ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর: তামিম ইকবাল

  শাণিত হওয়া মানে খেলার ধরণে আরও ম্যাচিউরিটি আসা, আরও বেশি ফোকাসড আসা।   শাণিত হওয়া মানে খেলার ধরণে আরও ম্যাচিউরিটি আসা, আরও বেশি ফোকাসড আসা।

দুটো পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতে চাই, তামিম ইকবালকে বোঝার ক্ষেত্রে আমি মনে করি যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ:

• ক্যারিয়ারের ১ম বা ২য় ওয়ানডেতে তামিম ইকবাল ওপেন করেছিলেন জাভেদ ওমরের সাথে। ২০১৫ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে তার সঙ্গী ছিলেন এনামুল হক বিজয়। এখনো পর্যন্ত তামিম ইকবাল টেস্ট খেলেছেন ৪৯টি, ওয়ানডে ১৭০টি এবং টি-টোয়েন্টি ৫৬টি- অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে ২৭৫ বার আবির্ভূত হয়েছেন, কিন্তু মেমরি স্ক্যান করে কেবলমাত্র ওই দুটো ম্যাচকেই স্মরণে আনতে পারি যেখানে তামিম ইকবাল ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে ছিলেন। এর বাইরে প্রতিপক্ষ, কন্ডিশন যা-ই হোক, যদি স্কোয়াডে থাকেন, বাংলাদেশের ইনিংসে প্রথম বল মানেই সেটা তামিম ইকবাল খেলবেন নিশ্চিত। একবার পাকিস্তানের বিপক্ষে কোনো এক ম্যাচে আম্পায়ার অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পার্টনারের সাথে প্রান্ত বদল পর্যন্ত করেছিলেন; তবু ম্যাচের প্রথম বল ফেস করা বা স্ট্রাইকিং ব্যাটসম্যান হিসেবে তামিম ইকবালই ছিলেন। ক্রিকেটের ইতিহাসে যতজন ওপেনার ছিলেন তাদের ব্যাটিং পজিশন নিয়ে রিসার্স করলে নিশ্চিত করে বলতে পারি, এমন একজনও পাওয়া যাবে না, যিনি ক্যারিয়ারজুড়ে নিরঙ্কুশভাবে ম্যাচের প্রথম বলটিই খেলেছেন সবসময়। প্রশ্ন হলো, প্রথম বলটি কেন খেলতেই হবে, কোনো কোনো ম্যাচে ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে খেললে সমস্যা কোথায়?

• ২০১২ বিপিএল আসরে চিটাগাং ভাইকিংসের দায়িত্বশীল একটি পোস্টে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ডিন জোন্স। তার সাথে তামিম ইকবালের মনোমালিন্যের খবর এসেছিলো মিডিয়াতে। টুর্নামেন্টে তার ফর্ম খুব স্বস্তিদায়ক ছিলো না, ডিন জোন্স তাকে ওয়ান ডাউনে খেলার জন্য বলেছিলেন, তিনি কোনোভাবেই সেটা মেনে নেননি। এ তো গেল ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কম-বেশি সব ওপেনারই ওয়ান ডাউন বা অন্য কোনো পজিশনে ব্যাট করেছেন। এখানেও তিনি ইউনিক; ওপেনারের বাইরে তার একটিও ইনিংস নেই। এমনকি আমার ধারণা, পাড়ার ক্রিকেটেও তিনি ওপেনিং ছাড়া খেলেননি।

এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। তামিম ইকবাল এমন এক পারসোনালিটি যাকে খুব সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হলে এই দুটো ফ্যাক্টরকে বিবেচনায় নেয়া বাঞ্ছনীয়। একজন বোলার বোলিং করছেন, ননস্ট্রাইকিং প্রান্ত থেকে সেটা দেখার মধ্যে এক ধরনের অপেক্ষা আছে, অন্য ব্যাটসম্যানকে দেখে পরিস্থিতি বোঝার ব্যাপার আছে, শেষ মুহূর্তের মানসিক প্রস্তুতি রিভিউ করে নেয়ার ব্যাপার আছে; ওয়ানডেতে টেন্ডুলকার ওপেনার হিসেবে যতগুলো ম্যাচ খেলেছেন, তার ৮০% এরও বেশিক্ষেত্রে তিনি ননস্ট্রাইকিং এন্ডে থাকতেন। স্ট্রাইকিং ব্যাটসম্যানের পরিস্থিতি আলাদা। নতুন বলটি তখনো পিচে স্পর্শ করেনি, তরতাজা বোলার, ফিল্ডাররা আড়মোড়া ভাঙছে, আম্পায়াররা সক্রিয় হচ্ছে ধীরে ধীরে- সেই মুহূর্তে সময় এবং হার্টবিট দুটোই সাময়িক স্থির হয়ে থাকে যেন; স্টেডিয়ামে প্রাণ আসে যখন প্রথম বলটা ডেলিভারি দেয়া হয়, এবং স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যানই নির্ধারণ করে ম্যাচের একদম প্রারম্ভিক রিএকশন কী হবে। এর মধ্যে এক ধরনের সুতীব্র কনফিডেন্স আর সেলফ-বিলিফ এবং রিলিফ কাজ করে।

