সাকিব আল হাসানের সঙ্গীর খোজে বাংলাদেশ!

আজাদ মজুমদার
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
     সঙ্গীর খোজে বাংলাদেশ!   সঙ্গীর খোজে বাংলাদেশ!

গত বেশ কিছুকাল ধরেই বাংলাদেশ দল একটা যুগ বদলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে; সাধারণ মানের এক দল থেকে সত্যি কারের শক্তিশালী দল হয়ে ওঠার যুগ বদল। প্রতিটি দলই পরিবর্তনের সময় বিশেষ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাঁর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

বর্তমানে বাংলাদেশ দলের প্রধানতম সমস্যাটা হলো পেস অ্যাটাক এবং স্পিন অ্যাটাকের সম্ভাব্য সেরা ভারসাম্যপূর্ণ কম্বিনেশনটা খুঁজে বের করা। সম্প্রতি কোর্টনি ওয়ালশের মত কিংবদন্তী খেলোয়াড় তাঁদের বোলিং কোচ হয়ে এসেছেন এবং এর বাইরেও আকিব জাভেদকে সাময়িক ক্যাম্পিং-এর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো।

আত্মিক নেতা মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশে এখন এক ঝাক ভালো ফাস্ট বোলার আছে। ফলে বাংলাদেশের এই ফাস্ট বোলিং নিয়ে বেশী মনোযোগী হওয়া অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। তবে এতে করে সমস্যা যেটা হয়েছে, বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট দলের অন্যান্য সব শক্তির জায়গাগুলো নিয়ে একটু বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশের মূল শক্তি নিয়ে দ্বিধার ব্যাপারটা গত বছর ভারতের বিপক্ষে হোম সিরিজটির উদাহরণ দিয়েই বোঝা যায়। ফতুল্লায় একমাত্র টেস্টে বাংলাদেশ মূল একাদশে চারজন স্পিনার রাখে, সাথে একমাত্র পেসার হিসেবে ছিলেন মোহাম্মদ শহীদ। ভারত সবসময়ই স্পিনে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে পরিচিত। কিন্তু প্রধান কোচ হাথুরুসিংহে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন, বলেন,তিনি নিজের শক্তির দিকটাতেই মনোনিবেশ করতে চান, প্রতিপক্ষের নয়।

অবাক করা ব্যাপার, ঠিক এই দলই ওয়ানডে সিরিজে এই উপমহাদেশের মাটিতে, সেই একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে চারটে ফাস্ট বোলার মাঠে নামিয়ে দিলো এবং সিরিজ জয়ী হিসেবে বেরিয়ে এলো। রাতারাতি যেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের উপলব্ধি হলো, তাঁদের মূল শক্তির জায়গাটা স্পিন নয়, পেস! এটাই মুলত দ্বিধা সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টও তাতে প্রভাবিত হয়।

হঠাৎ সবাই উপলব্ধি করে, গত এক দশক ধরে সব ফরম্যাটে জাতীয় দলের স্পিন বোলিংকে টেনে নেওয়া অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সাথে জুটি গড়ে তোলার মত সেই মানের স্পিনার বাংলাদেশে তেমন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! টেস্টে তাইজুল ইসলাম এবং উদীয়মান লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন থাকায় লঙ্গার ভার্সনে এখনো তেমন সমস্যা না হলেও সীমিত ওভারের ম্যাচগুলোতে সাকিবের সঙ্গী খুঁজে বের করতে গিয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে নির্বাচকদের!

কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী আবদুর রাজ্জাকই ছিলেন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে প্রথম পছন্দ। কিন্তু অংশত বাজে ফিল্ডিং এবং অফ ফর্মের যুক্তিতে চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে তাঁকে ব্রাত্য করে দেওয়ায় হঠাৎ করেই যেন স্পিনার-সংকট সৃষ্টি হয়।

প্রথমদিকে সোহাগ গাজী বেশ রোশনাই ছড়ালেও ‘অবৈধ বোলিং অ্যাকশন’-এর কারণে নিষিদ্ধ হওয়ার পর কখনোই নিজেকে আর ফিরে পাননি।  শুভাগত হোম আরও একজন সাদামাটা স্পিনার,  যাকে টিম ম্যানেজমেন্ট নানাভাবে সুযোগ দিলেও তিনি কখনোই ‘দ্বিতীয় স্পিনার’ অবস্থান পাকাপোক্ত করে তুলতে পারেননি। গত ওয়ার্ল্ড টি২০-তে সাকলায়েন সজীবকে সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি আন্তজাতিক ক্রিকেটের জন্য নিযেগে যথেষ্ঠ ভালো বলে প্রমাণ করতে পারেননি।

অগত্যা বাংলাদেশে ওয়ানডে ক্রিকেটে সাকিবের স্পিন বোলিং পাটনার হিসেবে কাজ চালানোর একমাত্র বিকল্প হিসেবে থাকেন আরাফাত সানি।

