আমি মজা করি, কড়াও হই: কোর্টনি ওয়ালশ

খেলাধুলা ডেস্ক
জুন ৭, ২০১৭
 কিংবদন্তি কোর্টনি ওয়ালশের সাক্ষাৎকার কিংবদন্তি কোর্টনি ওয়ালশের সাক্ষাৎকার

এবারের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ নেই, কিন্তু তাদের প্রতিনিধি ঠিকই আছে। এবং তিনিও যে সে নন, তাদের ক্রিকেটেরই অন্যতম বড় নাম, কোর্টনি ওয়ালশ। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ দলের বোলিং কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন ওয়ালশ, বাংলাদেশ দলের সাথেই এবার আছেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। সেখানেই উইজডেন ইন্ডিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। খেলাধুলা.কমের হয়ে অনুবাদ করেছেন সঞ্জয় পার্থ।

নব্বইয়ের দশকের অধিকাংশ বাচ্চাদের জন্য, যাদের মধ্যে এখনকার বাংলাদেশ দলের অনেক বোলারও আছেন, আপনি ছিলেন একজন আদর্শ। বাংলাদেশ দলের সাথে যুক্ত হওয়ার পর তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

- তারা সত্যিই অনেক ভালো। এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার পর তারা আমার জন্য অনেক খুশি ছিল। খেলোয়াড়েরা এবং কোচিং স্টাফেরা উদাত্তচিত্তেই আমাকে স্বাগত জানিয়েছে। সবাই অনেক সাহায্য করেছে আমাকে। আমি কেবল চেষ্টা করছি আমি যা জানি তাই ওদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। বোলারদের আমি এমন সব টিপস দিতে চাই যেটা দ্বারা তারা উপকৃত হবে। যেখানে যেখানে তাদের সাহায্য দরকার, সেখানে আমি সাহায্য করতে প্রস্তুত। এমন প্রতিভায় ভরা বাংলাদেশ দলের সাথে কাজ করা আসলেই অসাধারণ। কাজটা আমি উপভোগ করছি, কারণ দিনশেষে এটা এমন একটা খেলা, যেটাকে আমি আমৃত্যু ভালোবেসে যাব।

আপনার সাথে প্রথম পরিচয়ের পর খেলোয়াড়েরা কি একটু বেশি অভিভূত হয়ে পরেছিল আপনার কিংবদন্তি অবস্থান দ্বারা?

- বেশি অভিভূত শব্দটাকে আমি ঠিক যথার্থ বলব না। তাদের সাথে যুক্ত হওয়ায় তারা খুশি হয়েছিল। নবীন ক্রিকেটারেরা আমার জ্ঞান অর্জন করতে চাইছে, যেটা খুব ভালো দিক। আমি তাদের সাথে কাজ করতে চাই, যাতে তারা তাদের খেলায় আরও উন্নতি আনতে পারে, আর দল হিসেবে আমরা আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারি।

আমি সবাইকেই যথাসম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করি, কিন্তু অবশ্যই আমার মূল কাজটা ফাস্ট বোলারদের সাথে। আশা করছি আমরা আরও কিছু ফাস্ট বোলার খুঁজে বের করতে পারব। এরই মধ্যে আমাদের দারুণ প্রতিভাবান কিছু পেসার আছে, এবং আমরা চাই তারা নিজেদেরকে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাবে, যেখানে আমরা নিয়ে যেতে চাই।

আপনার এবং তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে যে গ্যাপ, ওইটা কিভাবে পূরণ করেছেন? আপনি কি ওদের সাথে মজা করেন নাকি একদম কঠোর শিক্ষকের মত আচরণ করেন?  

