আমরাই হয়ে উঠি বাংলাদেশ

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ২৩, ২০১৬
  প্রতীকি ছবি  প্রতীকি ছবি

আর মাত্র হাতে গোনা দুটো দিন। তারপরই শুরু হবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে।

কী হবে এই সিরিজে? কী আশা করছি আমরা?

অবশ্যই জয় আশা করছি। দেশ হোক, আর বিদেশ হোক; প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড হোক, ভারত হোক আর দক্ষিণ আফ্রিকা; আমরা জয় ছাড়া কোনো কিছুর স্বপ্ন দেখি না।

ক্রিকেটের হিসেব নিকেশ বলছে, ওয়ানডে সিরিজটা জেতাটাও আমাদের জন্য অসম্ভব নয়। একটা সাদা মাটা পরিসংখ্যান তো আছেই, গত দুটো দ্বিপাক্ষিক সিরিজে আমরা নিউজিল্যান্ডকে ওয়ানডেতে হোয়াইট ওয়াশ করেছি। সর্বশেষ বিশ্বকাপের ম্যাচে তাদের মাটিতেই তাদের অল্পের জন্য হারাতে পারিনি। এ ছাড়া দুই বছর ধরে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সাফল্য, এই ফরম্যাটে মাস্টার হয়ে ওঠা, সিনিয়রদের দারুন ধারাবাহিকতা ও তরুনদের উত্থান আমাদেরকে দারুন আশাবাদী করে।

কিন্তু এই আশাবাদের অর্থ কী? এর মানে কী, আমাদের জিততেই হবে? এর মানে কী, আমরা না জিতলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে? আমরা না জিতলে গত দুই বছরের অর্জন মিথ্যে হয়ে যাবে?

প্রথমত একটু নিউজিল্যান্ড ব্যাপারটা বোঝা যাক।

এই দেশটি বাকী ক্রিকেট বিশ্বের জন্য একটা দূর্গের মতো। সারা পৃথিবী জয় করা যায়, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে গিয়ে তাদের পতন ঘটানো যে কোনো দলের কাছে ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার বা চূড়ান্ত লড়াইয়ের মতো একটা ব্যাপার।

একটু ছোট্ট পরিসংখ্যান দেওয়া যাক।

নিউজিল্যান্ড কখনোই বিশ্বের সেরা দল নয়। কিন্তু এই দলটিই ঘরের মাঠে বাঘের চেয়েও শক্তিশালী। এ যাবৎ ইতিহাসে নিউজিল্যান্ড ঘরের মাঠে ৭২টি ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে; ৩৭টি জিতেছে এবং ১১টি ড্র হয়েছে। মানে, ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে মাত্র ২৪টি। টেস্টে ১৯৮০ সাল অবদি তারা কোনো সিরিজই জেতেনি। কিন্তু সে বছর জয়ের পর থেকে এখন অবধি ৫৮ টেস্ট সিরিজে মাত্র ১৮ বার কোনো সফরকারী দল নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পেরেছে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসটা দেখুন। ২০১৩ সাল থেকে নিউজিল্যান্ড ঘরের মাটিতে ৯টি টেস্ট সিরিজে মাত্র ২ বার হেরেছে। ওয়ানডেতে ২০১৪ সাল থেকে এই অবধি ৯টি সিরিজে ঠিক ২ বারই হেরেছে! এই সময়ে তারা অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডের মতো দলকে সিরিজ হারিয়েছে।

বুঝতে পারছেন যে, কতোটা দূর্ভেদ্য দূর্গে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশ দল। কতো বড় উচু পর্বত জয় করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে তারা!

এই নিউজিল্যান্ডকে আমাদের খেলোয়াড়রা যেমন বোঝার চেষ্টা করছেন, তেমনই দর্শকদেরও বুঝতে হবে।

লক্ষ্য করলাম যে, দুটি হালকা চালের অনুশীলন ম্যাচ, যেখানে খেলোয়াড়দের যাচাই করে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিলো প্রধাণ, সেখানেও পরাজয়ে আমাদের কিছু কিছু সমর্থক ‘জাত গেলো’ ভঙ্গি করছেন। এমনকি যথারীতি খেলোয়াড়দের মুন্ডুপাত ও গালিগালাজ করছেন। আমাদের পেজ থেকেই আমরা গন্ডা গন্ডা এমন মন্তব্য মুছে ফেলছি।

এসব দর্শকের মধ্যে যেমন কিছু না জানা স্রোতে ভাসা ক্রিকেট ভক্ত আছেন, তেমনই তথাকথিত শিক্ষিত লোকজনও আছেন।

এইসব দর্শকদের বলতে চাই, দয়া করে দুনিয়াটাকে স্রেফ নিজের ড্রয়িংরুম মনে করবেন না। এখানে সবই কেবল জয়-পরাজয়ের নিক্তিতে মাপা যায় না। কার সাথে খেলছি, কোথায় খেলছি; এসব জেনে-বুঝে তবে প্রত্যাশার চাপ তৈরী করতে হয়।

