আকাশ ভেঙে পড়ার মত ঘটনা নয়!

আরিফুল ইসলাম রনি
অক্টোবর ১৭, ২০১৬
  নির্বাচকদের ভাবনাও ফেলনা নয়!  নির্বাচকদের ভাবনাও ফেলনা নয়!

ঝড় কি থেমেছে? যুদ্ধ বিরতির আভাস মিলছে? রক্তপাত বন্ধ হয়েছে? তাহলে এবার একটু ভাবতে বসি, নাকি!

দলে ছয়টা পরিবর্তন দেখে সবার মাথাই নষ্ট। অথচ ছয়টি পরিবর্তনের তিনটি করতেই হতো। মুস্তাফিজ ইনজ্যুরড। শহীদ সাইড স্ট্রেইন কাটিয়ে পুরো ফিট নন। লিটন কাধের ইনজুরি মাত্রই কাটিয়েছেন, একদিন মাত্র ব্যাট করেছেন। কোনো ম্যাচ খেলেননি অনেকদিন। নইলে তিনজনই থাকতেন।

বাকি থাকল তিন। ১৪ মাস পর টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। ১৪ মাসে অনেক দলের খোলনলচে পাল্টে যায়। তিনটি পরিবর্তন খুব অস্বাভাবিক নয়।

একটি তিনটি পরিবর্তনের একটি আবার অনুমিতই ছিল। জুবায়ের হোসেন লিখন। আগের দিনই কোচ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, লিখনকে নিয়ে তিনি হতাশ। মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, এত কম বয়সে ওকে খেলানো হচ্ছিলোই কেবল কোচ চাচ্ছিলেন বলে। লিখনকে সবসময়ই শক্ত হাতে ব্যাক করেছেন কোচ। লিখনকে নিয়ে কোনো যুক্তি মানতে চাননি, নানা সময়ে গো ধরেছেন। সেই কোচই যখন বলছেন হতাশ, বুঝতে হবে ব্যাপারটা ভীষণ সিরিয়াস।

একজন কোচের কখনোই কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে বলা উচিত নয়। সেটা সত্যি হলেও। তবে সেটা অন্য বিতর্ক। এখানে যে প্রসঙ্গ, কোচের কথার পরই ষ্পষ্ট ছিল যে লিখন থাকছে না দলে। আমি হলে হয়ত প্রথম টেস্টে অন্তত লিখনকে নিতাম। তবে না থাকায় এত মাতমেরও কিছু দেখছি না। লিখনের বয়স ২১ বছর, ৩১ নয়। ৩১ হলেও ক্ষতি ছিল না। সে লেগ স্পিনার, ফাস্ট বোলার নয়! আপনারা যে কথায় কথায় ইমরান তাহির, ইয়াসির শাহ, আদিল রশিদের উদাহরণ টানেন, তাদের বয়সটা দেখেছেন কখনও? ইয়াসিরের টেস্ট অভিষেক ২৮ বছর বয়সে (সেটাও পাকিস্তানী বয়স, আসলে হবে আরও অন্তত ৪-৫ বছর বেশি)। রশিদও থিতু হলেন ২৮ বছর বয়সে। তাহিরের দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিকত্ব পেতে অনেকটা সময় লেগেছে। সেটা না ধরলেও, পোক্ত হতে হতে লেগে গেছে ৩০ বছরের মতো। লেগ স্পিন সাধনার ব্যপার। লিখন আরও ৫-৭ বছর পরে পোক্ত হয়ে এলেও তো সমস্যার কিছু দেখি না!

তাহল লিখনের জায়গায় কে? সাকিব-তাইজুল থাকায় আর বাঁ-হাতি স্পিনার নেবেন না নির্বাচকরা। লিখনকে নিয়ে হতাশা। বাকি কে? মিরাজ ছাড়া তো উপায় নেই! নির্বাচকরা বলছেন 'মিরাজ রেডি', আমরা অনেকে হয়ত একমত নই। আইডিয়ালি আরও ৩-৫ বছর পর হলে হয়ত ভালো হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, লঙ্গার ভার্সনে সম্ভবত আপাতত সে-ই সেরা অফ স্পিনার। কিছু করার নেই। নির্বাচকদের বিকল্প ছিল সামান্য।

