে মেরেছিলেন, ভারতের কেউ সে দৃশ্য এখনো ভুলতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের মানুষও সেটা বেশ মনে রেখেছে! যখন আমি জাতীয় দলে সুযোগ পেলাম, আমি তাতেই বেশ খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। বয়স নেহায়েত কম ছিলো, বুঝতে পারছিলাম না আমার আসলে কি করা উচিত। আমরা জানতাম, দল হিসেবে আমাদের অবশ্যই খুব ভালো খেলতে হবে।  আমি জানি না কীভাবে, কিন্তু আগে থেকেই মনে হচ্ছিলো আমরা ভারতকে হারিয়ে দিতে পারবো।  দলে শচীন (টেন্ডুলকার), (বীরেন্দর) শেবাগ, রাহুল (দ্রাবিড়), সৌরভ (গাঙ্গুলী) অনেকেই ছিলেন... তবু আত্মবিশ্বাসী ছিলাম আমরা। সৌভাগ্যবশত আমরা ভারতকে কম রানেই আটকে দিতে পেরেছিলাম (১৯১ রান), পরে জিতেছিলামও। [ম্যাচে তামিম ৭ চার এবং ২ ছক্কায় ৫৩ বলে ৫১ রান করেন। ] বিশ্বকাপের মত জায়গায় ভারতকে হারিয়ে দেওয়াতে আমরা দারুণ আত্মবিশ্বাস পেয়ে গিয়েছিলাম।  পরে সুপার এইটে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকেও হারিয়েছিলাম।  পুরোটাই শুরু হয়েছিল ভারতের বিপক্ষে জয় থেকেই।

সিনিয়র প্লেয়ার হিসেবে দলে আপনার মর্যাদা এবং দায়িত্ব আপনার কাছে কী গুরুত্ব বহন করে? 

সিনিয়র প্লেয়ার হিসেবে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা হলো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।  ভারতে রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলীরা একটা লিগ্যাসি রেখে গেছেন।  তাঁরা চলে গেছেন বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, তবু মানুষ এখনো তাঁদের নিয়ে কথা বলে। আমি, মুশফিক কিংবা সাকিবও একটা লিগ্যাসি রেখে যেতে চাই। পারফর্ম তো করতেই হবে, তবে আপনাকে একই সাথে অনুসরণীয় একজন ব্যক্তিত্বও হতে হবে। গ্রুপে আপনাকে একজন লিডার হতে হবে। আমি ২০টা সেঞ্চুরি করলাম, কিন্তু নেতার মত কাজ করলাম না, তাহলে কিন্তু সবাই ভুলে যাবে ক’দিন পর।  দলকেও নেতৃত্ব দিতে হবে আমার। সেটার জন্য অধিনায়ক বা সহ-অধিনায়ক হওয়াটা জরুরী নয়, বরং নির্ভর করে নিজেকে কীভাবে সামলাচ্ছি এবং ড্রেসিংরুমে আমি কি করছি সেটার উপর।

শুনলাম, দলে নতুনদের ধাতস্থ করার দায়িত্বটা নাকি আপনার উপরই বর্তেছে।

আমি যতটা পারি, চেষ্টা করি। দলে নতুন আসার পর কেউই সেভাবে কমফোর্টেবল থাকে না।  অনেক ইস্যু আছে, কোচের সাথে ভাষাগত একটা পার্থক্য রয়েছে।  আমি যখন নতুন, সিনিয়ররা আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। তাই এখন নতুনদেরকে কমফোর্টেবল করে দেওয়াটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। যেটা বললাম আগেই, রান করা কিংবা উইকেট নেওয়ার চেয়েও বড় ব্যাপার লিগ্যাসি রেখে যাওয়া, এমন কেউ হয়ে ওঠা যাকে নতুনরা অনুসরণ করতে পারে।

