ভারত বনাম ভারতের লড়াই

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
এপ্রিল ৩০, ২০১৭
 প্রতীকি ছবি প্রতীকি ছবি

দৃশ্যত ব্যাপারটাকে আইসিসি বনাম ভারতীয় বোর্ডের লড়াই বলে মনে হচ্ছে।

সেটাও এক ধরণের ‘ভারত বনাম ভারত’। কারণ আইসিসি যে এই হঠাৎ মহাবিপ্লবী হয়ে উঠলো, একেবারে উলফ কমিশনের পথে হাটার চেষ্টা করলো; সেটা হচ্ছে আসলে একজন স্বপ্নবাজ ভারতীয়র কারণেই-শশাঙ্ক মনোহর।

তবে লড়াইটা আসলে মনোহরের সাথে ভারতীয় বোর্ডেরও নয়। লড়াইটা ভারতের ভেতরেই। বলা যায়, ভারতীয় ক্রিকেট রাজনীতিবিদ বনাম আদালতের একটা লড়াই। আর তারই ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট একটা নয়া সম্ভাবনা বা শঙ্কার মধ্যে পড়েছে।

একটু গোড়া থেকে আলাপ করা যাক।

গত বছর তিনেক ধরেই ভারতের আদালত ও বুরোক্রেসি মনে করছিলো, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড স্বেচ্ছাচার ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। তারা ভেতরের কোনো সমস্যার সমাধাণ নিজেরা না করে বরং অন্যায় ও অসততাকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড করে চলেছে।

মূলত দিল্লী পুলিশ যখন আইপিএল নিয়ে একটার পর একটা অভিযোগের ভিত্তিতে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো, তখনই প্রথম স্টাবলিশমেন্টের সাথে বিসিসিআইয়ের এই বিরোধ প্রকাশ্য হলো প্রথম। ক্রিকেটার, সংগঠক, কর্মকর্তারা নির্বিশেষে গ্রেপ্তার হতে শুরু করলেন। দিল্লী পুলিশের সাথে অন্য কয়েকটা প্রদেশের পুলিশও হাত লাগালো। গ্রেপ্তার হওয়া এই নামজাদা সব ক্রিকেটীয় চাইদের আদালত নির্বিকারভাবে জেলে পাঠালেন। শুরু হলো তদন্ত।

এই ঘটনাবলীর জের ধরেই উঠে এলো বিখ্যাত সেই ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ ব্যাপারটা।

এরও আগে আইসিসির যখন সত্যিকারের ভালো একটা সংষ্কারের জন্য ২০১২ সালে যে উলফ কমিশন গঠিত হয়, সেই কথা মনে করা দরকার। সেই উলফ কমিশন এক গাদা সুপারিশ করে আইসিসিকে সত্যিকারের স্বাধীন সংস্থায় পরিণত করতে চেয়েছিলো। লর্ড উলফের সেই কমিশনের অন্যতম সদস্য ছিলেন ভারতীয় বিচারপতি মুকুল মুদগাল।

সেই কমিশনের রিপোর্ট আইসিসি ছুড়ে ফেললেও ভারতীয় আদালত ভোলেনি ব্যাপারটা। তাই এন শ্রীনিবাসনের বিপক্ষে জামাতা মেইয়াপ্পানের নামে দল কিনে অন্যায়ে ল্পি হওয়ার অভিযোগ উঠলে তদন্ত করতে ডাকা হলো সেই মুকুল মুগদালকে।

মুগদাল কমিশন একেবারে নগ্ন করে ফেললো ভারতীয় বোর্ডকে।

তার সুপারিশে শ্রীনিবাসন বিতাড়িত হলেন বোর্ড থেকে। এরপর আরও সংষ্কারের লক্ষে আদালত গঠন করলো বিচারপতি লোধা কমিশন। এই কমিশন ভারতীয় বোর্ডের কর্মকর্তা হওয়ার জন্যই নানারকম যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিলো। যে যোগ্যতার মাপকাঠিতে একের পর এক দুঁদে ভারতীয় কর্মকর্তা পদ হারাচ্ছিলেন। কিন্তু লোধা কমিশনের সব সুপারিশ বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হলো বোর্ড। ফলে আদালত চুড়ান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বোর্ড সভাপতি অনুরাগ ঠাকুর ও সাধারণ সম্পাদককে এক সাথে বরখাস্ত করে দিলেন।

