আমার বাজী সৌম্য ও তাসকিন!

আরিফুল ইসলাম রনি
জুন ১৩, ২০১৭
সৌম্য ও তাসকিন বিশেষ কিছু! সৌম্য ও তাসকিন বিশেষ কিছু!

ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে বাজী। জিতলে ফাইনালে বাজী। জিতুক বা হারুক, এই দুই ম্যাচে ওরা ভালো করুক বা খারাপ, তবু আমাদের পরের সিরিজে বাজী। পরের বছরে বাজী। আগামী ১০ বছরের জন্য বাজী…

সৌম্যকে নিয়ে আগেও অনেক বলেছি। একই কথা বলেই যাব। সময় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে। সবচেয়ে জরুরী, তাকে বিশ্বাসটা দিতে হবে।

খারাপ করলে সমালোচনা অস্বাভাবিক নয়। তবে সৌম্য একটু খারাপ করলেই যেভাবে

‘ফুটওয়ার্ক খারাপ, ফুটওয়ার্ক বাজে’ বলে শোরগোল দেখি চারপাশে, তাতে ধন্দে পড়ে যাই। ভালো করলে ফুটওয়ার্কের কথা মনে থাকে না!

সৌম্য কখনোই নিখুঁত ফুটওয়ার্কের ব্যাটসম্যান ছিল না। আপাতত তার জন্য সেটা জরুরীও নয়। তার চোখ দারুণ। তার মূল শক্তির জায়গা রিফ্লেক্স, তার হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন। তার ফাস্ট হ্যান্ড রিলিজ। এসব দিয়েই সে বিশ্বের যে কোনো বোলিংকে গুড়িয়ে দিতে পারে নিজের দিনে। তার প্রতিভা এতটাই সহজাত।

একটা কথা মনে করিয়ে দেই, ব্যাটসম্যানদের জন্য ফুটওয়ার্ক অবশ্যই ভীষণ জরুরী কিছু। আবার যখন-তখন ফুটওয়ার্ক টেনে আনা মানেও এটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। ক্রিকেট বই-ই শেষ কথা নয়। ব্যাটিং ইজ অল অ্যাবাউট অ্যাডজাস্টমেন্টস। যে যেভাবে অ্যাডজাস্ট করতে পারে, সেটি যদি কার্যকরি নয়, তাহলে সেটিই তার জন্য নিখুঁত টেকনিক।

২০১১ বিশ্বকাপের সময় ইংল্যান্ডের সেই সময়ের ব্যাটিং কোচ গ্রাহাম গুচের ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। গুচ বলেছিলেন, “আমি নিজেকে ব্যাটিং কোচ বলি না। ব্যাটিং তো সবাই করতে পারে। আমি নিজেকে বলি রান মেকিং কোচ। রান করাটাই আসল, যে যেভাবে পারে…।”

তার মানে এই নয় যে সৌম্যর ফুটওয়ার্কে উন্নতির দরকার নেই। করতে পারলে তো দারুণ। কিন্তু তার ধরণের ব্যাটসম্যানের জন্য সলিড টেকনিকের চেয়ে বেশি জরুরী সলিড টেম্পারামেন্ট। স্ট্রং মেন্টালিটি, প্রচণ্ড মানসিক শক্তি। যেটা ছিল বিরেন্দর শেবাগের। জায়গায় দাঁড়িয়ে শট খেললে আমরা ছ্যা ছ্যা করে উঠি। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন আর মানসিক শক্তি দিয়েই শেবাগ বছরের পর বছর যে কোনো বোলিং বিধ্বস্ত করে গেছেন।

ধরণটা একরকম বলেই শেবাগকে টেনেছি। এই ঘরানার ব্যাটসম্যানদের আল্টিমেট তো শেবাগই।

কথায় কথায় অনেককে বলতে শুনি, সৌম্যকে অনেক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ ছেলেটা মাত্র ৩০টি ওয়ানডে খেলেছে। শুরুর সময়ের শেবাগের সঙ্গে তুলনা করি। ৩০ ওয়ানডে শেষে শেবাগের রান ছিল ৭২০, গড় ২৮.৮০। ১টি সেঞ্চুরি, ৫টি ফিফটি। স্ট্রাইক রেট ৯৭.৮২। ৩০ ওয়ানডেতে সৌম্যর রান ৯৫৯, গড় ৩৬.৮৮। ১টি সেঞ্চুরি, ৬ ফিফটি। স্ট্রাইক রেট ৯৭.২৬। বেশ এগিয়ে সৌম্য। আমাদের অস্থিরতার কারণ তো দেখি না!

