ক্রিকেটের কুরুক্ষেত্র

খেলাধুলা ডেস্ক
অক্টোবর ২২, ২০১৬
শঙ্করীপ্রসাদ বসু শঙ্করীপ্রসাদ বসু

রমণীয় ক্রিকেট

 
 

শঙ্করীপ্রসাদ বসু

প্রথম প্রকাশ: ১৯৬১

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের একেবারে সূচনালগ্নের একটি বই ‘রমনীয় ক্রিকেট’। দুষ্প্রাপ্য এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় চুম্বকের মতো টেনে ধরে, ক্রিকেটকে করে তোলে রোমান্টিক এক উপন্যাস। ‘বাংলার নেভিল কারডাস’ ডাকনামের শঙ্করীপ্রসাদ বসুর এই বইটি পড়ুন ধারাবাহিকভাবে

বোমাটা শেষ পর্যন্ত ফাটল।আসুন,আমরা সকলে হিংসাত্মক কার্যের বিরুদ্ধে নিন্দা করি।৩০ শে জানুয়ারি পোর্ট অব স্পেনের ২৮ হাজার ক্রিকেট দর্শকের আচরণকে আক্রমণ করবার মত জোরালো ভাষা আমার নেই।কিন্ত ক্রিকেটের মর্যাদাকে যারা কমলালেবু,কাগজের বাক্স,টিনের টুকরো ও সোডার বোতলের দ্বারা আহত করেছেন,সবুজ মাঠে ও ফ্যাকাসে পিচের উপরে সে মর্যাদাকে যারা দুপায়ে মাড়িয়েছেন,তাদের বিরুদ্ধে কোন রাগই যথেষ্ট রাগ নয়।মর্যাদা যদি গেল ক্রিকেটের রইল কি?ক্রিকেট তো একটা খেলা নয়,সে হোল একটা মর্যাদাপূর্ণ আচরন।

  তবু বোমাটা সত্যই এভাবে ফাটল কেন,এতদিন ফাটেনি কেন,পূর্বে ফাটবার মত অবস্থায় কোনদিন এসেছিল কিনা-এমন নানা প্রশ্ন ভিড় করে আসে,ভেসে আসে সামনে ইতিহাসের কতগুলো টুকরো ঘটনা।সবকিছুই ইতিহাসের অভিব্যক্তি,আমরা ইদানীং শিখেছি।আকস্মিক বলে পৃথিবীতে কোন বস্ত নেই।বিনা মেঘে বজ্রপাত যখন বলি,তখন সেকথা বলি বিনা বুদ্ধিতে;নিশ্চয় গুপ্ত মেঘ ছিল,অথবা বজ্রপাতই হয়নি।

  তাই মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল খেলার মাঠে জনতার প্রবেশ,বা দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল মাঠে রিভলবার বর্ষণের পরিবর্তে যখন ত্রিনিদাদে ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের সময় মাঠে জনতার প্রবেশ ঘটল,তখন রয়টার স্বাভাবিকভাবে আর্তনাদ করেছে-ক্রিকেট ইতিহাসে অভূতপূর্ব।তবে আমরা জানি,কাক যখন তালটা ফেলে,তখন কাক আপাত নিমিত্তপাত্র;খসে পড়া ছিল তালের নিয়তি,সে নিয়তি পূর্ব কর্মফলের সমষ্টি।

  পোর্ট অব স্পেনে কি ঘতেছিল তা একটু বিস্তৃত ভাবে জানানো দরকার।রয়টারের বিবরণ-

  “পোর্ট অব স্পেন।৩০ শে জানুয়ারি।আজ ২৮ হাজার দর্শকের রেকর্ড সমাবেশ থেকে দাঙ্গা বেঁধে উঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ বিশৃঙ্খলার মধ্যে শেষ করে দিয়েছে।

  ক্রিকেটে অভূতপূর্ব এই দৃশ্যে দর্শকেরা বোতল এবং টিন ছুঁড়েছে,পিচের উপর ধাওয়া করেছে।আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ থেকে এই বিক্ষোভের জন্ম,যা চরণ সিংকে শূন্য রানে আউট দেওয়ায় চূড়ান্তে পৌঁছায়।

  ঘটনাটা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং বিপর্যয়ের শেষ অবস্থায় ঘটে।চরণ সিং এর বিদায়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থা-৯৮ রানে ৮ উইকেট।ট্রুম্যান ও স্ট্যাথামের আগ্নেয় বোলিঙের ধাক্কায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভেঙ্গে পড়েছিল।

  চা বিরতির ১৭ মিনিট পরে বিক্ষোভটি ঘটে।গতদিনে ৩৮২ রান সংগ্রহকারী ইংরেজ খেলোয়াড়দের বোতল-বিছানো পিচ থেকে পাহারাধীনে বার করে নিয়ে যেতে হয়।হাজার হাজার লোক মাঠে হৈ চৈ করে,এবং তৃতীয় দিনের খেলা নির্দিষ্ট সময়ের ৭৩ মিনিট আগে বন্ধ করে দিতে হয়।”

  আরও দুটি সংবাদ।এই দিন ইংল্যান্ড বেশী বাম্পার দেয়নি।এবং বোতল ছোঁড়া শুরু হলে বহুসম্মানিত লিয়ারী কন্সটাইন বিশেষ বীরত্বের সঙ্গে দর্শকদের শান্ত করার চেষ্টা করেন।

  ঘটনাটি ঘটে যাবার পর সারা পৃথিবী ছ্যা ছ্যা করল।লজ্জায় মাটিতে মিশে গেলেন ত্রিনিদাদের গভর্নর।বেতারভাষনে তিনি জানালেন-তোমাদের গভর্নর হয়ে আমি বড় গর্বিত ছিলুম,কিন্ত তোমরা এ কি করলে!আমার যে মুখ দেখাবার উপায় রাখলে না?এ জিনিস তোমাদেরই কীর্তি নিজের চোখে না দেখলে আমি কখনোই বিশ্বাস করতুম না।গভর্নর আরও বললেন,আমি জানি দোষী অল্প,গুণীই বেশী;আমার বিশ্বাস,পৃথিবীতে ক্রিকেট উপভোগ করার জায়গা ওয়েস্ট ইন্ডিজের তুল্যি কোথাও নেই,তবু-গভর্নর মুহ্যমান কণ্ঠে জানান,-এ জিনিস পৃথিবীতে প্রথম।

