স্ট্যান ম্যাককেব: শ্রদ্ধাঞ্জলি

আরিফুল ইসলাম রনি
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
    স্ট্যান ম্যাককেব: শ্রদ্ধাঞ্জলি স্ট্যান ম্যাককেব: শ্রদ্ধাঞ্জলি

তাঁর একেকটি শটে দর্শকের চোখ যেত জুড়িয়ে, বোলাররা যেত গুড়িয়ে। কিন্তু তাঁর চোখে তখন থাকত মায়া। বেদম মার খেয়েও বোলাররা যন্ত্রণা ভুলে যেত ব্যাটসম্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে। সেখানে বোলারদের জন্য সহানুভূতি!

স্ট্যান ম্যাককেব।

বলা হতো, তাঁর হৃদয়ে ছিল না ঘৃণা, তাঁর ক্রিকেটেও ছিল না ঘৃণা!

বডিলাইন সিরিজে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সম্পর্ক যখন চূড়ান্ত শীতল, একেকজন ইংলিশ ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ায় গণশত্রু, তখনও ইংলিশদের সঙ্গে মাঠে কথা বলতেন ম্যাককেব। চুটিয়ে আড্ডা দিতেন মাঠের বাইরে। ক্যারিয়ার শেষে বেশ অনেক বছর পর আরেকট অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট আর্থার মরিস প্রশ্ন করেছিলেন “জীবনী কিংবা স্মৃতিকথা কেন লিখেননি?”

ম্যাককেবের উত্তর ছিল, "Because I don't hate anyone enough"!!!

তাঁর অভিধানে আসলে ঘৃণা শব্দটিই ছিল না।

অথচ ব্যাটিং দর্শনে তিনি স্যার ডনদের ঘরানারই। আক্রমণই ছিল শেষ কথা। ছোটোখাটো কিন্তু পোক্ত গড়ন, শক্তিশালী পেশি, চোখ জোড়া প্রখর, নমনীয় কবজি আর ফুট ওয়ার্ক দুর্দান্ত। উইলো তার হাতে হয়ে উঠত যেন পালক। যখন কাট শট খেলতেন, স্লিপের ফিল্ডাররাও নাকি শব্দ শুনতে পেতো না! উইকেটের সামনে খেলতেন দারুণ সব ড্রাইভ। তবে স্পেশাল ছিলেন হুক শটে। এই শটে তিনি সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন!

অ্যাডিলেডে একবার দারুণ খেলছিলেন। স্যার ডনের সঙ্গে জুটি ছুটে চলেছে। বোলার হঠাৎ লেগ সাইডে ফিল্ডার বাড়িয়ে নিলেন। ফাইন লেগ, স্কয়ার লেগ সীমানা। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল শর্ট বল আসছে। ম্যাককেবেরও সেটি না বোঝার কারণ নেই। শর্ট বলই হলো। ম্যাককেব তবু হুক করলেন। সীমানায় ফিল্ডার প্রথমে ছেড়ে দিয়েও ধরে ফেললেন। ক্ষিপ্ত-বিরক্ত স্যার ডন দিনশেষে জিজ্ঞেস করলেন, “করলে টা কি!”

মাঠের দিকে তাকিয়ে ম্যাককেবের নির্লিপ্ত উত্তর, “ওই বল পেলে আমি আবার হুক করব!”

২০১০ সালে সিডনি ক্রিকেট মাঠে সফরকারী দলের ড্রেসিং রুমের পাশে ম্যাককেবের একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সিমেন্ট-পাথরের সেই ম্যাককেবও হুক খেলছেন!

তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা তিন ইনিংসের একটি, ক্রিকেট ইতিহাসেও যেটি অন্যতম সেরা ইনিংস, সেটিতেও ছিল চোখধাঁধানো সব হুকের ছড়াছড়ি। বডিলাইন সিরিজের সেটি প্রথম টেস্ট। ব্যাটসম্যানের শরীর আর মাথা তাক করে গোলা ছুড়ছিলেন দুই নটিংহ্যামশায়ার সতীর্থ হ্যারল্ড লারউড ও বিল ভোস। হতভম্ব অস্ট্রেলিয়ানরা ব্যাটিং করবে কী, শরীর বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছিল। ম্যাককেব জবাব দিলেন পাল্টা চপেটাঘাতে। ক্রিকেট বই থেকে বরে করে এনে ২২ গজে মেলে ধরলেন পুল-হুকের নিঁখুত ও সাহসী প্রদর্শনী। আর কোনো সতীর্থ যেখানে পঞ্চাশও ছুঁতে পারল না, ম্যাককেব মাত্র ৪ ঘন্টায় ২৩৩ বলে ১৮৭!

ওই ইনিংস নিয়ে যখন অস্ট্রেলিয়া জুড়ে উন্মাদনা, ম্যাককেব এমনকি চোখ রাখেননি পত্রিকার পাতায়ও। কারণ? “এমন কোনো ইনিংস ছিল না। ননসেন্স একটা ইনিংস। যেভাবে ব্যাট চালাতে চেয়েছি, হয়ে গেছে। পত্রিকায় সব বাড়িয়ে লেখা হবে, বাড়তি প্রশংসা হবে। ওসব পড়লে আমার জন্য ভালো কিছু হবে না!” ভেবে দেখুন, বয়স তখন তাঁর মাত্রই ২২!

