৯৯’র বিশ্বকাপে পাকিস্তান-বধ: স্বপ্ন এবং দু:স্বপ্ন

খেলাধুলা ডেস্ক
নভেম্বর ১৩, ২০১৭
  হুমায়ূন আহমেদের কলাম  হুমায়ূন আহমেদের কলাম

আমরা ননফরম্যাল এডুকেশনের ওপর একটা সিরিয়াল বানাচ্ছি। সিরিয়ালের নাম - ‘শুক্লপক্ষ’। প্রায় এক শ’ জনের বিরাট এক দল নিয়ে আউটডোর শ্যূটিং করছি গাজীপুরে। আমাদের সীমাহীন ব্যস্ততা। লাঞ্চব্রেকের পর ক্যামেরা খোলা হল বিকাল তিনটায়। শিল্পী দু’জন - নাগরিকের আতাউর রহমান সাহেব এবং এই দিন দিন নয় গানের কুদ্দুস বয়াতি। তিনটা চল্লিশ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে শ্যূটিং হল। তিনটা পয়তাল্লিশে আমি বললাম, শ্যূটিং প্যাকআপ। আমি খেলা দেখব। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের খেলা। আমাকে দেখতেই হবে।

আমার ধারণা ছিল এই ঘোষণায় আনন্দের একটা ঢেউ বয়ে যাবে। শ্যূটিং প্যাকআপ মানেই আনন্দ, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা দেখার আনন্দ। আমি খুবই অবাক হয়ে দেখলাম, আমার এই ঘোষণায় আনন্দের বদলে সবাই খানিকটা বিরক্ত হলেন। শ্যূটিং প্যাকআপ মানেই কাজ নষ্ট। বাড়তি কাজটা করার জন্য বাড়তি সময় থাকতে হবে। ঘরে ফিরতে দেরি হবে। বিরক্তির মূল কারণ এটাই। আমার ধারণা আরও একটি কারণে খেলাটা দেখার ব্যাপারে কেউ আগ্রহী হচ্ছিল না - পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশ কি খেলবে? দেখা যাবে বিশ্বকাপে নিম্নতম রান পাওয়ার বিষাদমফ রেকর্প নিয়ে আমাদের ফিরতে হবে। ক্রিকেট রেকর্ডবুকে চিরস্থায়ী কলঙ্কের রেকর্ড লেখা হয়ে যাবে।

“ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বনিম্ন রান সংখ্যা ... ১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের  রান। পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ খেলা।”

পাকিস্তানীদের ভয়াবহ সব বোলারের সামনে আমাদের অসহায় ব্যাটসম্যানদের করুণ মুখ দেখা যাবে। কমেন্ট্রিবক্স থেকে ব্যাসম্যানদের নিয়ে রসিকতা করা হবে। পাকিস্তানী পতাকা নিয়ে পাকিস্তানী সাপোর্টাররা লাফালাফি-ঝাঁপাঝাঁপি করবে। সেই ছবি বার বার টিভি পর্দায় দেখা যাবে - এই মানসিক কষ্টের চেয়ে খেলা না দেখা ভাল।

কাজেই আমি শ্যূটিং প্যাকআপ বলার পরেও সিদ্ধান্ত হল শ্যূটিং চলবে। শ্যূটিং শুরু হল। আমি শুধু চলে এলাম, খেলা দেখব। অসহায় দলের কষ্টের সময় আমি তাদের পাশে থাকব না, তা হয় না। খেলা চলছে - বাংলাদেশ ব্যাট করছে। কয়েক ওভার তো হয়ে গেল। কেউ আউট হচ্ছে না কেন? পৃথিবীর দ্রুততম বল দেখেও কেউ তো ঘাবড়াচ্ছে না। বাউন্ডারি হচ্ছে। ব্যাপারটা কি? আমি খেলা দেখছি - বাইরে শ্যূটিং হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। বাইরে এসে বললাম - শ্যূটিং বন্ধ। আসুন সবাই খেলা দেখুন। আজ আমরা জিতব। বাংলাদেশ পঞ্চাশের ওপর রান করে ফেলেছে এখনও কেউ আউট হয়নি।

শ্যূটিং বন্ধ হয়ে গেল। সবাই বারো ইঞ্চি ছোট্ট টিভির সামনে ভিড় জমালাম। মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িযে গেল। দু’জন প্রোডাকশনের ছেলে ছুটে গিয়ে ঢোল, করতাল নিয়ে এলো। ব্যাটসম্যানরা বলে ব্যাটে ছোয়ানোমাত্র ঢোল-করতাল বেজে ‍ওঠে। হাততালি চলতে থাবে। আমি খেল দেখছি আর আমার খুব আফসোস হচ্ছে কেন গোপনে ভিডিও ক্যামেরাটা ঠিক করে রাখলাম না? তাহলে দর্শকদের উত্তেজনা ও আনন্দের ছবি ধরে রাখতে পারতাম।

মিষ্টি আনতে লোক চলে গেল। যদি বাংলাদেশ জিতে যায়। এত রাতে মিষ্টি কোথায় পাওয়া যাবে? বাবুর্চিকে বলা হলো বিরিয়ানি রান্না করতে। আমরা দু‘শ’ রানের কাছাকাছি একটা সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছতে পারলেই একটা উৎসব হবে।

পাকিস্তানী শেষ ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলেন। আমরা যে প্রচণ্ড হৈ চৈ করছিলাম কিছুক্ষণের জন্য সেটা থেমে গেল। বিস্ময়কর এক নীরবতা নেমে এলো আমাদের মধ্যে। কারণ, আমাদের সবার চোখেই পানি। আমরা সবাই চেষ্টা করছি। চোখের এই পানি যেন কেউ দেখে না ফেলে।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের খেলাকে কেউ কেউ হয়ত ‘৭১-এর যুদ্ধের সাথে তুলনা করবেন। আমি তা করছি না। খেলা হচ্ছে খেলা, আর যুদ্ধ হচ্ছে যুদ্ধ। আমি আনন্দিত পাকিস্তানীদের আমরা খেলা দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পেরেছি যে, আমরা সহজ পাত্র নয়। আমরা কঠিন জিনিস।

পাকিস্তান হয়তবা এবারের বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফিরবে। তাঁদের আনন্দের কোনো সীমা থাকবে না। কিন্তু, পাকিস্তানী দলের এই খেলোয়াড়দা যত দিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই তাঁদেরকে এক দু:স্বপ্ন তাড়া করে ফিরবে। তাঁদের সেই দু:স্বপ্নের নাম - বাংলাদেশ!

- ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে গিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে হারানোর পর অনুভূতি জানিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় এই কলামটি লিখেছিলেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post