  সত্যই।এই সব মাননীয় ব্যক্তিদের ইতিহাসবোধে সন্দেহ করা যায় না।তথাপি ইতিহাসের দু একটি পাতা উল্টে দেখা যায় কৌতূহলবশে।

  ত্রিনিদাদের মাঠে অমনটি কেন ঘটল তার প্রথম প্রত্যক্ষ উত্তর-ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান স্বভাব।ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা স্বভাবে উত্তপ্ত,অধীর,উন্মত্ত।দ্রব্যঘটিত উত্তাপও বহুল্ভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হয়।ক্রিকেটের ঠোঁটে আঙুল তাদের স্বভাবের চেঁচানিকে থামাতে পারেনি একেবারে।মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গল হারবে,এ জিনিস যেমন দল দুটির সক্রিয় সদস্যদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না,তেমনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ হারবে,এ জিনিস সহ্য করা সম্ভব ছিল না ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সমর্থকদের পক্ষে।

  ৩০ শে জানুয়ারির গোলমালের এই হোল অমার্জিত স্পষ্ট কারণ।বোধহয় আরও কিছু কারণ আছে।আমার হাতে এই মুহূর্তে সব তথ্য নেই,কিছু কিছু ইঙ্গিত ও অনুমান করবার চেষ্টা করব মাত্র।

  তার আগেই ইতিহাস সন্ধান করলে পাঠকের হয়ত ভাল লাগবে।অমন অবস্থা কি পৃথিবীর আর কোথাও গড়ায়নি?ইতিহাস ইতিবাচক তথ্যের সন্ধান দিলে আমরা খুশী হব,কারণ আমাদের সকলেরই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের প্রতি কিছু বর্ণগত দুর্বলতা আছে।ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের রঙ কালো,আমার এবং আমার পাঠকের রঙও তাই।ব্রাউন হয়ে সায়েবদের কাছে আদর কুড়োতে গেলেও-আমরা কালোই।পৃথিবীর সব কালোরা এক হও।বিশ্ববিখ্যাত একজন কালো খেলোয়াড় দুঃখ করে বলেছিলেন,-সায়েবরা জর্জ হেডলি সম্বন্ধে বলে,কালা ব্রাডম্যান,-ব্রাডম্যানকে সাদা হেডলি বললে কেমন শোনায়?

  অস্ট্রেলিয়ানিজমের আলোচনাকালে বডিলাইন প্রসঙ্গ স্থগিত রেখেছিলাম।তারই দু’একটি তথ্য মনে পড়ছে।১৯৩২-৩৩ সালে লারউডের রক্তবাণ বুকে লেগে অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপ্টেন উডফুল মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।তখন যে অস্ট্রেলিয়ান দর্শক মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েনি,তার একমাত্র কারণ ঝাঁপিয়ে পড়ার মত অবস্থা সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি।কিন্ত আগুন জ্বলছিল গ্যালারিতে দর্শকের মনে।আহত উডফুলকে ড্রেসিংরুমে স্যার পেলহ্যাম ওয়ার্নার সহানুভূতি জানাতে এলেন;উডফুল বলেছিলেন-ক্রিকেটে বিখ্যাত হয়ে আছে সেই ব্যাঙ্গভাষণ-মাঠে দুটি দল খেলছে,কিন্ত ক্রিকেট খেলছে এগার জনের একটি দল।

  উডফুল ভেবেছিলেন দল নিয়ে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে জাবেন।অস্ট্রেলিয়ার দর্শক মাঠে নেমে পড়া ছাড়া আর সব কিছু করেছিল-লারউডের গায়ে থুতু দেওয়া পর্যন্ত।অস্ট্রেলিয়া থেকে ইংল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ার তীব্রোক্তিপূর্ণ তার চালাচালি হয়েছিল,এবং কি হয়নি?-যার সর্বোত্তম নাটকীয় বিদ্রুপ অতি ক্ষুদ্র একটি ঘটনায় পেয়েছি-নাচের আসরে একটি ছোট মেয়ে লারউডের পরিচয় শুনে তার মাকে বলল-মাগো,একে তো খুনি বলে মনে হচ্ছে না?

  পাঠককে অনেকক্ষণ ঝুলিয়ে রেখেছি আধুনিক গল্প-লেখকের কায়দায়।আসল ব্যপারটা খুলেই বলি।১৯৩২-৩৩ সালের বডিলাইন বোলিং ছিল ব্রাডম্যান এন্ড কোম্পানিকে সাবাড় করার ভীষণতম সঙ্কল্প।মানুষ খুন করা লারউড-জার্ডিনের মতলব না থাকতে পারে,ছিল না বলে তাঁরা জানিয়েছেন,কিন্ত তাঁরা সরল প্রানে যে বস্তর সৃষ্টি করেছিলেন,হ্যমন্ড বললেন,তার দ্বারা কোন মানুষ যে একেবারে অক্কা পায়নি,সে নিছক বরাত জোরে।মজা এই,হ্যামন্ড স্বয়ং সে বছর জার্ডিন ক্যাবিনেটের সদস্য ছিলেন।

  ১৯৩০ সালে ডন ব্রাডম্যান নামক জনৈক অস্ট্রেলিয়ান ছোকরা ইংল্যান্ডের ক্রিকেট গর্ব ও বোলিং দর্পকে ধুলো করে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের মাঠে!এক টেস্ট সিরিজে ৯৭৩ রান করে(যা এখনো বিশ্ব রেকর্ড) প্রমাণ করেছিলেন,যতদিন ব্রাডম্যানের হাতে ব্যাট আছে,ততদিন ইংল্যান্ডকে মাঠে শুধু বল কুড়োতে হবে।ব্রাডম্যানের সঙ্গে ছিলেন অনুরুপ আর এক ব্যক্তি,পন্সফোর্ড।ব্রাডম্যান যদি অর্জুন হন,পন্সফোর্ড ভীমসেন।

