ক্রিকেটারদের পেটে লাথি মারবেন না

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ১৮, ২০১৬
  প্রিমিয়ার লিগের সাধারণেরা  প্রিমিয়ার লিগের সাধারণেরা

রাতের বেলায় অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছি।

এই সময় ক্লান্তি আর বাসার ফেরার তাড়া মিলিয়ে খুব অস্থির থাকি। কেউ ডাক দিলেও বিরক্তি লাগে। এমন একটা সময় রিকশা থেকে নেমেই ছেলেটির সাথে এক ঘন্টা কথা বলতে হলো। একটুও বিরক্ত হলাম না; বরং মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো, আলোর বাইরে থাকা এক জগতের গল্প শুনছি।

গল্প শোনাচ্ছিলেন বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ দলের এক সাবেক ক্রিকেটার; নামটা নাই বলি।

ঢাকার ক্রিকেটের গল্প, যুব ক্রিকেটের গল্প, সৌম্য-মুস্তাফিজদের গল্প করছিলেন। গল্পের শেষ দিকে এসে গলাটা ধরে এলো তার। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘দাদা, প্রিমিয়ার লিগ কোনো কারণে না হলে খেলা ছেড়ে দিতে হবে। আমি একা না, অনেক ক্রিকেটার খেলা ছেড়ে দেবে।’

আমরা যারা জাতীয় দলের ফলাফল, জাতীয় দলের জয় এবং মাশরাফি-সাকিব-তামিম নিয়েই বুঁদ হয়ে আছি, তাদের জন্য এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, এই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ স্তরে খেলা কিছু ক্রিকেটার টাকার অভাবে খেলা ছেড়ে দিতে পারেন!

কিন্তু এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের লাখো ওয়াটের বাতির নিচে ঝলমল করে ক্রিকেট। এখানে বিপিএলের টাকা আছে, প্রাইজ মানি আছে, ম্যাচ ফি আছে; কারো কারো আইপিএল-সিপিএল-কাউন্টির টাকাও আছে। এর বাইরে আছে এক বিরাট অন্ধকার জগত।সেখানে সামান্য তিন বেলার খাবার টাকাটা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় ক্রিকেটারদের, ব্যাট-প্যাড আর বুট কিনতে ধার করে সে টাকা শোধ করতে না পেরে গলা ধাক্কা খেতে হয়।

এই বিশাল সংখ্যার ক্রিকেটারদেরই গলা টিপে মারার এক উদ্যোগ হলো, এবারও প্রিমিয়ার লিগ মাঠে না গড়ানো।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বাংলাদেশের শীর্ষ অধিকাংশ ক্রিকেটারের আয়ের একমাত্র উল্লেখযোগ্য উৎস। প্রিমিয়ার লিগের ১২টি দল থেকে কমবেশী ২৫০ জন ক্রিকেটারের রুটিরুজি চলে।

বাংলাদেশে ১৫ জন ক্রিকেটার আছেন বোর্ডের চুক্তিতে, মানে মাস গেলে বেতন পান। আর ঘুরে ফিরে জনা বিশেক খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বছরে কিছু আয় করেন।

বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বাড়তি একটা আয়ের জায়গা এখন বিপিএল। সেখানে ৭টি দলে সর্বোচ্চ দেশী ক্রিকেটার থাকেন ৭০ থেকে ৮০ জন; চুক্তির ১৫ জন, জাতীয় দল ও আশেপাশের খেলোয়াড়রাও এই ৭০-৮০ জনের মধ্যেই থাকেন। তাহলে বাকী দেড় শতাধিক ক্রিকেটারদের জীবন চলে কী করে?

হ্যা, তাদের কিছু সংখ্যায় ক্রিকেটার জাতীয় ক্রিকেট লিগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে সুযোগ পান। ম্যাচ প্রতি এক বেলার খাওয়া খরচের মতো একটা ম্যাচ ফি পান। তাহলে এই প্রায় দুই শ ক্রিকেটারের দেখা যাচ্ছে বছরের একমাত্র আয়ের উৎস ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ।

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এই আলোর বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের গলা টেপাটা অনেক আগেই শুরু হয়েছে।

আগে উন্মুক্ত দল বদল ছিলো।

তখন এসব ক্রিকেটারদের মধ্যে যারা নিয়মিত পারফরমার, তাদের ক্লাবগুলোর কাছে একটা কদর ছিলো। ফলে এরা বছরে ৫-১ লাখ টাকার একটা চুক্তি যোগাড় করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু গত দুই মৌসুম ‘প্লেয়ার বাই চয়েস’ শুরু হয়েছে। সেখানে এই ক্রিকেটারদের দল পেতেই জীবন বের হয়ে যায়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রেডিংয়ে যা বলা থাকে, সে টাকা পান না। বোর্ড মধ্যস্থতা করে কিছু টাকা যোগাড় করে দেয়।

সেই টাকাটাও এবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

কারণ, আবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ বন্ধ রাখার একটা আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, বড় কয়েকটি ক্লাব জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ছাড়া লিগ খেলতে রাজী নয়। সূচী অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে হওয়ার কথা পরের ঢাকা লিগ। কিন্তু সে সময় জাতীয় দলের ভারত ও শ্রীলঙ্কা সফর থাকায় তারকা ক্রিকেটারদের পুরো লিগে পাওয়া সম্ভব না। তাই নাকি ক্লাবগুলো আপত্তি করছে।