ভিন্ন একটি ভীষণ সরল অথচ তাৎপর্যপূর্ণ এঙ্গেল থেকে দেখতে চাচ্ছি ব্যাপারটা। ম্যাচের প্রথম বলটা যে ফেস করে স্কোরশিটে তার নামটাই থাকে সবার উপরে। ‘সবার উপরে’ শব্দবন্ধটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সবার উপরে থাকতে হবে এই এম্বিশন থেকেই জন্ম নেয় দৃঢ় সংকল্প বা ডিটারমিনেশন এবং তা বাস্তবায়নে কী করতে হবে এটা যদি আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করা যায় সেই মানুষকে দিয়ে অসাধ্য সাধন করানো খুবই সম্ভব। তামিম ইকবালের এই বৃহৎ বিবর্তনে আমি তাই একটুও অবাক হই না কখনো। অনেকে বলবেন কোচ বলেছেন, ম্যানেজমেন্ট বুঝিয়েছে বা বড় খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলে এই বিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তামিমের পারসোনালিটির মধ্যেই ‘টপমোস্ট’ বৈশিষ্ট্যটি থাকায় বাকি ব্যাপারগুলো সহজ হয়ে গেছে। কোচ, ম্যানেজমেন্ট, বড় খেলোয়াড় থেরাপি সবার উপরই তো প্রয়োগ করা হয়; তামিমের মতো কেউ হতে পারলো না কেন? যে কারণে প্রথম বলটিই খেলতে হবে মানসিকতা কাজ করে তার মধ্যে, একই কারণ।

কিন্তু টপ এর সীমানা কি শুধু বাংলাদেশ? এ তো অনেকটা কূপণ্ডুকতা হয়ে গেল, অন্তত সমকালীন ক্রিকেট দুনিয়ায় টপ ফাইভ ব্যাটসম্যান বললে সেখানে তার নাম থাকা উচিত ছিলো। সেটা হলো না হচ্ছে না কেন? এটা স্রেফ একটা প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িত একটি দেশের সামগ্রীক ক্রিকেট কালচার, ইনফ্র্যাসট্রাকচার এবং ঐতিহ্য, সর্বোপরি পারসোনালিটি টাইপ। এইসব ভাবতে গিয়েই চলে আসবে বিবিধ প্রসঙ্গ।

ক্রিকেটার না হয়ে আদৌ কি উপায় ছিলো?

৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনকে ধরা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম মিনিংফুল প্যারাডাইম শিফট। সারা দেশ উন্মাতাল হয়ে উঠেছিলো; সেই উন্মত্ততার অনুভূতি তামিমেরটার সাথে মিলবে না কারোরই। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকরাম খান তার চাচা; ১০-১১ বছরের এক বাচ্চার মনোজগত কতখানি আলোড়িত হতে পারে এই অর্জনে? তার বাবা ইকবাল খান বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়াসংগঠক, বড় ভাই নাফিস ইকবাল বয়সভিত্তিক দলগুলোর অধিনায়ক, এবং বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হবেন, এটা ছিলো প্রায় অবধারিত।

সেই পরিবারের একটা ছেলে ক্রিকেটার না হয়ে অন্য কোন্ পেশায় যেতে পারতো? টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর যতজন ক্রিকেটার জাতীয় দলে খেলেছে, এরকম সমৃদ্ধ ক্রিকেট-পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই একজনেরও। অন্যরা যখন পেপারে টেন্ডুলকার, লারা, সাঈদ আনোয়ারদের গল্প পড়তো, তখন তিনি চাচা বা ভাইয়ের মুখেই জেনেছেন এই মানুষগুলো সম্পর্কে। গ্রুপ অব কোম্পানীগুলো যেমন এক পর্যায়ে ফ্যামিলি বিজনেস হয়ে যায়, তার ক্ষেত্রে ক্রিকেটটাও তেমন পারিবারিক পেশার মতো।

