তিন অভিষেক: পরীক্ষা, নাকি ইগো!

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬
 শুভাশিষ রায় শুভাশিষ রায়

সব ধরণের খেলাধুলায় একটা ব্যাপার খুব জরুরী মনে করা হয়, স্থিতিশীল একটা দল।

বাংলাদেশ জাতীয় দলটা দেশের মাটিতে প্রায় দুই বছর অসামান্য ক্রিকেট খেলেছে। কিন্তু খুবই দূর্ভাগ্যের বিষয়, জাতীয় দলে জনা ছয়েক খেলোয়াড় ছাড়া এখনও আমরা তিন ফরম্যাটের কোনো ফরম্যাটেই একটা স্থিতিশীল দল পাইনি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী অস্থিতিশীল আমাদের টেস্ট দল। এরপর টি-টোয়েন্টি দল। তুলনামূলক আমাদের ওয়ানডে দলটা একটু স্থিতিশীল ছিলো। এই ‘বদনাম’ও এবার ঘোচানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে।

যতদূর জানা গেলো আগামীকাল আমাদের ভোর রাতে তিন জন ক্রিকেটারের অভিষেক হচ্ছে এক ওয়ানডেতে!

বেশী বেশী খেলোয়াড়ের অভিষেক করানোটা বেশী মার্ক পাওয়ার মতো কোনো গুনের ব্যাপার নয়। এ অবধি আমরা ৯৫টি টেস্টে ৮১ জন খেলোয়াড়কে অভিষেক করিয়ে ফেলেছি। ৩১৯টি ওয়ানডেতে আমাদের হয়ে অভিষেক হয়েছে ১১৯ জন খেলোয়াড়ের। আর ৬২টি ওয়ানডেতে ৫৫ জন ক্রিকেটার অভিষিক্ত হয়েছেন!

নিঃসন্দেহে অনুপাতের হিসেবে দুনিয়ায় সবচেয়ে সহজে পাওয়া জাতীয় দলের ক্যাপটি এখন বাংলাদেশের।

এই রেকর্ডটা দিনকে দিন সমৃদ্ধ করার চেষ্টায় আমাদের ম্যানেজমেন্ট কোনো ঘাটতি রাখছেন না। আমাদের বর্তমান কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই অবধি আমরা ১০টি টেস্ট খেলেছি; ৮ জন টেস্ট ক্রিকেটারের অভিষেক করিয়ে দিয়েছি। ২১টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখেছে ১২ জন ক্রিকেটারের অভিষেক।

আর এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডের আগ অবধি এই চান্দিকা-যুগে ৯ জন ওয়ানডে ক্রিকেটারের আন্তর্জাতিক জীবন শুরু হয়েছে; আগামীকাল সংখ্যাটা ১২ হয়ে যেতে পারে।

আগামীকাল ৩ জনের একসাথে অভিষেক হলে সেটা হবে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে চার বছর পরের এক ঘটনা। গত চার বছরে বাংলাদেশের কখনোই এক ম্যাচে ২ জনের বেশী ক্রিকেটারের অভিষেক হয়নি। ২০১২ সালের নভেম্বরে নিতান্ত ইনজুরি বিপাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ম্যাচে চার ক্রিকেটারের অভিষেক হয়েছিলো।

এবার ইনজুরি সংকট একটি অভিষেক ঘটাচ্ছে। বাকী দুটোকে পরীক্ষানীরিক্ষা ছাড়া আর কিছুই বলার নেই।

প্রথমেই আগামীকাল নিশ্চিত অভিষেক হতে যাওয়া নুরুল হাসান সোহানের কথা বলা যাক। সোহান এমনিতেই ওয়ানডেতে অভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য ক্রিকেটার। তবে সেটা দেশের মাটিতে হলে তার জন্য নিশ্চয়ই স্বচ্ছন্দ একটা ব্যাপার হতো।

মুশফিকের ইনজুরিতে কারো হাত নেই। দলে একমাত্র ব্যাকআপ উইকেটরক্ষক সোহান। ফলে তার অভিষেক ঘটাতেই হবে। আর উইকেটরক্ষক হিসেবে সোহান এখন দেশের বাকী উইকেটরক্ষকদের চেয়ে এতোটাই এগিয়ে যে, তাকে দলের বাইরে রাখাটাই কঠিন সিদ্ধান্ত। যদিও তিনি অন্যান্য ফরম্যাটে যে সুযোগ পেয়েছেন, তাতে ব্যাটে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। তবে সোহানের ব্যাটিংয়ের সাথে যারা পরিচিত, তারা খুব ভালো করে জানেন, ওয়ানডে বা টেস্টে তার বড় বড় ইনিংস খেলাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেই সাথে অবশ্যই দেশসেরা উইকেটরক্ষক।

কিন্তু বাকী দু জন?