ব্যাটিংয়ে ফিরি। শুরুতে যা কিছু পেতে চেয়েছিলেন, সে হিসেবে নিজের বর্তমান অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এর চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম নিঃসন্দেহে। অনেক সুযোগ হারিয়েছি আমি।  ওয়ানডে রেকর্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমি ৩৪টা ফিফটি করেছি কিন্তু হান্ড্রেড মাত্র ৭টা।  এটা অন্যরকমও হতে পারতো। আমার অন্তত আরো ১০টা ফিফটিকে হান্ড্রেডে পরিণত করা উচিত ছিলো। এটা হতাশাজনক, এতগুলো সুযোগ পেয়েও সেটা করতে না পারা।  এমন না যে আমি অন্য কাউকে দোষ দিচ্ছি, আমার নিজেরই দোষ। যদি আরো কিছু হান্ড্রেড পেয়ে যেতাম, হয়তো এখন আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতাম। এখনো আমার বয়স ২৮, এটা ভালো যে এখনো হাতে কিছুটা সময় আছে আমার। একই ভুল আবার না করলে হয়তো আরো ভালো করতে পারবো।

টেস্টে অবশ্য ওডিআইয়ের তুলনায় কিছুটা ভালো, ২২টা ফিফটির পাশাপাশি ৮টা সেঞ্চুরি।  আমার মনে হয়, অন্তত আরো সাত আটটা সেঞ্চুরি পাওয়া উচিত ছিলো আমার।  তবে হ্যা, কনভার্সন রেট হিসেবে ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে। আরো বেশ কিছু সেঞ্চুরি পেলে হয়তো আরো ভালো হতো, তবে গত দুই বছরে আমি বেশ ধারাবাহিকভাবেই রান করছি। আপাতত এই ধারাবাহিকতাই রক্ষা করতে চাই।

দলের কথা বাদ দিন।  আপনার কি মনে হয় আপনি নিজেই নিজেকে হতাশ করেছেন?

নিঃসন্দেহে। শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্টে লাস্ট ইনিংসটাই দেখুন। দারুণ ব্যাটিং করছিলাম, ভুল করিনি তেমন, সেঞ্চুরিটা পেয়ে যাওয়ারই কথা ছিলো। অথচ ৮২ রানে গিয়ে বাজে শট খেলে আউট হয়ে গেলাম।  এসব আমাকে হতাশ করে। আমার এভারেজ এখনো চল্লিশও ছোঁয়নি, যদি আমার এভারেজ ৪৫ বা ৫০ হতো... কোহলি বা অন্যদের দেখুন, ওদের এভারেজ প্রায় ৫০।  ওপেনার হিসেবে আমার অন্তত ৪৫ এভারেজ থাকা উচিত, খুবই হতাশাজনক। যদি আমি খারাপ খেলতাম বা সেভাবে সুযোগ না পেতাম, তাহলে বুঝতাম। কিন্তু সব পাওয়ার পরও আমি সে সুযোগ হারিয়েছি।  পঞ্চাশ পেরোনোর পর বারবার উইকেট ছুড়ে দিয়ে এসেছি। যা গেছে তা গেছে, সামনে কী হয় দেখা যাক এবার।

সারা বিশ্বে বিভিন্ন টি-টোয়েন্টি লিগে খেলা দুজন বাংলাদেশি খেলোয়াড় আপনি এবং সাকিব।  ক্রিকেটে এটা আপনাকে উন্নতি করতে কতটুকু সাহায্য করেছে?

বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে আপনি অনেক কিছু শিখতে পারবেন। বিদেশি খেলোয়াড়ের পারফর্ম করতেই হবে। বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে আপনি যখন কোথাও যাবেন, আপনার সতীর্থরা আপনার উপর নির্ভর করবে। চাপ তো থাকবেই; তবে চাপটা সামলাতে পারলে অনেক কিছু শিখতেও পারবেন। বাইরে খেলতে গিয়ে আমি এটাই সবচেয়ে বেশি এঞ্জয় করি। রান করতে পারলে খুব ভালো লাগে আমার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তো চাপটাই সব; সারা বিশ্বে খেলার সুযোগ পাওয়ার সেরা দিক এটাই।

দলের ব্যাপারে আসা যাক এবার। বাংলাদেশ দারুণ একটা সময় পার করছে, তাই না?

