রমনীয় ক্রিকেট-১

খেলাধুলা ডেস্ক
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
        শঙ্করীপ্রসাদ বসু        শঙ্করীপ্রসাদ বসু

রমণীয় ক্রিকেট

শঙ্করীপ্রসাদ বসু

প্রথম প্রকাশ: ১৯৬১

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের একেবারে সূচনালগ্নের একটি বই ‘রমনীয় ক্রিকেট’। দুষ্প্রাপ্য এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় চুম্বকের মতো টেনে ধরে, ক্রিকেটকে করে তোলে রোমান্টিক এক উপন্যাস। ‘বাংলার নেভিল কারডাস’ ডাকনামের শঙ্করীপ্রসাদ বসুর এই বইটি পড়ুন ধারাবাহিকভাবে

 

কিস্তি-১

চায়ের পেয়ালায় ক্রিকেট

  মণিশঙ্কর গড় গড় করে বলে গেল,-“ভারতে ক্রিকেট হচ্ছে   ইল্‌লেজিটিমেট,ইম্‌মর‍্যাল,ইল্‌কন্‌সিভড্‌,ইল্‌লজিক্যাল......’’

  আমি বললুম,-“ইল্‌-লি।’’ তারপর বললুম,-“বৎস ধীরে।ব্যাখা কর একে একে।’’

  হতাশ হয়ে সে শ্রাগ করল।–“এও বোঝাতে হবে?ক্রিকেট ইম্‌মর‍্যাল-দু’জন লোক এগার জনকে খাটাবে মাঠে,এর থেকে নীতিহীন কি হতে পারে?এক ধরণের নোংরা আমলাতন্ত্রের ছবি।”

  শিবনারায়ণ শিষ্টস্বভাব।জিজ্ঞাসা করল বিনীত ভাবে,-“ভায়া,দুজনে এগারজনকে খাটায়,না,এগার জনে দু’জনকে মারে অন্যায় সমরে?’’

  মণিশঙ্কর না দমে বলল-“এতে ক’রে ইম্‌মর‍্যালিটির পরিমাণ বেড়ে গেল।”

  আলোচনা হচ্ছিল খুরুট রোডের একটা বাড়িতে বসে।ঘরটা বড়,লম্বা টেবিল পাতা আছে।চেয়ার, বেঞ্চ চারিদিকে।রবিবার সকালে সেখানে একটা ছোটখাটো জনতা জমে।নিজেদের মধ্যে বলে,আড্ডা দিচ্ছি,বাইরের লোককে বলে,গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে;বাইরের লোক বলে-কেবলই ঝগড়া হচ্ছে।যারা জোটে তাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান কম নয়,কুড়ি থেকে পয়তাল্লিশ পর্যন্ত এক সঙ্গে আড্ডা মারে।

চা অফুরন্ত এবং সিগারেট।বয়স্থ সদেস্যরা নিজেদের বাঁচাবার জন্য অনধিক বয়স্কদের আগে থেকে ধূমপানের অধিকার দিয়ে রেখেছেন।

রবিবাসরীয় এই আড্ডার ইতিহাস নতুন সদস্যদের নিজস্ব সরস ভঙ্গিতে জানিয়েছিল মণিশঙ্কর।এর আগে নাম ছিল ‘শরৎকুমার চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ফাণ্ড’।সাদা অর্থ,-‘শরতকুমার ঘোষ নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে অন্যান্যদের চা-সিঙ্গারায় আপ্যায়িত করতেন।তারপর দু’জন সদস্য নিয়মিতভাবে এসে যোগদান করল-মিত্তিরদা এবং মণিশঙ্কর।তখন আড্ডাটি স্থায়ীভাবে খুরুট রোডে হোল সমিতিবদ্ধ।তিন জ তার মূল সদস্য,-শরৎকুমার,মিত্তিরদা ও মণিশঙ্কর।আড্ডা চালিয়ে যাওয়া,চা-সিঙারা সরবরাহ করা এবং দুপুর দেড়টার সময় ঝাঁপ বন্ধ করা-এই হোল তিন সদস্যের মূল দায়িত্ব।বাকি যাঁরা আসবেন,তারা কেবল চা-সিঙাড়া খাওয়ার এবং আড্ডা মারবার অধিকারী।সদস্যবৃদ্ধি ঘটে গেল অচিরে।

