একজন স্বনির্মিত গ্রেট

  একটা গোলে স্তব্ধ হয়ে গেলো ন্যু ক্যাম্প।  একটা গোলে স্তব্ধ হয়ে গেলো ন্যু ক্যাম্প।

আমি আর্জেন্টিনা-ভক্ত, ম্যারাডোনা-ভক্ত এবং উত্তরাধিকার সূত্রে মেসিও আমার ভক্তি পেয়েছেন। 

যেহেতু আমি মেসি-ভক্ত, অতএব রোনালদোকে আমার অপছন্দ করতেই হবে। এটা যেনো নিয়তির তৈরী করা একটা সিদ্ধান্ত।

আমি এই নিয়ম মেনে লম্বা একটা সময় অবধি রোনালদোকে ‘অপছন্দ’ করতাম। এমনকি রোনালদোকে ছাড়াই ‘আমার দেখা সেরা ফুটবলার’ নামক একটা তালিকা করেছিলাম। ইনফ্যাক্ট এখনও আমি রোনালদোকে অপছন্দই করতে চাই। কিন্তু চাইলেই সব কিছু পারা যায় না। কিছু লোক আছে, যারা পছন্দ-অপছন্দর ব্যাপারেও জোর করার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।

রোনালদো তেমনই একজন।

আপনি তাকে অপছন্দ করার চেষ্টা করতে পারেন, এমনকি ঘৃণাও করতে পারবেন। কিন্তু শেষ বিকেলে আপনাকে মানতেই হবে, সে সর্বকালের সেরাদেরই একজন। হি ইস গ্রেট, হু মেড হিমসেলফ গ্রেটেস্ট।

আমাদের ফুটবল নিয়ে পছন্দ-অপছন্দটা ঠিক করে দেয় আসলে ইউরোপিয়ান মিডিয়া। এই ইউরোপের মিডিয়ার একটা দারুন বৈশিষ্ট্য হলো, তাদের কাছে ইউরোপের চেয়ে লাতিন সবসময় বেশী আদরের। ব্রাজিল, আজেন্টিনা, এমনকি চিলির একজন তারকাও ইউরোপিয়ান কোনো একজন পরিশ্রমী ফুটবলারের চেয়ে এক কলাম বেশী প্রশস্তি পেয়ে থাকে।

এর একটা চোখে দেখা কারণও আছে।

লাতিন ফুটবলাররা জন্মগতভাবে এক ধরণের স্থিতিস্থাপক শরীরের মালিক থাকে। ফলে বল পায়ে কারিকুরি করা; একটা ড্রিবল, একটা ব্যানানা শট, একটা ডস; এসব তাদের পায়ে অনেক বেশী থাকে। ফলে দৃষ্টিজুড়ানোর এই জায়গাটায় দারুন পরিশ্রম করেও পিছিয়ে পড়ে ইউরোপের খেলোয়াড়রা।

এই ফেনোমেনাটা লম্বা সময় ধরে রোনালদোকে বেশ পিছিয়ে রেখেছে মেসির সাথে প্রতিযোগিতায়।

এই দু জনের মধ্যে তুলনা করতে যাওয়াটা হাস্যকর একটা ব্যাপার। প্রকৃতপ্রস্তাবে আমরা চরম সৌভাগ্যবান যে সর্বকালের অন্যতম সেরা দুই ফুটবলারকে বছরে অন্তত দু বার পরস্পরের বিপক্ষে লড়তে দেখছি এবং চোখের সামনে অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় সব কান্ড করতে দেখছি। মেসি ৫০ গোল করলে, রোনালদো ৫১ গোল করেন। রোনালদো দুটো হ্যাটট্রিক করলে, মেসি তিনটে করেন। আমরা এই সমকালীন প্রতিযোগিতায় ভুলেই যাই যে, বাকী দুনিয়ার ইতিহাসে এরকম ৫০-৫১ গোল রোজ মৌসুমে করা ফুটবলারই তো এর আগে আসেনি!

