জাতীয় দল মিরাকেলের জায়গা নয়

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ৩১, ২০১৬
 প্রতীকি ছবি: তানভির  প্রতীকি ছবি: তানভির

আমরা অনেকে তানভিরকে নিয়ে রসিকতা করেছি।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্রিকেটারদেরকে আক্রমণ, রসিকতা করার সবসময় বিপক্ষে; তাতে যৌক্তিক কারণ থাকলেও করি না। কারণ, বাকীদের জন্য যেমন তেমন, আমার জন্য ক্রিকেট ও ক্রিকেটাররা রুটিরুজির উপায়।

তাই আমার করা কোনো রসিকতায় তানভির বা অন্য কোনো ক্রিকেটার কষ্ট পেলে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।

তবে এবার একটু অবস্থানটাও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

আমরা যারা তানভিরকে নিয়ে রসিকতা করছি, তারা কী আসলে তানভিরকে কিছু বলছি? নাকি ম্যানেজমেন্টকে বলতে চাচ্ছি?

আমি অন্তত ম্যানেজমেন্টকে বলতে চাই।

নিউজিল্যান্ডে খেলা শুরুর আগেই লিখেছিলাম, এখানে জয়ের স্বপ্ন আছে আমাদের; কিন্তু প্রত্যাশার চাপ নেই। ফলে এই তিন ম্যাচ হেরে যাওয়ায় আমরা সবাই খুব খেপে গেছি, এমন ভাবার কারণ নেই। আমরা মোটামুটি জানতাম যে, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দু দলই সেরা ক্রিকেট খেললে নিউজিল্যান্ডই জিতবে।

কিন্তু দু দলই কী যার যার সেরা ক্রিকেট খেলেছে?

নাহ। নিউজিল্যান্ড তার বেস্ট ক্রিকেট খেলেনি। আর সেই না খেলাটার সুযোগে বাংলাদেশ তার বেস্ট ক্রিকেট খেলে জিতে যেতে পারতো। সেটাও হয়নি।

আমাদের আলোচ্য নিউজিল্যান্ড নয়, বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কেনো সেরাটা দিয়ে খেলতে পারলো না, সেটা বোঝার চেষ্টা করি।

এ ক্ষেত্রে চোখে দেখার মতো কারণ হলো, সিনিয়র ক্রিকেটাররা হতাশ করেছেন। জুনিয়র যাদের ভরসা মনে করা হচ্ছে, তারা জ্বলে উঠতে পারেননি।

কিন্তু এই সিনিয়র-জুনিয়ররাই তো কয়েক মাস আগেও পারফরম করছিলেন। এই সময়ে কী হলো যে, তারা পারফরম করতে ভুলে গেলেন? পারফরম নাও করতে পারেন। কিন্তু পছন্দের উইকেটে হঠাৎ এরকম ‘দায়হীন’ ব্যাটিং করলেন কেনো সিনিয়ররা!

এখানেই আমার হাইপোথিসিস হচ্ছে, মিরাকলের আশায় আমাদের টিম ম্যানেজমেন্ট দলটাকে খুব আনস্টেবল করে ফেলেছেন। গত কয়েক মাসে আমাদের প্রধাণ কোচ ও টিম ম্যানেজমেন্ট এমন কিছু কাজ করেছেন, যাতে সিনিয়র-জুনিয়র কেউ আর দলে নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না।

প্রথমত মিরাকলের প্রত্যাশার কথা বলি।

এই যে দলে তানভিরকে নেওয়া হলো বা দলের সাথে সাথে এবাদত হোসেন নামে একজন পেসার নিয়ে ঘোরা হচ্ছে, এরা কী যথাযথ নিয়মে নির্বাচকদের চোখে পড়ে উঠে এসেছেন।

একদমই না।

তানভির গত মৌসুমে ব্যাটিং অলরাউন্ডার হিসেবে উন্নতি করেছেন। কিন্তু তাকে সে যোগ্যতায় দলে নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়েছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটা প্রস্তুতি ম্যাচে তার লেগস্পিন দেখে; লেগস্পিনার হিসেবে।

এবাদত সেভাবে এখনও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে সময়ই কাটাননি। তার আগেই নেটে তাকে দেখে বোলিং কোচের পছন্দ হওয়ায় দলের সাথে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

এর আগে একইরকম তেমন কোনো প্রমাণ না দিয়েই দলে ঢুকে গিয়েছিলেন জুবায়ের হোসেন লিখন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে হঠাৎ করে দুটো প্রস্তুতি ম্যাচে ভালো ব্যাটিং করে দলে নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন মোহাম্মদ মিঠুন।

এই কান্ডগুলো জাতীয় দলে যে ঘটানো সম্ভব হয়, তাই বিশ্বাস করা কঠিন।

আপনি নেটে ভালো করলেন, একটু চমকে দিলেন বা প্রস্তুতি ম্যাচে একটা ইনিংস খেললেন; তাতে পাড়ার দলে জায়গা মিলতে পারে। জাতীয় দলে নয়। জাতীয় দলের জার্সি বা সফর এতো স্বস্তা হতে পারে না।

