বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ক্রিকেট

আরিফুল ইসলাম রনি
ডিসেম্বর ৫, ২০১৬
 প্রতীকি ছবি প্রতীকি ছবি

ক্রিকেট খেলাটা একটা জায়গায় দারুণ মজার।

অভাবনীয় অনেক কিছু এখানে নিয়মিতই হয়। ‘ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তা’ বলে তাই একটি টার্মই হয়ে গেছে। বিশ্বের সেরা ফিল্ডারও লো্প্পা ক্যাচ ছাড়েন, ফিল্ডিংয়ে জন্টি রোডসের হাত ফসকে যায় বল, মহেন্দ্র সিং ধোনি বা মাইকেল বেভানের মত ক্ষীপ্র রানার অনেক সময় বাজে ভাবে রান আউট হন, নিখুঁত টেকনিক নিয়েও সবচেয়ে বেশিবার বোল্ড হওয়ার তালিকায় শীর্ষে থাকেন দ্রাবিড়-টেন্ডুলকার-ক্যালিসরা।

হরহামেশা এসব হচ্ছে। জেতা ম্যাচ হারা বা হারা ম্যাচ জেতার ঘটনা তো অসংখ্য। ‘ক্রিকেটে এরকম হয়ই-এই কথাটি ক্রিকেটের নিজস্ব হয়ে গেছে। অন্য কোনো খেলায় এই লাইন এতবার ব্যবহার হওয়া তো বহুদূর, এর ধারে কাছে নেই।

খেলার ধরণটিই এমন যে চাইলেই এই ধরণের অজুহাতে বা ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তার কথা বলে যে কোনো কিছু জাস্টিফায়েড করে নেওয়া যায়।

ক্রিকেটে সবকিছুই হয়। সেরা ক্রিকেটারেরও চরম বাজে দিন আসে, চরম বাজেরও আসে সেরা দিন। এই সুযোগটিই অনেকে নেয়। যুগে যুগে নিয়েছে। নিজেদের কুকর্মের ঢাল বানিয়েছে ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তাকে। স্পট ফিক্সিংয়ের আবির্ভাবের পর তো এই সুযোগ নেওয়াটাও এখন শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। মোহাম্মদ আমির যে ম্যাচে ফিক্সিং করলেন, সেই ম্যাচে অসাধারণ বোলিং করেছিলেন। ক্যারিয়ার সেরা বোলিংই শুধু নয়, পেস-সুইংয়ের অসাধারণ প্রদর্শনী মেলে ধরেছিলেন। এখনও চোখে লেগে আছে। অথচ নো বল করে ঠিকই টু পাইস কামিয়ে নিয়েছেন।

স্পট ফিক্সিং অনেকের কাজ এভাবেই সহজ করে দিয়েছে। কেউ হয়ত ঝড়ো সেঞ্চুরি করেছ্ কিন্তু মাঝে এক ওভার মেডেন দিয়েছে বা ২-৩ ওভারে রান নির্দিষ্ট সংখ্যক নিয়েছে। একটা বোলার হ্যাটট্রিক করেছে, কিন্তু ওই এভারেই একটা-দুটো নো বা ওয়াইড করেছে। অ্যাকাউন্ট ভরপুর। এখন তো কে কোন কালারের সানগ্লাস পরবেন, কোন ক্রিকেটার হ্যাট পরবেন, কে পরবেন ক্যাপ, কার জুতোর রঙ কি হবে, এসব নিয়েও স্পট ফিক্সিং হয়ে যায়।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ব্যাপারটি আলাদা। তবে খুব জটিল কিছু নয় এখনও।

একটা ম্যাচের বারোটা বাজাতে দুই দলের ২২ জন ক্রিকেটার লাগে না। এক দলের ২-৩ জনই যথেষ্ট। ম্যাচ পাতানো মানে নিজেদের জালে গোটা দশেক আত্মঘাতী গোল করা নয়। একটা ম্যাচে স্রেফ ২-৩টা ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়া। ছোট ছোট, টুকরো টুকরো। ব্যস। এটুকুই যথেষ্ট। সেখানে অধিনায়ক জড়িত থাকবেই বা অমুক-তমুক থাকবেই, সেটা খুব জরুরী বা প্রয়োজনীয় কিছু নয়। মালিকপক্ষ, ক্লাব বা দল চাইলে অনেক ভাবেই হতে পারে। দলের বেশির ভাগ ক্রিকেটারের হয়ত সেই সম্পর্কে ধারণাই থাকে না!