দুই জনকে যেহেতু এক নম্বর বলতে একটু বাঁধো বাঁধো লাগে, তাই প্রতি বছর ভোট করে ঠিক করতে হয় যে, এদের মধ্যে কে সেরা!

আর এখানেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হয়ে ওঠেন চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন।

প্রায়শ আমি বলে থাকি যে, রোনালদোর পরিসংখ্যান বা অর্জন দিয়ে আপনি তাকে চিনতে পারবেন না। তাকে চেনার জন্য একটা তথ্যই যথেষ্ট যে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিনি ফুটবল ছেড়ে দেননি!

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এই সময়ই প্রমাণ করেছেন, মানসিকভাবে তিনি দুনিয়ার যে কারো চেয়ে বেশী কম্পিটিটিভ।

২০০৯ থেকে ২০১২; এই চার বছরে তিন বার রোনালদো মেসির কাছে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের পুরষ্কার হারিয়েছেন। তিন বার তিনি মঞ্চ থেকে একটুর জন্য নেমে এসেছেন খালি হাতে। একবার ফিফা বর্ষসেরা ও ব্যালন ডি অ’রে আলাদা আলাদা করে হেরেছেন। দুই বার ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’-এ রানার্সআপ হয়েছেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই পুরষ্কার বা পুরষ্কারগুলোকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি মনে করি না। কারণ, এখানে ওই অর্থে কোনো ক্রাইটোরিয়া ফলো করা হয় না। মূলত বিভিন্ন সাংবাদিক, জাতীয় দলের অধিনায়ক, কোচ ও একটি জুরি প্যানেলের ভোটে পুরষ্কারটা মেলে। সেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ কম কাজ করে না।

ফলে রোনালদো যখন জিতলেন, তিনি আসলেই সেরা হলেন বা যখন হেরেছিলেন, তখন আসলেই দ্বিতীয় ছিলেন; এটা মনে করার কারণ নেই।

তবে আমি মনে না করলেও রোনালদো নিজে ব্যক্তিগতভাবে এই ব্যালন ডি’অরটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এই ট্রফিটা জেতার জন্য সেই সময়টায় খুব আকুল ছিলেন। একবার শেষ অবধি জিততে না পেরে জনসম্মুখেই হতাশা ও বেদনা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন।

ওই প্রকাশ করা অবধিই। এরপর এই হতাশা তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারেনি।

অনুষ্ঠান শেষে ফিরে আবারও লড়াই শুরু করেছেন। আবারও আগের বারের পারফরম্যান্সকে ছাড়িয়ে গেছেন। শেষ অবধি ২০০৮ সালের পর ২০১৩ সালে এসে, পাঁচ বছর দফায় দফায় নিজেকে আরও কঠোর করে তুলে সেই পুরষ্কার আবার জিতেছেন।

একবার রোনালদোর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে দেখুন।

আমরা সামান্য জিপিএ ফাইভ না পেলে আত্মহত্যা করে ফেলি, আমরা প্রেমিকা কটুকথা বললে হাতের রগ কেটে ফেলি; সেখানে একটা মানুষ এই অল্পের জন্য দফায় দফায় না পাওয়ার পরও কিভাবে আবার লড়াই করতে নামতে পারে?

এই শক্তির একমাত্র উৎস টাফনেস। 

রোনালদোর একজন সাদামাটা উইংগার থেকে ম্যাচ উইনার হয়ে ওঠা, ম্যাজিশিয়ান ভাবমূর্তি না থাকার পরও দিনের পর দিন ম্যাজিক করতে থাকা; এসব আমি-আপনি সবাই চোখে দেখে থাকি। বড় ম্যাচ এলেই কিভাবে জ্বলে ওঠেন, বিন্দুমাত্র স্পেস না থাকার পরও কিভাবে গতি আর চতুরতা দিয়ে খেলাকে নিজের করে নেন; তাও আমরা বুঝি।

