অথচ, কাবাডি আমাদের জাতীয় খেলা!

উদয় সিনা
নভেম্বর ২৫, ২০১৬
কাবাডির দুর্দিন কাবাডির দুর্দিন

একমাস হলো ভারতের আহমেদাবাদে শেষ হয়েছে অষ্টম কাবাডি বিশ্বকাপ যেখানে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। সেখানে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে যায় বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে খেলার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও একটি ম্যাচে শেষ মিনিটের ভুলে তা আর হয়ে উঠে না আরদুজ্জামানদের। ভারতের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ হারের পর দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সেই ম্যাচের পুরোটা সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেও শেষ মিনিটে অলআউট হয়ে হার বরণ করতে হয় বাংলাদেশের। তারপর গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচগুলো জিতলেও আর সেমিফাইনালে খেলা হয় নি বাংলাদেশের। অথচ একমাত্র এই একটি খেলার বিশ্বআসরে সেরা তিনটি দলের মধ্যে একটি হিসেবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ।

একটা সময় কাবাডি খেলার অনেক জনপ্রিয়তা ছিল আমাদের দেশে। দেশের জাতীয় খেলা তো আর এমনিই হয় নি কাবাডি। আমাদের একটা গর্বের বিষয় ছিল কাবাডি। হ্যাঁ ছিল কিন্তু এখন নেই। বিভিন্ন কারণে এখন পিছিয়ে যাচ্ছে একসময়ের জনপ্রিয় খেলাটি। দর্শকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কাবাডি থেকে। এখন আর গ্রামে গঞ্জে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আয়োজন করা হয় না কাবাডি। তাই কাবাডির পাইপলাইনও সমৃদ্ধ হচ্ছে না বাংলাদেশের। যে কারণে কাবাডিতে বাংলাদেশের গায়ে লেগে যাওয়া ফেভারিটের তকমাটাও দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

যদি বাংলাদেশের কাবাডি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যায় তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আফসোস করতেই হয়। একটা সময় এশিয়ান গেমস থেকে বলে কয়ে পদক নিয়ে দেশে ফিরত বাংলাদেশ কাবাডি দল। কিন্তু এশিয়ান গেমসের গত দুই আসর থেকে কোন পদক জুটেনি বাংলাদেশের। ১৯৯০ ও ১৯৯৪ সালের এশিয়ান গেমসে টানা দুটি রূপা জেতে বাংলাদেশ। এরপর ১৯৯৫ সালে মাদ্রাজ সাফ গেমসেও আসে রূপা।

২০০২ সালের এশিয়ান গেমসে কাবাডিতে বাংলাদেশের সবশেষ রূপা জেতে। এশিয়ান গেমসে কাবাডিতে বাংলাদেশের সবশেষ পদক ব্রোঞ্জ আসে ২০০৬ সালে। এরপর আরো দুটি আসর হয়ে গেলেও বলার মত কোন অর্জন ছিল না বাংলাদেশের। ঊনিশ শতকে বাংলাদেশ কাবাডি দল স্বর্ণালি সময় পার করেছিল। তখন দলে খেলত দেশের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আব্দুল জলিল। তিনি দলে থাকা সময়ে এশিয়ান গেমস ও সাফ গেমস মিলে তিনটি রূপা জেতে বাংলাদেশ।

আগে বাংলাদেশ কাবাডি দলে খেলোয়াড় আসত সরাসরি গ্রামগঞ্জ থেকে। কিন্তু বিশ শতকের একটা সময় খেলাটি সেখান থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করে। ঠিক তখন থেকেই কাবাডিতে পিছিয়ে যেতে শুরু করে বাংলাদেশ। কারণ ন্যাচারালি ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় উঠে আসত কেবল গ্রাম থেকেই।

এখন জাতীয় পর্যায়ে যারা খেলেন তাদের বেশিরভাগই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিজিবির প্রশিক্ষণ নিয়ে জাতীয় দলে প্রবেশ করেন। সেইসাথে খেলোয়াড় বের করার প্ল্যাটফর্ম  জাতীয় যুব কাবাডিও অনিয়মিত হয়ে গেছে। ১৯৮২ সাল থেকে আয়োজিত হওয়া এ টুর্নামেন্ট গত ৩৪ বছরে আয়োজন করা হয়েছে মাত্র ১৪ বার। ২০০৫ সাল থেকে স্কুল কাবাডি শুরু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় ২০১১ সাল থেকে। গত পাঁচ বছর ধরে হচ্ছে না কাবাডির প্রিমিয়ার লিগও। তিন বছর বিরতি দিয়ে গত বছর প্রথম বিভাগ লিগ পুনরায় শুরু হলেও এ বছর তা আয়োজনের নামগন্ধও নেই। সবমিলিয়ে নতুন খেলোয়াড় বের করে আনতে যেমন ব্যর্থ হচ্ছে ফেডারেশন তেমনি সিনিয়র খেলোয়াড়দেরও খেলাটা ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

কাবাডি আমাদের জাতীয় খেলা, আমাদের জাতীর গর্বের খেলা। কিন্তু নানারকম অব্যবস্থাপনায় দিন দিন সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে খেলাটি থেকে। অন্যান্য খেলাগুলোর মত বাংলাদেশের কাবাডির অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুব দরকার। কারণ তা সম্ভব না হলে আমাদের জাতীয় খেলাটি লাইফসাপোর্টে যেতে আর বেশি সময় লাগবে না।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post