তিন নম্বর বিপদ সংকেত

   তিন নম্বর বিপদ সংকেত   তিন নম্বর বিপদ সংকেত

ক্রিকেট খেলাটার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সাথে সাথে আপনি প্রথমে ব্যাটিংটাই শিখবেন। ফুটবল যেমন গোলের খেলা, তেমনই ক্রিকেটে চার ছক্কার ফুলঝড়ি দেখতেই দর্শক টিভি সেটের সামনে বসে। যুগে যুগে সেই ব্যাটিং নিয়ে কত যে উপাখ্যান, কত যে রোমাঞ্চ তা বলতে শুরু করলে হয়তো কয়েকটা বই লিখতে হবে!

সেই ব্যাটিং নিয়ে গবেষণার কখনই শেষ হয়নি, আজ অবধি সেটা দুর্বার গতিতে চলছে। ওপেনিং থেকে শুরু করে আট নম্বর পর্যন্ত  ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে গবেষণায় মাথা ঘামিয়েছেন ও রীতিমত মাথা ঘামিয়েই চলেছেন ক্রিকেট কোচেরা। প্রায় সব দেশেই ঘরোয়া ক্রিকেটে বিভিন্ন পজিশনের ভাল করা ব্যাটসম্যানদের চোখে চোখে রাখেন নির্বাচকেরা, ভবিষ্যতের জন্য তাঁদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘এ’ দলসহ আরও অনেক দল!

ব্যাটিংয়ে অবশ্যই একটা ভাল শুরু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওপেনিং ব্যাটসম্যানদের ওপর দায়িত্ব তাই একটু বেশিই থাকে। কিন্তু সবসময় ভাল শুরু হয় না, সেটা সম্ভবও না। পাঁচ ও তাঁর পরের ব্যাটসম্যানরা সাধারণত পুরোনো বলে খেলতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।

সেক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পজিশন হচ্ছে তিন ও চার নম্বর। শুরুর দিকে দ্রুত উইকেটের পতন হলে দলের হাল ধরার দায়িত্ব এদের ওপরই থাকে। আবার ওপেনিংয়ে যদি ভাল শুরু হয়, সেটা চালিয়ে যাওয়া আর দলকে রানের পাহাড়ে তোলা কিংবা লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তা মসৃন করার দায়িত্ব তাঁদেরেই।

বুঝতেই পারছেন ব্যাটিংয়ে এই অর্ডারটার উপরই জোর দিতে হয় বেশি। সেই ডন ব্র্যাডম্যানের যুগ থেকে শুরু করে আজকে হালের স্টিভেন স্মিথ পর্যন্ত সবাই তিন নম্বর ব্যাটসম্যান এবং দলের ব্যাটিং এর মূল কাণ্ডারি। আমরা যদি সেরা তিন নম্বর ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং গড় দেখি তাহলে ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারবো।

প্রথমেই আসি ব্যাটিংয়ের ‘ডন’ স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের দিকে। টেস্টে  খেলেছেন মোট ৫২ টি, রান করেছেন ৬৯৯৬ আর গড় - ‘৯৯.৯৪’! এবার আসি স্যার ভিভ রিচার্ডসের দিকে। যাঁকে বলা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ব্যাটসম্যান! ভয়ডর নামক কোনো শব্দ ছিল না তাঁর অভিধানে।

অপমানজনক মনে করায় হেলমেট ছাড়াই পিটিয়ে ছাতু বানাতেন ফাস্ট বোলারদের, ব্যাট করতেন তিনে। টেস্টে ১৮২ ইনিংসে ৫০.২৩ গড়ে করেছেন ৮৫৪০ রান, ওয়ানডেতে ৪৭ গড়ে করেছেন ৬৭২১ রান। টেস্ট ও ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি ও ফিফটি যথাক্রমে ২৪টি ও ৪৫টি এবং ১১ টি ও ৪৫ টি।

রিকি পন্টিং যাঁকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান মানেন, তাঁর গড় ছিল টেস্ট ওয়ানডেতে যথাক্রমে ৫১.৮৫ ও ৪২.০৩, সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন যথাক্রমে ৪১ ও ৩০ টি । শ্রীলঙ্কার কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান সাঙ্গাকারার গড় টেস্ট ও ওয়ানডেতে যথাক্রমে ৫৭.৪০ ও ৪১.৯৮, সেঞ্চুরি করেছিলেন যথাক্রমে ৩৮টি ও ২৫ টি করে ।

বুঝতেই পারছেন তিনে কেমন ব্যাটসম্যানরা খেলে থাকেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই একটা পজিশনেই আমরা কখনও স্টেবল কোনো ব্যাটসম্যান পাইনি। এক হাবিবুল বাশারকে কিছুটা পেয়েছিলাম তাঁর গড়ও কত শুনবেন! টেস্টে ৩০.৭৮ এবং ওয়ানডেতে ২১.৬৮!