   আজকের আড্ডায় আছেন দু’জন তরুণ সাহিত্যিক,তিন জন অধ্যাপক(একজন বিজ্ঞানের,দু’জন সাহিত্যের)দু’জন কেরাণী,-এক শিক্ষক,এক উকিল,এক ব্যবসায়ী,এক অফিসার ও এক ইঞ্জিনীয়ার।তর্কে সবাই যোগদান করে এমন নয়,সে বিশয়ে বাধ্য করার কোনো আইন নেই,কিন্ত এক সঙ্গে পাঁচ জন চেঁচালেও তাদের কেউ বাধা না দেয়,সে বিষয়ে আইন আছে।

   ক্রিকেটের প্রসঙ্গে আলোচনা জমে উঠল অল্প সময়ের মধ্যে।

   মণিশঙ্কর হাত গুটোচ্ছিল কি একটা বলবার জন্য,মিত্তিরদা মধ্যস্থতা ক’রে বললেন,-“ঝগড়া থাক।মণিশঙ্কর,ইল্‌লেজিটিমেট কথাটা খুব চড়া।বিশ্লেষণে অন্তত নরম কর।”

  মিত্তিরদা আমাদের স্থায়ী সভাপতি।

  চোখের কোণে দুষ্টু হেসে মণিশঙ্কর বলল, “বুঝতেই পারছেন ভারতে ক্রিকেট ইংরেজী সভ্যতার বেআইনী ফসল।”

  উদার হাস্য করলে সুনীলবিহারী।তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ গম্‌ গম্‌ ক’রে উঠল খুরুট রোডের তিনতলা বাড়ীর একতলা কক্ষে,-“শক-হুণ-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হোল লীন।”

  অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায় এতক্ষণ কি ভাবছিলেন।নিজের বুড়ো আঙ্গুলের মধ্যে অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্বের অচিন্ত্যত্ব কিংবা বিশিষ্টা-দ্বৈতবাদের বিশিষ্টতা-যা হোক একটা কিছুর সন্ধান করছিলেন।

  মাইনাস পাঁচের চশমা কোঁচার খুঁটে মুছতে মুছতে বললেন-“কি যেন বলছিলে-”।

  সকলেই জানে ভাবজগত থেকে সদ্য-প্রত্যাবৃত্ত অধ্যাপকের দ্বিতীয় বাক্যস্ফুর্তি হতে কিছু দেরী হবে।সুযোগ নষ্ট না করে মণিশঙ্কর টেবিল চাপড়াল, “ব্রিটিশ সভ্যতা ভারতে তিনটি জিনিস চালাতে চেয়েছে-ক্রাইস্ট,ক্যাবারে ও ক্রিকেট।”

  জগতের সকল মহাত্মায় একান্ত বিশ্বাসী শরৎকুমার চটে গেলেন-“ভগবান খ্রীস্টের নাম নিয়ে,ইয়ে-”

  তড়বড়িয়ে মণিশঙ্কর বলল,- “ঠিক বলেছেন শরৎদা,এই জন্যই ইংরেজের উপর আমার রাগ।ছি ছি ! ম্যাঞ্চেস্টারের কাপড়,নিউক্যাসলের কয়লার মতই ব্যবসার জিনিস করলে কি না লর্ড জিসাসকে!”