  সুতরাং পূর্বোক্ত পৌরাণিক তুলনা অনুযায়ী ভীমার্জুনের বিরুদ্ধে কৌরবপক্ষে সমবেত হয় কর্ণ-শকুনি-দুর্যোধন।ইংরেজ প্রিয় পাঠক,আমার তুলনার অনৌচিত্ত ক্ষমা করবেন।কোথায় কোথায় ইংরেজপক্ষ কৌরবপক্ষ হয়ে গিয়েছে,নচেৎ ক্রিকেটে যুযুধান সকলেই সভ্য,স্বাধীন ও মহান।

  গোপন পরামর্শের কথাটা তা বলে মিথ্যা নয়।অস্ট্রেলিয়া আসার আগে জার্ডিন কয়েকবার গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের বজ্রবোলার এফ আর ফস্টারের কাছে।ফস্টার ১৯০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার লেগ-থিয়োরি চালিয়েছিলেন সাফল্যের সঙ্গে।জার্ডিনও সাফল্য চাইছেন।আর একদিন,লন্ডনে এক হোটেলে সান্ধ্যভোজের সময় লারউড,ভোস,আর্থার কার এবং জার্ডিনের চার মাথা ঝুকে পড়েছিল টেবিলে।মতলব হোল একান্তে,হিসেব হোল নানা তথ্যের,ফার্গুসনের স্কোর বইখানা খুঁটিয়ে যাচাই করা হোল নানাভাবে,পরিশেষে সিদ্ধান্ত হোল-পন্সফোর্ড,উডফুল এবং ব্রাডম্যান কোম্পানিকে স্বাভাবিক সময়ের বহু পূর্বে ফেরত পাঠাতে হবে প্যাভিলিয়নে।

  বডিলাইন বোলিং এর সৃষ্টি হোল।যার মূল কথা,লেগের দিকে ৬ থেকে ৮ জন লোক নিয়ে ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ্য করে ঠুকে প্রচন্ডতম সর্টপিচ বল পাঠানো হবে-যার বিরুদ্ধে যদি তুমি ব্যাট ধরে দাঁড়িয়ে থাক,মাথা বা বুক ফেটে মরবে,যদি গা বাঁচাতে ব্যাট তোল তাহলে তোমার হাতের ব্যাট খসে যাবে কিংবা ক্যাচ উঠবে,আর যদি সরে যাও লেগের দিকে,সেক্ষেত্রে পরের বলটি এসে সোজা উইকেট উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে।অর্থাৎ এগিয়ে বা পিছিয়ে যে কোন ক্ষেত্রেই তুমি নির্বংশের বংশধর।

  উডফুল,ওল্ডফিল্ড টিট হলেন বলের ধাক্কায়,পন্সফোর্ড সরে পড়লেন প্রাণের দায়ে,অতিপ্রাকৃত ব্রাডম্যান নেমে এলেন প্রাকৃত পর্যায়ে।ব্রাডম্যানের এভারেজ নামল একশ থেকে পঞ্চাশে।

  অস্ট্রেলিয়ানদের এতটা সয়নি।জার্ডিন দল নিয়ে আসছেন শোনা যেতে অস্ট্রেলিয়ানরা মুখে একটা ফুঁ শব্দ করে ঠোঁট উল্টে বলেছিল-তুশ্চু।তারপর বলেছিল-উড়িয়ে দেব।তারপরে বলেছিল-আরও কত কথা।অস্ট্রেলিয়ার জয়কে অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়ে বিরাট বাজি ধরা হয়েছিল।সেই সম্ভাবনার এমন ডিগবাজি!বাজিতে হার তো আছেই,তার উপর অস্ট্রেলিয়ানদের শোচনীয় পরাজয়ের অপমান।বিশ্বধন্য ব্রাডম্যান বিকট লাঞ্ছনা।ব্রাডম্যান ডবল তিনডবল সেঞ্চুরি করতে পারছেন না!কি ব্যাপার!অস্ট্রেলিয়ানরা এমন রেগে গিয়েছিলেন যে,অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড এম সি স্যার কাছে প্রথম যে তার পত্র পাঠিয়েছিলেন,(তৃতীয় টেস্টের পঞ্চম দিনে) তার মূল বয়ান ছিল,-হে মাতামহী,মামাদের আচরণে কুটুম্বিতার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে,মামাদের সামলাও।ব্যাপারটি বড় বেআইনি হচ্ছে,তোমার বোলাররা উইকেট ছেড়ে মানুষ শিকারে ব্যস্ত হয়েছে।

  এম সি সি উত্তর দিয়েছিলেন।সেই শীতল প্রতিবচনে অনেক কিছু ছিল।নিজ অধিনায়কের উপর আকুন্ঠ আস্থা,দলের সদস্যদের খেলোয়াড়ি মনোভাব সম্বন্ধে পূর্ণ শ্রদ্ধা,আইনের পরিবর্তন যদি অস্ট্রেলিয়ার কাম্য হয় সে বিষয়ে সুলিখিত সাজেসন আহ্বান এবং অস্ট্রেলিয়ান কতৃপক্ষের অসুবিধা হলে নিজেদের দল ফিরিয়ে আনার শান্ত প্রতিশ্রুতি,ইত্যাদি সুনিরবাচিত শব্দসমৃদ্ধ ব্রিটিশ আইনবোধ সেই প্রতি-তারবার্তার ছত্রে ছত্রে মুদ্রিত ছিল।

