দাদা, বাংলাদেশকে না টানলেও পারতেন!

শেখ মিনহাজ হোসেন
নভেম্বর ১১, ২০১৬
    বাঙালি বলে আমরা সৌরভ গাঙ্গুলীকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখি।    বাঙালি বলে আমরা সৌরভ গাঙ্গুলীকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখি।

বাঙালি বলে আমরা সৌরভ গাঙ্গুলীকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখি। তিনি আমাদের পছন্দের মানুষদের ৎ মধ্যেই পড়েন। কিন্তু শেষ কয়েক বছরে নানা সময়েই আমি গাঙ্গুলিকে আমাদের কট্টর সমালোচনাকারীদের মধ্যেই দেখেছি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের টার্গেটও খুব সিলেক্টিভ! ধরেন, সিধু বললেন যে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে রোহিতের নো-বল না হলে ভারত ২৬০-ও করতে পারতো না, খেলা অন্যরকম হতো অথবা মুস্তাফিজের ব্যাপারে আইপিএল এ কত প্রশংসা করলো। সেগুলো আমরা সেভাবে হাইলাইট করি না। কিন্তু সে ২০০৭ সালে আমাদের তেলাপোকা বলেছিলো সেটাকে খুব সমালোচনা করি। আবার জিওফ্রি বয়কট, ইয়ান বোথামদের ক্ষেত্রেও আমরা কট্টর সমালোচনাকারী ধরে এগিয়ে যাই। মিসবাহ, ইউসুফেরা সবসময়েই আমাদের প্রশংসা করে।

কিন্তু, যেহেতু তাঁরা পাকিস্তানী, সুতরাং তাদের প্রশংসা করা আমাদের জন্য রিস্কি! ভিভিএস লক্ষণ আমাদের সবসময়ের প্রশংসাকারী, আমরা সেটাও হাইলাইট করি না। আমার মনে আছে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের আগে এক সাক্ষাতকারে সৌরভ যথাসম্ভব ব্যঙ্গ করে ‘বাংলাদেশের চান্সই নেই!’ ‘প্রশ্নই আসে না।’ ‘আমরা তো সেমিফাইনালে উঠেই গেছি।’ - কথাগুলো বলেছিলেন।

সেসব অপমান আবার আমরা গায়ে লাগাই নাই। এগুলো প্রচার হয়নি সেভাবে। কারণ, সৌরভকে আমরা পছন্দ করি। সে খারাপ বললেও ইগ্নোর করা যায়। আবার বীরেন্দ্র শেবাগ ২০১০ সালে খুব জাস্টিফাইডলি বলেছিলেন যে, ‘বাংলাদেশ ওয়ানডেতে ভালো দল। নিজেদের দিনে যে কাউকে হারাতে পারে। কিন্তু টেস্টে অর্ডিনারি দল। ২০ উইকেট নেবার যোগ্যতা নেই!’

২০১০ এর প্রেক্ষাপটে সবগুলো কথাই সত্যি ছিল। এতোদিন পরে ২০১৬ তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের আগে আমরা জিম্বাবুয়ে/ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাদে কোনদিন ২০ উইকেট নিতে পারি নাই। কিন্তু সেহওয়াগ যেহেতু আমাদের অপ্রিয়, তাই তার কথা আমাদের খুবই গায়ে লেগেছিলো!

মাশরাফি তার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন যে, এশিয়া কাপ খেলতে যাওয়ার পরে জয়াসুরিয়া, সাঙ্গাকারারা আমাদের বলেছেন ‘তোমরা সুইমিং করে কী করবা? প্র্যাকটিস করো প্র্যাকটিস! এগুলো খুব গায়ে লাগতো। শ্রীলংকান এবং ভারতীয়দের তুলনায় বরং পাকিস্তানিরাই উৎসাহ দিয়েছে।’

আমি কখনোই শ্রীলংকানদের করা এসব তাচ্ছিল্যকে আমাদের লেখনীতে তুলে ধরতে দেখিনি। কারণ আমাদের চোখে শ্রীলংকানেরা ভালো! আবার মাশরাফি বিন মুর্তজা পাকিস্তানিদের তুলনামূলক ভালো বলেছে, সেটা এড়িয়ে যাওয়াই নিরাপদ। স্টেইন বল নষ্ট করবে না বলে খুব সমালোচিত হয়েছিলো। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলে আমাদের মন জয় করে নিয়েছিলো।

