আমাদের ওয়ালশ

আরিফুল ইসলাম রনি
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
 ওয়ালশ ওয়ালশ

কোচিং অভিজ্ঞতা থাকলে ভালো হতো, তবে সেটা খুবই জরুরী নয়। সব কোচই একসময় প্রথমবার শুরু করে! আর ওয়ালশের মাপের একজনের বোলিং কোচ হওয়ার ক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতা খুব জরুরী নয়। ফাস্ট বোলিং সম্পর্কে তার নলেজ নিয়ে তো সংশয় নেই! সেই নলেজ, সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা, আমাদের বোলারদের মাঝে স্রেফ ডেলিভারি করার ব্যাপার।

আমাদের পেসারদের কোচিং করানোর বাস্তবতায় সবচেয়ে ভালো ব্যাপার যেটা, ওয়ালশ কিন্তু ন্যাচারালি খুব ট্যালেন্টেড ক্রিকেটার ছিলেন না। ঠেকে শিখেছেন। হার্ড ওয়ার্ক করে শিখেছেন। সময়ের সঙ্গে নানা স্কিল আয়ত্ত করেছেন। ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা দ্রুত বের করার ব্যাপারটি রপ্ত করেছেন এবং সেখানে বারবার আঘাত করা শিখেছেন। দীর্ঘদিন মার্শাল-অ্যামব্রোসদের স্রেফ সহযোগি ছিলেন, আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছেন মূল অস্ত্র। ক্যারিয়ারের প্রথম ৬৩ টেস্টে ৫ উইকেট পেয়েছিলেন মাত্র ৫ বার, পরের ৬৯ টেস্টে ১৭ বার!

এসব বলার মানে, ওয়ালশ প্রসেসটা জানেন যে কিভাবে গড়পড়তা বা ভালো ফাস্ট বোলার থেকে খুব ভালো বা গ্রেট হয়ে উঠতে হয়। জানেন কিভাবে স্কিলগুলো আয়ত্ত করতে হয়। জানেন পরিশ্রম দিয়ে কিভাবে নানা সীমাবদ্ধতা জয় করতে হয়। সেই প্রসেসটা এখন আমাদের বোলারদের মাঝে ডেলিভারি করার ব্যাপার।

ফাস্ট বোলার হয়ে ১৩২টা টেস্ট খেলেছেন। ১৭ বছর সার্ভিস দিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় ৪১ হাজার ডেলিভারি করেছেন। গ্লস্টারশায়ারের হয়ে করেছেন ৪৪ হাজারের বেশি বল। জ্যামাইকা ও টুকটাক অন্যান্য দলের হয়ে তো ছিলই। তবু ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গতির হেরফের কিন্তু খুব বেশি হয়নি! বলা হয়, ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে গতিময় বোলিং করে গেছেন ওয়ালশ। এবং বয়সের সঙ্গে ধার বেড়েছে। ৩০ বছর বয়সের পর ৩৪১ টেস্ট উইকেট নিয়েছেন। ভুল শুনছেন না, ৩৪১টি! এমনকি ৩৫ বছর হওয়ার পরও নিয়েছেন ১৮০ উইকেট!

এসব বলছি তার টিকে থাকার ক্ষমতা বোঝাতে। কতটা লম্বা দৌড়ের ঘোড়া ছিলেন, সেটা বোঝাতে। ইনজুরি মুক্ত থেকে বছরের পর বছর খেলা, লম্বা স্পেলে বল করা…এসবের নিশ্চয়ই কোনো পদ্ধতি আছে, প্রসেস আছে। সেই জায়গাতেও শেখার আছে অনেক কিছু।

কোচিং অভিজ্ঞতা থাকলে যা হতো, নলেজগুলো শেয়ার করার প্রসেসটা ওয়ালশের পুরোপুরি জানা থাকত। ম্যান ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারটায় অভিজ্ঞতা থাকত। তবে এখনও যে ভালোভাবে শেয়ার করতে পারবেন না, তেমনও নয়। হয়ত ফ্রেশ কোনো আইডিয়া নিয়ে আসবেন। নলেজ শেয়ার করা বা ম্যান ম্যানেজমেন্টে তরতাজা কোনো ধারণা নিয়ে আসবেন, যেটা সবাই উপভোগ করবে।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, আমাদের ছেলেরা কতটা নিতে পারবে এবং কাজে লাগে পারবে। আজকে মাশরাফিও যে ব্যাপারটি বলেছেন যে ছেলেরা কতটা স্বতস্ফূর্ত হয়ে শিখতে চাইবে। ওয়ালশকে তিন বছর পাওয়া যাচ্ছে, বাংলাদেশের পেসারদের, বাংলাদেশ ক্রিকেট যেন এটা অপচয় না করে।

বোলিংয়ের বাইরেও শেখার আছে। ওয়ালশের শরীরী ভাষা বা আচরণে ছিল না ফাস্ট বোলার সুলভ ঔদ্ধত্য। তবে বোলিংয়ে ঠিকই ছিলেন জাত ফাস্ট বোলার। মাঠের ভেতরে-বাইরে দারুণ বিনয়ী। চাইলে সেটা থেকেও শেখার আছে আমাদের ছেলেদের।

ছোটখাটো একটা শঙ্কার ব্যপার আছে। ওয়ালশ এখানে তিন বছর থাকতে পারবেন তো? লাইফ স্টাইল বড় একটা ব্যাপার। এখানে নাইট লাইফ নাই, ক্রিকেটের বাইরে খুব বেশি কিছু করার নেই। অস্ট্রেলিয়ান-ইংলিশরা এসে হাঁপিয়ে যায় অল্প কদিনেই। ওয়ালশ তো সেখানে ক্যারিবিয়ান, জীবন যেখানে উপভোগের প্রতিশব্দ। সেখান থেকে এসে এখানে দীর্ঘদিন থাকা কঠিন। এখণ তো আরও নিরাপত্তার কড়াকড়ি। সামনে পেছনে সিকিউরিটির গাড়ীর বহর, সঙ্গে গানম্যান নিয়ে মাঠে আসা-যাওয়া করেন হাথুরু-মারিও-হ্যালসলরা। বাস্তবতার কারণেই সেটা করতে হচ্ছে। ওয়ালশকেও এই নিরাপত্তা বলয়ে থাকতে হবে। তার এসব ভালো লাগার কারণ নেই। তাছাড়া মিডিয়ার নিত্য আগ্রহের কেন্দ্রে থাকাও তার ভালো লাগবে না নিশ্চিত।

তবু আশা করি, ওয়ালশ টিকে যাবেন। আমাদের অনেক দেবেন, আমরা অনেক নেব। নিতে পারব, করে দেখাতে পারব। আমাদের ক্রিকেট সমৃদ্ধ হবে। টেস্ট বোলিংয়ে সেটার ছাপ পড়বে। মাশরাফি যেমন বলেছেন, আমাদেরও সেটিই আশা… ‘ওয়ালশের বোলিং কোচ হয়ে আসা হতে পারে আমাদের ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট’!

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post