আহ রাজ্জাক…!

আরিফুল ইসলাম রনি
অক্টোবর ১৪, ২০১৬
    রাজ্জাকের উপযুক্ত বিকল্প নেই এখনও    রাজ্জাকের উপযুক্ত বিকল্প নেই এখনও

এই দিনটি আসুক, আমি সত্যিই চাইনি। তবু আসবেই, জানতাম একরকম নিশ্চিত!

‘এই দিনটি’ মানে, এই সময়টা; যখন আমরা জানি না, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আমাদের দ্বিতীয় সেরা স্পিনার কে। আমাদের অধিনায়ক, টিম ম্যানেজমেন্ট, এমনকি আমাদের নির্বাচকেরাও জানেন না, পরের ওয়ানডে ম্যাচে সাকিব আল হাসানের স্পিন জুটির সঙ্গী কে!

আফগানিস্তান ও ইংল্যান্ড সিরিজের একটা পর্যায়ে তাইজুল ইসলাম ও মোশাররফ হোসেন রুবেলের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার মূল মানদণ্ড ছিল যেন, “কে কম খারাপ!”

অধিনায়ক মাশরাফি আপাতত নাসির হোসেনকে স্পেশালিস্টের মতোই ব্যবহার করছেন দারুণ চাতুর্যে। কিন্তু নাসির তো দীর্ঘ মেয়াদী সমাধান নন। অ্যাকশন শোধরানোর পর নতুন অ্যাকশনে কার্যকারিতা প্রমাণ করে তবেই ফিরতে হবে আরাফাত সানিকে। জুবায়ের হোসেন আছেন অদ্ভূত গোলকধাঁধায়, আন্তর্জাতিক সীমিত ওভার থেকে আপাতত যোজন যোজন দূরে। সাকলাইন সজীবে নেই নির্বাচক-টিম ম্যানেজমেন্টের ভরসা। আর কে?

আশু সমাধান নেই, সার্বক্ষনিক আক্ষেপ আছে। যে আক্ষেপ সঙ্গী গত দেড় বছর ধরেই। অনেকবারই, বেশ কিছু ম্যাচে, অনেক পরিস্থিতিতেই আমার মনে হয়েছে- আহা এখন যদি রাজ থাকত!

রাজ। আব্দুর রাজ্জাক। দ্বিতীয় স্পিনার নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অস্থিরতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল সেদিনই, গত মৌসুমের শুরুতে ফিটনেস ক্যাম্পের দল থেকে যেদিন ছেটে ফেলা হলো রাজ্জাকের নাম। সেদিন যে সুড়ঙ্গের মুখ খোলা হয়েছিল, আমরা এখন সেখানে ঢুকে হাঁসফাঁস করছি। বের হওয়ার পথ হাতড়ে মরছি!

আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি, সম্ভাব্য সময়ের চেয়ে অন্তত দু বছর আগে রাজ্জাকের সার্ভিস থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, অন্যায়ভাবে। অন্যায়টা তার সঙ্গে, বঞ্চিত হয়েছে দেশের ক্রিকেট।

আমি বিশ্বাস করি, একজন রাজ্জাক দলে থাকলে আমরা গত এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হতাম, গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টেনে অন্তত দুটি ম্যাচ জিততাম, এবার আফগানিস্তান সিরিজ ৩-০তে জিততাম, ইংল্যান্ড সিরিজও জিততাম এবং এখন ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে থাকতাম!

ভাবছেন, বাড়িয়ে বলে ফেলেছি? রাজ্জাক কবে এত বড় ম্যাচ উইনার হয়ে গেল!

এতবড় না হলেও রাজ্জাক ম্যাচ উইনার। বেশ কিছু ম্যাচ তো জিতিয়েছেন আমাদের। তবে আমার বিশ্বাসের পেছনে সেটিই মূল কারণ নয়। যে ম্যাচগুলো বা সিরিজের কথা বললাম, সেসবে আমাদের যেটুকু ঘাটতির জায়গা ছিল বা যেটি ছিল ‘মিসিং লিংক’, সেটা দারুণ ভাবে পূরণ করতে পারতেন রাজ্জাক। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুর্দান্ত একটি স্পেল, একটি-দুটি মিতব্যয়ী ওভার বা ব্রেক থ্রু দেওয়া, শেষ দিকে দ্রুত ১০-১২টি মহামূল্য রান, চাপের পরিস্থিতি সামলানোয় রাজ্জাকের স্কিল ও অভিজ্ঞতা মিস করেছে দল স্পষ্ট ভাবেই।

তাহলে রাজ্জাক নেই কেন?

