শান্ত থাকুন, সমর্থন দিন এবং উপভোগ করুন

 প্রতীকি ছবি প্রতীকি ছবি

পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে খুব অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে ভারতই হতে যাচ্ছে সেমিফাইনালে আমাদের প্রতিপক্ষ।

আরেকটা ভারত-বাংলাদেশ খেলা। ঠিক খেলা নয়, মিডিয়া ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কল্যানে এটা এখন ‘লড়াই’। আর এই লড়াইয়ের জোয়ারে ভেসে যায় আমাদের গোটা সমাজটাই। চায়ের দোকানে পান খেয়ে বকবক করতে থাকা তরকারী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ফিনফিনে পাঞ্জাবী পরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক; সবাই এখন খুব উত্তেজিত।

বাস্তবতা এই যে, রাজনৈতিক অসহনশীলতা ও রেষারিষির কারণে ভারত-পাকিস্তান লড়াই আর আগের মতো নিয়মিত হয় না। অন্য দিকে পাকিস্তান দুর্বল দলে পরিণত হওয়ায় যে দু একটা সাক্ষাত দু দলের হয়, তাতে ‘লড়াই’ ব্যাপারটা আর জমে না। তাই বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান, পৃষ্ঠপোষকরা এখন লড়াইটা তৈরী করে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে। তারাই উষ্কানিটা দেয়। উষ্কানি দেয় মিডিয়াগুলোও; তাতে হিট বাড়ে।

আর এই উষ্কানি এখন এমনই সর্বগ্রাসী যে, ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ আর ঠিক ক্রিকেট থাকছে না। এখানে চলে আসছে আরও অনেক অনেক ফ্যাক্টর। শুরু হচ্ছে নোংরামি। কাটা মুন্ডুর ফটোশপ থেকে শুরু করে নাম বিকৃতি, বিকৃত উল্লাস এসে দখল করে নিচ্ছে ক্রিকেট উপভোগের জায়গা।

এই কঠিন সময়ে দাড়িয়ে আমরা যারা ক্রিকেটেরই জয় দেখতে চাই, তাদের হয়ে কয়েকটা পয়েন্ট তুলে ধরবো।

 

নোংরামি জয় এনে দেয় না

খেলাটা মাঠে হবে। আমরা জানি, আপনাদের মাঠের খেলার অভিজ্ঞতা ভালো না।

মাঠেও বাংলাদেশকে এই ভারতের বিপক্ষে অন্যায়ের শিকার হতে দেখেছেন। তাই মাঠের লড়াইকে পার করে আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমে এক ধরণের গলাবাজি করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু বিশ্বাস করেন, ফেসবুক কখনোই জয় এনে দিতে পারে না।

নোংরামি কেবলই নোংরামি জন্ম দেয়।

আজ আপনি একটা কিছু বাজে কথা বলবেন, কাল ওপাশ থেকে তার আরও বাজে উত্তর পাবেন। এটা একটা দুষ্টচক্র। হ্যা, এমনও হতে পারে যে, ওপাশ থেকেই কেউ শুরু করলো। নিশ্চিত থাকুন, আপনি নোংরামির উত্তর নোংরামি দিয়ে দিলে একটুও লাভ নেই। বরং তার বদলে আপনি মুচকি হাসলে সেই অপমানিত হবে।

অতএব কোনো নোংরামি নয়।

কোনো কাটা মুন্ডু টাইপের ফটোশপ নয়, কোনো নাম বিকৃত করা নয়। দেশের নামে তো বিকৃত করা চলবেই না।

এই দেশের নাম বিকৃত করাটা একটা ফাঁদ। একটা হিসেব করে দেখুন। আমরা মানুষ ১৬ কোটি। ধরে নিলাম যে, সবাই একবার করে ইন্ডিয়াকে ‘*ন্ডিয়া’ বললাম। বদলে ওরা কী করবে? ওরা দেড় শ কোটি মানুষ। সবাই একবার করে আমাদের ‘*ংলাদেশ’ বলবে। গালির এই প্রতিযোগিতার ফল কী হলো।

আপনি একটা গালি দিয়ে নিজের দেশকে দশটা করে গালি শোনালেন। এই প্রতিযোগিতায় কী জয় এলো?