ঐতিহ্যের একটা অপ্রত্যক্ষ এডভান্টেজ তিনি পেয়েছেন; অন্যদের হয়তো কোনো না কোনো ইনস্পাইরেশন লেগেছে ক্রিকেটার হওয়ার জন্য, তিনি হয়তোবা জন্মের পরই ব্যাট পেয়ে গেছেন। এই ঐতিহ্যের দাম দিতে হবে না? এই যুক্তি খেলো লাগতে পারে; গাভাস্কারের ছেলে, টেন্ডুলকারের ছেলে, কিংবা চ্যাপেলদের কারো ছেলেই তো ভালো ক্রিকেটার হয়নি। একজন ক্রিকেটার ভালো, নাকি মিডিওকোর হবে সেটা সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টা, কিন্তু প্রথম স্ফূলিঙ্গ জ্বালানোর রসদ যোগাতে অন্যদের ছুটতে হয়, এরা স্ফূলিঙ্গ নিয়েই জন্মায়।

প্রথম বলই খেলতে হবে জেদ যার, তিনি অর্জনে চাচা বা ভাইয়ের চাইতে অনেক দূরে যাওয়ার ডিটারমিনেশন অবচেতনভাবেই ধারণ করবেন, এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা নয়কি? কিন্তু কীভাবে তার মধ্যে এই জেদটা চলে এলো! এটা বোঝার জন্য তার শৈশবটা বোঝা জরুরী। আমি তার শৈশব সম্পর্কে কিছুই জানি না, শুধু নাফিস তার চাইতে বছর পাঁচেকের বড় এইটুকু তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করানোর চেষ্টা করতে পারি। সাধারণত কাছাকাছি বয়সী ২ ভাই থাকলে বড় ভাইটা কিছুটা স্যাক্রিফাইসিং মেন্টালিটির হয়, এবং ছোট ভাইয়ের বিবিধ আবদার পূরণে আন্তরিক থাকে।

দুই ভাই একসাথে খেলতে গেলে হয়তোবা তামিম জেদ ধরতো তাকে বেশি ব্যাটিং করতে দিতে হবে, বা সে আগে খেলবে; এটার চর্চা করতে করতেই সেটা তামিমের ইনহারেন্ট ক্যারেক্টারের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। বড় হওয়ার পর দুই ভাইয়ের সম্পর্ক কেমন জানি না, তবে আমার ধারণা তামিমের ছোটবয়সে নাফিসের বিশাল ইনফ্লুয়েন্স আছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নাফিস ইকবাল এক রহস্যঘেরা আক্ষেপের গল্প হলেও, তামিম ইকবালের মহীরূহ হয়ে উঠার নেপথ্যে তার গভীর সাইকোলজিকাল এক কন্ট্রিবিউশন থাকার কথা; সে ছিলো বলেই হয়তো ‘প্রথম বলটাই খেলবো’ মানসিকতাটা তামিমের মধ্যে তীব্রভাবে জমাট বেঁধেছিলো।

সমগ্র বাংলাদেশ কত টন?

১৯৯৬ থেকে ৯৮, এই তিন বছর ভারতের খেলা মানে ছিলো টেন্ডুলকার, তিনি আউট মানে ম্যাচও সেখানেই শেষ। সেসময় আজহারউদ্দিন ছিলেন, কিন্তু সেরা সময় পেছনে ফেলে আসা একজন হিসেবে। সৌরভ গাঙ্গুলী আর রাহুল দ্রাবিড় থিতু হওয়ার পর ৯৯ সাল থেকে দৃশ্যপট বদল হতে থাকে, এরপর তো যুবরাজ, শেওয়াগ, ধোনিরা চলে আসে। কিন্তু ৩ বছরের টেন্ডুলকারনির্ভরতা যতসব গল্প তৈরি করেছিলো সেগুলো এখনো বোধহয় সতেজ আছে। অন্যদিকে ২০১০ এর পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের জয়-পরাজয় পুরোটাই তামিমনির্ভর।

এতো দীর্ঘ সময় ধরে একজনমাত্র ব্যাটসম্যান দিয়েই একটা ক্রিকেট দলের সাফল্য বিচার করা হয়েছে কিনা, মনে করতে পারছি না। আগে ব্যাট করলে যেমন-তেমন, কিন্তু চেজ করতে হলে একটাই শর্ত- তামিমকে জ্বলে উঠতে হবে, আর কোনো অপশন নেই। বাংলাদেশ চেজ করতে গেছে, আর তামিম ১৩ রানের নিচে আউট হয়েছে, এমন প্রতিটা ম্যাচে বাংলাদেশ বাজেভাবে হেরেছে (ব্যাটিং কলাপস করেছে), যেগুলোতে তামিম ২৩+ করেছে সেগুলোতে ফাইট দিয়েছে, এবং ৫০+ করা বেশিরভাগ ম্যাচেই জিতেছে।

