সেই ওয়ালশ

আরিফুল ইসলাম রনি
ডিসেম্বর ১২, ২০০৮
     কোর্টনি ওয়ালশ।   কোর্টনি ওয়ালশ।

“ব্রায়ান (লারা) আমাকে কিছুই বলেনি। আমিই ওকে বলছিলাম সবকিছু। বলেছিলাম, ‘আমি আজ আউট হচ্ছি না। তুমি আউট হয়ে যেও না, তুমি আউট হলে আমরা হারব’। সে আউট হয়নি, আমরাও ম্যাচটা হারিনি।”

---কোর্টনি ওয়ালশ।

ক্রিকেটের সামান্য খোঁজ-খবর রাখলে ওপরের কটা লাইনেই বুঝে যাওয়ার কথা এটি কোন টেস্ট, কোন ইনিংস, কোন মুহূর্ত! যে টেস্ট এখনও রোমাঞ্চের কাঁপন জাগায়। যে টেস্টে আমার, আমাদের অনেকের জীবদ্দশায় সেরা ইনিংসটি খেলেছিলেন লারা। যে ইনিংসে ব্যাট হাতে নিজের নামের প্রতি 'সুবিচার' করতে পারেননি ওয়ালশ। পারেননি বলেই জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ!

সেটি ১৯৯৯ সালের মার্চ। বারবাডোজের কেনসিংটন ওভাল। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, বোলিং আক্রমণে ম্যাকগ্রা-গিলেস্পি-ওয়ার্ন-ম্যাকগিল। শেষ ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লক্ষ্য ৩০৯। ১০৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলা দলকে একাই টানছিলেন অধিনায়ক লারা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন নবম উইকেট হারাল, জিততে চাই তখন ৬ রান। শেষ ব্যাটসম্যান ওয়ালশ, ব্যাট হতে বরাবরই যদি বালির দেয়াল। টিপিক্যাল নম্বর ইলেভেনের আদর্শ উদাহরণ। একগাদা বোলিং কীর্তিতর পাশাপাশি আছে টেস্টে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ড!

আজ প্রেস কনফারেন্সে Chowdhury প্রশ্ন করলেন, সেদিন ওয়ালশ উইকেট যাওয়ার পর কি বলেছিলেন লারা? সাড়ে ১৭ বছর আগে ফিরে গিয়ে ওয়ালশ বললেন, লারাকে কিছু বলার সুযোগই দেননি, সব তিনিই বলেছেন!

যা বলেছিলেন, সেটাই করেছিলেন। আউট হননি। তেতে থাকা অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে 'অবিশ্বাস্য ভাবে' খেলে ফেলেছিলেন ৫ বল! শেষ পর্যন্ত গিলেস্পির বলে লারার বাউন্ডারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়। অপরাজিত ছিলেন ১৫৩ রান, ২২ গজে অমর এক মহাকাব্য। উইজডেনের বিচারে (২০০১ সালে) সেটি সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা ইনিংস।

ওই সিরিজের প্রথম টেস্টে ৫১ রানে অলআউট হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাকগ্রা-গিলেস্পি দুই পাশ থেকে টানা ১৯ ওভার বল করে শেষ করে দিয়েছিলেন। ক্যারিবিয়ায় আর ক্রিকেট দুনিয়ায় ছি ছি পড়ে গিয়েছিল। লারার ক্যাপ্টেন্সি যায় যায় অবস্থা। পরের টেস্টেই অবিস্মরণীয় ঘুরে দাঁড়ানো। স্যার লারার ২১৩ রানে দুর্দান্ত ইনিংস, উইন্ডিজের জয়। এরপর বারবাডোজে লারার আরেকটি অতিমানবীয় ইনিংস আর ওয়ালশের মহাকাব্যিক অপরাজিত শূন্য!

রেকর্ড ৪৩ বার শূন্য রানে আউট হওয়ার ক্যারিয়ারে ওয়ালশের অন্যতম সেরা ব্যাটিং কীর্তি সেটি, ১৪ মিনিট আর ৫ বলে অপরাজিত শূন্য রানের ইনিংস। 'অন্যতম' সেরা বলতে হচ্ছে, কারণ একই রকম বীরত্ব দেখিয়েছিলেন আরেকবার। ওই ইনিংসের বছর খানেক পরই!

অ্যান্টিগায় এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ইনিংসে প্রয়োজন ছিল ২১৬ রান। নবম উইকেট পড়েছিল ১৯৭ রানে। ওয়াসিম আকরামের তখন রীতিমত অগ্নিমূর্তি, ম্যাচে নিয়েছিলেন ১১ উইকেট। ছিলেন ওয়াকার-মুশতাক-সাকলায়েন।

টিপিক্যাল নম্বর ইলেভেন ওয়ালশ সেদিনও দাঁড়িয়ে যান দারুণ দৃঢ়তায়। সবার চোয়াল ঝুলিয়ে দিয়ে টিকে থাকেন ৭২ মিনিট! ২৪ বলে অপরাজিত ৪ । আরেকপাশে জিমি এডামস (৪৮*) এগিয়ে নেন দলকে। শেষ উইকেটে ১৩ ওভারে ১৯ রানের জুটিতে আবার ১ উইকেটে জেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

সেই লড়াইয়ের গল্পগুলো ওয়ালশ নিশ্চয়ই শোনাবেন আমাদের ক্রিকেটারদের! অনুপ্রেরণার কত বড় এক উৎস!

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post