তিনি থাকেন নিভৃতে

রিজওয়ান রেহমান
জুন ১০, ২০১৭
 পর্দার আড়ালের নায়ক পর্দার আড়ালের নায়ক

ক্যারিয়ার শেষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের বড় পরিচয় কি হবে? বিশ্বকাপের মঞ্চে ‘ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরিয়ান’ নাকি ‘ক্রাইসিস ম্যান’? সব ছাপিয়ে বোধহয় ‘আনসাং হিরো’ পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠবে। নায়ক হওয়াটা যেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের চরিত্রেই নেই।

কালই যেমন। উইকেটে আসার পর এডাম মিলনে অভ্যর্থনা জানালেন ১৪৩ কি.মিয়ের গোলায়। এর আগের বলেই, ৯১ মাইলের বুলেটগতিতে পরাস্ত হয়ে ফিরে গিয়েছেন, টেকনিক্যালি দেশের সেরা ব্যাটসম্যান বলে বিবেচিত মুশফিকুর রহিম। এরও আগে, সুইং বোলিংয়ের অনুপম প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং লাইনআপের কোমর ভেঙে দেয়ার কাজটি করেছেন টিম সাউদি। বল তাই ৭০ টি খরচ হলেও রানের খাতায় কেবলই ৩৩, উইকেটের ঘরে সংখ্যাটি ৪। এরই মাঝে, তিনি এলেন।

যার সাথে জুটি বাঁধলেন উইকেটে এসে, সেই সাকিব আল হাসান পুরো ইউরোপ ট্যুরের মতোই তখনো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। তাঁর নামের পাশে তখন ১৩ বলে ৩ রান। তিনি এলেন, সাকিব আল হাসানের সাথে জুটি বাঁধলেন।

আরো বহুবারের মতোই তখন আবারো একটি ব্যাটিং ভরাডুবির শঙ্কা। এই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি শুরুর আগের প্রস্তুতি ম্যাচেই তো ভারতের সাথে ৮৪ রানে অলআউট হবার দুঃসহ স্মৃতি। শঙ্কাটা তাই অমূলকও নয়।

শঙ্কার সেই চোরাস্রোত উড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন মুখোমুখি হওয়া তৃতীয় বলেই। ‘আক্রমণই সেরা রক্ষণ’ এই আপ্তবচন মেনে মিড উইকেট দিয়ে চার মেরে যার সূচনা। বোলার সেই টিম সাউদি। কিছুক্ষণ আগেই যিনি সুইং বোলিংয়ে নাকাল করেছেন বাংলাদেশের টপ অর্ডার।

এরপর যখন থামলেন, জয় তখন হাতে ধরা দিয়েছে। আর এর মাঝের সময়টায় যা করলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের হল অব ফেমে জায়গা করে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। এই মাঝের সময়টায় সাকিব আল হাসানের যেই জুটি গড়লেন, রেকর্ড বুকে তা আঁকিবুঁকি কেটেছে অনেক জায়গাতেই।

কি ছিলো এই ইনিংসে? স্কোরকার্ড বলবে ৮ চার আর ২ ছয়ের এই ইনিংস বাংলাদেশকে জয়ের বন্দরে ভিড়িয়েছে। যা বলার সাধ্য নেই, গোটা বাংলাদেশের লাইফ সাপোর্ট হয়ে টিকে ছিলো এই ইনিংসটি। সেমিফাইনালের টিকেট যে এখনো মিথ্যে মরীচিকা হয়ে যায়নি, তার ‘বিহাইন্ড দ্যা সিন’ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ১০২ রানের এই কাব্যিক ইনিংস।

এই দেখুন, কাব্যিক বলাটা একটুও বাড়াবাড়ি হচ্ছে না। শুধু ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেই ইনিংসটি ‘ক্লাসিকাল ইনিংস’ হওয়ার দাবি রাখে। হুক, পুল, কাট, স্ট্রেট ড্রাইভ তথা নিখাদ সব ক্রিকেটিং শটে এমনই এক ইনিংস খেলেছেন, সব ক্রিকেটবোদ্ধার প্রশংসাবাক্য কুড়ানোর জন্য যথেষ্ট। এর সাথে যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়, ‘মহাকাব্যিক ইনিংস’ বলতে একটুও দ্বিধা হয় না।