কেন বাদ পড়লেন, কেনই বা আর ফিরতে পারছেন না! ২০১৫ বিশ্বকাপের দল থেকে রাজ্জাককে বাদ দেওয়ার অন্যতম যুক্তি নির্বাচকেরা দেখিয়েছেন, ফিটনেসের ঘাটতিতে অস্ট্রেলিয়ার বড় মাঠে তার ফিল্ডিংয়ের সমস্যা। বিশ্বকাপের পর দেশের ‘ছোট’ মাঠেই টানা খেলেছে বাংলাদেশ। চোট-টোট পেছনে ফেলে রাজ্জাক পুরোদমে ফিট হয়েছে। তবু ডাক পাননি। কেন?

শতভাগ নিশ্চিত জানার জো নেই। স্বয়ং রাজ্জাক এটি জানেন না। জানার পথও খুঁজে পাননি। কেউ তাকে বলেনি, কেন নেওয়া হচ্ছে না, বা কি করলে ফেরা যাবে!

নানা জনের কাছ থেকে জেনে, নানা সূত্রে শুনে আমরা দুটি কারণ জানতে পারি। সবচেয়ে ‘জনপ্রিয়’ কারণ, কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহের পছন্দ নন রাজ্জাক। আবার নির্বাচক কমিটিও নিতে চায় না রাজ্জাককে!

কোচের ব্যাপারটি সহজবোধ্য। রাজ্জাককে তিনি যথেষ্ট ভালো করে দেখেননি। যেটুকু দেখেছেন, পছন্দ না করার কারণ ছিল। হাথুরুসিংহে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন রাজ্জাক, বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে ছিলেন ভীষণ বিবর্ণ। শোনা যায়, শুরুর ইমপ্রেশনেই কোচের গুডবুক থেকে নাম কাটা গেছে রাজ্জাকের।

তবে ওই সময়টায় পারফরম্যান্সে পড়তির কারণও ছিল। ২০১৪ সালের প্রায় পুরোটাই চোট-আঘাত তার পিছু লেগেই ছিল। ম্যাচগুলি খেলেছেন কখনও খানিকটা চোট নিয়ে, কখনও চোট থেকে ফেরার ঠিক পরই। বছর জুড়েই তাই ছিলেন না আপন চেহারায়। কিন্তু তাতেই তো একজন রাজ্জাকের জন্য দুয়ার চিরতরে বন্ধ হওয়ার কথা নয়!

স্পর্শকাতর ব্যপারে অন রেকর্ড কথা বলবেন না কেউই। তাই অফ দা রেকর্ড আর নানা সূত্রের আশ্রয়।জানা যাচ্ছে, গত মৌসুম শুরুর আগে ফিটনেস ক্যাম্পের দলে রাজ্জাককে রাখার চেষ্টা করেছেন দলের সিনিয়র ক্রিকেটাররা। দলে রাজ্জাকের অভাবটা বুঝছিলেন সিনিয়র ক্রিকেটাররা এবং তাদের বিশ্বাস ছিল, ফিটনেস ক্যাম্পে কাজ করলে এবং কাছ থেকে নিবিড়ভাবে দেখলে রাজ্জাককে অবশ্যই মনে ধরবে কোচের। এই যুক্তিকে কোচকে প্রায় রাজী করেও ফেলেছিলেন তারা। কিন্তু নির্বাচক কমিটি শেষ মুহূর্তে সেই যুক্তি মানতে চায়নি। কোচও নিজের পক্ষে সমর্থন পেয়ে শক্ত হয়ে গেছেন! ব্যস, হলো না ফেরা।

পরে দুই দফায় দলের চরম প্রয়োজনের সময় তুমুল আলোচনা হলেও উপেক্ষিত থেকে গেছেন রাজ্জাক। প্রথমবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, যখন বোলিং অ্যাকশনের কারণে ছিটকে গেলেনে আরাফাত সানি। এবারও সিনিয়র ক্রিকেটাররা রাজ্জাককে পেতে অনুরোধ-আকুতির অন্ত রাখেননি। যথারীতি কোচ-নির্বাচকদের রাজী করানো যায়নি। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে শুভাগত হোমের সঙ্গে নেওয়া হলো অপরীক্ষিত সাকলাইন সজীবকে, যাকে সবসময়ই মূলত ভাবা হয়েছে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচের বোলার। টি-টোয়েন্টির খব উপযোগী কখনোই মনে হয়নি যাকে, সেই সাকলাইনকে হুট করে বিশ্বকাপে ডেকে নিয়ে পরদিনই বড় ম্যাচে কঠিন পরিস্থিতিতে নামিয়ে দেওয়া তো তার প্রতিও খানিকটা অন্যায়! সেই সিদ্ধান্তের খেসারত দিয়েছে বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে।