এরপরে আর স্টেইনের সমালোচনা হয় না। কথায় কথায় আমরা সেহওয়াগ, রমিজ রাজা, সিধু, হুকস, বয়কটেরা কী বলেছিলো; সেগুলো খুব বলি। কিন্তু যাদের আমরা পছন্দ করি যেমন সৌরভ, জয়াসুরিয়া, স্টেইন, ভন এদের নিয়ে কিছু বলি না!

যাই হোক, পোস্ট লেখা শুরু করেছিলাম শুধুমাত্র সৌরভ গাঙ্গুলী বিষয়ে কথা বলতে। লেখা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। চলমান ভারত বনাম ইংল্যান্ডের প্রথম টেস্টে সৌরভ ক্রিকইনফোতে বিশেষজ্ঞ মতামত দিচ্ছে। তো সঞ্চালক সৌরভকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইংল্যান্ড যে এতো ভালো ব্যাটিং করছে, তার মানে কি প্রতিপক্ষকে আউট করতে ভারতের স্পিনিং পিচ লাগবে। এছাড়া ভারত পারে না? এই ইংল্যান্ড তো মাত্রই বাংলাদেশে হেরে এসেছে।’

সৌরভের উত্তরটা ছিল, ‘একটা টেস্টের প্রথম দিনে এমন পিচই এক্সপেক্টেড। বাংলাদেশের পিচে তো প্রথম দিন থেকেই মাইনফিল্ডে খেলা হয়েছে। বল স্কয়ার টার্ন করছিলো। যদি ইন্ডিয়া বাংলাদেশের ওই পিচে খেলতো তাহলে বাংলাদেশ ১০০ রানও করতে পারতো না!’

তারপর বললেন, ‘টেস্ট ম্যাচ মাত্র ৩ দিনে শেষ হয়ে যাবার মানে হয় না। টেস্ট হতে হয় ৫ দিন ধরে!’ (এই বক্তব্যের সাথে ব্যক্তিগতভাবে একমত)।

এখানে ক্লিক করে অনুষ্ঠানের ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন।

আমার আপত্তি এই ‘বাংলাদেশ ১০০ রানও করতে পারতো না!’ লাইনটা নিয়ে। ‘যদি ইংল্যান্ড ১০০-ও করতে পারতো না’ - বলতো, তাহলেও মানতাম। শুধু শুধু বাংলাদেশকে টেনে আনার দরকার ছিল না।

আমি এটাও মানি যে, বাংলাদেশে যে পিচে খেলা হয়েছে সেটা বৃহৎ অর্থে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নেতিবাচক! টেস্ট উইকেট আরও স্পোর্টিং হওয়া দরকার। টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত স্পিনারদের দিয়ে বোলিং ওপেন দেখতে ভালো লাগে না। কিন্ত আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত যে এতোদিন সাউথ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ডের সাথে প্রত্যেকটা টেস্টে স্পিনের মাইনফিল্ড বানিয়ে ৩ দিনে শেষ করেছে তখন সৌরভের এই সমালোচনা কোথায় ছিল?

আমি শুধু অপেক্ষা করছি এটা দেখতে যে, ভারত পরের ৪ টেস্টেও কি একই উইকেট রাখে নাকি প্রথম টেস্টে ইংল্যান্ডের ৫০০+ রান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার সেই স্পিন মাইনফিল্ডে ফেরত যায়। তখন দেখা যাবে সৌরভের এই নীতিকথা কোথায় যায়!

----

ব্যক্তিগতভাবে আমি স্পোর্টিং উইকেটের পক্ষে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের উচিত কয়েকটা জয় পেয়ে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে আস্তে আস্তে স্পোর্টিং উইকেটের দিকে ঝুঁকা। নিজেদের আরেকটু সমীহ জাগানোর মতো দল না বানানো পর্যন্ত স্পিনিং উইকেট ঠিক আছে। আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য সৌরভের দ্বিমুখী নীতিতে।

Category : মতামত
Share this post