তাহলে শান্ত থাকাই শ্রেয়।

 

আইসিসি মানেই ভারত: এটা আর সত্যি নয়

আমাদের অনেক অভিমান, ক্ষোভ আইসিসির ভারতের প্রতি পক্ষপাত নিয়ে।

এর প্রতিটা ক্ষোভের উপযুক্ত কারণ আছে। একটা লম্বা সময় ধরে আইসিসিতে এই নোংরামি করেছেন ভারতীয় কিছু কর্মকর্তা। বিশেষ এন শ্রীনিবাসন। কিন্তু সবসময় যেটা বলি, শ্রীনিবাসন ভারতের প্রতীক নন। সেই কথাটা অবশেষে সত্যি হয়েছে।

আজ আইসিসি যে বদলাচ্ছে তারও মূলে আছেন একজন সৎ, নির্ভিক ভারতীয় আইনজীবি-শশাঙ্ক মনোহর। এই লোকটিরই উদ্যোগে ভেঙে গেছে তিন মোড়লের চক্র। এই লোকটিই ভারতের অন্যায্য পাওনা কেটে নিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, আইসিসি আর ভারতের ইঙ্গিতে চলে না। ফলে আইসিসির আয়োজন মাত্রেই ভারতকে সন্দেহ করার দিন শেষ।

আমরা জানি, নানারকম গুজব আপনারা শুনতে পাবেন এই সময়ে। ভরসা রাখুন। মনোহর বেচে থাকতে আইসিসি আর পক্ষপাত দেখাবে না। ফলে বুকে বল রেখে খেলা দেখার জন্য প্রস্তুত হন।

 

ক্রিকেট রাজনৈতিক সমাধাণ নয়

আমি খেলাধুলায় রাজনীতি মেশানোর বিপক্ষে নই। ততোটা সুশীল আমি নই।

খেলাধুলা একটা রাজনৈতিক কর্মকান্ড। এখানে রাজনীতি থাকবে। তবে ঘটনা হচ্ছে, খেলা থেকে যারা রাজনৈতিক সাফল্য আশা করেন, তারা আসলে রাজনীতির শক্তিকে ছোট করে দেখেন। রাজনৈতিক দাবি রাজনীতির মাঠেই আদায় করতে হয়।

এই বোধটা থাকলে ক্রিকেটের জয়ে রাজনৈতিক বিজয় হলো, এমন মূর্খের ভাবনা ভাবার আর সুযোগ থাকবে না। জীবনটা সহজ হবে। ফলে রাজনৈতিক বিজয়ের আশা নিয়ে ক্রিকেট দেখতে বসবেন না। ওতে প্রেশার বাড়বে ছাড়া আর কোনো লাভ হবে না।

 

ক্রিকেটই সেরা রোমাঞ্চ

আমি সবসময় বলি, বিরাট কোহলির একটা শট, মুস্তাফিজের একটা কাটার বা ডি ভিলিয়ার্সের একটা ৩৬০ ডিগ্রি শট দেখার পরও যার চিয়ার লিডার লাগে, সে সুস্থ মানুষ নয়।

ক্রিকেট নিজেই তো অনেক বড় বিনোদন। ক্রিকেটের পরতে পরতে পরিসংখ্যান আর ইতিহাস নিয়ে কতো খোচাখুচি, কতো মজা করার সুযোগ আছে। সেখানে গালি, ফটোশপের কী দরকার? লড়াইটা আমরা ক্রিকেট দিয়েই করতে পারি না?

আমরা কেনো আমাদের সামর্থের জায়গাগুলো নিয়ে বেশী বেশী প্রচার করবো না। কেনো আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দিয়ে লড়াই জিতবো না? কেনো আমাদের অক্রিকেটীয় ব্যাপার লাগবে?

কোনো কারণই নেই।

ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ আসছে। উত্তেজনায় মেতে উঠুন। ভাবুন এই ম্যাচের ভেতর কতো ধরণের ক্রিকেটীয় লড়াই আছে। সে নিয়ে কথা বলুন। দেখুন, রাজনীতি, গালি আর নোংরামি নিয়ে ভাবার সময়ই পাচ্ছেন না।

ক্রিকেট উপভোগ করুন।

 

আমি জানি আমার এই লেখা তেমন কাউকে বদলাবে না। যে যা করার তাই করবেন। তবে এটা একটা টেস্টিমনির মতো হয়ে রইলো। এই অনলাইনে ভারতের অসাধুতা, শ্রীনিবাসনদের দুষ্টচক্র নিয়ে অনেক অনেক লিখেছি। সেসব লেখা জনপ্রিয়ও হয়েছে। কিন্তু কখনোই চাইনি উষ্কানি দিতে।

আজ আরেকটা ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচ যখন সামনে, তখন নিজেদের লোকেদের কাছে উষ্কানিতে পা না দেওয়ার দাবিটা জানিয়ে গেলাম। আমি জানি, ভারতীয়রা হয়তো এরপরও অনেক কিছু করবে। করুক। ওরা তো আমরা নই।

আমরাই শুরু করে উপভোগের লড়াই, শান্ত থাকার লড়াই।

একদিন তারা আমাদের দেখেই হয়তো বদলাবে।

শুভরাত্রি।

 

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post