এক যুগ সাধনার পর...

কাওসার মুজিব অপূর্ব
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৫
  এক যুগ সাধনার পর... এক যুগ সাধনার পর...

১৭ জুন, ২০০২। জাপানের কোবে উইং স্টেডিয়াম। গ্রুপ পর্বে অধিনায়ক মার্ক উইলমটের একার দাপটে শেষ ষোলতে উঠে যাওয়া বেলজিয়ামের সামনে প্রতাপশালী ব্রাজিল। এবার আর হল না। ২-০ গোলে হেরে অশ্রু নিয়েই বিশ্বকাপকে বিদায় বলতে বাধ্য হল ইউরোপিয়ান দলটি।

বিধ্বস্ত হয়ে দেশে ফিরলো বেলজিয়াম। বার বার দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার হতাশার মধ্যে শুরু হল নতুন উদ্যোমে কাজ করা। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশি কিছু কিশোর ফুটবলার বেছে নিয়ে ফুটবল ফেডারেশন শুরু করলো এক মহাপরিকল্পনা।

কদিন বাদেই বেলজিয়ামের শীর্ষস্থানীয় একটি পত্রিকা এই কিশোরদের ভিতর থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ১৫ জন তারকার কথা উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে শুধু বেলজিয়াম নয়, একটা সময় পায়ের ছন্দে পুরো বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দেবেন তারা। সেখানে ছিলেন ইডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডি ব্রুয়েন, ভিনসেন্ট কোম্পানি, রোমেলু লুকাকু, মুসা ডেম্বলির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা। তখন সেই লেখাটি কেমন আলোড়ন তোলে জানা যায়নি, কিন্তু সেই খেলোয়াড়রা ঠিকই এবার আলোড়ন তুলছেন বিশ্বকাপে।

২০০২ বিশ্বকাপের ঠিক এক যুগ পরের ঘটনা। সেই ঘাতক দেশের মাটিতেই শুরু আরেকটি বিশ্বকাপ অভিযান। না, এবার মার্ক উইলমট একা নন। কোচের দায়িত্ব নিয়ে এবার তার সাথে আছেন ভিনসেন্ট কোম্পানি, ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকু, থিবাউট কোর্তেসহ এক ঝাঁক তারকা। এবারও কি স্বপ্ন ভঙ্গ হবে? প্রশ্নের উত্তরটা সময়ই বলে দেবে কিন্তু যেভাবে বেলজিয়াম বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু করলো তাতে তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবতেই হচ্ছে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে গত মঙ্গলবার রাতে গ্রুপ 'এইচ'-এর ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলের ব্যবধানে জিতে গেল দলটি।

 

 

শীর্ষস্থানীয় বেলজিয়ান দৈনিক প্রকাশিত সেই লেখা (২০০২)

শুরু থেকেই 'ডার্ক হর্স' তকমা নিয়ে বিশ্বকাপে আসা বেলজিয়াম প্রথম ম্যাচ দিয়েই নিজেদের অবস্থানটা জোরালো করে দিলো। তবে, অবস্থান জোরালো করার এই শুরুটা হয়েছে আরও এক যুগ আগে। ঠিক ধরেছেন, সেই জাপান কোরিয়া বিশ্বকাপের পরই পরিকল্পনাটা শুরু হয়।

২০০০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে স্বাগতিক হওয়ার পরও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় আর ২০০২ বিশ্বকাপ থেকে আশানুরূপ ফল না আসায় নতুন করে ভাবতে বসেন বেলজিয়ামের ফুটবল বোদ্ধারা। ২০০২ সাল পর্যন্তও টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছে বেলজিয়াম। কিন্তু ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে সেমিফাইনালে পৌঁছানো বাদ দিলে বড় কোন সাফল্য নেই দলটির। সাফল্যের খোঁজেই তাই নতুন কিছুর সন্ধান করা হয়!

