সমালোচকের সমালোচক

খেলাধুলা ডেস্ক
ডিসেম্বর ১০, ২০০৩
      গুগলি কাকে বলে      গুগলি কাকে বলে

রমণীয় ক্রিকেট

 

শঙ্করীপ্রসাদ বসু

প্রথম প্রকাশ: ১৯৬১

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের একেবারে সূচনালগ্নের একটি বই ‘রমনীয় ক্রিকেট’। দুষ্প্রাপ্য এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় চুম্বকের মতো টেনে ধরে, ক্রিকেটকে করে তোলে রোমান্টিক এক উপন্যাস। ‘বাংলার নেভিল কারডাস’ ডাকনামের শঙ্করীপ্রসাদ বসুর এই বইটি পড়ুন ধারাবাহিকভাবে

 

কিস্তি-২

মাঠে হাজির হতেই পটলার সঙ্গে দেখা।পটলাকে আপনারা চেনেন না সাক্ষাৎভাবে কিন্ত যে কোন পটলকে দেখেছেন নিজেদের পাড়ায়।তুখোড় ছেলে।প্রায়ই গ্রান্ড-গ্রেট ইস্টার্ণে যায় সিনেমা-তারকাদের সঙ্গে দেখা করতে।হোটেলের ভিতরে অবশ্য তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়না,তবে তাতে কিছু এসে যায় না,রাস্তার উপরে দাঁড়িয়েই দেখাসাক্ষাৎটা সেরে নেয়।তার প্যান্টের পকেটে থাকে সিনেমা-পত্রিকা।সেখানে ছাপা রঙ-বেরঙের ছবির সঙ্গে আসল মানুষটার মিল বা গরমিল সে চোখের ক্যামেরায় ও মুখের টেপে রেকর্ড ক’রে নেয়,পরে পাড়ায় এসে মুখ-চোখের রেকর্ড চালাতে থাকে অবিরত।

 পটলার আর দুটো আকর্ষণবস্ত-সরস্বতী ও ক্রিকেট।মা সরস্বতী কোন্‌ পাড়ায় কোন্‌ স্টাইলে বিরাজ করছেন,কোনারক থেকে কোন্‌ বাণীবিদ্যাদায়িনীর আবির্ভাব হয়েছে,কোন্‌ বাঁকা-মুখ সরস্বতী এপস্টাইনের ভাস্কর্য এবং কবিগুরুর ছবি মিলিয়ে ভুবনে অঙ্গ ধরেছেন,সে বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ অনেক বক্তৃতা শুনেছি পটলার কাছ থেকে।এ সব ব্যাপারে আমার মধ্যযুগীয়তা তার কাছে নিতান্ত ধিক্কৃত।পটলার সঙ্গে আগে আমার খুবই হৃদ্যতা ছিল,ইদানীং সেটা কিছুটা কমেছে-আমি ক্রিকেট-লেখা সুরু করার পর থেকে।আমারই দোষ।আমি অত ভুল লিখি কেন?

পটলা আমার সব দোষ ধরিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়,অপরের ভালো লেখা দেখিয়ে দেয় চোখে আঙুল দিয়ে।সে মাঝে মাঝে আমাকে দু’একটা ‘কোশ্চেন’ করে করুণা ক’রে।দু’এক কথায় তার পরেই থামিয়ে দেয় অনুগ্রহ ভরে।–থাক্‌ থাক্‌,আপনি যা বললেন,সেটা অমুক চন্দ্র অমুক অনেক ভ্ল ক’রে বলেছেন অমুক জায়গায়।এখানেই যদি শেষ হোত!তার আদর কাড়বার জন্য আমি একবার পাঠক-পাঠিকার কিছু মুগ্ধ চিঠি পটলাকে দেখিয়েছিলুম।ফল হয়েছে মারাত্মক।পটলা আগে শুধু নিন্দে করেই ক্ষান্ত হোত,এখন নিন্দাত্মক প্রস্তাবটি পূর্ণ-ভাবে পেশ করার পরে পরিশেষে যোগ ক’রে দেয়-না,আপনাকে এসব বলে ফল কি,আপনি তো আমার সোহাগের পাঠক-পাঠিকার চিঠি হাজির করবেন এখনি।

  কী লজ্জা!কোথায় খোঁচা দিলে মানুষ আহত হয় অথচ প্রতিবাদ করতে পারে না,পটলা তা ঠিক জানে।আজকাল তাই তার উপর আমার একটা জাতক্রোধ এসে গেছে।বিশেষত গত দুদিন ধরে তার উপর আগুনের মত জ্বলছি।কারণ,পটলা নয়—পটলার বাবা।

  কয়েকদিন আগেকার কথা।ভদ্রলোক মহা খাপ্পা হয়ে আমাকে বললেন,-মশায়,আপনাদের জ্বালায় আর তো পারা যায় না।