রইল বাকি দুই। কেন শফিউল-কামরুল রাব্বি? রুবেল-আল আমিন কেন নয়! টেস্টে ৪০ ইনিংসে রুবেলের উইকেট ৩২টি, গড় ৭৫.৯০। আল আমিনের ৯ ইনিংসে উইকেট ৬টি, গড় ৭৬.৬৬। দুজনের বোলিং গড় টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে গড়গুলোর অন্যতম। তো এই দুজনকে নিয়ে এত হাহাকার কেন? শফিউলেরও অবশ্য ১৪ ইনিংসে মাত্র ১৫ উইকেট, গড় ৫০.৫৩। রাব্বিও স্পেশাল কেউ নন। আমাদের গড়পড়তা পেসারদের মতোই। তবে গত কিছুদিনে রাব্বি দারুণ বোলিং করেছে। স্কিল আমাদের কোনো পেসারের সেরকম নেই। রাব্বি তবু জানপ্রাণ দিয়ে বোলিং করে। শফিউলও প্র্যাকটিসে ভালো করছে।

আপনারা একমত না হতে পারেন। কিন্তু নির্বাচকদের যুক্তিগুলিও খুবই যৌক্তিক। আমার ব্যক্তিগত মত, মুস্তাকে ছাড়া টেস্টে আমাদের কোনো পেসারই আহামরি কিছু নন। সবই প্রায় একই। নির্বাচকদের মনে হয়েছে, ব্যর্থ দুজনকে না নিয়ে রিদমে থাকা দুজনকে বাজিয়ে দেখতে। ক্ষতি কোথায়?

১৪ জনের দলে ২ জন পেসার কেন? আপনার কি ধারণা, টিম ম্যানেজমেন্ট-নির্বাচকরা সুরার আসরে বসে দল করছে? ভুল করে ২ পেসার নিয়ে ফেলছে? তাদের কোনো পরিকল্পনা নেই! টিম ম্যানেজমেন্ট হয়ত ঠিক করেছে, ১ জন পেসার নিয়ে খেলবে। সেক্ষেত্রে আরও একজন বাড়তি আছেই! ইংল্যান্ডকে হারাতে হলে খুব টার্নিং উইকেট ছাড়া হারানো সম্ভব নয়। তাতে বাংলাদেশেরও হারার চান্স থাকবে। সেটা তো সব ধরণের উইকেটেই হারবে। টার্নিং উইকেটে তবু কিছুটা হলেও সম্ভাবনা থাকবে। কিংব এমনও হতে পারে, ড্র করার জন্য ১ পেসার নিয়ে খেলবে, ব্যাটসম্যান ৮-৯টা থাকবে। এখন দল যদি ১ পেসার আর ৩ স্পিনার নিয়ে খেলতে চায়, স্কোয়াডে ২ পেসারই যথেষ্ট।

রইল বাকি এক। কেন শুভাগত? কুক-ডাকেট-ব্যালান্স-স্টোকস-মঈন, অন্তত ৫ বাঁহাতি ইংল্যান্ডের একাদশেই থাকবেন। নির্বাচকদের যুক্তি, এজন্যই তারা স্কোয়াডে দুজন অফ স্পিনার রাখতে চেয়েছেন। মিরাজের সঙ্গে শুভাগত না হয়ে, হতে পারতেন নাসির। যেহেতু শুধু স্পিনার হিসেবে নেওয়া, দুজনের বোলিংটাই তুলনা করা যাক।

দুজনের কেউই কিন্তু স্পেশালিস্ট অফ স্পিনার নন। আমি হলে অবশ্যই নাসিরকে নিতাম। কারণ নাসির চতুর বোলার, ব্যাটসম্যান বুঝে মাথা খাটিয়ে বোলিং করে। অন্তত একটা পাশ আটকে রাখতে পারে। শুভাগতকে নিয়ে আমি অতটা নিশ্চিত নই। তবে নির্বাচকদের মনে হয়েছে, লঙ্গার ভার্সনে শুভাগত বেটার অপশন। সে একটু হলেও প্রথাগত ঘরানার, ফ্লাইট-লুপের চেষ্টা করে। শুভাগত ৭ টেস্টে ৮ উইকেট, নাসিরের ১৭ টেস্টে ৮ উইকেট। আমি তবু নাসিরকেই নিতাম। আবার নির্বাচকদের ভাবনাও ফেলনা নয়!