এতে যারা লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলে ঢোকার জন্য লড়াই করছেন, তাদেরকে বলে দেওয়া হয় যে, সিস্টেমের পাচ পয়সা দাম নেই। সেই সাথে জাতীয় দলে যারা আছেন, তাদেরও বলা হয়, হঠাৎ একদিন নেটে কোনো এক ‘প্রতিভা’ পেলে তোমাকেও ছেটে ফেলবো আমরা।

কেউ কেউ না জেনে তর্ক করতে পারেন যে, মুস্তাফিজ বা সৌম্যও এভাবে এসেছেন জাতীয় দলে এবং সফল হয়েছেন। প্রথম কথা হচ্ছে, এটা সত্যি হলেও সিস্টেমে এভাবে অনাস্থা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, এমন মিরাকল রোজ ঘটবে না। দ্বিতীয় কথা হলো, মুস্তাফিজ ও সৌম্য মিরাকল নন। তারা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ধাপে ধাপে জাতীয় দলে এসেছেন। রীতিমতো ‘এ’ দলের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন তারা।

যেটা তানভিরদের ক্ষেত্রে ঘটেনি।

একজন তানভির কারো শত্রু নয়। কিন্তু একজন তানভিরের একটা ‘ভেল্কি’র প্রত্যাশায় আপনি যখন নাসির হোসেনকে দলের বাইরে রাখেন, সেটা ভীষন একটা ব্যাপার হয়। এবাদত ম্যাচই পাবেন না, আগেই বলা হয়েছিলো। তারপরও জাতীয় দলের সাথে সাথে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে ঘোরাটাও একটা রিওয়ার্ড। সেই রিওয়ার্ড যখন বছর জুড়ে ভালো করতে থাকা আল আমিন না পান, আনকোরা কেউ বিনা যুক্তিতে পায়; সেটা পুরো দলের জন্য ধাক্কা হয়।

আপনি যখন টেস্ট বা ওয়ানডে অধিনায়ককে মনমতো বোলিং চেঞ্জ, ফিল্ডিং প্লেসমেন্ট করতে না দেন; তখন তো ভয় পেতেই হয়। দলের একজন ক্রিকেটার যখন জানে যে, অধিনায়ক নন, বাইরে থেকে প্রতিটা সিদ্ধান্ত আসছে ম্যাসেজের ভেতর দিয়ে, ওই দলে আর চেইন অব কমান্ড বলে কিছু থাকে না।

আমরা জানি, আমরা একটা দুর্বল ক্রিকেটীয় কাঠামোর দেশ। আমাদের কাঠামো অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো নয়; ভারতের মতোও নয়। কিন্তু যে কাঠামো আছে, তাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল কিছু কিছু মুখ দেখায় আমাদের প্রতিনিয়ত। এরা বছরের পর বছর লড়াই চালাতে থাকেন। তাদেরকে একেবারে উপেক্ষা করে এভাবে আকাশ থেকে তারকা পেড়ে আনার নেশা এবং দলে চেইন অব কমান্ড শেষ করে দেওয়াটাই আসলে একটা দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত নষ্ট করার জন্য যথেষ্ঠ।

আমরা যখন ঘরের মাটিতে নিয়মিত জিতছিলাম, তখনই ভেতরে ভেতরে এই ‘ম্যাগানোমেলিয়া’ তৈরী হয়েছে। তখনই আমাদের ম্যানেজমেন্ট মনে করেছেন, ভুল বলে তাদের কিছু নেই। যেহেতু যা করছেন, সাফল্য আসছে; তাই আরও আরও বাজি ধরেছেন তারা, আরও আরও কতৃত্ব হাতে নিয়েছেন।

দলের সবাইকে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ঘন ঘন পরিবর্তন।

নিউজিল্যান্ডে তো আমরা হঠাৎ জেনে সফর করতে যাইনি। লম্বা সময় থেকে আমরা জানি যে, সেখানে যেতে হবে। এই সফর মাথায় রেখে অস্ট্রেলিয়াতে ক্যাম্পও করা হয়েছে। তারপরও আমরা নিউজিল্যান্ডে তিনটা ম্যাচে একটা স্ট্যাবল একাদশ খেলাতে পারলাম না কেনো? কেনো সৌম্যকে নিউজিল্যান্ডে আরও একটা ম্যাচ খেলানোর পর বোঝা গেলো যে, তিনি ফর্মে নেই!

এই মিরাকলের প্রত্যাশা, চেই অব কমান্ডে আস্থা না রাখা এবং দল বদলাতেই থাকা; আমাদের আর যাই হোক, স্বপ্নের দুয়ারে নিয়ে যাবে না।     

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post