মূল কাজটা করেন বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মিশেল স্যাবলন। বেলজিয়ামে তখন বেশ কিছু তরুণ প্রতিভা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদের মধ্য থেকেই অভাবনীয় কিছু গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করতেন স্যাবলন। ২০০১ সালে তিনি ১০ বছর মেয়াদী একটা ফুটবল সাফল্যের নীল নকশা নির্মাণ করেন। ঢেলে সাজানো হয় ঘরোয়া লিগের কাঠামো। মিশেল স্যাবলন এই প্রসঙ্গে বলেন, '২০০১ সাল থেকে বেলজিয়াম তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের মধ্যে আরও উন্নতি আনার জন্য কাজ শুরু করা হয়। এটা ছিল খেলোয়াড়দের দিকে আরও মনোযোগ দেয়ার এক রকম কর্মকৌশল। সেরা মানের কোচিং ফর্মুলার কথা সেখানে বলা হয়।'

স্যাবলন বিশ্বাস করেন সেসময় প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ ক্লাব সেই কর্মকৌশলটি মেনে নিয়েছিল। আর সেই ফলাফলই এখন চোখের সামনে। স্যাবলনের মতে, 'আগে আমাদের দলে ৪-৫ পাঁচজন খেলোয়াড় থাকতেন যারা প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। এখন সেই সংখ্যাটা দ্বিগুণে পরিণত হয়েছে।'

পরিকল্পনা থেকে তাত্ক্ষণিক কোন সাফল্য আসেনি। এক যুগ বড় কোন টুর্নামেন্টে খেলারই সুযোগ আসেনি বেলজিয়ামের সামনে। কিন্তু তার মাঝেও কাজ করে গেছে বেলজিয়াম। এই সময়ের কাজটাও করেন সেই মিশেল স্যাবলন। তার মুখেই শোনা যাক সেই সময়ের কথা, '২০০২ সালে আমরা খুব কাছ থেকে ফ্রান্সকে দেখার চেষ্টা করি। বছরে অন্তত দু'বার ওদের বিপক্ষে আমরা খেলতাম। একই কাজটা করি নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রেও। জার্মানীর সাথেও বছরে দু'-একবার খেলার চেষ্টা করতাম। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে আমাদের মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তখন আমরা কোথাও ছিলাম না। কেউ কোন রকম সমীহ দেখাতো না। আমাদের বয়সভিত্তিক দল যেমন অনূর্ধ্ব ১৭ ও অনূর্ধ্ব ১৯ দলের র্যাংকিং তখন ছিল ২৩ ও ২৮। পরিবর্তনটা বুঝতে পারছেন তো। সেই বেলজিয়ামের র্যাংকিং এখন দশের মধ্যে।'

এমনকি ২০০৭ সালেও এই বেলজিয়াম দলেরই র্যাংকিং ছিল ৭১। আর সর্বশেষ ফিফা জানিয়েছে, তাদের র্যাংকিং এখন ১১। দশ বছরের সেই কর্মপরিকল্পনার অধীনে খেলার স্টাইল নিয়েও কাজ করেন স্যাবলন, 'আমি সবাইকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলার কথা বলি। সেখানে উইঙ্গার, তিনজন মিডফিল্ডার ও ফ্ল্যাট ব্যাকে চারজন রাখতে বলি। এটা তাদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।'

সেই পরিকল্পনা এবার কাজে লাগতে শুরু করেছে বেলজিয়ামের জন্য। কখনও ইউরোপিয়ান পাওয়ার ফুটবল, কখনও ছোট ছোট পাসের অপূর্ব সমন্বয়ে প্রথম ম্যাচেই তারা মাতিয়ে দিল বেলো হরিজোন্তে। এবার আরও সামনে এগিয়ে যাবার পালা।

প্রশ্ন হচ্ছে, বেলজিয়ামের পক্ষে কি বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব। প্লে মেকার ইডেন হ্যাজার্ড খুব বেশি কথার মধ্যে গেলেন না। খুব কম কথার মধ্যেই জানিয়ে দিলেন নিজেদের স্বপ্নের কথা, 'সেটাই তো আমাদের চূড়ান্ত স্বপ্ন। কিন্তু তার আগে অনেক কাজ বাকি। আগে ফাইনালে পৌঁছাই। তারপর বাকিটা...'

এমন আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনা নিয়ে যাদের বিশ্বকাপে আগমন, তাদের পক্ষে বাজি ধরার মত সমর্থকের এবার আর অভাব হবে না!

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post