গত ঢাকা লিগে আবাহনীর অসংখ্য কাণ্ড-কারখানা আমরা লিখেছি। দেশের প্রায় সব মিডিয়া লিখেছে। সাকিব-তামিম-মোসাদ্দেকরা খেলেছে আবাহনীতে। তখন কি ব্যাপারটা সাকিব-তামিমদের দিকে আঙুল তোলা ছিল? মোটেও না। আঙুল তোলা হয়েছিল ক্ষমতার অপব্যবহারের দিকে, সিস্টেমের দিকে। বিপিএল নিয়েও কিছু বলা হলে, ব্যাপারটি একইরকম। স্পট ফিক্সিং হলে সেটা প্লেয়ারের দিকে তোলা যায়। কিন্তু ম্যাচ পাতানো যদি হয়, আঙুল ওঠে সংশ্লিষ্ট সবার দিকে।

এই ধরণের ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ এসে এই স্পট ফিক্সিংয়ের অবাধ বিচরণ যেমন নিশ্চিত করেছে, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ক্ষেত্রও তৈরি করে দিয়েছে নতুন করে। চলছে তো চলছেই।

কেউ আগেই শেষ চার নিশ্চিত করে, কেউ আগেই বাদ পড়া নিশ্চিত হয়ে; তার পর বাকি ম্যাচগুলোর দু-একটির শ্রাদ্ধ করে ফেলে। ইদানিং আবার এই শ্রাদ্ধ করা ম্যাচের পক্ষে আওয়াজ তোলার লোকও দেখছি। শেষ চারের বা নক আউটের বা ফাইনালের পথে নিজেদের পছন্দের প্রতিপক্ষ পেতে ইচ্ছে করে হারা নাকি স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার!

যে কোনো খেলার মৌলিক স্পিরিট বা চেতনার মত কেতাবি কথা বাদই দিলাম; গাঁটের পয়সা খরচ করে হাজার হাজার লোক খেলা দেখতে গেল স্টেডিয়ামে, টিভি পর্দার সামনে কোটি দর্শক, এক বিজ্ঞাপন, স্পন্সর; সবার সঙ্গে যে ধোঁকা হলো, প্রতারণা করা হলো, সেটার জবাব কি?

মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার নাম স্ট্র্যাটেজি! ফ্রাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগের অবদান। প্রতারণা করাটাকেও বৈধতা দেওয়ার ঢাল লোকে বানিয়ে ফেলেছে!

মিডিয়ায় ম্যাচ পাতানো ধরণের কিছু এলেই এক শ্রেণির লোককে দেখা যায়, অস্থির হয়ে উঠতে। ‘আমাদের লিগ, আমাদের ক্রিকেটার’ বলে হইহই করে আসেন। ‘চেপে যান’, ‘কথা বাড়াবেন না’; এসব পরামর্শ, হুমকি আসে। অবাক লাগে। আমাদের রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিবিদদের দূর্নীতির খবর, আমলা, ব্যাংকার, ডাক্তার, সাংবাদিক, সব পেশার সবার দূর্নীতির অভিযোগ এলে কেউ প্রমাণের অপেক্ষা রাখেন না; চামড়া তুলে ফেলেন।

অথচ ক্রিকেটে ‘আমাদের’ বলে সব চেপে যেতে হবে। অন্য কেউ ‘আমাদের’ না?