শেবাগের সঙ্গে সৌম্যর তুলনায় কেউ আবার আঁতকে উঠবেন না। যারা ২০০১ বা ওই সময়ের শেবাগকে দেখেননি বা যাদের মনে নেই, সেই সময়ের শেবাগকে টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হত। তাতে কেউ জিহবায় কামড় দেয়নি। শেবাগ পরে টেন্ডুলকার হননি, নিজেরই ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছেন। সৌম্যরও শেবাগ হতে হবে না। নিজস্ব ব্র্যান্ডও গড়তে হবে না। স্রেফ তার সামর্থ্যটা দেখিয়ে যেতে পারলেই অনেক অনেক অনেক ম্যাচ জেতাবেন বাংলাদেশকে।

স্রেফ মনটাকে আরও শক্ত করতে পারলেই সৌম্য আরও বিধ্বংসী ও ধারাবাহিক হবে। মন শক্ত করার কোনো বটিকা বা জাদুমন্ত্র নেই। সময়ের সঙ্গে তার সেই আত্মবিশ্বাস আসবে। যদি সেই সময়টা আমরা তাকে দেই। যদি ফুটওয়ার্কের ধোয়া তুলে পাগল করে না ছাড়ি। শেবাগ যদি চিন্তা করত তার পা কোথায়, তাহলে সে শেবাগ হতে পারত না। সৌম্যকে যদি ফুটওয়ার্কের চিন্তায় ঘুম হারামের পথে ঠেলে দেই আমরা, তাহলে সৌম্য আর সৌম্য হয়ে উঠতে পারবে না।

শেবাগের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, ক্যারিয়ার জুড়ে সে একই ভাবে ব্যাট করে যেতে পেরেছে। সৌম্যর জন্য কাজটা কঠিন। এখন সোশাল মিডিয়ার এত প্রভাব, হাজারো অনলাইন, প্রতিক্রিয়া এখন এত সরাসরি আর কাছাকাছি যে সবসময় এড়িয়ে চলা মুশকিল। আমাদের দায়িত্বের জায়গাটা এখানেই, সৌম্যর কাজ কঠিন করে না ফেলি। সৌম্যকে আমরা ব্যাটিংটা উপভোগ করতে দেই। সৌম্য ব্যাটিং উপভোগ করলে সেটি দেখার মতো উপভোগ্য কিছু বাংলাদেশের ক্রিকেটে কমই আছে।

তাসকিনের যন্ত্রণা আরও বেশি। সে সুদর্শন। গ্ল্যামারাস। তার ক্রিকেটের চেয়ে লোকজনের কাছে যেন এসবের আবেদনই বেশি। বেশি বলেই এসব দিয়ে তার ক্রিকেটকে বিচার করতে থাকে অহরহ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে ওর বোলিং বাজে হয়েছে বলে সে কী সমালোচনা! সবচেয়ে আপত্তিকর কথাটাই সবচেয়ে বেশি বলা হয়। সে নাকি ব্রেইনলেস, তার মাথা নাই!

অথচ বছরের পর বছর ধরে আমরা একজন গতিময়, আগ্রাসী ফাস্ট বোলার খুঁজে হাপিত্যেশ করেছি। যার কাজ হবে শুধু জোরে বল করা। দলের সবার আলাদা ভুমিকা থাকে, এটাও লোকে বুঝতে চায় না। তাসকিনের তো রান আটকানোর দরকার নাই! সেই দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয় না। রান আটকানার জন্য দলে আরও ৪-৫টা বোলার আছে। তাসকিনের কাজ গুলির বেগে বল করা। গোলায় ব্যাটসম্যানদের উড়িয়ে দেওয়া। সিম্পল। তাসকিন আমাদের বোলিংয়ের “এক্স ফ্যাক্টর।”

তার বয়স ২২ বছর, ৩২ নয়। আগামী ৫ বছর তার কাজ হবে শুধু জোরে বল করা। খাঁটি বাংলায় বললে ধুমাইয়া উড়াধুরা বল করা। ৫ বছর পর ২৭ বছর বয়সী তাসকিন জানবে, কখন কিভাবে বল করতে হয়।

আমাদের গোল্ড ফিশ মেমোরি। তাই মনে নেই, রানের খেলা টি-টোয়েন্টি গত এশিয়া কাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কতটা অসাধারণ বোলিং করেছিল তাসকিন। আমাদের মনে নেই, ছোট বেলা থেকে অভ্যস্ত অ্যাকশনটা মাত্রই গত বছর শুধরেছে ছেলেটা। ওসব যদি মনে নাও থাকে, নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটাও অন্তত কিছুদিন যেন সবার মাথায় থাকে।

প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছিলেন তাসকিন, লুক রনকি আউট হয়েছিলেন গতির কারণেই। পরের উইকেটটি ছিল তাসকিনের স্মার্ট চিন্তা আর বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে। রস টেলরকে বাউন্সারে কাঁপালেন। পরের বলটি স্লোয়ার করবেন বলে ঠিক করলেন। টেলরকে স্কুপ করার পজিশনে যেতে দেখে স্লোয়ারই করলেন শেষ মুহূর্তে লেংথ অ্যাডজাস্ট করে।

ফেসবুক যোদ্ধারা সুযোগ পেলেই ঘোষণা করে দেয় তাসকিন ব্রেইনলেস। দেশের একটা সম্পদকে যারা ব্রেইনলেস বলে, তারা কত বড় ব্রেইনলেস!