  হাত নেড়ে বিচক্ষণ ভঙ্গিতে লক্ষ্মীকান্ত কি বলতে গেল।তাঁর চর্বিত বচনকে ডুবিয়ে মণিশঙ্করের গলা শোনা গেল,-“আর ঐ ক্যাবারে ও ক্রিকেট।বড়লোকদের মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরাবার জন্য ক্যাবারে এবং জোয়ানদের মাথা খাবার জন্য ক্রিকেট।”

  “বল কি হে?কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্‌মা যত ছেলের মাথা খেয়েছে,ক্রিকেট যে তাঁর লক্ষাংশের একাংশেরও পারেনি,”-বললেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সৃষ্টি ডক্টর পি কে ব্যানার্জি।প্রশান্ত বন্দোপাধ্যায় মহাশয় বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট নিয়েছেন গ্রন্থসমুদ্রে ডুব দিয়ে।পুঁথিঘেঁষা শিক্ষাপদ্ধতির বিরুদ্ধে পুথিসমুদ্র মন্থন ক’রে তিনি বহু যুক্তি আবিষ্কার করেছেন।

  মণিশঙ্করের কোথায় আইনজীবী প্রফুল্ল রায় তীক্ষ্ণ ক’রে হাসলেন।তাঁর এই ধরণের হাসিতে সাক্ষীরা ধড়পড় ক’রে ওঠে।বললেন-“ছোকরা,আমার এক বড়লোক রাজকীয় মক্কেল ক্যাবারে দেখে খুব প্রশংসা করেছিল।বলেছিল-আহা, বড়ো সংযত!”

  অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায় এতক্ষণে বাস্তবায়িত হয়েছেন।–“ক্রিকেটের যদি মূল্যায়ন করতে হয়-”

  “-তাহলে গুহাহিত রসসত্তার অশরীরী আকুতি অপেক্ষিত,-থাম ইডিয়ট,”-খিঁচিয়ে উঠলেন রমেন মিত্তির,গঙ্গোপাধ্যায়ের সহপাঠী,বিজ্ঞানের দুঁদে ছাত্র।

   অধ্যাপককে থামানো গেল না। “অমৃতং বালভাযিতম্‌” বলে মিত্তিরের দিকে ঠোঁট বেঁকিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষায় এবার বললেন-“ক্রিকেট কিন্ত অলস বিলাসের পরিপশক।অঢেল পয়সা আর সময় থাকলে ক্রিকেট সম্ভব।’’

  আমি সম্ভ্রমভরে বললুম,-“দেখুন,সেইটেই বক্তব্য।ক্রিকেট সুন্দরের সীমানা।আমরা কি সকলে চাই না যে,আমাদের সকলের অঢেল পয়সা আর অঢেল সময় থাকুক?ধনতন্ত্র কিছু লোকের জন্য ঐ জিনিস বাস্তব  করেছে। সাম্যতন্ত্র সব লোককে ঐ জিনিস দেবে বলে লড়াই করছে। ক্রিকেট সুখী পৃথিবীর স্বর্ণযুগের নন্দনক্রীড়া।যা হওয়া উচিত,তারই নমুনা তুলে ধরেছে ক্রিকেট।বিশ্রী বর্তমানের সঙ্গে শ্রীমন্ত ভবিষ্যতের ব্যবধানে আমরা লড়াই করে মুছে দেব।আগামী পৃথিবীতে সবাই ক্রিকেট খেলবে।”

  ঘটা করে পাঞ্জাবির হাতা সরিয়ে ঘড়ি দেখছিল মণিশঙ্কর।আমি তাঁর দিকে তাকাতে বলল,-“দাদার উচ্ছ্বাসের ‘ওভার’ কতক্ষণের?অন্তত আট বলের অস্ট্রেলিয়ান ওভারের চেয়ে বেশি?”

  আমি বললুম,-“বাঁদর কোথাকার!”