- আমি মজা করি, কড়াও হই, আবার রিল্যাক্সও করি। যতটা সম্ভব রিল্যাক্সড হয়ে কাজ করার চেষ্টা করি, কারণ আমি জানি এটাই বোলারদের থেকে সেরাটা বের করে আনার সেরা উপায়। আমি সবসময়ই তাদের সাথে সরাসরি কথা বলি। যখন তাদের সুসময় যায়, তখন যেমন সরাসরি বলি, আবার খারাপ সময় গেলেও আমি সরাসরিই কথা বলি। যদি দেখি যে তাদের যেটা করা দরকার সেটা তারা করছে না, কিংবা তাদের মান উন্নয়নের দরকার, তাহলে আমি অবশ্যই সরাসরি বলব আমি কি চাই। তাদেরকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার চেষ্টা করি সবসময়, আর আমার কাজের প্রতিও ফোকাসড থাকি।

আপনি হিথ স্ট্রিকের থেকে দায়িত্ব নিয়েছেন, বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ে প্রাথমিক কাজটা উনিই শুরু করেছিলেন। দায়িত্ব নেয়ার পর সবচেয়ে বড় কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

- হিথ স্ট্রিক বোলারদের নিয়ে দারুণ কাজ করে গেছেন। আমিও সেই ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করছি। দিনশেষে আমরা ম্যাচ জিততে চাই, সে কারণে বোলারদের যথাযথ উন্নতি আনতে চাই। আমাদের পুরো কোচিং স্টাফই নিজের নিজের কাজের প্রতি ফোকাসড, এবং আমি যদি আমার কাজটা ঠিকভাবে করতে পারি, আমি খুশি হব।

এখনো পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলব সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জকে। আমি যা বলছি সেটা বোলাররা নিতে পারছে কিনা। ভাষাগত সমস্যাটাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছে। তারা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে, এবং আমি মানিয়েও নিয়েছি। মাঝে মাঝে কেউ কেউ আমি কি বলছি সেটা ছেলেদের কাছে অনুবাদ করে দেয়। ভালো দিক এটাই যে আমি ভাষাগত সমস্যাটা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, আর আমি দিন দিন আরও উন্নতি করছি।

জুটিতে কাজ করার ব্যাপারে আপনার ছাত্রদের সাথে কথা বলেন আপনি? যেমনটা আপনি  কার্টলি অ্যামব্রোসের সাথে করতেন?  

- হ্যাঁ, এটা আমি ওদের প্রতিনিয়তই বলি যে ফাস্ট বোলারেরা জুটি বেঁধে শিকার করে। সকল ভালো বোলার জুটি বেঁধে উইকেট শিকারে নামে। আপনি যদি ক্রিকেট ইতিহাসের দিকে তাকান, ওয়ার্ন-ম্যাকগ্রা; হোল্ডিং-রবার্টস; মার্শাল-গার্নার; লিলি-থমসন; আকরাম-ওয়াকার, এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে। প্রতিটি দলেই এমন জুটি ছিল, যারা একসাথে উইকেট তুলত।

আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। এমন না যে এটা দুইজন পেসার নিয়েই হতে হবে, দুইজন স্পিনার মিলেও জুটি হতে পারে। এরকম একটি জুটি তৈরি করতে পারলে তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যই ভালো হবে।

বাংলাদেশ দলে এমন কোন জুটি কি আপনি শনাক্ত করতে পেরেছেন?

- দলে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে। তাসকিন ও মেহেদী আছে। শফিউল-রুবেলরাও ভালো করছে। টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিলেও মাশরাফি এখনো খুব ভালো বোলার। আর মুস্তাফিজুর তো আছেই। মুস্তাফিজ আর তাসকিন মিলে যদি ১০ বছর একটানা জুটি বেঁধে খেলে যেতে পারে, সাথে মেহেদী যদি যোগ্য সঙ্গ দিতে পারে, তাহলে সেটা দারুণ হবে। তারা জানে তাদের কি করতে হবে, এবং সেই মোতাবেকই তারা কাজ করছে।

বাংলাদেশের জন্য পরবর্তী চ্যালেঞ্জ কি একজন এক্সপ্রেস বোলার খুঁজে বের করা?