স্বপ্ন অবশ্যই দেখতে হবে, তবে কিছুতেই সেই স্বপ্ন যেনো প্রত্যাশার চাপ হয়ে না যায়।

নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের এই সিরিজটা কতোটা কঠিন, সেটা বুঝতে আমাদের নিজেদের চ্যালেঞ্জটাও বুঝতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য নিউজিল্যান্ড সিরিজটা একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু। গত আড়াই বছর ধরে ঘরের মাটিতে বাংলাদেশ অপরাজেয় শক্তি হয়ে উঠেছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছাড়া দেশের বাইরে ক্রিকেটই খেলেনি; তার মধ্যে কেবল ওয়ানডে বিশ্বকাপ ছিলো উপমহাদেশের বাইরে।

ফলে এটা নিঃসন্দেহে নতুন এক যুগ। আর সেই যুগের শুরুটা হচ্ছে কঠিনতম নিউজিল্যান্ড থেকে। ফলে আমাদের ফলাফলের ব্যাপারে আরও সহ্যক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে উঠতে হবে।

এখানে হারলেই চিৎকার, গালিগালাজ শুরু করা যাবে না। আসলে এতো্সব বোঝার দরকার কী?

আমরা তো সবসময় বলি, কোনো পরাজয়েই গালি বা চিৎকার চলতে পারে না।

নিউজিল্যান্ড কেনো, আয়ারল্যান্ডের সাথেও বাংলাদেশ হারতে পারে। কারণ, এটা একটা খেলা। খেলায় একটা দল হারবে, এটাই স্বাভাবিক; টেস্ট হলে হয়তো ড্রয়ের অপশনও থাকে। কিন্তু হারা দলটাই যে সবসময় খারাপ, খেলা তা বোঝায় না।

আমরা সেই অস্ট্রেলিয়ার স্বর্ণযুগে অস্ট্রেলিয়া, এক নম্বর দক্ষিণ আফ্রিকাকে কিংবা ট্রফি প্রত্যাশী ভারতকে হারিয়েছিলাম। তাতে তাদের বাদ যায়নি। আমরা এখনও সেই অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে উঠিনি। এখনও আমরা কেবল পথ চলতে শিখছি। ক্রিকেটের আঙ্গিনায় এখনও আমরা তরুন এক দল।

সেখানে আমাদের পরাজয়ে, সে যার সাথেই হোক না কেনো, তাতে সম্মান যাবে কেনো! পরাজয়ে কখনো সম্মান যায় না; সেটা আরও অনেক কারণে যায়; যা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই।

সবশেষে আমি বাংলাদেশের সেই বিখ্যাত সমর্থকদের একটু দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ করে যে তরুনরা দল বেধে আমাদের দলটিকে সময়ে-দুঃসময়ে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

আপনারা লম্বা একটা সময় ধরে বাংলাদেশকে কেবলই হারতে দেখেছেন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন একটা জয়ের জন্য। ক্রিকেটাররা মাঠে যে অসীম তিক্ততার ভেতর দিয়ে গেছে, আপনারাসেটা দর্শক হিসেবে সহ্য করেছেন। আপনারা সেই পরাজয়ের সময়েও বারবার বলেছেন, ‘জিতলেও বাংলাদেশ, হারলেও বাংলাদেশ।’

আপনারা হারতে হারতে জিততে শেখা সমর্থক গোষ্ঠী।

কিন্তু আজ বাস্তবতা বদলে গেছে। দেশে এখন কোটি কোটি মানুষ। যারা গত আড়াই বছরে স্বপ্নের যাত্রা দেখে ক্রিকেটের সঙ্গী হয়েছেন। এদের অনেকেই হয়তো সুসময়ের সঙ্গী; সুসময় না থাকলে তারাও থাকবেন না। কিন্তু সকলকে এভাবে দেখা যাবে না।

সুসময় কেন্দ্র করে মানুষের জোয়ার এসেছে ক্রিকেটে। তাদেরকে আপন করে নিতে হবে। তাদেরকে খেলাধুলার সুরটা বোঝাতে হবে, সেই হারের সময়ের কষ্টের গল্প বলতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে, জয় বা পরাজয় নয়, আমাদের প্রধাণ অস্ত্র ভালোবাসা।

এই আড়াই বছর বাংলাদেশ যখন জিতেছে, তখন দলের জন্য কোনো ক্রিকপ্লাটুন, ক্রিকেটখোর, ক্রিকেট ফিকের দরকার হয়নি। এই সময়ে অগনিত মানুষ জয়ের নেশায় পথ হেটেছেন। আজ আবার আপনাদের গলা উচু করে কথা বলতে হবে।

বাংলাদেশ জিতলে তো সবাই পাশে থাকবেই। সবাই ধন্য ধন্য করবে। আমরাও বড় বড় ফিচার প্রকাশ করবো। কিন্তু হারলে কাজটা আপনাদেরই করতে হবে।

আবার বলতে হবে, জিতলেও বাংলাদেশ, হারলেও বাংলাদেশ।

আসুন, এই সকলকে নিয়ে আমরাই হয়ে উঠি বাংলাদেশ।    

 

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post