কালের পরিক্রমায় বহু ব্যাটসম্যান আসা যাওয়ার মধ্যে ছিলেন কিন্তু কেউই থিতু হতে পারেননি । ২০১৪ সালের শেষের দিকে কোচ হিসেবে আসেন চান্দিকা হাতুরুসিংহে, ২০১৫ এর বিশ্বকাপে তিনে খেলান সৌম্য  সরকারকে। কিন্তু সৌম্য পারফরমেন্স দিয়ে ওপেনিংয়ে উঠে যান।

এরপরে রিয়াদের আগমন। খুব বেশি আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে দুই সেঞ্চুরির মালিক। এরপরই শুরু হল কোচের ভয়ঙ্কর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বাংলাদেশের অনেকদিনের হার্ড-হিটিং ব্যাটসম্যানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সাব্বিরকে তুলে আনলেন তিনে!

কোচের মনে হল তাঁর ব্যাটিংটা তিনের জন্য সহায়ক, কেন যে এমন মনে হল সেটা অবশ্য তিনিই ভাল বলতে পারবেন! শুরুটা হল আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৬৫ রানের ইনিংস দিয়ে। কিন্তু সেই ধারা কিন্তু তিনি বরাবর বজায় রাখতে পারেননি। সাব্বির ওয়ানডেতে তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন মোট ১১ টি ইনিংসে, তাতে তিনটি হাফ সেঞ্চুরিতে তাঁর গড় ৩১.৫৫, সেঞ্চুরি নেই একটিও।

এখানে অনেকেই বলবেন যে, তাহলে তুলনায় সাব্বির তো ঠিক পথেই আছে, সে-ই এখানে খেলার যোগ্য। কিন্তু, আগেই বলেছি তিন নম্বর ব্যাটসম্যানের দায়িত্ব অনেক বেশি এবং সেই জায়গাটাতেই সাব্বিরের ঘাটতি প্রচুর।

আপনি হালের জো রুট, ভারতের বিরাট কোহলি, নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসন কিংবা অস্ট্রেলিয়ার স্মিথের দিকেই তাকান। দলের টেকনিক্যালি সবচেয়ে দক্ষ ব্যাটসম্যান তাঁরা। তাঁদের সাথে কি সাব্বিরের রহমানের ক্যালিবার মেলে? পেশি টানটান করে ডাকসাইটে হিটিং পজিশন নিয়ে যদি বোলারের অপেক্ষা করা হয়, তারা কিন্তু আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না, বরং বোলিংয়ের মোক্ষম অস্ত্রগুলো কিন্তু বোলাররা শুরুর দিকেই ছাড়ে বেশি!

সেই অবস্থায় ক’টা বল টানা বাউন্ডারির বাইরে পাঠানো সম্ভব? সবাই কি ডেভিড ওয়ার্নার বা সনাথ জয়সুরিয়া হতে পারে? তারাও উইকেটে থিঁতু হওয়ার জন্য বাউন্ডারির পাশাপাশি সিঙ্গেলস-ডাবল নেয় বা নিত, কিন্তু সাব্বিরের সেই অ্যাপ্রোচটাই আছে কি? তাছাড়া ওয়ার্নার-জয়সুরিয়া খেলেছেন ওপেনিংয়ে, তিন নম্বর পজিশনে ওরকম ব্যাটসম্যান খেলার উদাহরণই বা কয়টা?

