সাকিবদের রসিকতার অধিকার নেই

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
নভেম্বর ২৬, ২০১৬
  সাকিব-মাশরাফি  সাকিব-মাশরাফি

একেবারে টাটকা উদাহরণ দিয়ে বলা যাক।

ধরুন  সাব্বির রহমান রুম্মন বিপিএলে প্রথম ম্যাচ খেলার আগে বললেন, এবার শ খানেক ছক্কা মারতে চাই। আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

  • এর মধ্যে পেঁকে গেছে। এখনও সোজা হয়ে দাড়াতে পারে না। কী ছক্কা মারতে পারে তো জানি।
  • মুখেই বলো। আর ওদিকে যার তার সাথে বিজ্ঞাপন করে বেড়াও।

আচ্ছা, সাব্বিরকে বাদ দিন। ধরা যাক, আজ তামিম বলেছেন যে, রেকর্ডের কথাটা আগে বলবেন না? তাহলে সব ম্যাচ মন দিয়ে খেলতাম!

সাথে সাথে আমরা গর্জে উঠবো, রেকর্ডের জন্য খেলো? এই তোমার খেলার প্রতি ভালোবাসা! এসব খেলোয়াড় দিয়ে হবে না।

কিংবা সাকিব আল হাসান বললেন যে, সাকিব ইস ব্যাক।

আমি ঠিক কল্পনাও করতে চাই না যে, সাকিবের নামে কী কী গালি তখন বরাদ্ধ হবে। আমি শিউরে উঠে সাকিবের বা বাংলাদেশী কোনো ক্রিকেটারের এমন রসিকতার কথা কল্পনা করে।

কল্পনা করার দরকার কী?

এই তো আজ যখন গেইল এসব রসিকতা করলেন, তার কয়েক ঘন্টা পর সাকিব ছোট্ট একটা রসিকতা করলেন। টূর্নামেন্টে লক্ষ্য কী এখন, জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন, গাড়ি না থাকলে ম্যান অব দ্য টূর্নামেন্টে হয়ে লাভ কী?

আমরা নিউজ করলাম, এটাকে ‘ক্যাচি লাইন’ ধরে। এমনকি নিউজের যে অংশটা ভেতরে না ঢুকেই পড়া যায়, সেখানেও বলে দিলাম, এটা রসিকতা; আজকাল কৌতুক করলে বলে দিতে হচ্ছে; তাই বলে দেওয়া। কিন্তু গেইলের ওইসব কাঁপিয়ে দেওয়া রসিকতা শুনে যে আমরা হেসে কুটিকুটি, সেই আমরাই নিউজটা পড়লাম না, রসিকতা লেখা নোটটুকুও দেখলাম না; সাকিবের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা শুরু করলাম!

আমরা ঠিক এমন কেনো! কেনো আমরা আমাদের ক্রিকেটারদের কাছ থেকে এসব মজার কথা শুনতে চাই না?

রসিকতা করে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী বিপাকে পড়া ক্রিকেটার নিশ্চয়ই সাকিব।

একবার সাকিব বললেন, ‘লাঞ্চ মনে হয় খুব ভালো ছিলো, তাই সবাই দ্রুত আউট হয়ে ফিরেছে।’

আমি সেই প্রেস কনফারেন্সে ছিলাম। বাংলাদেশের ব্যাটিং ধ্বস নিয়ে বলতে গিয়ে প্রথমে সিরিয়াস উত্তর দিলেন। তারপর শ্রাগ করে, মানে কাঁধ ঝাকিয়ে বললেন, ‘কী আর বলবো?’

এরপরই করুন হেসে এই রসিকতাটা করলেন।

পরদিন সাকিবকে নিয়ে যে কী কী কীর্তি এই দেশে হয়েছে!

আরেকবার সাকিব একটা পত্রিকায় বললেন, বাংলাদেশের শিশুরা বাইরের দেশগুলোর শিশুদের মতো অরেঞ্জ জুস বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার ছাড়াই বড় হয়ে ওঠে। এটা ক্রিকেটার হওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। এটা রসিকতা নয়। রীতিমতো সত্যি কথা।

আমাদের মুস্তাফিজ থেকে শুরু করে বেশীরভাগ ক্রিকেটারের তারুন্য অবদি জানাশোনার অভাব, পরিবারের আর্থিক অভাব তাদের পুষ্টিকর নিউট্রেশনের সুযোগ দেয় না। ফলে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ অগঠিত থাকে। যার ফল টের পাওয়া যায় সর্বোচ্চ স্তরে এসে টানা ইনজুরির ভেতরে পড়তে থাকায়।

এই সিরিয়াস আলোচনা করেও সাকিব মহা বিপাকে।

আজকাল ক্রিকেটাররা অনেকটাই নিজেদের সামলে নিয়েছেন। আমাদের ক্রিকেটারদের যে গুনেরই অভাব থাক, রসিকতা করতে পারার অভাব নেই। হাবিবুল বাশার সুমন আমার দেখা সবচেয়ে উইটি কথা বলতে পারা মানুষ। এরপর মাশরাফির মতো সদা রসিক আছেন। সাকিবের হিউমার সেন্স আমাদের সাধারণের চেয়ে অনেক ওপরে। রিয়াদ, তামিম; প্রত্যেকে দারুন জমিয়ে দিতে পারেন মজার মজার কথা বলে।

কিন্তু এরা সাকিবকে দেখে শিখেছেন। সাকিবের পরিণতি দেখে শিখেছেন। আজকাল সংবাদ সম্মেলন তো বটেই। আড্ডাতেও এরা আর রসিকতা করতে চান না। কোনটা প্রকাশ হয়, আর কোন গালি হজম করতে হয়, কে জানে!

রসিকতা করারই বা দরকার কী!

ফেসবুকে একটা ছবি দিলেই তো গালির বাজার জমে যায়।

শুধু অর্ধশিক্ষিত লোকেরা গালি দিলে আমার আফসোস ছিলো না। আমি বহু পরিচিত ‘বিদ্ধান’, ‘সচেতন’ লোককেও এসব গালিতে অংশ নিতে দেখেছি।

স্যামি বা গেইলের রসিকতার উচ্চ লেভেল নিয়ে যারা আসর গরম করেন; তারাই সাকিব-রিয়াদের রসিকতায় অপমানিত হন এবং গালি দেন।

কি যেনো বলে? ও হ্যা, ডাবল স্টান্ডার্ড।

নাহ, এটাই আমাদের স্টান্ডার্ড। বিদেশী হলে ঠিক আছে। দেশী হয়ে আমাদের সামনে রসিকতা করবে কেনো? তোর কাজ খেলা। মজা দেওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের কাজ আর হানিফ সংকেতের কাজ। তুই মুখ বুজে খেলবি, আমাদের জয় এনে দিবি; আর একটাও বেশী কথা বলবি না।

রসিকতা করতে আসছে!

 

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post