বাংলাদেশ সমস্যায় পড়ে যায়, যখন ওয়ার্ল্ড টি২০-এর মধ্যে হুট করেই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে যান তাসকিন আহমেদ এবং আরাফাত সানি। দুজনেই বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসেছেন গত ১০ সেপ্টেম্বর। ২২ সেপ্টেম্বর দু জনের বোলিং অ্যাকশনই আইসিসি বৈধ বলে ঘোষনা করেছে। তবে আরফাত সানি আগের মতই কার্যকর থাকবেন কিনা, সেটা নিয়েও থাকছে যথেষ্ট সংশয়। গত কিছুদিনের রেকর্ড বলছে, অ্যাকশন পরিবর্তন করে ফেরার পর স্পিনারদের অনেকেই আর পুরোনো রূপে ফিরতে পারেননি। বাংলাদেশের সোহাগ গাজী, পাকিস্তানের সাঈদ আজমলের মত স্পিনাররা ক্যারিয়ারের শুরুতেই চারদিকে শোরগোল ফেলে দিলেও অ্যাকশন বদলে ফেরার পর নিজেকে আর ফিরে পাননি। অতএব, ধরে নেওয়াই যায় যে বাংলাদেশের স্পিনার-সংকট আরও একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

সানিকে হারানোর পর বাংলাদেশ অগত্যা আশা খুঁজেছে সোহরাওয়ার্দী শুভতে, যিনি তাঁর সর্বশেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন ২০১১ সালে। সর্বশেষ ডিপিএল-এ শুভ যথেষ্ট ভালো পারফর্ম করার সুবাদে প্রায় ছয় বছর পর আবারও ডাক পেয়েছেন ৩০জনের ঘোষিত স্কোয়াডে। তবে এটা বোঝা গেছে যে, ছয় সপ্তাহের ক্যাম্পিং-এ তিনি হাথুরুসিংহেকে তেমন মুগ্ধ করতে পারেননি। ফলে ২০ জনের স্কোয়াডে তাঁর নাম আসেনি আর।

হাথুরুসিংহে যে শুভ’র প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট নন, সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় ২৭ আগস্ট। শুভ’র জায়গায় হঠাৎ ডাক পান মোশাররফ হোসেন রুবেল, যিনি আদতে ৩০ জনের স্কোয়াডেই আদৌ ছিলেন না। মোশাররফ তখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটিতে ভারতে বেড়াতে গেছেন, স্বাভাবিকভাবেই আশা করেননি হঠাৎ করে জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার। আর তাই এক সাংবাদিক বন্ধু’র থেকে এই সংবাদ পাওয়ার পর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি!

মোশাররফ রুবেলকে ক্যাম্পে ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েও নিবাচকরা তাকে খুজে পাচ্ছিলেন না; কারন তার ফোন বন্ধ। তখন নিরুপায় হয়ে ওই সাংবাদিক বন্ধুকে দিয়ে খবর পাঠানো হয়, ফিরে আসার জন্য!

মোশাররফ তার ক্যারিয়ারের তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন ২০০১ সালে। যখনই তার ক্যারিয়ারটায় উত্থান শুরু হয়েছিলো, তখনই আরওে ডজন খানেক ক্রিকেটারের সাথে তিনি ঢাকা ওয়ারিয়রস দলের হয়ে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) খেলতে চলে যান। তার ক্যারিয়ার আরও একবার ধাক্কা খায় বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোয়।

মোশাররফ রুবেল আগামী নভেম্বরেই ৩৫-এ পা দিচ্ছেন। তিনি এ বছর বিপিএল-এ লিজেন্ড অফ রূপগঞ্জের নেতৃত্ব দিয়েছেন, আর লিজেন্ড অফ রূপগঞ্জের মালিকের সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ তিক্ততা থাকায় মোশাররফ দলে ডাক না পেলেও অবাক হওয়ার কিছুই ছিল না। তবে সাবেক ভারতীয় স্পিনার ভেংকটপতি রাজু’র তত্ত্বাবধায়নে অনুষ্ঠিত বিশেষ ক্যাম্পিং-এ যথেষ্ট ভালো পারফরম্যান্স দেখানোয় ভাগ্য পক্ষে এসেছে মোশাররফের, এতসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন সংক্ষিপ্ত স্কোয়াডে।

মোশাররফের পারফরম্যান্সে রাজু এতটাই মুগ্ধ ছিলেন, তিনি নিজে হাথুরুসিংহেকে মোশাররফের কথা বলেছেন। তিনি এও যোগ করেছেন, মোশাররফ যথেষ্ট ভালো ব্যাটিং করতেও সক্ষম। হাথুরুসিংহে অগত্যা মোশাররফ রুবেলের প্রতি বিশেষ নজর দেন এবং ব্যক্তিগত ভারত সফর থেকে তাঁকে ডেকে পাঠান। এ মাসের শুরুতে একটি ওয়ার্ম আপ ম্যাচে পাঁচ উইকেট অতঃপর সাকিবের পরবর্তী বোলিং-সঙ্গী হিসেবে নিশ্চিত করে দেয় তাঁকে। অন্তত আফগানিস্তান এবং ইংল্যান্ড সিরিজে তাঁর চূড়ান্ত স্কোয়াডে থাকা মোটামুটি নিশ্চিত। যদিও ব্যাকআপ স্পিনার হিসেবে স্কোয়াডে ডাক পেয়েছেন অনুর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও। তবে এটা স্পষ্ট, নির্বাচকেরা সম্ভবত আরো একবার আস্থা রাখতে যাচ্ছেন মোশাররফ হোসেন রুবেলেই।

 

প্রথম প্রকাশ: http://cricwizz.com

অনুবাদ: অক সাহা

 

 

 

Category : মতামত
Share this post