আর এখান থেকেই শুরু হলো যুদ্ধটা।

অনুরাগ ঠাকুর, শ্রীনিবাসন নিজেরা কিছুদিন আগে পরষ্পরকে খোলা চিঠি লিখেও গালিগালাজ করেছেন। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম ক্রিকেট রাজনীতিবিদরা সব দলাদলি ত্যাগ করে একটি দলে পরিণত হলেন। তাদের প্রতিপক্ষ কেবল আদালত এবং আদালতের নিয়োগ করা তত্ত্বাবধায়করা।

এই সময়ে অননানুষ্ঠানিকভাবে নানা জায়গায় শ্রীনিবাসনরা বৈঠক করে আইসিসি সভা, বিসিসিআই সভায় ঢোকার চেষ্টা করেছেন। আদালত তা বন্ধ করেছেন। ফলে এক সময় যুদ্ধটা যাচ্ছেতাই রূপ পেলো। এমনকি এই আইসিসি সভার কিছুদিন আগেও সকলে মিলে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের সাথে বৈঠক করেছেন। চেষ্টা করেছেন আইসিসি সভায় বিগ থ্রি টেকাতে। সেই চেষ্টার শর্ত ছিলো একটাই-সভায় বিসিসিআই প্রতিনিধি হিসেবে শ্রীনিবাসনকে যেতে দিতে হবে।

আদালত তাতে সায় দেয়নি।

ফলে রাতারাতি পাশার দান বদলে গেছে। নিন্দুকেরা বলছেন, ভারতীয় ওই বিতাড়িত কর্মকর্তাদের ইঙ্গিতেই তাদের মিত্র বোর্ডগুলো ভারতের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। যাতে রাষ্ট্রকে দেখানো যায় যে, আদালতের হস্তক্ষেপে বোর্ড এখন নেতৃত্বশূন্য ও স্বার্থ আদায়ে অক্ষম হয়ে গেছে।

শেষ অবধি খেলা কোথায় গিয়ে শেষ হবে বলা কঠিন।

পাশার দান হয়তো বদলাবে। এখন দেখার বিষয় তারা কিভাবে নিজেদের সমস্যার সমাধাণ করে। অনেকে মনে করছেন, একবার ভারতের ভেতরের সমস্যা মিটে গেলে তারা পাল্টা কামড় দেবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করে, তার আগেই আইসিসি তথা বাকী দেশগুলো শক্তি সঞ্চয় করে ফেলতে পারে।

শশাঙ্ক মনোহর মেধাবী, সৎ এবং স্বপ্নবাজ মানুষ।

তিনি নিশ্চয়ই বসে নেই। আইসিসির বড় সাহসের জায়গা হলো, তাদের আট বছর মেয়াদী সম্প্রচার চুক্তি এই গন্ডগোলের আগেই হয়ে গেছে। আর চুক্তি হওয়া প্রতিষ্ঠানটির আদত মালিকানা রুপার্ট মার্ডকের হাতে; আমেরিকায়। ফলে বললেই আইসিসির টাকা হাওয়া হয়ে গেলো, ব্যাপারটা এতো সোজা নয়।

হ্যা, ভারত আইসিসিকে সহায়তা বন্ধ করলে দুশ্চিন্তা আছে বৈকী। তারা দল প্রত্যাহার না করলে দর্শক কমবে, স্টার এশিয়া ক্ষুব্ধ হবে; সবই সত্যি। কিন্তু ভারতীয় দর্শককে এ করে ভারত নিজে কী ধরে রাখতে পারবে? ভারতীয় দর্শকরা তো আর শ্রীনিবাসন নয়।

তারা পৃথিবীর সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট দর্শকগোষ্ঠীর একটি। তারা বোর্ডের কথায় নাচবে এমন মনে করারও কারণ নেই। দিনের পর দিন নিজেদের দলকে ট্রফির জন্য ছুটতে না দেখলে তারা ক্রিকেট থেকেই মুখ ঘুরিয়ে নেবে। তখন আর আইপিএলও জমানো কঠিন হবে। লড়াইতে তাই আইসিসি খুব বিপাকে নেই।

এখন লড়াইটা কতোদূর চলে, সেটাই দেখার বিষয়।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post