মারার বল মারব, ভাল বল ঠেকাবো এই হচ্ছে যার মন্ত্র আর যাই হোক তিনে ব্যাট করার যোগ্য সে না। এখন শ্রীলঙ্কার যে এত বাজে সময় চলছে, তাঁরাও কিন্তু তাঁদের সবচেয়ে টেকনিক্যাল ব্যাটসম্যান কুশল মেন্ডিসকে তিনে খেলায়। এরকম টেকনিক্যাল ব্যাটসম্যানদের কাজ হচ্ছে, দলের রান সচল রেখে ইনিংস বিল্ড আপ করা, এরা কুইক ডাবল সিঙ্গেলসেই রান বেশি করে আর গ্যাপে চার মারে অথবা টাইমিংয়ে জোরে বল সীমানার বাইরে পাঠায়।

সাব্বির এখনও পর্যন্ত যেসব ইনিংস খেলেছেন সেখানে তার রানগুলো যদি আমরা দেখি, যদি হয়তো বা ২৪ রান করবেন তার ১৬ থেকে ২০ রানই আসে বাউন্ডারিতে। দলকে আনস্টেবল রেখেই আউট হয়ে যাচ্ছেন, না মারার বলও সাজোরে চালাচ্ছেন, ইনিংস বড় হচ্ছে না, আসলে ৬৫ এর বেশি বড় হতে পারছে না।

যার ফলে প্রেশার যেয়ে পড়ছে সেই মুশি, রিয়াদ, সাকিব, মোসাদ্দেকের ওপর । কেউ হিটিংয়ে ভাল বা ব্যাটিং স্টাইল মানানসই হলেই যদি তিনে ব্যাট করতে পারত তাহলে খুব সম্ভবত স্টিভ স্মিথ আজ তিন খেলতেন না। অথচ কোচ মুশফিকের মত একজন টেকনিক্যালি সলিড ব্যাটসম্যানকে ক্রমাগত ছয়ে খেলিয়ে গেছেন, এখন মুশির কনসিস্টেন্টলি পারফরমেন্স এর জোরে চারে খেলাতে বাধ্য হয়েছেন।

অথচ তাঁকে খুব স্বছন্দেই তিনে খেলানো যেত। আর যদি কোচের ভবিষ্যত কোনো পরিকল্পনা থাকে, যে বাংলাদেশ দলকে আরও দীর্ঘদিন সার্ভিস দিবে এমন কাউকে খেলাবেন, একজন ইয়াং ট্যালেন্টকে কোহলি, রুট অথবা স্মিথ বানাবেন  তাহলে কেন  মোসাদ্দকের মত একজন টেকনিক্যাল ব্যাটসম্যানকে তাঁর চোখে পড়ছে না? দুর্দান্ত টাইমিং, সাথে সিঙ্গেলস-ডাবল বের করে নেয়া এরকম একজন ব্যাটসম্যানকে যে আমরা এতদিন পর পেয়েছি সেটা পরম সৌভাগ্য।

ধরুন আপনার দলে জো রুট ও জস বাটলার আছে, আপনি কাকে তিনে এবং কাকে সাতে খেলাবেন? দুজনই কিন্তু যথেষ্ট ধারাবাহিক। দুজনই দলের জন্য রান করছেন এবং রুট যতটা সিঙ্গেলস বা ডাবলসের উপর বেশি খেলেন, বাটলার কিন্তু বাউন্ডারি দিয়ে তুলনামূলক রান বেশি তোলেন, সাথে সাথে তাঁর সিঙ্গেলস-ডাবল রান নেয়ার প্রবণতাও বেশ ভাল।

কিন্তু তারপরও ইংল্যান্ড এখন কাকে তিনে খেলাচ্ছে? সাতেই বা কে খেলছেন? শ্রীলঙ্কা তো কুশল মেন্ডিসকেই তিনে খেলাচ্ছে, গুনারত্নেকে খেলাচ্ছে কি?

পরিশেষে একটু ফুটবল টেনে বলতে চাই, রিয়াল মাদ্রিদের রামোস যেমন গোল করলেও তাকে ডিফেন্সেই বেশি দরকার, তেমনি রোনালদো ডিফেন্স মোটামুটি পারলেও তাকে গোল করার জন্যই বেশি জরুরি। অনেকেই হয়তো একমত হবেন না, বলবেন আরও সময় জরুরি, কথাটা সেখানেই।

সময়টা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, যদি এর সঠিক ব্যবহার না হয়, মোসাদ্দেক ও সাব্বিরের পজিশন যদি সুইচ না হয়, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটে আরও  দু‘টি আক্ষেপের নাম বাড়বে! 

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post