দ্য আউটসাইডার

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
জানুয়ারী ৪, ২০১৭
 মহেন্দ্র সিং ধোনি মহেন্দ্র সিং ধোনি

ক্রিকেটে ইতিহাসের প্রতি এক ধরণের টিটকারী, ক্রিকেটের সংষ্কৃত ভাবমূর্তির প্রতি এক ধরণের তাচ্ছিল্য হল মহেন্দ্র সিং ধোনি।

ক্রিকেটের যে একটা মুখোশ শত শত বছর ধরে নেভিল কার্ডাস ও তার উত্তরসুরীরা তৈরী করেছেন, তাতে ধোনির কোনো জায়গা নেই। ধোনি একটা টিকিট চেকার, ধোনি একটা বখাটে, ধোনি এক বাইকার, ধোনি একটা রুটলেস, ধোনি একটা চক্রের বাইরের ফালতু ছেলে।

কোন এক বিপাকে পড়ে ভারতের মতো দেশ তাকে অধিনায়ক করে ফেলেছিল!

ক্রিকেটের মুখোশটা ইংল্যান্ডের বানানো। ওখানে কফির কাপে শব্দ করে চুমুক দিতে না পারাটাই ভদ্রতা। ইংলিশরা আমাদের শিখিয়েছে, হারার পর টুপি খুলে হ্যান্ডশেক করাটাই হলো ক্রিকেট!

ধোনি এই ক্রিকেটকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে গেছেন।

ভারতীয় ক্রিকেটের জন্যও ধোনি ছিল বড় যন্ত্রনা। যে যন্ত্রণা বারবার রবি শাস্ত্রীরা এই ধোনিকে অপমান করে, খুচিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। সৌরভকে হজম করা যায়। কারণ, সে লর্ডসের মাহাত্ম বোঝে বলেই লর্ডসকে অপমান করতে পারে। কিন্তু ধোনি তো ‘মাহাত্ম’ই বোঝে না!

সেই ধোনি কী জেতেনি!

ক্রিকেট অধিনায়ক হিসেবে যা যা জেতা যায়; সব জিতেছে। আইসিসি তিনটে গ্লোবাল টূর্নামেন্ট করে, তিনটেই ধোনি ভারতকে জিতে এনে দিয়েছেন। সংষ্কৃতি টেকাতে আমরা লিখেছি ভাগ্য, জুয়া, সাহস। কক্ষনো তার মেধা বা ক্রিকেটের প্রশংসা দুনিয়ার কোথাও শুনবেন না। কারণ ধোনির ক্রিকেটকে স্বীকৃতি দিলে রাচিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, ট্রেনের টিকিট চেকার থেকে ক্রিকেটার হওয়াকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আচরেকারদের বাইরে, ডালমিয়াদের বাইরেও ক্রিকেট যে আছে; সেটা কিছুতেই স্বীকার করা চলবে না।

রাচি! আহা, রাচি!

রাচি নিজেই তো ক্রিকেটের জন্য এক অন্ধকার গ্রাম। সেখানে ক্রিকেট খেলা হয় কে জানতো? আমরা ছোট বেলায় জানতাম, রাচির পাগলা গারদ। আর জানতাম, টেনিদারা হাওয়া বদলাতে রাচি যায়। সেই রাচি থেকে এক ধোনি বেরিয়ে এলো। রাচি থেকে এলো এক আউট সাইডার।

তাই বেচারা ধোনি আউট সাইডার হয়েই রইলো; স্রেফ আউট সাইডার।

শেষমেশ এক শ্রীনিবাসন নামের টাউটের সঙ্গে গাটছড়া বেধেছিল। কেউ পাত্তা দেয় না, এই লোকটা তো দিয়েছিল। এই আউটসাইডারও বুঝেছিল, তাকে নিয়ে মহাকাব্য কখনোই হবে না; ফলে টাকা কামানোই ভালো।

সেদিন ধোনিকে নিয়ে বানানো সিনেমা মুক্তি পেলো।

চিন্তা করুন তো গাভাস্কার, টেন্ডুলকার কিংবা কলিন কাউড্রে নিজেদের খেলোয়াড়ী জীবনে নিজেকে নিয়ে সিনেমা বানানোর অনুমতি দিতে পারতেন! প্রস্তাব পেলে শিউরে উঠতেন-এহ, ক্রিকেটের জাত গেলো যে!