ম্যাককেবের দুটি ইনিংস সম্পর্কে বলা হয়, স্বয়ং স্যার ডনও অমন খেলতে পারতেন না। একটি ওই ১৮৭, যে ম্যাচে ছিলেন না স্যার ডন। আরেকটি ড্রেসিং রুমে থেকেই মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন ডন। ১৯৩৮ অ্যাশেজে ট্রেন্ট ব্রিজের ২৩২, ক্রিকেটের গল্পগাঁথায় যে ইনিংসটির জায়গা হয়ে গেছে চিরস্থায়ী!

এক প্রান্তে নিয়মিত উইকেট হারাচ্ছিল অস্ট্রেলিয়া, আরেক প্রান্তে ম্যাককেব চালিয়ে গেছেন শিল্পিত তাণ্ডব। ১৯৪ রানে পড়েছিল ৬ উইকেট, সেখান থেকে প্রায় একাই দলকে নিয়ে গেছেন চারশর ওপারে। লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে ম্যাককেব যখন রচনা করছেন ক্রিকেট ইতিহাসের অনুপম এক অধ্যায়, ড্রেসিং রুমে স্যার ডন তখন গোটা দলকে ডেকে নিয়ে এলেন ব্যালকনিতে। বললেন, “দেখে নাও, এমন কিছু আরও কখনো দেখতে পাবে না!”

হতাশ এক ইংলিশ বোলার এক পর্যায়ে নন স্ট্রাইকে থাকা বিল ও’রিলিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি করা যায় বলো তো?” ভ্রু নাচিয়ে টাইগার ও’রলির উত্তর, “দৌড়ে গিয়ে ওর অটোগ্রাফ নিয়ে এসো!”

২২২ মিনিটে ছুঁয়েছিলেন ডাবল সেঞ্চুরি। শেষ পর্যন্ত হেডলি ভেরিটিকে আকাশে তুলে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন ফিরলেন, চার ঘন্টারও কম সময়ে নামের পাশে ২৭৭ বলে ২৩২। ফেরার সময় অনেক দর্শক মাঠে নেমে দিয়েছিলেন গার্ড অফ অনার। উইজডেন লিখেছিল, “McCabe played an innings the equal of which has probably never been seen in the history of Test cricket” ।

ড্রেসিং রুমে ফেরার পর তাঁর হাত ধরে স্যার ডন বলেছিলেন, “স্ট্যান, এমন একটা ইনিংস খেলতে পারলে আমি নিজেও গর্ববোধ করতাম!”

আরেকটি ইনিংস আছে, জোহানেসবার্গের ছোবল দেওয়া উইকেটে। দলের ২ উইকেটে ২৭৪ রানে ম্যাককেবের একারই অপরাজিত ১৮৯!

৩৯ টেস্টের ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে ৬টি সেঞ্চুরি। ৩টিই সর্বকালের সেরা ইনিংসগুলোর কাতারে। স্যার ডন অবশ্য এতটুকুতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। অনেক পরে বলেছিলেন, “খুবই অদ্ভূত…ওর মতো এমন অসাধারণ সামর্থ্যের একজন ব্যাটসম্যান কেবল ৩টি স্পেশাল ইনিংস খেলেছে..!!!”

কিন্তু ম্যাককেব ছিলেন এমনই। যুগে যুগে আরও অনেক প্রতিভাবানের মতোই বড্ড খেয়ালি। নিজের দিনে তাকে মনে হতো সেরাদের সেরার চেয়েও এগিয়ে। কিন্তু সেরকম দিন এসেছে কমই!

অস্ট্রেলিয়ান সতীর্থ জ্যাক ফিঙ্গলটনের বিশ্বাস, লম্বা টেস্ট সিরিজের শেষের দিকে মাঠে একদমই মন বসত না ম্যাককেবের। সেটির প্রমাণ মেলে পরিসংখ্যানেও, সিরিজের প্রথম ৩ টেস্টে যেখানে তার ক্যারিয়ার গড় প্রায় ৬০, পরের ২ টেস্টে সেটা নেমে এসেছে অর্ধেকের কমে! শেষের দিকটায় ২২ গজের চেয়ে তাকে বেশি টানত পরিবার, স্ত্রী আর ভাইদের সঙ্গ। হেয়ালি না হলে ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় ৪৮ না হয়ে হতে পারত ৫৮, কিংবা আরও বেশি!

তাতে ক্রিকেট রোমান্টিকদের হাহুতাশ থাকলেও ম্যাককেবের যায়-এসেছে সামান্যই। সবচেয়ে দীর্ঘসময় অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকা স্যার রবার্ট মেনেজিস যেমন বলেছিলেন, “স্ট্যান গড় নিয়ে কখনোই ভাবেনি। সে ব্যাটিং উপভোগ করত, আমরা তার ব্যাটিং উপভোগ করতাম।”

ম্যাককেবকে সবচেয়ে ভালো বোঝাতে পেরেছেন হয়ত স্যার লেন হাটন। সমসাময়িক ইংলিশ কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান বলেছিলেন, “অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার চেয়ে ভালো কাউকে কল্পনা করা কঠিন। এমন কিছু গুণ তার ছিল, যেসব ছিল না এমনকি ব্র্যাডম্যানেরও। তার ব্যাটিং দেখতে আমার সবসময়ই ভালো লাগত। মানুষ হিসেবেও তাকে পছন্দ না করে উপায় ছিল না।”

এটিই স্ট্যানলি জোসেফ ম্যাককেব। অসাধারণ ব্যাটসম্যান। তার চেয়েও বড় মানুষ!

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post