  মণিশঙ্কর হেসে বলল।–“বাঁচা গেল,ভাষাটা নাতি-ক্রিকেট।”

  ইতিমধ্যে তৃতীয় প্রস্থ চা এসেছে।প্রসঙ্গান্তর আনতে অনেকের আগ্রহ দেখা গেল।“কি পচা ভ্যাজর ভ্যাজর হচ্ছে-” প্রফুল্ল রায় বললেন।অন্যদিন প্রফুল্ল রায় তাঁর আদালতের চমকপ্রদ কাহিনীতে আমাদের নিঃশ্বাস কেড়ে রাখেন।আজ ক্রিকেট-মাঠ ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে আদালত-কক্ষকে।প্রফুল্ল রায় বিরক্ত ভাবে আরও কি বলতে জাচ্ছেন-অদ্ভুত ঘটালেন অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায়।সড়সড় করে চায়ে একটা বিরাট চুমুক দিয়ে দুই চোখ মুদিত করে প্রসন্ন কণ্ঠে বাণী দিলেন,-“আমি ক্রিকেট খেলতুম।”সকলে হতবাক।ক্রিকেটের বিরুদ্ধে যে গলা ভাঙছিল,সেই মণিশঙ্কর নিজেকে সামলাতে পারল না।অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায়ের বিস্ময়কর পদস্থলনের ইতিহাস জানবার জন্য ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,-“কবে-কবে-?”

  “ছেলেবেলায়”।চায়ে আবার সুদীর্ঘ চুমুক।–“বলতুম-ক্রিকেট।”

  “কী-ই-ই?”

  “ত্রিকেট।তিনটে কাঠি দিয়ে খেলা,তাই ভেবেছিলুম খেলাটার নাম ত্রিকেট অর্থাৎ ত্রিকাষ্ঠিকা।ছেলে ভালই ছিলুম।ঐ বয়সেই সংস্কৃত অনেকের চেয়ে বেশি জানতুম।”

  এই কথা বলে অধ্যাপক একটু নাক বাঁকালেন।ঠিক সেই সময়ে রমেন মিত্তিরের ছুঁচলো ঠোঁট থেকে একটা ধোঁয়ার রিং বেরিয়ে এসে ঘুরতে লাগল অধ্যাপকের ঠিক নাকের ডগায়।অধ্যাপক মুখ ফিরিয়ে নিলেন তীব্র বিতৃষ্ণায়।সকলে বুঝল অধ্যাপক আর নামবেন না।

  আলোচনায় ভাবগাম্ভীর্য আনল শিবনারায়ণ।সে অল্প বলে কিন্তু গভীর ক’রে।বয়সে তরুণ হলেও তাকে আমরা সমীহ করি।বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তাঁর কৃতিত্বের জন্যও বটে।শিবনারায়ণ মার্জিত গলায় বলল,-“আজকের পৃথিবীতে কোন অগ্রসর দেশ কিন্ত ক্রিকেট খেলে না।বিজ্ঞান ও দর্শনে শ্রেষ্ঠ জার্মানি,বৈদগ্ধে ও বিলাসে অগ্রণী ফ্রান্স,মানবমুক্তিতে রক্তোজ্জল রাশিয়া,কিংবা বেগে ও ভোগে প্রবল আমেরিকা,এমন কি কর্মে অশ্রান্ত,বর্ণে পীত চীন পর্যন্ত,-কেউ ক্রিকেট খেলে না।”