ওডিআইতে আমরা ভালো পারফর্ম করছি। সে কনফিডেন্সটাই আস্তে আস্তে টেস্ট ক্রিকেটেও চলে আসছে। ৫০-৬০ রানগুলো এখন ১০০, ১৫০, ২০০তে পরিণত হতে শুরু করেছে।  ছোট ছোট পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। দল হিসেবে এখনো সম্পূর্ণ নই আমরা, উন্নতির জায়গা এখনো অনেক রয়েছে। কিন্তু তার জন্য দেশে বা দেশের বাইরে আমাদের আরো বেশি করে খেলা দরকার।  ইংল্যান্ড সিরিজের পর নিউজিল্যান্ড, ভারত এবং শ্রীলংকায় আমরা বেশ কিছু টেস্ট খেলে ফেলেছি।  আমরা প্রতি বছর ২-৩টার মত টেস্ট পাই, সেখানে এ বছর ইতিমধ্যে অনেকগুলো টেস্ট খেলে ফেলেছি আর এখনো অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫-৬টার মত টেস্ট বাকি।  এমন চলতে থাকলে আমাদের গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হবেই। মাঝে মাঝে এমন ম্যাচ আসবে, যেখানে আমরা আমাদের সামর্থ্যমত খেলতে পারিনি। কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে, এর আগে আমরাই দারুণ কিছু ম্যাচও খেলেছি। সবার জীবনেই ব্যাড প্যাচ আসে, দলের ক্ষেত্রেও সেটা সত্যি। কিন্তু তাতে আত্মবিশ্বাস হারালে চলবে না। টেস্ট আপনি যত খেলবেন, ততই উন্নতি করবেন। ওডিআইতে চিত্রটা পাল্টাতে শুরু করেছে, ঘরের মাঠের পাশাপাশি বাইরেও আমরা ম্যাচ জিততে শুরু করেছি। কিন্তু আরো ভালো করতে হবে আমাদের, আর সেটার জন্য আরো বেশি ম্যাচ খেলতে হবে আমাদের।  অভিজ্ঞতার সাথে সাথেই এটা চলে আসবে। ঘরের মাঠে আমরা এখন শক্তিশালী ওয়ানডে সাইড, এখন সময় শক্তিশালী টেস্ট দলে পরিণত হওয়ার। তারপর ছোট ছোট স্টেপে এগোতে হবে, আস্তে আস্তে বিদেশেও ভালো করতে শিখতে হবে।

মনে হচ্ছে, অবশেষে আপনি, মুশফিক কিংবা সাকিব, তিনজন সিনিয়র প্লেয়ারই একসাথে পারফর্ম করতে শুরু করেছেন। কলম্বো টেস্ট সেটারই উদাহরণ। দলের জন্য সেটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এটা। বেশ কিছুদিন হয়ে গেল টেস্ট খেলতে শুরু করেছি আমরা, ভালো কিছু পারফরম্যান্স দেওয়ার সময় এটাই। সিনিয়র প্লেয়াররা যদি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে দারুণ কিছুর, তরুণদের জন্য সেটা অনুসরণীয় হবে। আমাদের তিনজনের জন্যই সেটা দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ওয়ানডেতে কয়েক বছর আগে থেকে বেশ কমপিটিটিভ ক্রিকেট খেলছে।  হঠাৎ এমন বদলে যাওয়ার কারণটা কি?