আমি এর চেয়ে একটু বেশী করে বুঝতে চাই এই কঠিন, কঠোর মানসিকতার সরল ফুটবলারটিকে।

এবারের ইউরোটা ফিরে দেখুন।

ভাগ্য, দুর্বল গ্রুপ পর্তুগালকে এগিয়ে দিয়েছে, এটা সত্যি। কিন্তু ফিগোদের সোনালী প্রজন্ম তো এর চেয়েও দারুন সুযোগ পেয়ে এই ইউরো জিততে পারেনি। রোনালদো যতই দলে থাকুন, এই পর্তুগালকে শিরোপা জয়ের জন্য আর কেউ গোনায় ধরছিলো না। বলাই হতো, পর্তুগাল তার সেরা সুযোগ ফেলে এসেছে; এই প্রজন্মকে দিয়ে আর সম্ভব না।

সেটাই সম্ভব হলো।

তাও সম্ভব করলেন কে? না, মাঠের রোনালদো নয়। ইনজুরিতে মাঠ ছেড়ে এক লহমার জন্য মেন্টর হয়ে যাওয়া একজন রোনালদো।

সেই ফাইনালে রোনালদোর প্রতিটা চিৎকার, প্রতিটা আস্ফালন, প্রতিটা আফসোস বলে দিচ্ছিলো, তিনি ট্রফিটার জন্য এই পাটা মাঠে রেখে আসতে রাজী আছেন। এতোটাই চাইছিলেন ওই ট্রফিটাকে।

সে তো সবাই চায়।

মেসি চান, আমি চাই।

আমিও চাই বাংলাদেশ বিশ্বকাপ জিতুক এবং আমি ফাইনালে হ্যাটট্রিক করি। চাওয়াতে কোনো সমস্যা নেই, কৃতিত্বও নেই। সেই চাওয়ার জন্য কে কতোটা নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে পারে, সেটাই ব্যবধান গড়ে দেয়।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রোনালদো, রিয়াল মাদ্রিদের রোনালদো এবং পর্তুগালের রোনালদো বারবার, দফায় দফায় প্রমাণ করেছেন; তিনি চাওয়ার জন্য ছুটতে পারেন, নিজের স্বপ্ন তৈরীর জন্য জীবন দিতে পারেন। পরাজয় তাকে হারাতে পারে না। এই জন্যই সাফল্য শেষ অবধি তার পায়েই এসে লুটায়।

সাফল্যকে হাতছানি দিলেই পাওয়া যায় না; ছিনিয়ে আনতে হয়। সেটা রোনালদো পারেন।

পুনশ্চ:

সেটা ২০১২ সালের ঘটনা।

এল ক্ল্যাসিকোটা নু ক্যাম্পে, বার্সেলোনার উঠোনে। আমরা কল্পনা করছি এবার ৫টা দেবে বার্সেলোনা; নাকি ৬টা?

১-১ সমতায় চলছে খেলা। শেষ হতেও আর বেশী বাকী নেই সময়। বার্সেলোনা একটার পর একটা আক্রমণ করছে। ইজ্জত বাচানোর দায়। ৭৩ মিনিটে কোত্থেকে আকাশ চিরে বেরিয়ে এলেন রোনালদো। একটা গোল।

একটা গোলে স্তব্ধ হয়ে গেলো ন্যু ক্যাম্প।

তখন রোনালদোর রিয়ালে ‘অখুশী থাকা’, মেসির সাথে দ্বৈরথ, অনেক কিছু নিয়ে খুব হইচই হচ্ছিলো। রোনালদো দুটো হাত কোমরের কাছে এনে সবাইকে থেমে যাওয়ার একটা ভঙ্গি করলেন-এবার চুপ করুন।

আমি সেই প্রথম চুপ করে গিয়েছিলাম। সেই প্রথম মনে হয়েছিলো, এই লোকটার চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এই ক্ষমতাটা সবার থাকে না।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post