তানভীর ও শুভাশীষ।

প্রথমে তানভীরের ব্যাপারে আলাপ। তানভীর মূলত একজন মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটা প্রস্তুতি ম্যাচে লেগস্পিন দিয়ে কোচকে মুগ্ধ করেছিলেন। এরপর ক্যাম্পেও তিনি দারুন পারফরম করেছেন বলে শোনা গেলো। ফলে কোচ মুগ্ধ হয়ে তার অভিষেক করাচ্ছেন।

হাতুরুসিংহের খেলোয়াড় চেনার চোখ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। মুস্তাফিজ, সৌম্যদের এমনই হঠাৎ দেখে পছন্দ করে তিনি বিশ্বকে চিনিয়েছেন। আমরা ধরে নিলাম, তানভীর আসলেই দুনিয়া কাপানো একজন লেগস্পিনার হতে পারেন।

কিন্তু সেই তানভীরের নিজের ক্যারিয়ারের জন্য আজকের অভিষেকটা কী সুখকর হবে?

নেলসনের উইকেটে বাউন্স পেতে পারেন, টার্নও আদায় করা সম্ভব। ফলে একটা চান্স তো থাকেই সফল হওয়ার। কিন্তু এই প্রতিকূল পরিবেশে এমন অভিষেকের ধকল সামলাতে না পারলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ওই তানভীরই হবেন। দু দিন পর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেললে জুবায়েরের মতো কোচই সবার আগে ছুড়ে ফেলবেন তাকে।

যেমনটা সম্ভবত সৌম্যর সাথেও হচ্ছে।

এই সৌম্যকে সবচেয়ে বেশী সুযোগ কোচই দিয়েছেন। তিনিই এখন তার ওপর খেপে তাকে বাইরে পাঠাচ্ছেন। এটাতে আপত্তি করার সুযোগ নেই। কিন্তু সৌম্যর বিকল্প কী তানভীর? আমার তা মনে হয় না। সৌম্যর বিকল্প মেহেদী হাসান মিরাজ নয় কেনো!

আগামীকালকের তিন অভিষিক্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রশ্ন মাথায় নিয়ে সম্ভবত অভিষেক হবে শুভাশিষ ছেলেটির।

শুভাশিষ যদি আগামীকাল ৫-৬টা উইকেট নিয়ে নেন, তাতেও এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার সুযোগ নেই। কারণ, এটা একাধারে রুবেল হোসেনের প্রতি অন্যায় ও শুভাশিষকে ওভাররেট করা হয়।

শুভাশিষ ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেকদিন ধরে পরিচিত নাম। কিন্তু বড় ম্যাচে ভালো করার রেকর্ড তার খুব কম। উল্টো দিকে দলে আছেন রুবেল হোসেন। মুস্তাফিজকে বিশ্রাম দিলে কারো একজনের একাদশে জায়গা প্রাপ্য হলে সেটা রুবেল।

মাঝে ইনজুরি থেকে ফেরার পর নিজেকে খুজে পেতে একটু সমস্যা হচ্ছিলো। কিন্তু বিপিএলে দূরন্ত বল করে ছন্দ ও ফর্ম প্রমাণ করেছেন। এরপর আছে নিউজিল্যান্ডে ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তার ভালো করার রেকর্ড।

তাহলে রুবেলকে আরেকবার অবহেলা করার কারণটা কী হতে পারে?

শেষ অবধি বাংলাদেশ যদি আরেকটা ম্যাচ জেতে, এসব প্রশ্ন হয়তো আমরা অনেকেই ভুলে যাবো। এমনকি যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টাও হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একটা জয়ের চেয়ে একটা সংষ্কৃতি তৈরী করা বেশী জরুরী।

Category : মতামত
Share this post