আমরা যতোই বলি ২০১২ থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট উন্নত হয়েছে, কথাটা আংশিক সত্যি লাগে, কারণ দলের চাইতে তামিমের ক্রমবিবর্তনটাই মূখ্য হয়ে উঠেছে। আমরা তো খালি চোখে শুধু জয়-পরাজয় দেখি, কিন্তু ব্যাটিং এটিচুড, টোটাল স্কোর- এই ফ্যাক্টরগুলো উহ্য রয়ে যায়। ওই সময়ে তামিম শুরুতে বিপক্ষ দলের পেসারদের অবলীলায় খেলতেন, কোনো কোনো ম্যাচে এগ্রেসিভ ব্যাটিং করতেন, তার প্রেক্ষিতে পরবর্তী ব্যাটসম্যানরা সাহস পেতেন।

এর আগে বাংলাদেশের ওপেনার মানেই ছিলো বলে বলে পরাস্ত হওয়া, আর সহজ শিকারে পরিণত হওয়া। বিদ্যুৎ, অপি এই ধারণা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি, শাহরিয়ার নাফিস ব্যতিক্রম হওয়ার সবরকম যোগ্যতা রাখতেন, কিন্তু আইসিএল এর ভূতে তারও সলিল সমাধি; বাংলাদেশের ওপেনার মানেই তাই জাভেদ ওমরের মতো নিরীহ কারো প্রতিচ্ছবি হয়ে ছিলো দীর্ঘদিন। সেই দীর্ঘদিনের ধ্যানধারণা ভাঙার জন্যই তামিম এসেছিলেন, এবং দেখিয়েছিলেন বোলার কোনো ব্যাপারই নয়, সাহসই সবকিছু।

মুশফিক অধিনায়ক হওয়ার কিছুদিন পরই দীর্ঘ ব্যাডপ্যাচে পড়েন তামিম, যার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ দলও পথ হারিয়ে ফেলে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর তামিম নিজের খেলার ধরন বদলে ফেলেন, বাংলাদেশও কক্ষপথে ফেরে। এই ‘ওয়ানম্যান শো ডাউন’ এর কুফল আমাদের কত মূল্যে শোধ করতে হয় সেটাই দেখবার বিষয়। তর্কের খাতিরে স্ট্যাটিসটিক্স দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব, বাংলাদেশের বহু জয়ের ম্যাচে তামিম ইকবাল নিষ্প্রভ ছিলেন, কিন্তু ভালো খেলা ম্যাচেও ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন অন্য কেউ।

যেমন ২০১৫ ভারত সিরিজটা সবাই মনে রেখেছে মোস্তাফিজের কারণে, দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ সৌম্যের। এইবার মনে করে দেখুন, ভারত সিরিজের প্রথম ম্যাচটাতে তামিম কী করেছিলেন, সৌম্য যেসব ম্যাচে ভালো খেলেছিলেন সেখানে তামিমের পারফরম্যান্স কেমন ছিলো! তাই স্ট্যাটিসটিক্স দিয়ে গভীর কোনো অন্তর্দৃষ্টির সন্ধান পাবেন না আসলে। তামিম ইনিশিয়েটর, ফিনিশার নন; একারণেই স্ট্যাটিসটিক্সে তিনি হয়তো আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবেন।

তামিম এখনো পর্যন্ত কতজন পার্টনার পেয়েছেন সেটা একটু দেখলেই তার ইমপ্যাক্টটা বোঝা সহজ হবে। জাভেদ ওমর, শাহরিয়ার নাফিস, জুনায়েদ সিদ্দিক, ইমরুল কায়েস, আশরাফুল, শামসুর রহমান, নাজিমউদ্দিন, এনামুল হক বিজয়, সৌম্য সরকার। এছাড়া ওপেনার হলেও অন্য পজিশনে ব্যাট করেছেন এমন কয়েকজন হলেন লিটন দাস, জহুরুল ইসলাম। এদের মধ্যে জাভেদ ওমর, শাহরিয়ার নাফিস আর আশরাফুলকে বাইরে রাখছি।

প্রথমজন ক্যারিয়ার সায়াহ্নে, ২য় জন আইসিএল কাণ্ডে কক্ষচ্যুত, আর ৩য় জন তো ক্যারিয়ারজুড়েই এক্সপেরিমেন্টের পাত্র হয়েছেন। বাকি কেউ তামিমের সাথে টিকতে পারেনি কেন, এবং ইমরুলের সাথেই তার পার্টনারশিপটা জমে গেলো কীভাবে! যাদের নাম উল্লেখ করলাম প্রত্যেকেই স্ট্রোক খেলতে পছন্দ করতো, কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে মানিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিলো, যে কারণে তামিমের মতো করে খেলতে গিয়ে হারিয়ে গেছে।