পাওয়ারপ্লেতে এবারের টুর্ণামেন্টের সবচেয়ে কম আর সবচেয়ে বেশির দেখা মিলেছে এই ম্যাচের বাংলাদেশের ইনিংসেই। প্রথম ১০ ওভারে ২৪ রানের কম এবারের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কোনো দল তোলেনি, একইসাথে ৩ উইকেট কোনো দল হারায়ওনি। যার প্রেক্ষিতে স্কোরবোর্ডে ৫০ রান জমা করতে বল লেগেছে ৯০ টি।

১৬ তম ওভারে প্রথম ৫০ ছোঁয়া বাংলাদেশ যে ১০০ রানের হার্ডল পেরিয়ে যায় পরবর্তী ৪৫ বলেই, তার কারণ মাহমুদউল্লাহর শুরুর দিকের প্রতি আক্রমণ। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা যে শুরুর ওই চার উইকেট তুলে নেয়ার পর আরো চড়াও হতে পারেননি, ইনিংসের গোড়ার দিকের মাহমুদউল্লাহর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংই তার পেছনের কারণ।

শুরুর ওই প্রতি আক্রমণের পরে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে সিঙ্গেলস-ডাবলসেই মন দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। দ্রুত চার উইকেট পতনের পরও মুহূর্তের জন্যও আর রান পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েনি, তার নেপথ্যের কারণ মাহমুদুল্লাহর ওই ইনিংস। একপাশে বড় সীমানার সুবিধা আদায় যে পুরোটাই করেছেন, কেবল সিঙ্গেলস-ডাবলসেই ৫৮ রান নেয়া সেটাই প্রমাণ করে।

শুরুর দিকের সেই দুর্দান্ত কিউই পেস এটাক সময়ের সাথে সাথে ধারহীন হয়ে গিয়েছিলো, তার জন্য মাহমুদুল্লাহর ইনিংসকে কৃতিত্ব দেয়াই যায়। একটি ছোট্ট পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা যেতে পারে এ প্রসঙ্গে, যেখানে দেখা যায়, শুরুর দশ ওভারে বাংলাদেশের ইনিংসে ওয়াইড ছিল একটি, ইনিংস শেষে সে সংখ্যা বেড়ে ১৮ তে দাঁড়িয়েছে। পুরোটা ইনিংসেই একবারও ব্ল্যাকক্যাপস বোলিং ইউনিটকে চেপে বসার সুযোগ দেননি বরং সুযোগ পেলেই চড়াও হয়েছেন বোল্ট-সাউদি-মিলনেদের উপর। ৮ চার কিংবা ২ ছয়ে সাজানো ইনিংস তো সে সাক্ষ্যই দেয়।

বলা যায়, সাকিব-মাহমুদুল্লাহর রেকর্ড ২২৪ রানের জুটির কথাও। এই জুটিতেই তো রচিত এবারের কিউই-বধ কাব্য। দেশের ক্রিকেটের মাহাত্ম্য ছাড়িয়ে যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই এক সৌধ তুলে দাঁড়িয়ে।

বিশ্লেষকেরা এই ম্যাচের ‘ম্যান অব দ্যা ম্যাচ’ হিসেবে খুঁজে নিয়েছেন সাকিব আল হাসানকে। দারুণ ইকোনোমিক বোলিংয়ের পর চাপের মুহূর্তে ম্যাচ জেতানো শতক, ম্যান অব দ্যা ম্যাচ পুরষ্কার তিনি পেতেই পারেন। তবে এই ইনিংসের কিছুটা কৃতিত্ব অপর প্রান্তের রিয়াদকে না দিলে অকৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

ফর্ম খুঁজে ফেরা সাকিব আল হাসান যে রানে ফেরার জন্য এই ম্যাচকেই বেছে নিতে পারলেন, তার কারণ তো ওই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ-ই। এক প্রান্ত ঠিকঠাক আগলে রাখতে পেরেছেন বলেই তো দ্রুত চার উইকেট হারানোতে সাকিব টলেন না, সাকিবও আর চাপে পড়েন না।

জয়সূচক রানটি তাই মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এলে প্রতীকী ছবি হিসেবেই চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু, ক্রিকেট-বিধাতা বোধহয় ভিন্ন কিছু ভাবছিলেন। সাকিবের আউটের পর মোসাদ্দেকের ব্যাটেই তাই ম্যাচের সমাপ্তি।

চাইলে এই ছবিটাকেও প্রতীকী ধরতে পারেন, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ নায়ক হন না।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post