- এটা কঠিন কাজ। এটা কোন ছোট বিষয় না, তারপরেও আমার বিশ্বাস আমাদের সেই সামর্থ্য আছে। তাসকিনের মধ্যে সেই সম্ভাবনা আছে। তাকে শুধু পরিচর্যা করে যেতে হবে, আমাদের দেখতে হবে তার স্কিলে কতটা উন্নতি আনতে পারি আমরা।

বিশ্ব ক্রিকেট কি দিন দিন বোলারদের জন্য আরও বেশি নিষ্ঠুর হয়ে যাচ্ছে?

- সব নিয়ম, পরিবর্তন মিলিয়ে বলতে গেলে, হ্যাঁ, কিছুটা তো সম্ভবত হচ্ছেই। কিন্তু এটা একইসাথে আপনাকে আপনার অন্যান্য স্কিলগুলোকেও ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়। এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। নিজের খেলা নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে, আর স্কিলগুলোকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।

আপনাকে সবসময়ই তাদের অনুপ্রাণিত করে যেতে হবে। এটাও কিন্তু একটা দক্ষতা, একটা কাজ। এবং এই কাজটাকে আপনার উপভোগ করতে হবে, ভালবাসতে হবে। পরিশ্রমের পাশপাশি আমরা বোলারদের উপভোগ করতেও শিখাই। মাঝে মাঝে আপনি পছন্দমত উইকেট পেতে পারেন, কিন্তু সব নিয়ম-কানুন মিলিয়ে খেলাটা এখন ব্যাটসম্যানদের পক্ষেই। সেজন্য বোলার হিসেবে আপনাকে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হবে।

এই যুগের বোলার হলে আপনি কেমন করতেন বলে মনে হয়?

- এটা একটা চ্যালেঞ্জ, এবং আমি চ্যালেঞ্জটা নিতাম। যখন খেলতাম, কখনোই হাল ছেড়ে দেইনি। এটাকেও আর দশটা চ্যালেঞ্জের মত ধরে নিয়ে নতুন কিছু অনুশীলন করতাম। নতুন কোন স্কিল যোগ করে ব্যাটসম্যানদের ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করতাম।

আপনাদের সময়ের তুলনায় এখনকার সময়ে পেস বোলিং এর মান কমে গেছে, এমন ধারণার সাথে একমত আপনি? 

- না আমি এর সাথে একমত নই। আমি তো মনে করি অনেক তরুণ প্রতিভাবান ফাস্ট বোলার আছে এখন। কিন্তু উইকেটের কারণে হয়তোবা তারা ধারাবাহিকভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারছে না, যতটা আমরা করতাম।

সাউথ আফ্রিকার রাবাদা, অস্ট্রেলিয়ার স্টার্ক, ভারতের উমেশ, ইনজুরিতে পড়ার আগে পর্যন্ত স্টেইন, অনেক পেসার আছে মানের দিক থেকে ও পরিসংখ্যানের দিক থেকে উন্নত। সুতরাং আমি বলব না যে পেসারদের মান কমে গেছে। ট্র্যাকের কারণেই তারা ধারাবাহিক হতে পারছেনা।

সম্প্রতি ব্যাটের আকার পরিবর্তনের নিয়মে তো তাহলে আপনার খুশিই হওয়ার কথা...  

- খেলাটিতে উন্নতি আনতে পারে, এমন যেকোনো কিছুকেই আমি স্বাগত জানাবো। এখন দেখতে হবে নিয়মটা কিভাবে কাজ করে। কিন্তু আমি মনে করি ব্যাট বলের মধ্যে সর্বদাই একটা ভারসাম্য থাকা উচিত।

শেষ প্রশ্ন, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মিস করছেন?

- তারা এখানে থাকলে খুবই ভালো হত। অবশ্যই একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিশ্ব আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের খেলতে দেখলে ভালো লাগত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটা হচ্ছে না। নিজেদেরকে গুছিয়ে নিয়ে ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য চেষ্টা করতে হবে তাদের। বিশ্ব ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে খেলতে দেখতে পছন্দ করে, কিন্তু তার আগে তাদের নিজেদেরকে গুছিয়ে আনতে হবে। 

Share on your Facebook
Share this post