  শেষ পর্যন্ত বডিলাইন নিষিদ্ধ হয়েছিল।অস্ট্রেলিয়ান সংবাদপত্র ও দর্শকদের কোলাহলে নয়,অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের তার-স্বরে নয়,স্যার জ্যাক হবস বা জার্ডিনের দলের ম্যানেজার স্যার পেলহ্যাম ওয়ার্নারের পরবর্তী প্রতিবাদের পর্যন্ত নয়-বস্তটি নিষিদ্ধ হোল যখন ওল্ড ট্রাফোর্ড মাঠে  ১৯৩৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান লিয়ারী কন্সটাইনের বডিলাইন বল জার্ডিনের গালে হাওয়া লাগিয়ে চলে গেল এবং হ্যামন্ডের চিবুক দিল দু ফাঁক করে।জার্ডিন যদিও ভয় পাননি,এম সি সি কতৃপক্ষ ভয় পেয়েছিলেন।ওল্ড ট্রাফোর্ড মাঠের পিচ যথেষ্ট মন্থরগতি,তাতেই এই!ইংল্যান্ডের কাউন্টি ম্যাচেও বডিলাইনের তোড়জোড় চলছে,সিডনির রাস্তায় অস্ট্রেলিয়ান ছোড়ারা বডিলাইন প্রাক্টিশ করছে।গোটা আষ্টেক ক্রিকেত-টুপি একসঙ্গে মিলিয়ে শিরস্ত্রাণ করে খেলতে নেমেছেন হেন্ড্রেন।হ্যামন্ড বললেন,এরকম চললে-ক্রিকেট!তোমারে করি নমস্কার।

  অনেকগুলো বছর ছেড়ে দেওয়া যাক।১৯৪৮ সাল।মিলারের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিয়েছেন হাটন।মিলার বললেন,লেন আমাকে অপছন্দ করে কেন বুঝতে পারি না।৮ বছর পরে ১৯৫৬ সালে লেন হাটন বল্লেন,কিথ!সেদিন তোমার সাথে মৌখিক ভদ্রতা রাখা সম্ভব ছিল না।তোমাকে পছন্দ করার পক্ষে তুমি অনেক ভাল বোলার ছিলে।তুমি এবং লিন্ডওয়াল আমার জীবন নরক করে দিয়েছিলে।

  যুদ্ধের সময় দুর্ঘটনার জন্য হাটনের বাঁ হাত ছোট হয়ে গিয়েছিল।সেই দুর্বল হাতের উপর মিলার লিন্ডওয়াল বাম্পারের পর বাম্পার ছেড়েছেন।হাটন বেদনাস্নিগ্ধ কণ্ঠে বলেছেন,আমার ইচ্ছা করে শয়নঘরে তিনজনের ছবি টাঙিয়ে রাখি-মিলার,লিন্ডওয়াল ও রামধীনের-আমার বহু বিনিদ্র রজনীর স্মারকরূপে।

  ১৯৩২-৩৩ সালে বডিলাইনের প্রত্যুত্তর দেবার মত কোন দ্রুত বোলার ছিল না অস্ট্রেলিয়ার।ইংল্যান্ড এক তরফা পিটিয়ে এল অস্ট্রেলিয়াকে।১৯৪৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারদের তুলনায় ইংল্যান্ডের দ্রুত বোলাররা ছিল শান্তি ও সৌভ্রাত্রের অভ্রান্ত প্রতীক।সুতরাং ইংল্যান্ড বিচূর্ণ।ইংল্যান্ডের লোক চেঁচাল-বডিলাইন!বেশ জোরেই-ইংল্যান্ডের সৌজন্যের পক্ষে।ব্রাডম্যান হাসলেন।না,আইন তিনি ভাঙেননি।মিলার লিন্ডওয়ালের বাম্পার সংখ্যায় যতই হোক উইকেটের উপর ছিল এবং লেগের দিকে লোক ছিল না বেশী।একবার বললেন,কি করব ছেলেগুলোকে সামলাতে পারি না।কিন্ত মনে মনে তৃপ্ত হলেন;১৬ বছর কেটে গেলেও ব্রাডম্যান বডিলাইনকে ভোলেননি।ব্রাডম্যান কিছুই ভোলেন না।

  মিলারের বিরুদ্ধে যখন লারউডের গাঁয়ের লোক চেঁচাল বিশ্রীভাবে,মিলার তখন হাত ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিলেন,সর্টপিচ বাম্পার এইভাবে ঠেঙাতে হয়।পরে লিখে জানালেন সাংবাদিকরূপে-বাম্পার ফাস্ট বোলারের ন্যায্য অধিকার।

  মিলার যখন কম্পটন-হাটনের বিরুদ্ধে বাউন্সার ছাড়ছিলেন এবং লারউডের দেশভাইরা ভয়ানকভাবে আপত্তি করছিল,তখন মাইকে বেজেছিল কতৃপক্ষের অনুরোধ ও সাবধানবাণী,-তোমরা কার বিরুদ্ধে চেঁচাচ্ছ,-অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে-যারা নাজী-নিধনে আমাদের সহযোগী?-ছি!

  ক্রিকেটে রাজনীতি।বডিলাইন সিরিজের সময়ও রাজনীতি এসেছিল।উপরমহলে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।সাম্রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক ইত্যাদি কথা তার মধ্যে ছিল।আর রাজনীতি এসেছিল যখন ১৯৫৩-৫৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে লেন হাটন দল নিয়ে গিয়েছিলেন।সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সদ্য ঘটনাকে সূত্র করেই বডিলাইন-বাউন্সারের বিস্তৃততর কাহিনীতে প্রবেশ করেছিলুম।ক্রিকেট মাঠের কুরুক্ষেত্রই আমার উপজীব্য।আবার পুরাতন প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

  ২৯ শে জানুয়ারি ১৯৬০ তারিখে সংবাদপত্রে সংবাদ বেরিয়েছে-আম্পায়ার লী,হোল এবং ওয়াটসনকে অভিসন্ধিমূলক বোলিঙয়ের জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন।

