‘সাকিব-মাশরাফির দল’ ব্যাপারটা কী!

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
জানুয়ারী ৩, ২০১৭
 মাশরাফি ও সাকিব মাশরাফি ও সাকিব

আমাদের বোর্ড সভাপতি যখন বললেন যে, স্কোয়াড ও একাদশ সাকিব-মাশরাফিই নির্বাচন করেন; আমি একাধানে আনন্দিত হয়েছি।

মাশরাফি বিন মুর্তজা দলের অধিনায়ক, সাকিব আল হাসান দলের সহঅধিনায়ক।

জাতীয় দলের একাদশ তো তারাই নির্বাচন করবেন। আর কারো, আই মিন ইট, আর কারো অধিকার নেই একাদশ নিয়ে কথা বলার। অধিনায়ক ও সহঅধিনায়ক প্রয়োজন মনে করলে কোচ ও বাকী খেলোয়াড়দের পরামর্শ নিতে পারেন। তবে দলটা তাদেরই হবে। এটাই ক্রিকেটের রীতি।

আবারও বলি, ক্রিকেট ক্যাপ্টেনস গেম। ফুটবলের মতো এটা ‘ম্যানেজারস গেম’ নয়। কোচ বড় জোর ম্যাচ ট্যাকটিকস নিয়ে কথা বলবেন। বোর্ড কোচ-ক্যাপ্টেনের নিয়োগ দেবে। কিন্তু বোর্ড বা কোচ কেউ একাদশ গঠন করতে পারবে না।

ফলে মাশরাফি-সাকিব দল গঠন করবেন, এটাই স্বাভাবিক।

মাননীয় সভাপতির কথায় একটু অবাক হলাম এই কারণে যে, এমন একটা স্বাভাবিক ঘটনা আমাদের এখানে আজকাল সংবাদ সম্মেলন করে জানানো লাগছে! এতো কিছু নানা জায়গায় ঘটছে ও রটছে যে, বোর্ড সভাপতিকে আশ্বস্ত করতে হচ্ছে, দল এখনও অধিনায়ক ও সহঅধিনায়কই নির্বাচন করছেন।

আমি খুব খুশী হলাম। স্বস্তি পেলাম।

অন্তত আজকের টি-টোয়েন্টির দল দেখে মনে হয়েছে, এটা সত্যিই মাশরাফি-সাকিবের দল। অন্তত এই স্কোয়াড থেকে বেস্ট যে দল তারা করতে পারতেন, সেটাই আজ মাঠে খেলেছে। মুশফিক সুস্থ থাকলে তিনি হয়তো খেলতেন। নাসির স্কোয়াডে থাকলে হয়তো সৌম্য, নাকি নাসির; এ নিয়ে ভাবতেন। এগুলো মার্জিনাল ব্যাপার, এটা দিনে দিনে, ভেন্যুতে ভেন্যুতে, প্রতিপক্ষ বিবেচনায় বদলায়। মোদ্দা কথা হলো, দলটা তাদের।

তাহলে আমার কথা কী দাড়ালো?

তানভির, শুভাগত বা শুভাশিষ খেললে সেটা মাশরাফি-সাকিবের দল নয়?

এখানেই দারুন একটা মজা আছে। দলে যেই খেলুক, যাকে নিয়েই একাদশ গঠিত হোক, সেটাই মাশরাফি-সাকিবের দল। দল কিভাবে গঠিত হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের অভিমান থাকতে পারে। কিন্তু ওই সত্তর গজের দড়ি পার করে খেলোয়াড়রা যখন ভেতরে ঢোকে, এর প্রত্যেকের বড় ভাই ওই মাশরাফি-সাকিব। শুধু মাশরাফি আর সাকিবের কথা বলি কেনো?

রিয়াদ, মুশফিক, তামিম?

বাংলাদেশের প্রতিটা খেলোয়াড় এদের খেলোয়াড়; প্রতিটা দল এদের দল। কোনো একটা খেলোয়াড়কে বুকের বদলে পিঠ আমাদের সিনিয়ররা দেখিয়ে দেয় না। তানভিরের প্রতি একজন মাশরাফির যতটুকু ভালোবাসা, ঠিক ততোটুকুই ইমরুলের প্রতি। এটা মুখের কথা নয়। আমাদের দল এমনই।

কিন্তু যারা ওপরে বসে নীতি নির্ধারণ করে, তাদের দায়টা হলো, এই মাশরাফি-সাকিবদের বিব্রত না করা। যেহেতু সকলকে তারা সমান ভালোবাসেন। মাঝখান থেকে এমন কিছু করা যাবে না যে, ভালোবাসাটাও কোনো কারণে যেনো বিড়ম্বনায় পরিণত হয়ে না যায়।