বাংলাদেশের সবসময়ই সে সামর্থ্যটা ছিলো, শুধু আত্মবিশ্বাসটা ছিলো না।  অবশ্যই আমাদের স্কিলটাও ছিলো। ক্রিকেটে এটা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, আপনি যেকোনো দলকে হারাতে পারেন, আপনি হান্ড্রেড বা ফিফটি মারতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, আমরা এটা করতে পারি। আস্তে আস্তে তিন-চার ম্যাচ সিরিজে আমরা একটা-দুটো করে জিততে শুরু করলাম, এরপর বিশ্বাসটা চলে এলো।  অন্তত ঘরের মাঠে ‘উই ক্যান ডু ইট’ বিশ্বাসটা দৃঢ় হলো। আমরা এক ধাপ এগিয়ে এবার আমাদের স্কিলটা বাড়িয়ে নিতে শুরু করলাম।

খেলোয়াড়দের সাথে সাথে কোচরাও দারুণ একটা ভূমিকা রেখেছে। তাঁরা সবাই আমাদের স্কিলটা দেখেছে, আমাদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেটেছে। বর্তমান কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে একটা বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন, আমরা সেরা পাঁচটা দলের একটা হয়ে উঠতে পারি। জেমি সিডন্স এই দলে নিজের উপর বিশ্বাস করতে বলার ট্রেন্ডটা শুরু করেছিলেন।

এমন কি হয়েছে যে সিনিয়র প্লেয়ার, মানে আপনারা ভেবেছেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার আর একটু কম্পিটিটিভ হওয়ার সময় এসে গেছে?

আমাদের নিজেদের মধ্যে, মানে আমি, মাশরাফি (মর্তুজা), মুশফিকুর (রহিম), (মাহমুদউল্লাহ) রিয়াদ এবং সাকিব (আল হাসান) প্রায়ই এ নিয়ে আলোচনা করতাম। আমরা পরিবর্তন আনতে চাইতাম। মাশরাফিকে অনেকটা ক্রেডিট দিতেই হবে, দলকে ওই অবস্থা থেকে এই অবস্থায় আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা মাশরাফিরই। তিনি ক্যাপ্টেন হওয়ার ক’দিন পর থেকেই বলতে শুরু করেছিলো, ২০১৫ বিশ্বকাপে আমরা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবো। সবসময় সে এটা বলতেই থাকতো।  শুরুর দিকে কেউ তাঁর ওই কথা অতটা সিরিয়াসলি নেয়নি, ভেবেছিলাম সে এটা বলার জন্যই বলছে। সে একেবারে প্রথম ম্যাচ থেকেই এটা বলে এসেছে। প্র্যাকটিস ম্যাচে হেরে গেছিলাম, তবু আশা ছাড়িনি। সে আমাদের সাথে যেভাবে কথা বলতো, মনে হতো সত্যিই হয়তো আমরা বড় দলগুলোকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারবো। এরপর বাকিটা আপনারা দেখেছেন। ওর ভূমিকাটা সবচেয়ে বেশি।

হাতুরুসিংহের অধীনে বাংলাদেশ তো দারুণ করছে। তিনি দলে এমন কি নিয়ে এসেছেন?

টিম কালচারের ক্ষেত্রে অনেকটা ক্রেডিট তাঁর প্রাপ্য। তিনি আসলেই অনেকটা বদলে দিয়েছেন আমাদের। আমি সবসময় জেমি সিডন্সের কথা বড় মুখ করে বলি। সিডন্স আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে ব্যাটিং-ফিল্ডিং নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। এরপর আরো দুই-তিনজন কোচ পরিবর্তন হয়ে অবশেষে হাতুরুসিংহে এলেন। খেলা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো একেবারে অন্যরকম। খেলাটা সম্পর্কে অনেক বেশি জানেন, প্রতিপক্ষের সম্পর্কে তথ্যও বেশি রাখেন। খুবই কঠিন ব্যক্তিত্বের অধিকারী তিনি। সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো, তিনি খেলোয়াড়দের দারণ আত্মবিশ্বাসের যোগান দিতে পারেন। সবসময় তাঁকে পাশেই পাবেন আপনি।  “ম্যাচের প্রথম বল হোক বা শেষ বল, যদি তুমি ছক্কা মারতে পারো, তাহলে মারো।  তোমার শট, যদি তোমার খেলতে ইচ্ছে করে, খেলো।  তুমি আউট হলে আমি সামাল দেবো সেটা।” আমি যখন ২০১৪-১৫ সালে ধুঁকছিলাম, আমাকে দল থেকে বাদ দেওয়াও যেতে পারতো; কিন্তু তিনি কখনোই আশা হারাননি, আমার উপর ভরসা রেখেছিলেন।  আমাকে বুঝিয়েছিলেন, দলের জন্য আমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে কনফিডেন্স দিয়েছিলেন। আর এরপর তার ফলাফল আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন, আমি আমার ক্যারিয়ারের সেরা দুটো বছর কাটাচ্ছি।  শুধু আমিই নই, পুরো দলটাই।

