নামে কী বা আসে যায়!

খেলাধুলা ডেস্ক
নভেম্বর ১৪, ২০১৬
পাগলা ও ময়না পাগলা ও ময়না

বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ডাক নাম ও তার পেছনের গল্প নিয়ে আগেই প্রকাশিত একটা রম্য

ভদ্রলোকের পকেটে সব সময় গোটা কয়েক নিজের ছবি থাকত। সব দিন পকেট থেকে বের করতেন না। কোনো কোনো দিন ম্যাচের আগে ছবি বের করে সাংবাদিকদের হাতে ধরিয়ে দিতেন, ‘ম্যাচের শেষে তো ছবি খুঁজে পাবেন না। তাই আগে থেকে দিয়ে দিলাম। আজ সেঞ্চুরি করব।’

বিশ্বাস করুন, এমন করে যেদিন ছবি বের করতেন, সেদিন নাকি সেঞ্চুরি করেই মাঠ ছাড়তেন! কী বলবেন এমন ক্রিকেটারকে-বাঘের মতো সাহসী, আত্মবিশ্বাসী? হ্যাঁ, আসলেই তাঁর নাম বাঘ! ঠিক বাঘ নয়, বাঘ মামা।

একটু পুরোনো দিনের ক্রিকেটের খোঁজখবর যাঁরা রাখেন, তাঁরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই হাসতে শুরু করে দিয়েছেন। ‘বাঘ মামা’কে চিনে ফেলেছেন? হ্যাঁ, একসময়ের মারকুটে ব্যাটসম্যান এবং বাংলাদেশের নির্বাচক কমিটির সাবেক প্রধান রফিকুল আলমের ডাকনাম ‘বাঘ মামা’!

শুধু বাঘ মামাকে নিয়ে গল্প করলে চাচা, ময়না, সুন্দরী, লালা কিংবা দুই পাগলা রাগ করে বসতে পারেন। তাই আজ বরং ক্রিকেট দলের এসব মধুর নামওয়ালা সবাইকে নিয়েই আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই বাঘ মামার গল্প। ছোট্ট বাচ্চারা, ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। রফিকুল আলম স্বভাব-চরিত্রে মোটেও বাঘের মতো নন; বরং তিনি বড় বিনয়ী এবং নম্র-ভদ্র মানুষ। তাহলে কেন তিনি বাঘ মামা?

কারণটা খুঁজতে গিয়ে একবার মনে হয়েছিল, শার্লক হোমস সাহেবকে খবর দিতে হবে। কিছুতেই কোনো সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না; রফিকুল আলমও শুধু হাসেন, কিছু বলেন না।

অবশেষে এক অভিজ্ঞ ও রসিক সাংবাদিকই এগিয়ে এলেন, ‘রফিক ভাই একবার সম্ভবত বাংলাদেশ টাইগারস নামে একটা দলের অধিনায়ক ছিলেন; ওটা জাতীয় দলের সমান্তরাল দল ছিল। সেই থেকে বোধ হয় ওনার নাম বাঘ মামা।’

রফিকুল আলমের সতীর্থ মিনহাজুল আবেদীন অবশ্য একটু আপত্তি করলেন, ‘নামটার উৎস আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে আরও আগে থেকে রফিক ভাইয়ের এই নামটা প্রচলিত। অবশ্যই ওনার মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ের জন্য এই নামটা হয়েছে।’

সে তো বোঝা গেল। কিন্তু নামটা এল কোত্থেকে? এবার উদ্ধার করলেন রফিকুল আলমের অতিঘনিষ্ঠ একজন। তিনি আবার নাম প্রকাশ করতে নিষেধ করে গল্পটা বলে দিলেন, ‘সম্ভবত ১৯৮২ সালের ঘটনা। আমরা সেবার ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম। ওখানে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ ছিল। সেই ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কয়েকজন ফাস্ট বোলারের বিপক্ষে দারুণ রান করেছিলেন রফিকুল আলম। দেখে ওরাই তাঁকে প্রথম ‘টাইগার’’ বলল। আর আমাদের মুখে উনি হয়ে গেলেন বাঘ মামা।’

তা বেশ। ‘বাঘ’ বলা সুন্দরবনে নিষেধ, ‘মামা’ বলতে হয়! বাঘ মামার নামকরণের সার্থকতা পাওয়া গেল। কিন্তু চাচা! চাচাকে চিনতে পেরেছেন? ওনাকে না চেনা অন্যায়। বাংলাদেশের টেস্ট শুরুর যুগে নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার, সাবেক অধিনায়ক, এখন দলের ম্যানেজার, বোর্ড পরিচালক।

এবার নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, চাচা হলেন খালেদ মাহমুদ; লোকেরা যাঁকে সুজন বলেও চেনে।

খালেদ মাহমুদ মোটেও চাচাসুলভ ভাবমূর্তির লোক নন। বয়সের তুলনায় বুড়োও নন; বরং এ যুগের তরুণ ক্রিকেটারদের চেয়েও যেন তরুণতর মানুষ। তার পরও তিনি চাচা। খালেদ মাহমুদের এই নামকরণের রহস্য উদ্ধার করতে বেগ পেতে হলো না।

হাবিবুল বাশার গড়গড় করে বলে দিলেন, ‘এখন যারা চাচা ডাকে, এরা আমাদের শোনাশুনি ডাকে। আমরা সুজন ভাইকে চাচা ডাকতাম হালিম শাহর কারণে। হালিমের কেমন সম্পর্কে চাচা হতেন তিনি।’

হালিম শাহ, মানে জাতীয় দলের সাবেক ব্যাটসম্যান। তিনি হালিম শাহর চাচা হলেন কীভাবে, সেটা মাহমুদ নিজেই গল্প করে শোনালেন, ‘আমরা তখন বোধ হয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলি। হালিম একদিন বলল, ওর দাদি নাকি আমাদের আত্মীয়। বাসায় গিয়ে আব্বুকে বললাম। উনি সব শুনে হিসাব করে বললেন, হালিমের দাদি আমার ফুফু। মানে আমি হালিমের চাচা। সেই থেকে শুরু। হা হা হা...’