ধোনি এই জাত যাওয়া নিয়ে এক বিন্দু ভাবেননি। সোজা ইংরেজীতে, হি ডিডন’ট গিভ....; থাক, গালি না দেই।

ধোনি এমনই। দুনিয়ার কাউকে, প্রশংসাকারীকে বা নিন্দাকারীকে পাচ পয়সার দাম দেয়নি কখনো। তামাশা করে গেছে।

ধোনির ক্যারিয়ারের প্রথম দিনটায় তাকে দেখেছিলাম।

লম্বা চুল, বখাটে চেহারার একটা ছেলে। এই আমাদের এখানে অভিষেক হয়েছিলো। তারপর থেকে চোখের সামনে একটু একটু করে ধোনিকে ‘বুড়ো’ হয়ে যেতে দেখেছি; চুল ছেটেছেন, কুল হয়েছেন। কিন্তু ধোনি সেই আগের মতোই বেপরোয়া থেকে গেছেন।

একদিন এই ঢাকায় বসে ভারতীয় এক সাংবাদিক প্রশ্ন শুরু করেছিলেন, ‘আপনার আশেপাশে যেসব কথা হচ্ছে...’

ধোনি ফিক করে হেসে দিয়ে বললেন, ‘আরে ভাই, মেনে আসপাস তো এক মিডিয়া ম্যানেজার হ্যায়। ও কই বাত নেহি করতা। এক তুম লোগ হো, যো  স্রিফ বাতই কারতে রাহতে হো।’

আমি এটা পছন্দ করিনি। কিন্তু এই যে এটিটিউড, এই যে ধাক্কা; এটা আমাকে সিনেমা দেখার মজা দিয়েছে।

কখনো সাংবাদিকদের ঝাড়ছেন, কখনো হাসছেন, কখনো সাংবাদিককে ডেকে পাশে বসিয়ে প্রশ্ন করছেন এবং কখনো দল বেধে এসে প্রতিবাদ করছেন সংবাদ সম্মেলনে।

শেষ সফরটায় পাশ থেকে হেটে যাচ্ছিলেন।

চোখে বড় লাগলো-দাড়িগুলো পেকে গেছে। এই তো ক দিন আগে ধোনির অভিষেক হলো। এর মধ্যে দাড়ি পেকে গেলো!

কাচা-পাঁকা দাড়ি নিয়ে ধোনি আজ যখন বাকী দুটো অধিনায়কত্বও ছেড়ে দিলো; আমি এক বিকৃত উল্লাস আর স্বস্তি দেখছি ক্রিকেটে-বাচা গেল। আপদটা গেছে তো!

আ ইন্টারেস্টিং আপদ। আ স্লাপ টু রবি শাস্ত্রী অ্যান্ড গং। আ স্লাপ টু ক্রিকেট বুক।

গোপন কথা বলি, আমি কখনো ক্রিকেট বইয়ের ভক্ত নই। আমি কখনো ইংলিশ ভদ্রতার ভক্ত নই। আমি বালোতেল্লিকে ভালোবাসি, আমি ম্যারাডোনাকে ভালোবাসি এবং আমি জর্জ বেস্টের ভক্ত। এই আমাকে ক্রিকেটে সেই ফ্লেবারটা দিতে পেরেছেন ওয়ার্ন, সেই তাচ্ছিল্যটা দেখাতে পেরেছেন ধোনি।

এই ধোনির জন্য আমার একটা স্যালুট তোলাই থাকবে।

স্যালুট, দ্য আউটসাইডার।

Category : মতামত
Share this post