দ্বিতীয়বারেরটি মাত্র কদিন আগেই। আফগানিস্তান সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে তাইজুলের বোলিং ছিল ঠিকঠাক, কিন্তু ছিল না ‘বাইট।’ বিকল্প ভাবনায় যথারীতি আবার উঠে এলেন রাজ্জাক। তুমুল বিতর্ক হলো। শেষটায় গিয়ে বোঝা গেল, কোচ কখনও কখনও একটু নরম হলেও নির্বাচক কমিটির সমর্থন পেয়ে আবার শক্ত হয়ে যান।

আমাদের প্রায় সব নির্বাচক কমিটির মাঝেই একটা ব্যাপার প্রায় কমন। খেলেয়াড়ী জীবনে ‘বেশি বয়সী’ তকমা পেয়ে তারা নিজেরা বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই আবার পরে নির্বাচক হয়ে অনেককে একই ভাবে বঞ্চিত করেছেন এবং করছেন!

রাজ্জাকের প্রত্যাবর্তন এবারও হয় না। নেওয়া হয় মোশাররফ রুবেলকে,  বয়সে যিনি রাজের চেয়েও মাস ছয়েকের বড়, ফিটনেস নিয়ে সংশয় ও আরও কিছু ব্যাপারে অনেকের অস্বস্তির কারণে সিরিজের শুরুতে যাকে নেওয়া হয়নি! 

যথারীতি কোচ-নির্বাচক কমিটির নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই ভুল প্রমাণ করেছেন দ্রুতই। ইংল্যান্ড সিরিজের শেষ ওয়ানডের আগে সেই রুবেল বাদ। আবার তাইজুলে ফেরা, তবু নেওয়া যাবেই না রাজ্জাককে!

নির্বাচকদের সিদ্ধান্ত ডুবছে, একের পর এক। তবু তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন খড়কুটো আকড়ে রাখার, একের পর এক!

অথচ নির্ভরতার তরী হাতের কাছেই। দল থেকে বাদ পড়ার পর ভেঙে না পড়ে পারফর্ম করে গেছেন রাজ্জাক। গত দুই মৌসুমেই উইকেট নিয়েছেন প্রায় নামতাগুণে। লোয়ার অর্ডারে দারুণ সব ইনিংস খেলছেন প্রায় নিয়মিতই। ফিল্ডিংয়ে রাজ্জাক অবশ্যই নাসির-সাব্বির নন, তবে এখনকার দলের অন্তত ৪-৫ জনের চেয়ে খারাপ নন, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

হাথুরুসিংহে এখন আনুষ্ঠানিক ভাবেই নির্বাচক। কিন্তু ঘরোয়া ক্রিকেট দেখার সুযোগ বলতে গেলে হয়েই ওঠে না তার। তাছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেট দেখবেন পারবেন না, এই শর্তেই নির্বাচক প্যানেলে ঢুকেছেন কোচ। কিন্তু অন্য নির্বাচকরা তো দেখছেন! 

গত নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষ ম্যাচে রাজ্জাককে বিদায়ী ম্যাচ খেলার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন নির্বাচকরা। বরাবরই ব্যক্তিত্ববান রাজ্জাক বিনয়ের সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেছেন চাপিয়ে দেওয়া বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন। তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান। চেষ্টার সর্বোচ্চ করছেনও। কিন্তু সেই চেষ্টা নজর কাড়ছে না মুখ ফিরিয়ে রাখা নির্বাচকদের।

লেখার শুরুর দিকে বলেছিলাম, আশু সমাধান নেই। কারণ রাজ্জাককে নিয়ে কোচ-নির্বাচকদের মনোভাব কট্টর। একটু শিথিল হলেই সমাধান। মানে সমস্যার শুরু যার বাদ পড়ায়, তাকে ফেরালেই সমাধান!

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আর খুব বেশি দিন নেই। ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে হলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিটি সিরিজই গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিশ্বাস করি,  বাংলাদেশকে এই র‌্যাঙ্কিং বৈতরণী পার করে দিতে পারেন রাজ্জাক। আরও অন্তত এক বছর, রাজ্জাককে চাই-ই চাই। মুস্তাফিজ ফিরলে, রাজ্জাকও যোগ হলে, আমাদের বোলিং আক্রমণ হয়ে উঠবে বিশ্বসেরা, অন্তত বিশ্বসেরার একটি!

রাজ্জাক না পেয়ে বাংলাদেশ দল হারিয়েছে অনেক। রাজ্জাককে না পেলে হারাবে আরও অনেক!

যখন ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল, বাংলাদেশ দলে তখনও ছিল না রাজ্জাকের উপযুক্ত বিকল্প, নেই এখনও! 

Category : মতামত
Share this post