তিন পরিবর্তনের বাইরে প্রশ্ন আরেকটি জায়গা নিয়ে। কেন সৌম্য, কেন নয় শাহরিয়ার নাফিস? প্রথমত, দুজনের এখানে দ্বন্দ্ব নেই। সৌম্যকে টেস্টের জন্য কখনোই টপ অর্ডারে বিবেচনা করা হয় নাই। সাত নম্বর ব্যাটসম্যান, আর পার্ট টাইম পেসার। দল যদি এক পেসার খেলায়, সেক্ষেত্রে সৌম্যকে নিয়ে নতুন বলে কাজ চালানো আর লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাটিং শক্তিশালী করার ভাবনা থাকতেই পারে। দল তো স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে সেই অনুযায়ী স্কোয়াড গড়ে, তাই না?

শাহরিয়ার নাফিসকে আপাতত বলতে হবে দুর্ভাগা। টপ অর্ডারে জায়গা নেই। আর একটি টেস্টের জন্য ব্যাক আপ ওপেনার রাখার প্রয়োজন মনে করেননি নির্বচকরা। তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে এবং পুশ করছেন দলে, এটাও কি তার পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি নয়? তাকে ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি নিজে তাতে সন্তুষ্ট। আমরাও সন্তুষ্ট হই, নাকি?

তো, দেখা যাচ্ছে, একটা জায়গা নিয়ই কেবল তীব্র মতভেদের সুযোগ আছে...শুভাগত। সেটা কি খুব অস্বাভাবিক? তাহলে কেন এই দল হতাশার, তামাশার, হাস্যকর, ননসেন্স…(আরও হবিজাবি)… কেন? আমাদের টেস্ট দল কবে দারুণ কিছু ছিল?

আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের ক্রিকেট নিয়ে ৩২ কোটি মত। কারণ কেউ নিজেই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিওর নন। সবচেয়ে হতাশার, সমালোচনাগুলোর ৯০-৯৫ ভাগই গড়পড়তা, কোনো পয়েন্ট না ধরে, যুক্তির আশ্রয় না নিয়ে।

সমালোচনা অবশ্যই হবে, করবেন। ইতিহাসের সব দল নিয়েই সবসময় প্রশ্ন ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। স্কোয়াড হয় ১৪-১৫ জনের। প্রায় কাছাকাছি থাকেন আরও ১৫-২০ জন। একেক জনের একেক মত থাকবেই। বাংলাদেশে বরং বিকল্প কম। স্কোয়াডের বাইরে কাছাকাছি মানের বড়জোর ৪-৫ জন থাকে। এই স্কোয়াডেই যেমন বাইরে থেকে কেবল আসতে পারে শাহরিয়ার, লিখন, আল আমিন, রুবেল, মোসাদ্দেক… আর কে? আর মাত্র একটি টেস্টের দল এটি। পরের টেস্টেই আপনার কাঙ্ক্ষিত ক্রিকেটার জায়গা পেতে পারেন! তখনও আবার অনেকে নাখোশ হবেন!

দলে চার নতুন, ছয় পরিবর্তন দেখেই খোলা তলোয়ার হাতে ঝাপিয়ে না পড়ে একটু ভাবুন। কাকে নেওয়া হয়েছে, বিকল্প কে ছিল, যুক্তিগুলি কি কি, সেসব ভাবুন আর বুঝুন। তাহলেই হয়। আমি-আপনি অবশ্যই মহা ক্রিকেট পণ্ডিত নই। তবে এই ব্যাপারগুলো বুঝতে খুব বড় বিশেষজ্ঞও হতে হয় না। এমন কোনো রকেট সায়েন্স না। তার পরও নিজে না বুঝলে নির্বাচকদের ব্যখ্যা, যুক্তি শোনার অপেক্ষা করুন। সেসব ভাবুন, বুঝুন এবং তার পর মন্তব্য-সমালোচনা করুন।

চট্টগ্রামে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে আমাদের কারও ওপর ছাদ ভেঙে পড়েনি। তবে ফেসবুকের আঙিনায় দেখলাম প্রায় সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। আশা করি, আকাশ আবার জায়গামতো ফেরত যাবে!

- ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে।

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post