প্রাণখোলা হাসিতে দেশজোড়া ‘ভাতিজা’দের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলেন চাচা।

এবার আসুন ময়নার কথায়। ময়না আর লালা নাম দুটো টেলিভিশনে খুব শোনা যায়। বাংলাদেশ যখন ফিল্ডিং করে, তখন শুনবেন একটা কণ্ঠ চিৎকার করছে, ‘শাবাশ ময়না’, ‘অফে রাখ লালা’। এরা কারা!

ময়না হলেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। সাকিব কি ময়না পাখির মতো কথা বলেন? মোটেও না। তাহলে তাঁর নাম ময়না কেন?

কারণ জানালেন সাকিবের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সতীর্থ নাঈম ইসলাম, ‘নামটা আসলে নাসিরুদ্দিন ফারুকের দেওয়া। আমরা একসঙ্গে বিকেএসপিতে ছিলাম। ও তো সেই ছোটবেলা থেকে খুব সুন্দর দেখতে, তাই না? আর একটু চুপচাপ থাকত। একদিন হঠাৎই ফারুক বলল, ‘ছেলেটা দেখতে ময়না পাখির মতো না?’ ব্যস, সেই থেকে আমরা ওকে ময়না ডাকা শুরু করলাম।’

আর লালা? অনুমান করুন তো। থাক, অনুমানের কষ্টে গিয়ে লাভ নেই। এই নামটা দিয়েছেন চাচা। কার নাম? আবদুর রাজ্জাক। রাজ্জাক ‘লালা’ হয়েছেন ‘লাল’ থেকে। কিন্তু লাল হলেন কীভাবে? রোদে পুড়ে।

সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে ক্যারিবীয় সূর্যের প্রখর তাপে রাজ্জাকের শরীরের চামড়া নাকি আক্ষরিক অর্থেই লাল হয়ে গিয়েছিল। বেচারা রাজ্জাক! কোথায় সবাই তাঁকে সহানুভূতি জানাবে, তা নয়, খালেদ মাহমুদ বললেন, ‘রাজ তো পুরো লাল হয়ে গেছে।’

আর যায় কোথা! অমনি সতীর্থরা তাঁর ডাকনাম বানিয়ে দিল, লালা; সেখান থেকে মুশফিকুরের কণ্ঠে লাল্লা!

ডাকনামে সতীর্থদের প্রকাশ্যে সবচেয়ে বেশি ডাকতে হয় উইকেটরক্ষক মুশফিকুরকে। তাই এসব মজার ডাকনামের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যাটাও শোনা জরুরি, ‘আসলে আমরা সবার নামই ছোট করে নিতে চেষ্টা করি। ওতে ম্যাচের সময় যোগাযোগে সুবিধা হয়। যাদের মজার নাম নেই তাদের, যেমন আশরাফুলের নাম অ্যাশ, মাশরাফির নাম ম্যাশ করে নিয়েছি।’

মাশরাফির ‘ম্যাশ’ নামটা এখন বেশি চালু হলেও আসলে বাংলাদেশ অধিনায়কের আরও সুন্দর একটা নাম আছে-পাগলা। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে মাশরাফির ‘পাগলা’ নামটা খুবই পরিচিতি পেয়ে গেছে। এর উৎপত্তিও মোটামুটি অনেকের জানা।

মাশরাফি বললেন শুরুর গল্পটা, ‘আমি তো কেমন মানুষ, জানেনই। ওই যে সব সময় হইচই করি, মজা করি। এসব দেখে আমাকে পাগল বলত সবাই। আর ডেভ (হোয়াটমোর) এটা শুনে বলল, ‘‘ওর নাম তাহলে পাগলা’।

পাগলা নামটায় মাশরাফি অবশ্য একাধিপত্য রাখতে পারেননি। দলে তাঁর মতোই দুর্দান্ত পেস নিয়ে এবং মাশরাফির চেয়েও বেশি পাগলামি নিয়ে শুরু করেছিলেন শাহাদাত হোসেন। অতএব, মাশরাফিই তাঁকে নিজের নামটা উইল করে দিলেন, ‘আমি আর কী পাগলা! ও আমার চেয়েও বড় পাগলা।’

অনেক কিছু জানা গেল। কিন্তু ডাকনামের সবচেয়ে বড় কথক মুশফিকুরের নিজের ডাকনামটা কী? মুশফিকুর বললেন, ‘ওরা মুশি বলে ডাকে।’

আসলেই তাই? কিন্তু মুশফিকুরের এক সতীর্থ-বন্ধু যে অন্য এক নাম ফাঁস করে দিলেন। নামটা হলো...

না, থাক! সবকিছু আমাদের জেনে কাজ কী? এই নামটা অন্তত দলের মধ্যেই থাক।

 

Category : রম্য
Share this post