ক্রীড়া সাংবাদিকতা বনাম বস্তুনিষ্ঠতা

কাওসার মুজিব অপূর্ব
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
   ক্রীড়া সাংবাদিকতা বনাম বস্তুনিষ্ঠতা ক্রীড়া সাংবাদিকতা বনাম বস্তুনিষ্ঠতা

‘নো নিউজ ইজ গুড নিউজ’ - ফরাসি লেখক লুডোভিচ হেলভির শতাব্দি প্রাচীন বক্তব্যটি একজন সাংবাদিকের জন্য সত্য হলেও একজন দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের জন্য তা মোটেই নয়। ১৯৫২ সালে কাছাকাছি একটি কথা বলেছিলেন অ্যামেরিকান সাংবাদিক গ্লোরিয়া বোর্গার – ‘কোন সংবাদই সুসংবাদ নয়, আর সুসংবাদ কখনওই সংবাদ নয়।’ এই বক্তব্যেরও সাড়কথা ওই একই।

বাকি সংবাদের কথা ভুলে যান, গোলটা বাঁধে আসলে ক্রীড়া সাংবাদিকতায়। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে প্রিন্ট মিডিয়ার স্পোর্টস রিপোর্টিংয়ে। রিপোর্টিং কে সাধারণ ভাষায় বলা যায়, কোন সংবাদ যোগ্য ঘটনাকে পক্ষপাতশূণ্য, সঠিক, তথ্যবহুল, বস্তুনিষ্ঠ ও ডেডলাইনের মধ্যে থেকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে প্রকাশ করা।

অন্য সব রিপোর্টিংয়ের সুবিধা হল সেখানে মূল ঘটনাটা একজন অডিয়েন্সের চেয়ে একজন রিপোর্টার কিছুটা হলেও বেশি জানেন। কিন্তু, লাইভ সম্প্রচারের যুগে একজন স্পোর্টস রিপোর্টারের এগিয়ে থাকার সুযোগ কই! যে তথ্য ভাণ্ডার নিয়ে তিনি লিখতে বসেছেন সেই একই তথ্যভাণ্ডার মাথায় নিয়েই পরদিন পাঠক খেলার পাতা পড়তে বসবেন।

একটা কথা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় স্রেফ ম্যাচ রিপোর্ট, কে কত মিনিটে গোল করলো, কে কত রান করলো, কে কোন রেকর্ড করলো, কে কার সাথে কত ব্যবধানে জিতলো এটা জানতে কেউ পকেটের পয়সা খরচ করে পত্রিকা কিনে না। মূল ব্যাপারটা হল, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মজার কিছু পরিসংখ্যান যা পাঠককে আগ্রহী করে তুলতে পারে, শব্দ নিয়ে খেলতে পারার ক্ষমতা ও সাইড স্টোরি!

আর তাই একটা ব্যাপার নিসন্দেহে বলে দেয়া যায় যে, ক্রীড়া সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা (Objectivity) একটা মিথ ছাড়া কিছুই না। বস্তুনিষ্ঠতা হল নিরপেক্ষতা। সহজ কথা হল, একজন রিপোর্টার নিজস্ব ভাবনা, বিশ্বাসের প্রভাব ছাড়া নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন থেকে কোন ঘটনাকে বিশ্লেষণ করবে। খেলাধূলার ক্ষেত্রে আরও সহজ করে বলা যায় একজন রিপোর্টার কখনও সাপোর্টারের মতো আচরণ করবেন না।

বাংলাদেশ ২০০৫ সালেে ইংল্যান্ডের কার্ডিফে পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে পর প্রথম আলো প্রথম পেজে ব্যানার হেডলাইন করেছিল ‘বাঘের গর্জন শুনেছে বিশ্ব’। আবার ২০১৪ সালের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের ৩২৬ রানের পাহাড় তাড়া করে পাকিস্তান জিতে যাবার পর হেড লাইন ছিল ‘আলোর মাঝে কালোর কষ্ট’। মোদ্দা কথা হল – নিউজ অ্যাঙ্গেল। ক্রীড়া সাংবাদিকতায় অনেক ক্ষেত্রেই একটা পক্ষ ধরে নিয়ে রিপোর্টিং করে যেতে হয়। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায়ই প্রযোজ্য নয়। ব্রিটিশ, অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াও তাই করে। নৈকট্য (Proximity) বিবেচনা করেই ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান, ডেইলি মেইল, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি হেরাল্ড মর্নিং কিংবা বাংলাদেশের প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ইত্তেফাক সংবাদের ট্রিটমেন্ট দেয়। বলাই বাহুল্য, প্রাধান্য পায় নিজ নিজ দেশের খেলার খবর। আর রিপোর্টিংয়ে যে ধরণের ভাষা ব্যবহার করা হয়, সেটা আর যাই হোক বস্তুনিষ্ঠ হয়ে উঠে না।

আসলে বিষয়টা খেলা বলেও একটা ঝামেলা হয়ে যায়। এখানে একজন রিপোর্টারকে রিপোর্টিংয়ের বাইরে একজন সাহিত্যিক হয়ে উঠতে হয়।এখানে ভাষা, শব্দের খেলা আর নানা উপমা ব্যবহার করে ম্যাচের বর্ণনা দিতে হয়। এখানে ‘কভার ড্রাইভ থেকে চার রান’ আর ‘চোখ-ধাঁধানো কভার ড্রাইভ থেকে চার রান’-এর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। এখানে লেখা দিয়ে আপনাকে বোঝাতে হয়ে মার্ক ওয়াহ কিংবা আজহার উদ্দিনের মাঝারি মানের ব্যাটিং গড়ের মধ্যেও কি অপার মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে? বোঝাতে হবে, হ্যাভিয়ের মাশেরানো, রামিরেস, জাবি আলোনসোরা কিভাবে গোল না করেও হয়ে ওঠেন মহীমাময়! এতো কিছুর মাঝে বস্তুনিষ্ঠতার সুযোগ কই!

খেলাধূলার ‘বাইরে’ অনেক বিষয় খেলার পাতায় স্থান পায়। যেমন - বোর্ডের দুর্নীতি, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, আকসুর তদন্ত রিপোর্ট, নিরাপত্তা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্য বস্তুনিষ্ঠতা দেখানোর সুযোগ থাকে।

শেষটা করছি যোগাযোগ তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহানের একটা কথা দিয়ে। তিনি কোথায় যেন একবার বলেছিলেন, ‘আসল খবর গুলো সব সময়ই খারাপ খবর।’ খেলাধূলার ক্ষেত্রে মোটেই সেরকম নয় ব্যাপারটা। এখানে বাংলাদেশ জিতলে প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেড লাইন নয়, হারলে সিঙ্গেল কলাম, কিংবা বড়জোর ডাবল কলাম।

যাই হোক, মোট কথা খেলাধূলা যেমন মজার ব্যাপার এর রিপোর্টিংয়ের ধরণটাও সেরকম। বস্তুনিষ্ঠতার জন্য হাহাকার নয়, বরং পাঠককে আগ্রহী করে তোলার জন্যই লেখালেখি। ভালবাসতে হবে খেলাধূলাকে, বুঝতে হবে পাঠককে, বোঝাতেও হবে!

তথ্যসূত্র:

১. মাহমুদুল হক মনি, মিথ অব অবজেক্টিভিটি ইন স্পোর্টস রিপোর্টিং (http://alochonaa.com/2014/02/24/the-myth-of-objectivity-in-sports-reporting/)

২. দৈনিক প্রথম আলো

৩.দ্য নিউজ ম্যানুয়াল (http://www.thenewsmanual.net/index.htm)

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post