ইমরুল নিজের সীমাবদ্ধতা জানে, সে প্রতি বলে স্ট্রাগল করে, তবু যে কোনোভাবে নিজের উইকেটটা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে অনেকটুকু সফলও হয়ে যেতো;ওপেনিং জুটিতে ৫০ উঠে গেলেও সেখানে তার কন্ট্রিবিউশন বড়জোড় ১৫-২০; গত বছর থেকে ইমরুল নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু ততদিনে সৌম্য উঠে এসেছে, যে স্ট্রোক খেলায় তামিমকেও ম্লান করে দেয়, এবং সৌম্য আসার প্রেক্ষিতে তামিমও খেলার ধরB বদলে ফেলেছে। তবে সৌম্য যতই স্টাইলিশ এবং এগ্রেসিভ ব্যাটসম্যান হোক, সে পুরোদস্তুর তামিমনির্ভর একজন ব্যাটসম্যান।

তার বড় স্কোরের প্রতিটি ম্যাচে তামিমকেও রিজনেবল একটা স্কোর করতে হয়েছে, নয়তো সে ৩০-৩৫ এ আটকে গেছে; যে ম্যাচে তামিম ১০-১৫ এর নিচে আউট, সে ম্যাচে সৌম্যেরও উজ্জ্বলতা নেই। আরও ৫ বছর পরে সৌম্য কোথায় যাবে এটা অনেকটাই নির্ভর করছে তামিমকে দেখে সে কতোটা শিখতে পারে সেই লারনিং এটিচুডের উপর। নয়তো তামিমের অলটারনেটিভ ইগো হয়েই হয়তোবা তার ক্যারিয়ার শেষ করতে হবে।

তামিম যে নিজের উইকেটটার মূল্য বাড়িয়ে দিলো, এবং খেলার ধরন বদলে ফেললো, এর থেকে বাংলাদেশ আরও এডভান্টেজ নিতে পারতো যদি ওয়ানডাউনে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান থাকতো। পুরো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেই ওয়ানডাউনে কোনো এস্টাব্লিশড ব্যাটসম্যান নেই, এরকম সেনসিটিভ একটা পজিশনে অদ্যাবধি কেবল এক্সপেরিমেন্টই চলেছে।

ওয়ান ডাউনে একজন নির্ভর করার মতো কেউ থাকলে তামিম তার ন্যাচারাল খেলাটা খেলতে পারতো, সমগ্র দলের বোঝা বহনের পরিস্থিতিতে থাকতে হতো না। জো রুট, কোহলি, উইলিয়ামসন, স্মিথ- বর্তমান ফ্যাবুলাস ফোরের প্রত্যেকেই ওয়ান ডাউনে ব্যাটিং করে, তাদের ওপেনিংয়ে আছে গাপটিল, রোহিত শর্মা, ওয়ার্নার, কিংবা এলেক্স হেলস। কিন্তু তামিমের ব্যাটনটা নেয়ার জন্য সাকিব, মুশফিক বা মাহমুদুল্লাহর আগে একজনকে থাকতে হতো; সেই একজনের অনুপস্থিতি তামিমকে যেমন নির্ভার হতে দিলো না, দলের স্ট্যাবিলিটিও খর্ব করেছে।

তবু কেন টপ ফাইভে নয়?

পার্থক্যটা ট্যালেন্টের নয়, এবিলিটি আর ফিটনেসের। তামিমের ফিটনেস প্রথম থেকেই একটা সমস্যা, চিকি সিঙ্গেল নেয়া, সিঙ্গেলসকে ডাবলস এ কনভার্ট করা এগুলোতে তার দুর্বলতা লক্ষণীয় স্পষ্টভাবে। সিঙ্গেলস বের করতে না পারা তার প্রধান সমস্যা; বাউন্ডারির বাইরে ক্রমাগত স্ট্রাইক রোটেট করা এটা তার মধ্যে খুবই কম, এছাড়া স্কোর ৮০ পার হলেই কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এটাই পার্থক্য আসলে।

তবে এই একমুখীতার পেছনে আমাদের ক্রিকেট এনভায়রনমেন্টেরও দায় আছে। যারা ক্রিকেট খেলে তাদের হাতেখড়ি হয় টেপটেনিস বলে খেলার মধ্য দিয়ে; সেখানে ডিফেন্সের কোনো বালাই নেই, বলে বলে চালিয়ে খেললেই হাততালি পাওয়া যায়। ফলে আমরা ছোট থেকেই শুনে অভ্যস্ত, তালি পাওয়ার প্রধান উপায় চালিয়ে খেলা, আমাদের মধ্যেও তাই রোটেট করে খেলার প্রতি আগ্রহ জন্মায় না। আমরা মনের দিক থেকেও জাতিগতভাবে একমুখী; ভালো লাগলে পুরো ভালো, খারাপ লাগলে পুরো খারাপ- মধ্যবর্তী কিছু নেই। ক্রিকেট খেলাটাও তো শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদকেই ধারণ করে।