  একটু অবাক হলুম।ভদ্রলোক শান্তপ্রকৃতি।দেখা-সাক্ষাতে অমায়িক হাসি মিশিয়ে হেঁ হেঁ করেন।তিনিই এমন চড়াও হয়ে আক্রমণ করছেন!দোষের কি কারণ থাকতে পারে ভাবতে চেষ্টা করলুম।

  অজয় বোস কে?-রীতিমত চড়া গলা।

  আজ্ঞে-কোন্‌ অজয়-মানে-

  আমি আলোক পেলুম। ওঃ-যুগান্তরের অজয় বোসের কথা বলছেন?ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার ঠিক আলাপ নেই,কিন্ত কি চমৎকার বলে শুনেছেন?ওঁর সঙ্গে ছিলেন কমল ভট্টাচার্য,বিখ্যাত ক্রিকেটার।মারভেলাস বলেছেন রেডিওতে এবার ক্রিকেট নিয়ে।

  কচু-যাচ্ছেতাই-বোম্বেটে-।বোমার মত ফেটে পড়লেন প্রতিবেশী মহাশয়।

  আমার চোখ কপালে উঠে গেছে,-মুখের অবস্থা শোচনীয়।

  মহা বিরক্তিভরে থুতুর পিচ কেটে ভদ্রলোক হতশ্রদ্ধ গলায় বললেন- ও কি,অমন মুখ করবেন না,আমার হার্টের ট্রাবল্‌ আছে।

  ওরে বাবা,রীতিমত সাবধানী ব্যক্তি!একটু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম—তা কমল বাবু,অজয় বাবু করলেন কি আপনার?

  করেন নি কি?আমার ‘ওয়াইফ’ আর আমার ছেলের মাথা চিবিয়ে খেয়েছেন।

  আবার মুখ যা-তা হয়ে যাচ্ছিল,তাড়াতাড়ি সাম্লে নিলুম।মনে মনে বললুম,অজয় বাবুর সুখাদ্যপ্রীতি বটে।

বাইরে বললুম—মশায়,ঠাণ্ডা হয়ে বলুন হয়েছে কি?

  হবে আবার কি,-ভদ্রলোক দ্রুত বেগে আমার মুখের সামনে সাঁই সাঁই দু’হাত নেড়ে চাপা বিষাক্ত গলায় বললেন,-চায়নাম্যান কাকে বলে?

  -কেন চীনেম্যানকে।

  হুঁ! গুগলি কাকে বলে?

  গুগলি-ইয়ে-কোন্‌ গুগলি?

  গেঁড়ি আর গুগলি! হয়েছে। মুরোদ বোঝা গেছে।বাড়ি যাচ্ছি,পটলার মাকে গিয়ে বলছি,খবরের কাগজের পাতা জোড়া ক’রে যাদের রাবিশ ছাপা হয়,তারাও তোমার চায়নাম্যান-গুগলি বোঝে না।

  ব্যাপারটা এতক্ষণে বোঝা গেল।ভদ্রলোকের স্ত্রী কমল-অজয়ের বাংলা ধারাবিবরণীর কল্যাণে কিছু ক্রিকেট শিখে স্বামীকে জ্বালিয়েছেন।একটু হেসে বললুম,-বৌদি বুঝি আপনাকে ঐ সব কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন?

  ভদ্রলোক এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলেন-দুঃখের কথা কি বলব মশাই,তেতেপুড়ে অফিস থেকে ফিরেছি,কোথায় আপনার বৌদি হাতপাখা নিয়ে বাতাস করবে,পাঁচটা মিষ্টি কথা বলবে,তা নয়,ঐ সব চীনেম্যান গেঁড়ি-গুগলির কথা।আমি একটু রাগ করতে,-মেজাজটাও ভালো ছিল না,অফিসে কেল্টে সায়েবের সঙ্গে খিটিমিটি হয়েছে,-বিতিকিচ্ছিরি ভাবে বললে,-ভাগ্যে পটলাটা তার বাপের মত হয়নি।সে এসব জানে।যাই,তাকেই জিজ্ঞেস করি।এই বলে পটলার গর্ভধারিণী পটলার সঙ্গে ক্রিকেটের আলোচনা করতে উঠে গেলেন।না জলখাবার,না চা,কিচ্ছু নয়।হবে কি ক’রে,সারা দুপুর রেডিওতে-‘কি বল অজয়?-হ্যাঁ কমলবাবু’-এই সব শুনলে জলখাবার করবার টাইম মিলবে কোথা থেকে?বলেই ভদ্রলোক আকাশের দিকে চোখ উল্টে বৈরাগ্যভাবে বললেন,-হা রে সংসার! সংসার না অরণ্য!

  এবং সেই অবস্থায় ওল্টানো চোখে একটু তির্যক তাকিয়ে শুধোলেন,-ক’টা বাজে?

  বললুম,-সওয়া আটটা।

  তিরিং ক’রে লাফিয়ে উঠে ভদ্রলোক বললেন,-আচ্ছা লোক তো আপনি! দেরি করে দিলেন।বাজার ক’রে ফিরব কখন? অফিসে যাব কখন? এদিকে পটলার মার মেজাজ,ওদিকে কেল্টে সায়েবের মেজাজ। হন্‌ হন্‌ ক’রে বাজারের দিকে দৌড়তে দৌড়তে ভদ্রলোক ঘৃণাভরে বললেন,-আপনাকে একটি বাম্পারে থেঁতলে দেওয়া উচিত।

  অ্যাঁ-কি বললেন?