  শিবনারায়ণের ব্যবহারে রীতিমত ক্ষুব্ধ হোল ক্রিকেট-পক্ষীয়েরা।আলোচনার সবচেয়ে ঘন বিন্দুতে ইতিপূর্বে সে সশব্দে তিন চারটে হাই তুলেছে।আমরা কিছু মনে করিনি।কারণ এর আগে সে এক দিন মেনে নিয়েছে--কোয়ান্টাম-থিয়োরিতে বীতস্পৃহ হয়ে আমরা ততক্ষণ অন্যায় করব না যতক্ষণ না তাকে ক্রিকেট ফুটবল ইত্যাদির মধ্যে টেনে আনবো।সেই আপসের পটভূমিকায় ক্রিকেটের পৃষ্ঠে তার এ কী অতর্কিত ছুরিকাঘাত!তাছাড়া অমন সাজানো বাংলায় ভাষণ!কিন্ত তাকে খাতির করতে আমরা বাধ্য।সুতরাং সমান গভীরতার সঙ্গে বোঝাবার চেষ্টা করতে হোল।বললুম,-“দেখো,তোমার যুক্তি অনুসারে কোন কিছুর অভাবই হচ্ছে যেন তার গুণের কারণ।দোষের অভাব গুণের কারণ হতে পারে,গুণের অভাব গুণের কারণ হয় না।তোমার ঐ সব আদরের দেশের তুলনায় ইংলন্ডও কম সভ্য বা অগ্রসর নয়।তার উন্নতির কতকগুলো লক্ষণ আছে।ইংরেজ পৃথিবীতে বড় যে যে কারনে,তার তিনটে প্রথমেই মনে আসবে-রাষ্ট্রব্যবস্থায় পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র,সাহিত্য নাটক এবং খেলায় ক্রিকেট।পৃথিবীর অন্য দেশ যে ক্রিকেট খেলে না সেটা তাদের অগৌরব।”

  অবজ্ঞার অন্যমনস্কতায় কান খুঁটছিল মণিশঙ্কর।আমার বক্তৃতার কোন প্রভাব তার উপর পড়েছে বলে মনে হোল না।ঠোঁট উল্টে বল্ল,-“ক্রিকেট আবার খেলা!রঙ্গিন মাছ যেমন মাছ নয়-”

  নিরীহভাবে বললুম, “ক্রিকেটের পক্ষে বলছ না বিপক্ষে?”

  “তার মানে?”

  “রঙিন মাছ বললে ক্রিকেটের প্রশংসাই করা হয়।কাতলা রুই হলে সেটা খাওয়ার জিনিস হোত,খেলার হোত না।”

  মিত্তিরদা এবার মণিশঙ্করের পক্ষ নিলেন।–“যাই বল,ক্রিকেটের সব ঢঙ্‌ ভালো নয়।যেমন মুহুর্মুহু রেকর্ড হওয়া আবার ভাঙা।গ্রামোফোন রেকর্ডের মতই ভঙ্গুর।”

  রমেন মিত্তির হাততালি দিয়ে বললেন, “বাহবা দাদা,বলেছ ভালো।এবার থেকে ক্রিকেট-রেকর্ড বাক্সবন্দী ক’রে তার উপর লিখে দিতে হবে-“উইথ কেয়ার।রেকর্ডগুলো তন্বী তরুণীর মতই ডেলিকেট।”

  প্রতিবাদ ক’রে বললুম,-“ঠিক উল্টো।ক্রিকেট পুরুষের খেলা।তাই তার রেকর্ড ভঙ্গুর।অর্থাৎ এক কীর্তি এগিয়ে গিয়ে নতুন কীর্তিকে ডাক দেয়।পুরোনো রেকর্ড ভাঙে,নতুন রেকর্ডের সৃষ্টি হয়।চিরকালের জিনিস পাওয়া যাবে নীতিকথামালা বা হিতোপদেশে।”

  স্নিগ্ধ হাস্যবর্ষণ ক’রে অধ্যাপক গঙ্গোপাধ্যায় বললেন,-“শ্রীমানের ক্রিকেটে উৎসাহ আছে মানছি,কিন্ত অলঙ্কারপ্রয়োগে একটু সাবধান হলে ভাল হয়।”

  মণিশঙ্কর দম নিচ্ছিল।আমার দুর্দশায় খুশী হয়ে বলল-“ক্রিকেট মাঠে গেলে আমার আটকড়াইয়ে যাওয়ার কথা মনে হয়।চড়বড় ক’রে কুলো পিটানোর মত হাততালি পড়ছে আর খড়মড় ক’রে খাবার চিবোচ্ছে মাঠশুদ্ধ লোক।”