  ওয়েসলি হোল যে,বোলিং এর সময় নাতিভদ্র ও উদ্দামপ্রকৃতি,গত বছর ভারতবর্ষে আমরা র]তার প্রমাণ পেয়েছি।বীমারের মত বর্বর বল(জোরালো ফুল্টস বল,যা ব্যাটসম্যানকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়) হোল ছেড়েছিলেন ভারতের ইউনিভার্সিটির ছোকরাদের উপরও।টেস্ট ম্যাচে তো কথাই নেই।সেই হোল ইংল্যান্ড খেলোয়াড়দের আক্রমণ করবেন,সন্দেহ নেই।কিন্ত তবু হল-ওয়াটসনদের অসহিষ্ণুতার পিছনে বোধহয় আরও কিছু ইতিহাস আছে।

  ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনেক দিন পরে তাদের ফাস্ট বোলারদের ফিরে পেয়েছে।

যুদ্ধের পরে ১৯৫০ সালে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটে হঠাৎ আলোর ঝলকানি এল,তখন কিন্ত সেই সুবিখ্যাত দলে কোন উচ্চ শ্রেণীর ফাস্ট বোলার ছিল না।যাদুকর রামাধীন এবং সহকারী ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ডকে ইঁদুর খেলিয়েছিলেন,-সে কিন্ত স্পিন বলে।নেভিল কার্ডাস একবার অসতর্কভাবে বলেছিলেন-ধীর বোলার জন্মাতে হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কয়েক জন্ম ঘুরতে হবে।কন্সটাইন,ফ্রান্সিস,গ্রিফিথ,মার্টিনডেল,ক্লার্ক,জর্জ জন,হাইন্সজন-ইত্যাদি ফাস্ট বোলারের দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য তাঁর মনে ছিল।পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্রুত বোলার কন্সটাইন যদিও নিজের নাতিদ্রুত স্পিন বলের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে কার্ডাসের উক্তির প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন,আসল প্রতিবাদ কিন্ত এসেছে পৃথিবীর দুই বিস্ময় বোলার,স্পিনার রামাধীন ও ভ্যালেন্টাইনের কাছ থেকেও।

  ১৯৫১-৫২ সালে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের দুর্বলতা প্রকট হয়ে পড়ল।দলে পরমাশ্চর্য ধীর বোলার আছে।নেই উচ্চ শ্রেণীর কোন ফাস্ট বোলার।আম্পায়ারের অনুমতি নিয়ে মাটিতে বল ঘষে বলের পালিশ উঠিয়ে অধিনায়ক গর্ডাড রামাধীন ভ্যালেন্টাইনকে দিয়ে বল করিয়েছিলেন;কিন্ত অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারেরা ভেঙ্গে দিয়েছিল বাম্পারে ও ইয়র্কারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটসম্যানদের শরীর ও উইকেট।

  ১৯৫৩-৫৪ সালে ইংল্যান্ড গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজে।তখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজে প্রথম শ্রেণীর ফাস্ট বোলার নেই।অথচ খুবই প্রয়োজন কারণ প্রতিশোধ চাই।ট্রুম্যান মার দিয়েছেন জর্জ হেডলিকে।

  ইয়র্কশায়ারের এক চাষাড়ে ছেলের নাম ফ্রেডি ট্রুম্যান।যেমন লম্বা চওড়া চেহারা,তেমনি মেজাজ।ট্রুম্যানকে পেয়ে হাটন আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন-এতদিনে পেয়েছি!অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারদের গোলা খেয়ে খেয়ে হাটনের মন বিষিয়ে ছিল,সত্যিকার ফাস্ট বোলিং দিয়ে ইংল্যান্ডের আক্রমণ শুরু করতে চাইছিলেন।খুশী হলেন ট্রুম্যান-স্ট্যাথামকে পেয়ে।বেডসার যত বড় বোলারই হোক,যথেষ্ট ফাস্ট নয়।বেডসার ওয়েস্ট ইন্ডিজ না যেতে হাটনের স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল।ট্রুম্যানের মধ্যে(হাটনের ভাষায়)যথার্থ ফাস্ট বোলারের গুণ আছে।সে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে ব্যক্তিগত শত্রু মনে করে।

  ১৯৫৩-৫৪ সালে হাটনের দলে একদিকে ছিল এই উদ্ধত উগ্র ট্রুম্যান,অন্যদিকে প্রতিপক্ষে ছিলেন জাতির গৌরব জনশ্রদ্ধেয় জর্জ হেডলি।হেডলিকে জ্যামাইকার লোক এমন ভালবাসে যে,রাজা জর্জ বলে ডাকে;হাজার পাউন্ড চাঁদা তুলে ইংল্যান্ড থেকে আনিয়েছে এম সি স্যার বিপক্ষে খেলার জন্য।নেট প্র্যাক্টিসের সময় হেডলির জনপ্রিয়তার প্রমাণ পেল ইংরেজরা।হাজার হাজার কালা আদমি বিদেশিদের খেলা দেখছিল নেটে,-হঠাৎ সব শূন্য,সকলে উধাও,-দেখা গেল ব্যাট ঘোরাতে ঘোরাতে হেডলি নামছেন।সকলে ছুটছে সেদিকে।

  সেই হেডলির গায়ে গিয়ে লাগল ট্রুম্যানের সর্ট-পিচ বল।মাঠের মধ্যে আহত হেডলির শুশ্রূষায় ডাক্তারেরা ছুটে এল।এই অভূতপূর্ব দৃশ্যে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক নতুন কিছু দেখার সুখবোধ করলেন মাত্র কিন্ত ট্রুম্যানকে সমঝালেন না।মাঠের সবাই যখন হেডলির সাহায্যে ব্যস্ত,তখন ট্রুম্যান আমিও বাঁ কম কি ভঙ্গিতে উল্টোমুখ উপেক্ষা ভরে দাঁড়িয়ে রইলেন।হাটন স্নেহভরে বলছেন,তা বলে তোমরা মনে করো না যে,ট্রুম্যানের মনে কম লেগেছিল।ও বাইরে নিজেকে প্রকাশ করে না।