কোর্টনি ওয়ালশ? দলে তাঁর অবদানটা কেমন?

আমার ওয়ালশের সম্পর্কে মন্তব্য করাটা আসলে ঠিক হবে না। উনি তো আসলে বোলারদের নিয়েই কাজ করেন, তবে দারুণ মানুষ উনি। ড্রেসিংরুমে এরকম ক্যারেক্টার আপনি সবসময়ই পেতে চাইবেন। তিনি বোলিং কোচ বটে, তবে নতুন কোনো ধারণা বা চিন্তা আমাদের সাথে শেয়ার করতে কখনোই লজ্জাবোধ করেন না। তিনি আমাদেরকে কনফিডেন্স দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি ক্যারেক্টার বটে একটা!

দারুণ কিছু তরুণ প্রতিভা উঠে এসেছে সম্প্রতি, যেমন- মুস্তাফিজুর রহমান, মেহেদী হাসান মিরাজ, সৌম্য সরকার। এদেরকে পূর্বসূরীদের থেকে বেশি প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে... কীভাবে সম্ভব হলো এটা?

দশ বছর আগে আমাদের যে অবস্থা ছিলো, আমরা তুলনামূলক একেবারেই নতুন ছিলাম আর একের পর এক ম্যাচ হারছিলাম। তরুণ হিসেবে সেটা খুব আদর্শ পরিবেশ ছিলো না।  এখন সময় বদলেছে, আমরা জিততে শুরু করেছি। প্রথমে ম্যাচ, এরপর সিরিজ। তরুণদের জন্য এটা একেবারেই আলাদা একটা অনুভূতি। মাইন্ডসেট বদলেছে, আমরাও এখন সিনিয়র হয়ে গিয়েছি। ছেলেরা জানে, দলে থাকতে হলে ভালো খেলার বিকল্প নেই।

একাডেমি, বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান – এটার ভূমিকাটা কেমন ক্রিকেটে?

বিসিবি তাঁদের সামর্থ্যের মধ্যে সবটা দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে, ক্যাম্প করছে। তবে আমার মনে হয়, এখানে আমাদের উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে। আমরা আরো ভালো করতে পারি। উন্নতি করতে পারলে আরো বেশ কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে। আমি ঠিক অভিযোগ করছি না, বিসিবি যথাসাধ্য চেষ্টা করছে; তবে আমার মনে হয় আমরা আরো ভালো কিছু করতে সক্ষম।

শেষ প্রশ্ন। সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলতে হলে কীভাবে এগোনো প্রয়োজন বলে মনে করেন?

ব্যক্তিগত এবং দলগত পারফরম্যান্সে উন্নতি আনা। এমন সময়ও আসবে, যখন জয় আসবে না তেমন। ওই সময়টায় আমাদেরকে শক্ত থাকতে হবে। এ পর্যন্ত আসতে আমাদের অনেকটা কষ্ট করতে হয়েছে, এটা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আর আরো ভালো করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার এটাই একমাত্র উপায়। আমি নিশ্চিত করছি যে আমি আরো ক্ষুধার্ত থাকবো, রান করার জন্য, ম্যাচ জেতার জন্য। এটাই একমাত্র উপায়। 

- সাক্ষাৎকারটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় উইজডেন ইন্ডিয়ায়। অনুবাদ করেছেন অর্ক সাহা।

Share on your Facebook
Share this post