  তার আগেই তিনি অদৃশ্য।

  বুঝলুম,ক্রিকেট কোথায় প্রবেশ করেছে।পটলা বা পটলার মা নন,পটলার বাবাও ধরা পড়েছেন।তাঁর কানেও কমলবাবু অজয়-বাবুর বাংলা-গলার ‘বাম্পার’ ঠেলে ঢুকেছে।

এহেন পিতা-পটলের পুত্র-পটলকে সমীহ ক’রে চলতেই হয়।তাকে ভয় করার আরও বিশেষ কারণ,পটলা যে গলি-ক্লাবের সেক্রেটারী সে গলিটি আমার জানলার পাশে।জানলায় বলাবাহুল্য কাঁচ আছে।পটলাকে অনেক তোয়াজ করি-দেখো ভাই,বুঝতেই পারছ,ছেলেপুলে নিয়ে টানাটানির সংসার।পটলা মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট উলটে উদাসীন ভাবে বলে,-কী করা যাবে!ভারী তো কাঁচের দাম।ওটাকে চাঁদা বলে ধরে নেবেন।তারপরে হঠাৎ ফিরে চোখ কুঁচকে ঠোঁট সরু ক’রে ধারালো গলায় জিজ্ঞাসা ক’রে বসে-আপনি না লিখেছিলেন-সিড বার্নসরা গলিতে প্রাক্টিশ করার সময়ে জানালার কাঁচ ভাঙত!আপনার লেখা পড়ে তো মনে হয়েছিল,যাদের জানলা ভাঙছে তারাই শয়তান,তারা উঠতি জিনিয়াসদের বাধা দিচ্ছে।

  সর্বনাশ! ছোঁড়া সব মনে রেখেছে!দু’কথায় আমাকে শয়তান বানিয়ে ছেড়ে দিলে।একে কি ক’রে বোঝাব,আমরা কলম ধরলে বিশ্বপ্রেমিক,কিন্তু প্রতিবেশীর বাপান্ত ক’রে এসে তবে সেই কলম ধরে থাকি।

  আমারি প্রস্তাব পটলা সেদিন গৃহিণীর কাছ থেকে লাঞ্চের আলুর দম তৈরি করিয়ে নিয়ে গেল।

  তবু পটলা আমাকে ফেভার করে।আমাকে গলি- ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট করেছে। প্রেসিডেন্ট করতে পারেনি,কারণ ক্রিকেটের দুটো ইংরিজি বই পড়া বা বাংলায় ক্রিকেট নিয়ে দু’কলম লেখা প্রেসিডেন্ট হবার পক্ষে যথেষ্ট কোয়ালিফিকেসন নয়,বিশেষ পাড়ায় যখন বদ্রীদাসবাবু আছেন।বদ্রীদাসবাবু ক্রিকেটকে কম ভাল-বাসেন না,পঁয়ত্রিশ টাকার সিজন্‌ টিকেটে গোটা পরিবার নিয়ে ব্যবসায়ের ঝামেলা ফেলে খেলা দেখতে যান এবং তিনি এ বছরই পটলাদের ক্লাবে দুটো ব্যাট ও চারটে বল উপহার দিয়েছেন।সেখানে আট আনা চাঁদা দিতে আমার ‘ধক’ গুটিয়ে যায়।তদপুরি পটলা তাঁর টিকেটে একদিন লাঞ্চ পর্যন্ত এক রুপালী কুমারীর পিছনে পঁয়ত্রিশ টাকার সিটে বসে খেলা দেখেছে।

  পটলাদের ক্লাবে ক্রিকেট সম্বন্ধে আমি একটা বক্তৃতা করেছিলুম।পটলার সঙ্গে ঝন্টের হাতাহাতি হয়েছিল ক্রিকেট ও ফুটবলের আপেক্ষিক গুনাগুণ নিয়ে।ঝন্টেকে ঘুষিতে কাত করেও পটলা সন্তষ্ট হয়নি,তাকে যুক্তিতেও কাত করা দরকার।তারই হুমকিতে আমাকে ক্রিকেটের পক্ষে বক্তৃতা করতে হয়েছিল।বক্তৃতার আগে পটলা বলেছিল,মণিশঙ্করদার সঙ্গে ক্রিকেট নিয়ে আপনার চেঁচামেচির কথা শুনেছি। ও রকম হালকা চলবেনা,সিরিয়াস কিছু ছাড়ুন।শ্রীযুক্ত মুকুল দত্ত ভাবতে পারেন,তাঁর কথাতেই বুঝি ঐ ‘সিরিয়াস’ লেখাটি হয়েছিল।আপাতত তাই বটে।আসল কারণ কিন্ত পটলা।

Category : বই
Share this post