বিরাট কোহলি বা জো রুট ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে আনতে পারে, তামিম তা পারে না- এই যুক্তিতে আমি বিশ্বাসী নই। কোহলি বা রুট যতটা পারে তার চাইতে বেশি সহায়ক হয় তাদের দীর্ঘদিনের ক্রিকেট ঐতিহ্য। কোহলি বা রুটের ইনস্পাইরেশন নেয়ার মতো বহু পূর্বপুরুষ আছে, কিন্তু তামিমরা নিজেরাই পূর্বপুরুষ হওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত, আরও ২০ বছর পরে যদি কোনো বাংলাদেশী ওপেনার বা ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান ঠাণ্ডা মাথায় ম্যাচ বের করে আনে সেখানে অবশ্যই তার ইনফ্লুয়েন্স থাকবে।

কোহলি বা রুটরা ফোর্থ জেনারেশন সুপারস্টার, আর তামিমরা মাত্র ফার্স্ট জেনারেশন পার করছে। সুতরাং তাদের এই এডভান্টেজ দিয়ে তামিমকে বিচার করা ভুল মানদণ্ড হবে। আমি তাই ডট বল প্রশ্নেই তামিমকে ফ্যাবুলাস ফোরের থেকে পিছিয়ে রাখবো, কিন্তু ট্যালেন্ট প্রশ্নে বরং কিছুটা এগিয়েই রাখবো। একজন ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে যদি ইঞ্জিনিয়ার হয় এটাকে খুব বড় কিছু বলতে চাই না, কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামের এক নিরক্ষর জেলের ছেলে যদি ইঞ্জিনিয়ার হয়, সেটা অভাবনীয় এচিভমেন্ট, কারণ এতোসব প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তবেই ছেলেটি এই পজিশনে পৌঁছেছে।

তবু সাকিব বা মুস্তাফিজের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতি প্রশ্নে তামিম পিছিয়ে কেন? সাকিব অলরাউন্ডার, তার সাথে তামিমের কম্পিট করতে হয় না, তার কম্পিটিশন জেনুইন ব্যাটসম্যানের সাথে, এবং দিনে দিনে ক্রিকেট যেরকম ব্যাটিংসর্বস্ব এবং পাওয়ার হিটিংয়ের জায়গা হয়ে উঠছে, সেই কনটেক্সট এ তামিম পিছিয়ে পড়েন। অন্যদিকে মোস্তাফিজ ভারতের বিপক্ষে পরপর ২ ম্যাচে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে ভারতকে হারতে বাধ্য করেছে; ক্রিকেট মিডিয়া তো পুরোটাই ভারতনিয়ন্ত্রিত, তদুপরি আইপিএল এ নৈপুণ্য- এসব কারণে সাময়িক একটা ব্রেক মোস্তাফিজ পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ধরে রাখার জন্য বহু কাঠখড় পাড়ি দিতে হবে।

কোনো এক অদ্ভুত কারণে ভারতের বিপক্ষে তামিমের ম্যাচজয়ী কোনো ইনিংস নেই; সেই কবে ক্যারিয়ারের শুরুতে জহির খানকে ডাউন দ্য উইকেটে ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন, সেটাই এখনো তাঁর ট্যাগ হয়ে আছে। তবু আমি মনে করি, বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা পড়লে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক সবচাইতে বেশি যাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে, নিশ্চিন্তে বলতে পারি তিনি তামিম ইকবাল।

বাংলাদেশের লিগগুলো খেলে তামিমের নিজেকে প্রমাণের কিছু নেই; নিচুসারির দলে হলেও তিনি যদি এক বা দুই সিজন কাউন্টিতে খেলে আসতে পারেন, সেটা তার মৌলিক দুর্বলতাগুলো কাটাতে হয়তোবা সহায়তা করবে। এখন ৩০ চলছে, বড়জোড় আর ৫ বছর খেলবেন; এই সময়ে নিজেকে সমকালীন ক্রিকেটের একজন লিজেন্ড হিসেবে অধিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটা কাজে লাগতে পারে। কিন্তু ৩ নম্বরে আনস্টেবল ব্যাটসম্যানের মহামারিতে শেষ পর্যন্ত কতদূর যেতে পারেন, দেখবার বিষয় সেটাই।