  ট্রুম্যানের বাম্পারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ জমা হোল ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান দর্শকদের মনে।টনি লকের অঙ্গভঙ্গিকে ঘৃণা করল তারা।ইংরেজ অধিনায়ক লেন হাটনের নানা আচরণ সম্বন্ধে নানা কথা রটতে লাগল সর্বত্র।নিজেদের শ্বেতচর্ম অধিনায়ক স্টলমায়ারের সম্বন্ধে বিষিয়ে রইল তাদের মন।এবং আম্পায়ারের নির্দেশ যখন প্রতিকূলে যেতে লাগল,ক্ষেপে গেল একেবারে।

  ১৯৫৩-৫৪ সালে টেস্টে জনতার উপদ্রব থেকে বাঁচবার জন্য স্টল্মায়ারের বাড়তি পুলিশের ব্যবস্থা করেছিলেন,এবং চতুর্থ টেস্টের জন্য সামরিক বাহিনী তলব করার প্রয়োজন হয়েছিল।প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছিল ৪১৭।ইংল্যান্ড মাত্র ১৭০।স্টল্মায়ার ফলো অন করাননি ইংল্যান্ডকে।দর্শকেরা সেটা পছন্দ না।আগে থেকেই তারা রেগে আছে।প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হোল্ট ৯৪ রানের মাথায় বার্কের সিদ্ধান্তে এল বি হয়ে যান।দর্শকেরা চটে গিয়ে বলল,যখন সেঞ্চুরির ৬ রান বাকি তখন আউট দিয়ে দেওয়া?আম্পায়ার বার্কের স্ত্রী মাঠে ছিলেন পুত্র সহ।তাঁদের আদ্যশ্রাদ্ধ করল দর্শকেরা।ব্রিটিশ গিয়েনায় চতুর্থ টেস্টের সময় ব্যাপারে চরম পৌঁছল।হাটনের কোথায় আম্পায়ার করা হয়েছিল গ্রাউন্ডস্ম্যান মেঞ্জিসকে।তিন দিন বেশ কাটল,গোলমাল বাধল চতুর্থ দিনে।ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যাকওয়াট ৫৪ রান করে রান আউট হলেন মেঞ্জিসের সিদ্ধান্তে।ম্যাকওয়াট-হোল্টের সহযোগিতায় হয়েছে হয়েছে ৯৯ রান,জুটি ১০০ রান করতে পারবে কিনা এ নিয়ে বাজি ধরা হয়েছে-এমন সময় ৯৯ রানের মাথায় ম্যাকওয়াটকে রান আউট দেওয়া!

  পিটার মে বেড়ার ধার থেকে তৎপরতার সঙ্গে বল ছুঁড়ে দিলেন,যার জন্য ম্যাকওয়াট রান আউট হয়েছিলেন;দর্শকেরা অধিকতর তৎপরতার সঙ্গে লেবু,বাক্স,কাঠের টুকরা,বোতল ছুঁড়ল পিটার মের মাথায়।মে যখন মাঠের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে এলেন,তখন তাঁর মুখের অবস্থা-হাটন বলেছেন-জীবনে ভুলব না।

  হঠাৎ দেখা গেল আম্পায়ার মেঞ্জিস প্যাভিলিয়নের দিকে ধাবমান।হাটন চিৎকার করে নিজের খেলোয়াড়দের বললেন,মেঞ্জিসকে থামাও!উইলি ওয়াটসন মেঞ্জিস্কে পাকড়ে আনলেন মাঠের ভিতরে।ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা ভরসা দিল-আমাদের শরীরে যতক্ষণ রক্ত আছে-ইত্যাদি।ব্রিটিশ গিয়েনার গভর্নর এসে বললেন,অবস্থা আয়ত্তের অতীত,খেলা বন্ধ রাখ।ইংরেজরা গররাজি,খেলা তাদের অনুকূলে।

  সেদিনের খেলা শেষে অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল-টেস্ট আম্পায়ার মেঞ্জিসের প্যাভিলিয়ন পানে দৌড়-যে দৌড় ম্যাকওয়াটকে ধার দিলে সে রান আউট হোত না এবং গোলমালও বাঁধত না।

  ১৯৫৩-৫৪ সালে ব্রিটিশ গিয়েনার গভর্নর বলেছিলেন,অবস্থা আয়ত্তের অতীত।কিন্ত শেষ পর্যন্ত কিছু ঘটেনি।সে জিনিস ঘটল ১৯৬০ সালে।অবস্থা সত্যই আয়ত্তের অতীত হয়ে খেলা বন্ধ হয়ে গেল সমাপ্তির ৭৩ মিনিট আগে।পূর্বে বহুবার অবস্থা বিস্ফোরণের কাছে গিয়েও সামলে গিয়েছে।যেমন বডিলাইন সিরিজের সময় অস্ট্রেলিয়ায়,যখন উডফুল আহত হয়েছিলেন।তেমনিভাবে হেডলিও আঘাত পেয়েছিলেন ট্রুম্যানের বলে।ইংরেজ খেলোয়াড়ও আহত হয়েছে-তাদের কম্পটন,হাটন,এড্রিচ,ওয়াসব্রুক;মিলার-লিন্ডওয়ালের বলে।তবে ইংরেজ দর্শক চেঁচামেচির বেশী কিছু করেনি।অন্য দেশের দর্শক এতখানি সংযত নয়।তাই এবার যখন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ফাস্ট বোলারেরা ট্রুম্যানের বাম্পারের বাঁ ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডে তাদের পরাজয়ের শোধ তুলতে চাইল,অবস্থা তখনি ভিতরে ভিতরে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।দুপক্ষই বাম্পার ছাড়ছে যৎপরোনাস্তি।কিন্তু খেলায় যদি অবিরত বাম্পার বৃষ্টি হয়,তাহলে খেলোয়াড় ভদ্রভাবে খেলবে কি করে?ট্রুম্যানের শিক্ষাদাতা আচার্য লিওনার্ড হাটনের স্বীকারোক্তিই ধরা যাক, “কোন মানুষের পক্ষে কিভাবে সুস্থ ও সুখী মনে টেস্ট বোলারের বলে খেলা সম্ভব হবে,যদি সে ভাবতে থাকে,ঐ বলটা আমাকে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠাতে পারে,যেমন ঘটেছিল আমার ক্ষেত্রে ১৯৩৮ সালে সাউথ আফ্রিকায়?”