কিন্তু নিন্দুকেরা বলছেন অন্য কথা।

বোর্ড আসলে এই সময় ঢাকা লিগ আয়োজন করে নির্বাচনকে নাকি ঝুকিতে ফেলতে চায় না। আগামী অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে বর্তমান নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ। আশেপাশের কোনো এক সময়ে নির্বাচন করতে হবে। এখন নির্বাচনের আগে ঢাকা লিগ হয়ে গেলে ভোটের হিসেব এলোমেলো হয়ে যাবে।

নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা লিগের সুপার লিগ খেলা ৬টি দলের দু জন করে ভোটার থাকেন। সর্বশেষ লিগে যারা সুপার লিগে ছিলো, তাদের ১২টি ভোটের বেশীরভাগই নাকি বর্তমান বোর্ডের প্রতি অনুগত। কিন্তু এই সময়ে আরেকটা লিগ হলে এই ৬ দল সুপার লিগে নাও খেলতে পারে। তাই ঝুকি কমাতে লিগই বন্ধ করে দেওয়া হোক!

এই অবদি গল্পটা বলতে বলতেই যুব দলের সাবেক ক্রিকেটারটি চোখ মুছছিলেন, ‘দাদা, এক জোড়া কেডসে এক বছর খেলা যায় না। আগে বিভিন্ন জেলায় খ্যাপ খেলতাম আমরা। তাতে কেডস, ব্যাটের পয়সাটা হয়ে যেতো। এখন নিয়ম হয়েছে, জেলাগুলোর লিগে বাইরের খেলোয়াড় নেবে না। বাড়িতে হাত পেতে ব্যাট-কেডস আর কতো কিনবো?’

এই স্তরের ক্রিকেটারদের সমস্যা স্রেফ এটুকুই নয়।

প্রিমিয়ার লিগটা তাদের ক্রিকেটার হিসেবেও বাচিয়ে রাখে। প্রিমিয়ার লিগ হলে সেই উপলক্ষে তিন-চার মাস নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেলে, আরও ভালো ক্রিকেটারদের সাথে মেশার সুযোগ হয়। জাতীয় লিগ বা বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে কেমন সিরিয়াস অনুশীলনের সুযোগ হয়, সেটা তো সবাই জানেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘হোম’ মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম বা বড় ভেন্যুগুলোতে অনুশীলনের সুযোগ জোটে না। সেই ছেলেটির কথাই বলি, ‘যদিও আমাদের বলা হয়, মিরপুরে প্র্যাকটিস করতে বাধা নেই। কিন্তু এখন তো জানেন, কেমন অবস্থা। সবসময় ওখানে বিভিন্ন দলের প্র্যাকটিস থাকে। আমাদের মতো ক্রিকেটারকে গেট থেকে ঢুকতেই দেয় না। কোনো স্যারকে ধরে ভেতরে গেলেও নেটে জায়গা পাওয়া যায় না। বড়দের নেট থেকে সরিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের কেউ প্র্যাকটিস করতে দেবে না!’

মিরপুরের দরজা বন্ধ, টাকার জোগান নেই; এমন অবস্থায় বিশাল ব্যগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে কোনোদিন গুলশান, কোনোদিন আবাহনী মাঠ, কোনোদিন ধানমন্ডি মাঠে একটু অনুশীলনের জন্য ঘোরাঘুরি। তাও আবার ন্যাচারাল উইকেট নয়, বাধানো উইকেটে অচেনা প্র্যাকটিস।

ফলে যারা বিপিএল বা জাতীয় স্তরের কোনো ক্রিকেট খেলেন না, তাদের সিরিয়াস অনুশীলনেরও একমাত্র সুযোগ এই প্রিমিয়ার লিগ।

সবমিলিয়ে এক বাক্যে বলা যায়, দেশের পাইপলাইন বলুন, ক্রিকেটারদের বাচিয়ে রাখা আসলে নির্ভর করে এই প্রিমিয়ার লিগের ওপরে। নির্বাচন, তারকাহীনতা; কোনো যুক্তিতেই দেশের শত ক্রিকেটারের সেই অক্সিজেনের পাইপটা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।   

আমরা নির্বাচনের এসব জটিলতা বুঝতে চাই না।

আমরা মনে করি, এসব কেবলই নিন্দুকদের প্রচারণা। আসলে এরকম কোনো ব্যাপার ভেতরে নেই। আমরা আসলে জটিল কিছু দিয়ে ক্রিকেটারদের জীবনটা বোঝার ব্যাপারে আগ্রহী নই। আমরা কেবল বুঝি, ক্রিকেটারদের না খেয়ে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়াটা হতে পারে না।

হিসেব নিকেশ যাই হোক, ক্রিকেটারদের হয়েই আমরা কড়জোরে অনুরোধ করি, প্রিমিয়ার লিগটা সময়মতো করুন। হোক, সেটা একবার তামিম-সাকিব-মাশরাফিদের ছাড়াই। তাতে তারকা ক্রিকেটারদের এমন কিছু ক্ষতি হবে না। কিন্তু লিগটা না হলে অনেকের চুলোয় যে হাড়ি চড়বে না।

     

Category : মতামত
Share on your Facebook
Share this post