২ বছর আগেও একটা সিরিজ পাওয়ার জন্য আমাদের অধীর অপেক্ষায় থাকতে হতো। ফলে পর্যাপ্ত ম্যাচ না খেলেই তামিমের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে কিনা, এরকম একটা আশঙ্কা ছিলো। সিরিজের সংখ্যা বাড়ছে, এটা একটা পজিটিভ লক্ষণ। পরের প্রজন্মের জন্য ব্যাটিং কিংবদন্তী রেখে যাওয়ার জন্য হলেও আমাদের বেশি ম্যাচ পাওয়া উচিত।

ভারতে গাভাস্কার একটা বেঞ্চমার্ক সেট করেছিলেন, পরের ব্যাটসম্যানদের সেটা অতিক্রম করার জন্য লড়তে হয়েছে, এরপর টেন্ডুলকার এসে নতুন বেঞ্চমার্ক গড়েছেন, কোহলিরা প্রাণপণ চেষ্টা চালাবে সেটা ছাড়িয়ে নতুন বেঞ্চমার্ক সেট করতে। এভাবেই সমণ্বিতভাবে একটা দেশের ক্রিকেট স্ট্যান্ডার্ড সেট হয়। এখন যারা দলে আসবে তাদের প্রথম টার্গেটই হবে তামিমকে ছাড়িয়ে যাওয়া; এই মহান উদ্দেশ্য পূরণের জন্য হলেও তামিমকে মহারথী হতে হবে।

একিলিস নিয়তি:

তামিমের যে পারসোনালিটি টাইপ তাতে রাজ্যের শক্তিমান যোদ্ধা হওয়াই তার নিয়তি, সেনাপতি বা রাজা হওয়া তার চরিত্রের সাথে যায় না। একারণেই অধিনায়ক হিসেবে তিনি খুবই আনাড়ি প্রকৃতির হবেন, ধারণা আমার। তামিমকে মাঠে বা মাঠের বাইরে কখনো প্রাণ খুলে হাসতে দেখেছেন? যাদের টার্গেট থাকে আকাশের কাছাকাছি তারা সঙ্গতকারণেই আত্মমগ্ন থাকে, ফলে বৃহত্তর স্কেলে চিন্তা করতে কিছুটা সমস্যা হয়; তাদের মধ্যে প্রায়শই চলে আসে এরোগেন্স। তামিমও তার ক্যারিয়ারে বহুবার এরোগেন্সের কারণে নিন্দিত হয়েছেন।

একবার ভাবুন, কত ম্যাচে পেসার বোলিং শুরু করার পর হঠাৎ করে তিনি স্ট্রাইক থেকে সরে গেছেন সাইটস্ক্রিন ঠিক করার কথা বলে! এটা একধরনের মাইন্ডগেম। মাঠের মধ্যে এটিচুড তো হঠাৎ করে নাজিল হবে না, এটা ভেতরে থাকতে হয়; এককালে আমাদের ব্যাটসম্যানদের নিয়ম করে স্লেজিং করতো বড় দলের পেসাররা, সম্ভবত তামিমই প্রথম প্রবল ঔদ্ধত্যে সেই স্লেজিংয়ের জবাব দিয়েছে ব্যাটের ভাষায়, শারীরিক এক্সপ্রেশনে।

এই এগ্রেসিভনেসটা মাঠের বাইরেও বয়ে বেড়ান তিনি। পক্ষান্তরে, তিনি ব্যক্তি হিসেবে ইন্ট্রোভার্ট, হুম দেখতে এগ্রেসিভ লাগলেও তামিম ইকবালের পারসোনালিটি টাইপ ইন্ট্রোভার্টেড। মাহমুদুল্লাহও তো ইন্ট্রোভার্ট; স্টিফেন ফ্লেমিংও তাই ছিলেন। তাহলে সমস্যা কী? আসলে ইন্ট্রোভার্টের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে; তামিমের পারসোনালিটি টাইপ ISTJ; অন্যদিকে মাহমুদুল্লাহর INTJ, পার্থক্যটা তাই থিংকিং বনাম ফিলিং আর সেনসিং বনাম ইনটিউশনের। তামিমের বৈশিষ্ট্য তাই একিলিসের মতো, রাজা হওয়ার গুণ যার নেই, অথচ রাজ্য টিকিয়ে রাখতে সে-ই আস্থা।

আশরাফুলের সাথেকার শার্পলাইন:

বাংলাদেশের সবচাইতে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান কে? আমি মনে করি আশরাফুল। কিন্তু একই সাথে বাংলাদেশের সবচাইতে বোধশূন্য ব্যাটসম্যান বললেও আশরাফুলের নামই উল্লেখ করবো। ক্রিকেট শুধুমাত্র ব্যাট-বল নয়, এটা খেলতে হয় মাথা খাটিয়ে, ইমোশন দিয়ে। সেই কনটেক্সট এ আশরাফুল তামিমের থেকে বহু যোজন্ দূরে পিছিয়ে পড়বেন। আর যদি খেলার স্টাইল বা ডমিনেন্স বলি, বাঁ-হাতি হিসেবে এক্সট্রা এডভান্টেজ তামিমের আছে। বাঁহাতিদের খেলা দেখতে এমনিতেই ভালো লাগে।

আশরাফুল আনঅর্থোডক্স শট বেশি খেলতেন, তামিম কেতাবি শটগুলোই অনেক পারফেকশনের সাথে খেলেন। ৫ বছরের জয়খরা কাটানো, অস্ট্রেলিয়া-সাউথ আফ্রিকাকে হারানো, ইংল্যান্ডের মাটিতে ৫২ বলে ৯৪ প্রভৃতি বহু সিঙ্গেল ইনসিডেন্সের কারণে আশরাফুল বাংলাদেশের ক্রিকেটে ইউনিক একটা পজিশন হোল্ড করবেনই, যেটা কারো সাথেই তুলনাযোগ্য নয়, কিন্তু ব্যাটসম্যানশিপ প্রশ্নে, টিমগেম প্রশ্নে তামিম বোধহয় ইতিমধ্যেই আনপ্যারালেল লিজেন্ড হয়ে গেছেন। কাল যদি তিনি অবসর নিয়ে নেন, তবুও তামিম ইকবাল একটি ইতিহাস হয়ে থাকবেন, যেখানে আশরাফুলের প্রবেশাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিম ইকবাল নামটি কি তবে শুধুই একটি রাইজিং দলের ট্যালেন্টেড ব্যাটসম্যান হিসেবে লেখা থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আর ৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে তিনি নিশ্চয়ই আরও শাণিত হবেন, তার মানে এই না উল্টাপাল্টা আউট হবেন না। ৪০০ এর বেশি ম্যাচ খেলা টেন্ডুলকারও বহু ম্যাচে নবিশের মতো আউট হয়েছেন; ক্রিকেট খেলার প্রকৃতিই এমন, এখানে পুরো বিষয়টাই রিদমের উপর নির্ভরশীল; ঘোষণা দিয়ে কেউ কনফার্ম করতে পারবে না অমুক ম্যাচে সেঞ্চুরি করবোই, বা ৫ উইকেট নেবোই।

কিন্তু শাণিত হওয়া মানে খেলার ধরনে আরও ম্যাচিউরিটি আসা, আরও বেশি ফোকাসড আসা। তামিম যদি সেটা পারেন, ২০১৯ বিশ্বকাপে সেমিতে উঠা খুবই বাস্তব স্বপ্ন। ৭ বছর ধরে যে নির্ভরতা প্রবণতা তৈরি হয়েছে, ক্যারিয়ার শেষ না হওয়া অবধি তা আর শেষ হবে না। তার চাইতে নির্ভরতাটাই বেটার রেজাল্ট নিয়ে আসুক। ফিফটি নয়, সেঞ্চুরির সংখ্যা বৃদ্ধি পাক, ডটের সংখ্যা কমতে কমতে মিলিয়ে যাক।

প্রিয় তামিম ইকবাল, আপনার সাথে আমার কোনোদিনই দেখা বা কথা হয়নি, তবু সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এই লেখা যদি কোনোভাবে আপনার নজরে আসে সেই ভরসায় ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়ে রাখি। আজ থেকে ৭ বছর পরে আমার বয়স হবে ৩৭, আপনার ক্যারিয়ারও তখন শেষ হয়ে যাবে। এতো ফ্যান-ফলোয়ার, মিডিয়া কোনোকিছুই আর থাকবে না এখনকার মতো; আপনার চাচার জীবন দেখলেই সেটা বুঝতে পারবেন।

আশা করছি ঠিক সেই দিনগুলোতে আপনার একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিবো, যেখানে ধরাবাঁধা প্রশ্ন থাকবে না, আপনার সাথেকার আলাপচারিতাতেই উঠে আসবে বাংলাদেশ ও বিশ্বক্রিকেটের সামগ্রীক চিত্র ও চ্যাম্পিয়ন সাইকোলজির কথা। এক সাক্ষাৎকারেই হয়ে যাবে আস্ত একটা বই; আমি মনে করি, বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তেমন একটা বই অমূল্য সম্পদ হবে; বলতে পারেন একজন ক্রিকেট পর্যবেক্ষক হিসেবে সেটাই আপনার প্রতি আমার সত্যিকারের ট্রিবিউট। এপোয়েন্টমেন্টটা ৭ বছর আগেই নিয়ে রাখলাম।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post