  অথচ স্যার লিওনার্ডের চিরপোষিত আকাঙ্ক্ষা-যথার্থ ফাস্ট বোলার দিয়ে দলের আক্রমণ সূচনা করতে হবে!যদি ফাস্ট বোলারদের প্রাধান্য দিতে হয় খেলায়,তাহলে তাদের মনোভাবকেও প্রশ্রয় দিতে হবে;বাম্পারকে ফাস্ট বোলারেরা নিজেদের রক্তশোষা পরিশ্রমের দ্বারা সৃষ্ট প্রয়োজনীয় দৈত্য মনে করে থাকে।

  বাম্পারের বিকারে বিষাক্ত হয়ে ওঠে দর্শকের মন।বিষাক্ত মন দর্শক উত্তরোত্তর স্বীকার চায়।সেই ক্ষুধার মনোমত তৃপ্তি না হলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় মাঠে।অধিকাংশ সময় ভদ্রতাবোধ তাকে বেঁধে রাখে।ওয়েস্ট ইন্ডিজে ভদ্রতার বাঁধন ছিঁড়ে গেছিল সেদিন।

  তাছাড়া বাজি ধরা তো আছেই।ক্রিকেট মাঠের কদর্য বস্তু ঐ জুয়া!ক্রিকেটের মহান অনিশ্চয়্তার লোলুপ ব্যবহার।১৯৩২-৩৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার দর্শকেরা দুর্বল ইংল্যান্ডের শোচনীয় পরাজয়ের পক্ষে নিশ্চিন্ত চিত্তে বাজি ধরেছিল।লারউড-জার্ডিন মহা চাকা ঘুরিয়ে দিলেন সম্পূর্ণভাবে।অনুমান করতে পারছি,১৯৬০ সালে অস্ট্রেলিয়া বিধ্বস্ত ইংল্যান্ডের পরাজয় ধ্রুব ধরে নিয়ে বড় বাজি ধরা হয়েছিল।বাজির হার বেড়েছে প্রথম টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ম্যারাথন ব্যাটিং দেখে।সেক্ষেত্রে একশ রানের মধ্যে যদি ওয়েস্ট ইন্ডিজের পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় এবং সেই সময়ে স্থানীয় তারকা চরণ সিংকে শূন্য রানে রান-আউট দিয়ে দেওয়া হয়!

   আরও একটা কথা আছে,আপনারা জানেন তা,সেই বেদনার কথা সবশেষে নিবেদন করছি।ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা ভুলতে পারেনি ইংরেজদের কাছে তাদের পরাধীনতা।শ্বেতাঙ্গদের প্রভুত্ব।ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ছিলেন অলেকজান্ডার,ওরেল নন।যে বর্ণ বিদ্বেষ সাউথ আফ্রিকায় আছে নারকীয় রূপে,ওয়েস্ট ইন্ডিজে তারই সংবৃত রূপ।ভাল খেললেও কালো ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানকে বহু সময় সাদা লোককে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়;কালো লোকগুলো দরিদ্র,ভালো কথা বলতে জানে না,তাদের প্যান্ট যথেষ্ট সাদা নয়,টেবিলে বিশ্রী ব্যবহার করে।এদের নিয়ে গিয়ে মহারাণীর সঙ্গে করমর্দন-অ্যাঁ?এইসব নিয়ে দুঃখ করে গেছেন সুবিখ্যাত লিয়ারী কন্সটানটাইন।জীবনে গাঁয়ের রঙের জন্য তাঁকে বহু কিছু সহ্য করতে হয়েছে।এই সুমহান ক্রিকেটারের শেষ কামনা ছিল-তিনি মরবার আগে দেখে যাবেন একজন কালো লোক ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাপ্টেন হয়েছে।ওরেল ভারতভ্রমণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাপ্টেন হয়েছিলেন,আসতে পারেননি;ওয়েস্ট ইন্ডিজে তাঁকে দলে স্থান দেওয়া হোল,অধিনায়ক করা হোল না কেন?

  আর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা বোধহয় ভুলতে পারেননি ইংল্যান্ডের নটিংহিলের পাষণ্ড ছোকরাগুলোর কথা।সেই সাদা চামড়া ক্ষুদে শয়তানগুলো ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের জানলা গলিয়ে বোমা ফেলেছে,বাড়ীর মেয়েদের করেছে অপমান।

  খেলা থেকে রাজনীতি দূরে যাক,দূরে থাক।তবু অপমানিতের জ্বালা যায় না।আমি এখনো যে কোন ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড হারলে খুশী হই কেন?

  তাহলে জুয়া,বর্ণবিদ্বেষ অ বাম্পার-পোর্ট অব স্পেনের অবাঞ্ছিত ব্যাপারের মূলে।ক্রিকেটের তিন শত্রু।জুয়ার অভিশাপ থেকে ক্রিকেট(এবং সকল খেলাধুলা) কিভাবে মুক্তি পাবে জানি না,বিশেষত জুয়াই যখন ঘোড়দৌড়ের রূপে ইংল্যান্ডের রাজকীয় খেলা,কিন্ত বর্ণবিদ্বেষ ও বাম্পার বিভীষিকা থেকে মানুষের মুক্তির দু একটি ঘটনার কথা আমার জানা আছে।

  ভদ্রস্বভাব ইংরেজ টেস্ট খেলোয়াড়টি মনেপ্রানে ঘৃণা করেছিলেন বর্ণসংকর ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়টি।মিশ্রবর্ণ ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানটির ধারনা ছিল সে খাঁটি সায়েব।তাই তাঁর নিজের দলের কোন কোন খেলোয়াড়ের সঙ্গে যখন কোন কোন ইংরেজ খেলোয়াড়ের কিছু কিছু খিটিমিটি হোল মাঠে,তখন সে মরমে মরে গিয়ে জনৈক ইংরেজ খেলোয়াড়কে বলল-সত্যি আমি বড় দুঃখিত।এই নিগ্রোগুলো জঘন্য ব্যবহার করে।কিভাবে যে আপনাদের জানাব,-আমরা,সাদা লোকেরা-অদের কোনদিন সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারলুম না!মিশ্র ব্যক্তিটি এমন জোরে কথাগুলি বললেন যে,তাঁর সব কটি কথা অমিশ্র ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান শুদ্ধ মাঠের সকলের কানে গেল।ইংরেজ খেলোয়াড় গভীর ঘৃণায় তিক্তভাবে বলেছেন-কী জঘন্য মর্বিডিটি।