আর পাতানোর খবর উঠে এলে সেটা খেলাটার ভালোর জন্যই। এই বিষবাষ্প দূর করার জন্য। নাকি চেপে গিয়ে সেটা আরও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়া ভালো? সেলিম মালিকের হাত ধরে এক গাদা এসেছে, আজহারের হাত ধরে জাদেজারা এসেছে, ক্রনিয়ের হাত ধরে গিবস-উইলিয়ামসন; এভাবেই চলুক, নাকি?

আরেকটা কথার স্রোত খুব তীব্র হয় এই সময়।

অমুক এটা করতেই পারেন না, তমুকের মত একজন কিংবদন্তী এটা করতেই পারেন না। এমন হাসি পায়! মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, হানসি ক্রনিয়েদের খেলা দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। দুজনই স্রেফ ব্যাটসম্যান বা অধিনায়কের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন ভালো মানুষের প্রতিমূর্তি। ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, নিবেদন, সততা, সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কোটি কোটি মানুষের আদর্শ। অথচ বছরের পর বছর ধরে মানুষের সেই বিশ্বাসকে স্রেফ বলাৎকার করেছেন তারা। একসময় ধরা পড়েছেন। আমরা তবু বিশ্বাস করতে চাইনি। প্রমাণিত হয়েছে, তবু অবিশ্বাস্য ঠেকেছে।

আজহার? ক্রনিয়ে! কিন্তু সবই ছিল সত্যি।

কিংবা আমাদের আশরাফুল! আমাদের হাসির উপলক্ষ্য এনে দিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তার চেয়েও বেশি পুড়িয়েছে আক্ষেপ, আফসোসে। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। একই ভাবে, একই ধরণে আউট হয়েছেন, একই মানসিকতার প্রতিফলন ফেলেছেন ২২ গজে।

আমরা হাহাকার করেছি, ‘ছেলেটা শিখবে কবে?’ আমরা বলেছি, ‘বোকা নাকি, এত ভুল থেকেও শেখে না!’ আসলে সে দিনে পর দিন আমাদেরই গাধা বানিয়ে গেছে!

এগুলো কিছু ঘটনা মাত্র। আর্ কত শত ঘটনা শোনা যায়, ফিসফাস, গুঞ্জন, কখনও আরেকটু বেশি। তার সিকি ভাগও সত্যি হলে এই খেলাটা ভীষণ রকম অসুস্থ!

আমি তবু খেলাটায় বিশ্বাস হারাই নাই। আমার চার পাশে, দেশের বাইরের সংবাদকর্মী, ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট লোকজনের বড় একটা অংশকে দেখি ক্রিকেট নিয়ে খুব হতাশ। বলেন, ‘খেলাটা পঁচে গেছে অনেক আগেই, এখন গন্ধ বের হচ্ছে।’ আমি তবু কান দেই না।

আমি বিশ্বাস করি, ক্রিকেটে বিশ্বাস হারানো পাপ। খেলাটার তো দোষ নেই! খেলাটাকে যারা কলুসিত করেছে, দায় তাদের।

ক্রিকেটকে বিশ্বাস করা যায়, মাঠের ভেতরে-বাইরের কলা-কুশলীদের সবাইকে সবসময়ই নয়। আজহার-ক্রনিয়ে বা চেন্নাই সুপার কিংসরা শিখিয়েছে এটিই। আজ আমি স্বয়ং যাকে পূজা করছি, কিছুদিন পর বা বহু বছর পর যদি জানি সেই ক্রিকেটার, সেই কর্মকর্তা, সেই ক্লাব বা দল অমুক ম্যাচে, তমুক দিন আমাদের প্রতারণা করেছিল, অবাক হব না একটুও!

এই লেখার সঙ্গে চলতি বিপিএল বা সাম্প্রতিক কোনো ম্যাচের কোনো সম্পর্ক নেই। স্রেফ সাধারণ কিছু টুকরো ভাবনার জোড়াতালি

 

 

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post