অথচ তাসকিন মানে শুধু প্রতিভা নয়, শুধু সম্ভাবনা নয়, পারফরম্যান্সে সামর্থ্যের প্রমাণও। সৌম্য-শেবাগের মতোই একটু ব্রেট লি আর তাসকিনের তুলনা করার দু:সাহস দেখাই। ২৮ ওয়ানডেতে ৪৩ উইকেট তাসকিনের, গড় ২৬.৮৩। প্রথম ২৮ ওয়ানডেতে লির উইকেট ছিল ৪৮টি, গড় ২৫.৩৩। খুব পিছিয়ে তাসকিন?

লি তখন প্রতি ৩০.৮ বলে নিয়েছেন উইকেট, তাসকিন প্রতি উইকেট নিয়েছেন ২৮.৫ বলেই। সেই ২০০০-২০০১ সালে ওভারপ্রতি ৪.৯১ রান দিয়েছেন লি। এই যুগে তাসকনের ৫.৬৪ তাই লির চেয়ে খুব বাজে নয়। দুজনের ৫ উইকেট একবার করে। ৪ উইকেট লির একবার, তাসকিনের ২ বার!

অবশ্যই তাসকিন ব্রেট লি নন। লি হতেও হবে না, তাসকিন হলেই চলবে। তাসকিন তাসকিন হলেই বর্তে যাবে দেশের ক্রিকেট। আর লি-টি বাদই দিলাম, মুস্তাফিজ ছাড়া বাংলাদেশের আর কোন বোলারের এমন শুরু হয়েছে!

তার পরও তাসকিনের রক্ষে নেই। কারণ সে ‘মডেল’। যেহেতু সে মডেল, তাকে প্রতি ম্যাচেই ভালো করতে হবে। সে যদিও ফাস্ট বোলার, তবে যেহেতু মডেলও, তাই তাকে মাঠে মাথা খাটানো আইনস্টাইন হতে হবে প্রতি ম্যাচে!

অথচ এই ছেলেটির ক্রিকেটের প্রতি নিবেদনে বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই। এই ছেলেটি নিজেকে ফিট রাখতে, নিজেকে শাণিত করতে দিনের পর দিন কষ্ট করে যাচ্ছে। ট্রেনিংয়ে কোনো ফাঁকি নই, দলের রুটিনের বাইরেও নিজ দায়িত্বে বাড়তি জিম করা, বাড়তি খাটুনি খেটে যাচ্ছে। ঘাম ঝরাচ্ছে। ওয়ার্ক এথিকস দারুণ।

শেখার আগ্রহ প্রবল। স্বপ্ন আকাশ সমান। ফাস্ট বোলারদের জন্য যেটা ভীষণ জরুরী, বোলিংয়ের প্রতি প্যাশন তীব্র। আমার কাছে আগ্রহ আর এই ডেডিকেশনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা তাসকিনের চুলের জেল দেখি। তার গা ঝরানো ঘাম দেখি না। আমরা টিভিতে, বিলবোর্ডে তাসকিনকে দেখে জ্বলে পুড়ি, অথচ জিমে-নেটে স্বপ্ন নিয়ে খেটে যাওয়া ছেলেটার খবর নিয়ে তৃপ্তি পেতে চাই না।

সবচেয়ে অবাক হয় দেখেছি, তাসকিনকে আগলে রাখে বলে মাশরাফিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। ম্যাশের স্বার্থ কি? স্বার্থ, ছেলেটা দলের সম্পদ। দেশের ভবিষ্যত তো বটেই, বর্তমানও। ছেলেটাকে দেখে তার নিজের অতীত মনে পড়ে। তাই নিজের দুর্ভাগ্যের পথে এই ছেলেটিকেও যেতে দিতে চান না। ম্যাশের স্বার্থ, তাসকিন ঠিক পথে থাকলে জিতবে দেশের ক্রিকেট।

বহুবার বলা আরেকটা কথাও আরেকবার বলি। বিশেষ প্রতিভার জন্য ব্যবস্থাও বিশেষ রাখতে হয়। ট্রিটমেন্ট বিশেষ করতে হয়। সবার সঙ্গে গড়পড়তা তুলনা চলে না।

সৌম্য ও তাসকিন বিশেষ কিছু!

- ফেসবুক থেকে

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post