  এই মর্বিডিটি থেকে মুক্ত ছিলেন ইংরেজ খেলোয়াড়টি।এই মর্বিডিটি থেকে মুক্তির অন্য ক্ষেত্রও আছে।১৯৪৫ সালে ইংল্যান্ডে যখন কমনওয়েলথ একাদশ গঠিত হোল,তখন কমনওয়েলথের সাদা কালো সকলে মিলে ক্রিকেটের একটি গৌরবময় কৃষ্ণবর্ণকে নির্বাচন করেছিল অধিনায়করূপে-তাঁর নাম লিয়ারী কন্সটানটাইন।

   আগুন যে আগুন নেভায় তেমন একটি কাহিনী মনে পড়ছে বাম্পার প্রসঙ্গে।সেখানেও কন্সটানটাইন।

  ১৯২৮ সাল।কন্সটান্টাইনের মধ্যাহ্ন রৌদ্রের দিন।যথেচ্ছ করছেন ব্যাটে বলে।বল দিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছেন উইকেট প্যাঁকাটির মত,ব্যাট ধরে বল উড়িয়ে দিচ্ছেন গ্রাউন্ডস্ট্যান্ডের ছাতের উপর দিয়ে।এই বছর ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজে বড় মন কষাকষি।কন্সটান্টাইনের প্রাণপ্রাচুর্য ফেটে পড়ছে লেগের দিকে বাম্পারে।হ্যামন্ডের উপর কন্সটানটাইনের বিশেষ আক্রোশ।দুই দল খুবই উত্তপ্ত।এমন সময় এল ফোকস্টোন ফেস্টিভ্যাল ম্যাচ।সকলে ভাবল বজ্রপাতসহ ঝড়বৃষ্টি অনিবার্য।

  ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমে ব্যাট করল,পড়ে ইংল্যান্ড।দুদলই দুদলের খেলোয়াড়দের রক্তশুন্য করতে সচেষ্ট হোল।

  দ্বিতীয় ইনিংসে ইংরেজপক্ষ ‘কৃষ্ণপক্ষ’ কন্সটানটাইনের কাছ থেকে পলায়নে ব্যস্ত রইল।ওয়াট ও লী গেলেন,এলেন হ্যামন্ড।আজ কিন্ত হ্যামন্ডের নয়,কন্সটানটাইনের দিন।ইংল্যান্ড-শ্রেষ্ঠ ওয়েস্ট ইন্ডিজ-শ্রেষ্ঠের কাছে পরাভূত হয়ে ফিরে গেলেন।

  এমন সময় দেখা গেল প্যাভিলিয়নে থেকে ফ্রাঙ্ক উলীর সুদীর্ঘ সুচ্ছন্দ মূর্তি।মনোভাব ভয়াভ রকম চড়ে আছে।বিশ্রী একটা কিছু ঘটতে পারে।বিশেষত উলী যখন ফাস্ট বোলিং এর পরোয়া করেন না।মার খেলে কন্সটানটাইন হয়ত খেপে যাবেন।কতৃপক্ষ চিন্তিত।

   উলী ঠিক তাই করলেন।আগুনের গোলার মত বলে ব্যাট লাগাতে লাগলেন অলস ভঙ্গিতে।বোলারের মাথার উপর দিয়ে বল উড়ে গেল,ছুটে গেল লেগের দিক দিয়ে,অফের দিকে পালিয়ে গেল প্রাণপণে।ব্যাটে বলে দাঙ্গা বেঁধে গেল যেন।চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ধরে গেল দর্শকের।মার খেলে বন্য হয়ে ওঠে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা।সকলে ভাবল কী না কি ঘটে!ঠিক এই সময়ে বেরিয়ে এল যথার্থ খেলোয়াড়ী খেলোয়াড়-ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের নিজস্ব রূপ।তারা উপভোগ করতে লাগল সাহসের সৌন্দর্য,মারের সুষমা।তাদের হাত থেকে জয় ফস্কে যাচ্ছে,তবুও।তারা অদ্ভুত বল করল,চমকপ্রদ ফিল্ডিং করল,আর খেলা থেকে নিঃশেষে মুছে দিল মনোমালিন্যের শেষ চিহ্নটুকু।উলী তিন ঘণ্টায় ১৫০ রান করলেন,ইংল্যান্ড জিতল চার উইকেটে।উলী মাঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন-ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রা জয়ধ্বনি করল সমস্বরে।

  আরও একটি ছবি-পোর্ট অব স্পেনের মাঠের যে আটাশ হাজার দর্শক বোতল ছুঁড়েছে,বেড়া ভেঙে মাঠে ঢুকেছে,তারাই,যখন খেলার ষষ্ঠ দিনে ২৫৬ রানে জয়লাভ করে ইংল্যান্ড মাঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছে,তখন-

  “ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ইনিংস যখনই শেষ হইল,তখনই দেখা গেল দর্শকদের গ্যালারীতে রীতিমত নৃত্যোৎসব আরম্ভ হইয়া গিয়াছে।এমন কি ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়গণ যতক্ষণ পর্যন্ত প্যাভিলিয়নে না ফিরিয়া গিয়াছিলেন,ততক্ষণ দর্শকগণের করতালি ও আনন্দ উল্লাসে আকাশ বাতাস মুখরিত হইতেছিল।”

  শেষ কথা,মানুষের বিকার দিয়ে মানুষের বিচার যেন না হয় পৃথিবীতে।

Category : বই
Share this post