১৬ বছর পুরনো আক্ষেপ...

উদয় সিনা
নভেম্বর ১০, ২০১৬
  আগামী ১৬ বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিত্রটা কি হবে তা জানি না।  আগামী ১৬ বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিত্রটা কি হবে তা জানি না।

টেস্ট ক্রিকেটে আজ পূর্ণ হলো বাংলাদেশের ১৬ বছর। বছরের হিসাবে ১৬ সংখ্যাটা বেশ বড়। কিন্তু বছরের সংখ্যা বিচারে ম্যাচের সংখ্যাটা কিছুই না। ষোল বছরে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে মাত্র ৯৫ টি। ভাবা যায় ব্যাপারটা!

সবশেষ ইংল্যান্ড সিরিজের সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক মুশফিকের কথাটা টানতেই হয়। তিনি খুব আক্ষেপ করে সেদিন বলেছিলেন যে, ইংল্যান্ডের অ্যালিস্টেয়ার কুকের অভিষেক তাঁর এক বছর পর হয়েও কুক খেলে ফেলেছেন ১৩৪ টি টেস্ট আর মুশফিক দাঁড়িয়ে আছে মাত্র ৫০-এ।

কুকের আরেক সতীর্থ স্টুয়ার্ট ব্রড ঠিক নয় বছরে খেলে ফেলেছেন ১০০টি টেস্ট। আর দল হিসেবে ষোল বছরে আমরা টেস্ট খেলেছি মাত্র ৯৫ টি। তাছাড়া কোন এক সংবাদ সম্মেলনে মুশফিক বলেছিলেন যে তিনি যখনই টেস্ট খেলতে নামেন তখনই তাঁর মনে হয় যেন অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামছেন।

দীর্ঘ বিরতি দিয়ে টেস্ট খেললে এমন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। মুশফিকের এ কথাই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে ভালো করা কতটা কঠিন যেখানে দীর্ঘ বিরতি দিয়ে টেস্ট খেলতে হয়। পর্যাপ্ত টেস্ট ম্যাচের অভাব তাই অবশ্যই প্রভাব ফেলছে বাংলাদেশের টেস্ট পারফরম্যান্সে।

অনেকেই বলে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। সত্যিই তো। টেস্ট ক্রিকেটে ৯৫ ম্যাচে যেখানে জয় মাত্র ৮টি তখন তো বলাই যায় যে আমরা ক্রিকেটের এই বৃহৎ সংস্করণে ভালই পিছিয়ে আছি। এর জন্য অবশ্যই কম ম্যাচ খেলাকে শুধু এককভাবে দায়ী করা যায় না। দায় আমাদের ক্রিকেট বোর্ডেরও নিতে হবে। 

১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফি জেতার পরই তখনকার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরি ২০০০ সালের মধ্যে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার লক্ষ্য উপস্থাপন করেন। অবশেষে ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাসও পেয়ে যায়। এরজন্য অবশ্য কম কাঠ খড় পোড়াতে হয় নি। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ ১৯৯৯-২০০০ সালে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট চালু করা হয়। যদিও ২০০০-২০০১ পর্যন্ত ম্যাচগুলো প্রথম শ্রেণির মর্যাদা পায়নি।

তারপর ২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর সে বছর আজকের এই দিনে ভারতের বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের প্রাপ্তির পাল্লাটা কম ভারি ছিল না। আমিনুল ইসলামের ১৪৫ রান, হবিবুল বাশারের অর্ধশত ও অধিনায়ক নাইমুর রহমানের ৬ উইকেট তাই প্রমাণ করে। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ প্রায় ৫৩৪ মিনিটের মত ব্যাটিং করে বোর্ডে জমা করে ৪০০ রান যা এক যুগ ধরে টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা ইনিংসের রেকর্ড হয়ে থাকে। যদিও দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যর্থতায় ম্যাচটি ৯ উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ।

সেই থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ৯৫ ম্যাচ খেলে ৮ জয়ের বিপরীতে হেরেছে ৭২ টিতে এবং বাকিগুলো ড্র। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পাঁচটি টেস্ট জিতেছে এবং নিজেদের প্রথম টেস্ট জয়ও এসেছিল তাদের বিপক্ষেই। তারপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ জয় দুটি।

কিন্তু, টেস্টে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়টি আসে গত ৩০ অক্টোবর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। কারণ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জেতা প্রতিটি ম্যাচে ফেভারিট হিসেবেই জয় লাভ করেছি বাংলাদেশ। আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে যে দুটি জয় সেটিও ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুর্বল দলের বিপক্ষে কারণ বোর্ডের সাথে ঝামেলা হওয়ায় সে ম্যাচ খেলেছিল বেশিরভাগ জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটার। সে হিসেবে পূর্ণ শক্তির ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট জয়ই ইতিহাসের সেরা টেস্ট জয় বাংলাদেশের।

২০০০-২০১৬ এই ষোল বছরের টেস্টে ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির পাল্লাটাই বেশি ভারী। এখনও বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের তলানিতেই পড়ে আছে। তবে এর দায়টা ক্রিকেটারদের নয়, ক্রিকেট অবকাঠামোর যা এই ফরম্যাটের উপযুক্ত করে ক্রিকেটারদের গড়ে তুলতে অসমর্থ। এই ১৬ বছর পর এখনও পিকনিক মেজাজের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়।

টেস্ট ক্রিকেটের জন্য খেলোয়াড়দের তৈরি করার কথা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের। অথচ বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতা জাতীয় লিগে খেলেন না দেশের বেশিরভাগ সেরা ক্রিকেটার। খেলেন না বললে ভুল হবে। খেলার সুযোগ পান না তাঁরা। সে সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করছে ক্ষোদ ক্রিকেট বোর্ড। কারণ জাতীয় লিগের সময় আন্তর্জাতিক ব্যস্ত সূচির মধ্যে ক্রিকেটারদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। জাতীয় লিগের সময়সূচি চূড়ান্ত করার সময় এ বিষয়টি মাথায় থাকে না আমাদের বোর্ড কর্মকর্তাদের।

টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার মূলমন্ত্র হলো বেশি বেশি ম্যাচ খেলা। কিন্তু আমাদের ক্রিকেটাররা সে সুযোগটা পান না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও তাদের খেলা হয় না আন্তর্জাতিক ম্যাচ থাকায়। এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও গত দুবছর ধরে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ভালো করছে বাংলাদেশ। পনেরো মাস পর খেলতে নেমেও কয়েকদিন আগে পূর্ণ শক্তির ইংল্যান্ডকে টেস্টে সফলভাবে হারিয়েছে আমাদের ক্রিকেটাররা।

আজ টেস্ট ক্রিকেটে আমাদের ষোল বছর পূর্ণ হলো। আগামী ১৬ বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিত্রটা কি হবে তা জানি না। তবে হ্যাঁ, ষোল বছর পর বাংলাদেশ ক্রিকেট এখনকার অবস্থানে থাকবে না। নিশ্চয়ই আরো ভালো অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ। তবে মুখের কথা মুখেই থাকবে যদি আমরা বেশি বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলতে না পারি এবং আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট অবকাঠামোর উন্নতি না হয়।

Category : মতামত
Share this post