  মণিশঙ্করকে সমর্থন করলেন রমেন মিত্তির।বললেন,-“ঠিক পাঁচ মিনিটে একবার ক’রে হাততালি।পাশের এক ছোকরাকে জিজ্ঞাসা করলুম,-ভাই,হাততালি কেন?সে হাঁ ক’রে বললে,তা তো জানিনা,সকলে দিচ্ছে,দিচ্ছি।অন্য পাশের ভদ্রলোককে শুধাতে তিনি বললেন,কোন্‌ হাততালির কথা জিজ্ঞাসা করছেন,প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা কারণ।আমি বললুম,অন্ততঃ এইটার?ইতিমধ্যে আর একটা হাততালির সময় এসে গিয়েছিল।সেটা সেরে নিয়ে ভদ্রলোক জানালেন,আগের হাততালিটা ছিল লক্ষতম নো-বলের।–আর গত হাততালিটা?-১৮৭৩ সালের পর একই ম্যাচে একই খেলোয়াড়ের দ্বারা দ্বিতীয়বার ২৫ টি ক্যাচ ফসকানোর।আমি ভড়কে গেলুম।ক্যাচ ফসকানোর হিসেব আছে?হাততালি দিতে দিতে ভদ্রলোক বল্লেন-সব আছে,-- স্নিক-এ ওভার-বাউন্ডারী,হাঁচির পরে সেঞ্চুরী,কাশির পরে ক্যাচ,হাইতোলার পরে ডিক্লেয়ার,সবের হিসেব পাবেন।শুনতে শুনতে আমার হাঁ বড় হয়ে গিয়েছিল।ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বল্লেন,আপনার দাঁত খারাপ।তারপর বললেন,ক্রিকেটে ভদ্রতাই আসল।আমরা সব কিছুতেই হাততালি দিই।সেঞ্চুরীতে দিই,শূন্যে দিই,রানে দিই,রান আউটে দিই,খেললে দিই,খেলা ছেড়ে দিলে দিই,শুকনো মাঠে দিই,ভিজে মাঠে দিই।কোথাও বিরাম নেই।উইকেট পেলে দিই বোলারকে তাতাবার জন্য,না পেলে দিই বোলারকে তাড়াবার জন্য।ক্রিকেটে আসল বস্ত হচ্ছে সহবৎ।এসব যদি না জানেন,মাঠে এসেছেন কেন?-না না মুখ খুলবেন না,আপনার দাঁত খারাপ।আমি দাঁতে দাঁত চেপে চেপে আমার শেষ প্রশ্নটি কোনোক্রমে পাড়লুম-আগামী হাততালিটা কিসের জন্য হবে?বলতে বলতে প্রবল হাততালিতে মাঠ ডুবে গেল।উম্মত্তের মত হাততালি দিতে দিতে ভদ্রলোক প্রাণপণে চেঁচিয়ে বললেন-হাততালির কোটি জয়ন্তী হোল।”

  সকলে অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল।আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললুম,-“এমন একটা উপভোগ্য আলোচনা ক্রিকেটই সৃষ্টি করতে পারে।”

  সভাপতি মিত্তিরদা উঠে পড়তে মণিশঙ্কর গোঁ-ভরে দাবি করল,-“কিন্তু তর্কের ফলাফল?”

  “সময়াভাবে ড্র”-মিত্তিরদা বললেন।

  মণিশঙ্কর এতক্ষণ বসেছিল।তড়াক ক’রে লাফিয়ে উঠে বলল,-“কি সব বাজে আলোচনা করছি রবিবারের সকালে বসে।কখন ছেলেরা মাঠে ব্যাট-বল পেতেছে।চলুন,চলুন।”

Category : বই
Share on your Facebook
Share this post