আসলে কথা ওই একটাই।

চেইন অব কমান্ডটা ঠিক রাখতে হবে। বোর্ড সভাপতি আমাদের সকলের অভিভাবক। সকল ক্রিকেটার, কর্মকর্তার, কোচের তো বটেই; আমাদের ক্রিকেট সাংবাদিকদেরও অভিভাবক তিনি। তিনি কেবলই নীতি ঠিক করে দেবেন এবং সঠিক জায়গায় সঠিক লোকটা নিয়োগ দেবেন।

যেমন আমরা স্বপ্ন দেখি-

# আমাদের জন্য একজন মিডিয়া ম্যানেজার নিয়োগ দেবেন।  যে মিডিয়া ম্যানেজার কেবল সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নকর্তা ঠিক করবেন না; তিনি সত্যিই মিডিয়ার প্রয়োজন দেখবেন। তিনি ক্রিকেট বোর্ডের জন্য দারুন সক্রিয় একটা যোগাযোগ মাধ্যম গড়ে তুলবেন। যেখানে সাংবাদিকরা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকলে চোখের পলকে সব তথ্য, সংবাদ সম্মেলন পেয়ে যাবেন। যাতে করে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।

# আমাদের বোর্ড সভাপতি বিভিন্ন কমিটির প্রধাণ ও সদস্যদের নিয়োগ দেবেন। যেমন নিয়োগ দেবেন নির্বাচক কমিটিকে। সেই নিরাচক কমিটি কারো কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন না। কোনো এক বহু পরিচয়ের কর্মকর্তা, সাবেক খেলোয়াড় কিংবা অন্য কোনো কমিটির প্রধাণ নির্বাচক কমিটির অভিভাবক হবে না। অভিভাবক হবেন কেবলই সভাপতি।

# আমাদের বোর্ড সভাপতি নিয়োগ দেবেন গ্রাউন্ডস কমিটিকে। যারা সত্যিই মাঠ সংরক্ষনের অভিজ্ঞতা রাখেন এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক মানের উইকেট বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।

# বোর্ড সভাপতি আম্পায়ারস কমিটির প্রধাণ নির্বাচন করবেন, যিনি নিশ্চিত করবেন কোনো একজন আম্পায়ার যেনো ঢাকা লিগে একটি দলের সব ম্যাচে দায়িত্ব পালন না করেন। একজন আম্পায়ার নিষেধাজ্ঞা থেকে ফিরেই যেনো বিতর্কের হাতিয়ার না হয়ে ওঠেন।

# বোর্ড সভাপতি বিপিএলের জন্য কমিটির প্রধাণদের নিয়োগ দেবেন। যার কেউ পরোক্ষভাবে কোনো একটি বিপিএল দলের দণ্ডমুন্ডের কর্তা হবেন না।

# আমাদের বোর্ড সভাপতি কোচ নিয়োগ করবেন। কোচ স্বাধীনভাবে দলের রনকৌশল ঠিক করবেন, অনুশীলনের কৌশল, লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবেন। কিন্তু সেই কোচ যেনো বছরে একটা দুটো হলেও ঘরোয়া ম্যাচ দেখেন, এটা নিশ্চিত করবেন অভিভাবক। কোচকে নির্বাচক করে ফেলা হবে, অথচ কোচ আন্তর্জাতিক খেলা না থাকলেই অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাবেন ছুটিতে; এটা অভিভাবক ঠেকাবেন। নেটে একদিন একটা চমক না খুজে এই পদাধিকার বলে হওয়া নির্বাচকরূপী কোচ দেশের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট দেখবেন, বিপিএল দেখবেন, ঢাকা লিগ দেখবেন; তবে জানবেন কারা দেশের সত্যিকারের প্রতিভা।

আর এভাবে ধাপে ধাপে নিরপেক্ষতা, সততা, কোয়ালিটি ক্রিকেট, সঠিক নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যে দলই মাশরাফি-সাকিবদের হাতে এসে পৌছাবে, সেটাই এদের দল।

প্রক্রিয়াটা আমরা ঠিক রাখতে পারলে আর মুখ ফুটে এটা বলতে হবে না যে, দল অধিনায়ক-সহঅধিনায়ক নির্বাচন করেন। ওটা লোকে এমনিই বুঝবে।

ফুল ফুটবলে অন্ধজনও টের পায়; সুবাস ছড়ায় যে।

Category : মতামত
Share this post