অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌

খেলাধুলা ডেস্ক
অক্টোবর ১৬, ২০১৬
সবচেয়ে ভূগোল-ভাঙা খেলার নাম ক্রিকেট সবচেয়ে ভূগোল-ভাঙা খেলার নাম ক্রিকেট

সবচেয়ে ভূগোল-ভাঙা খেলার নাম ক্রিকেট। যে কোন দেশের ক্রিকেটারকে ভালবাসতে পারে যে কোন দেশের ক্রীড়া-প্রেমিক। তাই বলে ভালবাসার সময়ে ‘ভিতরে সবার সমান রাঙা’ বলে ছাল ছাড়িয়ে ভালবাসবে না। মানুষটা কালো হলে কালো রেখেই তাকে ভালবাসবে। যদি ঢ্যাঙা হয়, পা ছেঁটে ছোট করবে না,কিংবা বেঁটে হলে তাকে টানে লম্বা ক’রে তবে গলা জড়াবে না। ভারতীয় ক্রিকেটারকে ইংরেজ গ্রহণ করবে তাঁর ভারতীয়ত্বের সঙ্গে; অস্ট্রেলিয়ানকে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান বরণ করবে তার মধ্যে অস্ট্রেলীয় প্রতিভার বিকাশ দেখেই। একটিমাত্র গোভার ট্রেনিং স্কুলে সারা পৃথিবীর খেলোয়াড়দের ঢুকিয়ে দিলে তারা বড়জোর ভালো গোভারিয়ান হবে,কিন্ত গ্রেট ক্রিকেটার হতে পারবে না।

তাই রসিকজনে ক্রিকেটে স্থানীয় রঙের পক্ষপাতী। সে রসবোধ সকলের থাকা উচিত। শ্রেষ্ঠ শিল্প হোল লোকশিল্প। ট্রেনিং স্কুল,কপি বুক থেকে আসে পাইকারি উৎপাদন, জিনিয়াস সম্ভব হয় নিয়মভাঙা নিয়মের নির্মানসাধনায়।

আগেই বলেছি, ইংরেজদের স্বভাব যেখানে ক্রিকেটে ফুটেছে সেখানে বলা হয় টিপিক্যাল ইংলিশ। অস্ট্রেলিয়ানদের স্বভাব সম্বন্ধে একটা কথা চালু হয়েছে ইংরেজ সমালোচকমহলে-অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌। ঐ কথাটি আমি ১৯৫৯-১৯৬০ সালে ভারত সফররত অস্ট্রেলিয়ানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলুম একটি রচনায়। স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। কানপুর টেস্টে অস্ট্রেলিয়ানরা নিদারুণ হেরেছিল, পরবর্তী বোম্বাই টেস্টে সহজেই ড্র করেছিল ভারত। আহত ব্যাঘ্র প্রবাদমত প্রতিশোধ নিতে পারেনি। এমনকি ছোকরা ভারতীয় ক্রিকেটাররা পর্যন্ত বোর্ড সভাপতির একাদশের পক্ষে স্বচ্ছন্দে খেলে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান অস্ত্রচালনার বিরুদ্ধে। আমি কিন্তু ভারতের সেই প্রতিঘাতের সাফল্যকে কিছুতে সহজ মনে গ্রহণ করতে পারিনি। কেবলই মনে হচ্ছিল-অস্ট্রেলিয়ান সংকোচনের পিছনে একটা কিছু আছে, এমন কোন দংশন, যার দাঁতের চেহারাটা আমরা যেন চেষ্টা করেও ধরতে পারছি না। আমার সেই বিচিত্র মানসিকতার মুলে ছিল দুর্বলতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব-স্বদেশীয় ক্রিকেট সম্বন্ধে পরাভূতের ধারনা। আমার সেই অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌ রচনাটির ভিতরকার উদ্দেশ্য ছিল অস্ট্রেলিয়াকে নয় ভারতকে সতর্ক করা।

অস্ট্রেলিয়ানদের সম্বন্ধে এ ধারণা কি শুধু আমার?-

“যখন ইংলন্ড সুনিশ্চিত জয়ের মুখে তখনো আমরা অস্ট্রেলিয়ার রুখে দাঁড়ানোর আশংকা করি-নিজ দলকে বাঁচানোর ক্ষমতা যে কোন অস্ট্রেলিয়ানের আছে। আর যখন অস্ট্রেলিয়ানেরা চড়ে আছে মাথায়,তখন আমরা মনে প্রাণে অনুভব করি-এখনো,এই অবস্থাতেও,এরা এক মুহূর্তের জন্যও রাশ আলগা করবে না।”

 এরই নাম ‘অস্ট্রেলীয়তা’-ক্রিকেটে।ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ দান। অস্ট্রেলিয়ান দল তার বোলারদের ব্যাটিঙয়ের জন্য বিখ্যাত। তার নাম ক্যাঙ্গারুর লেজ ঝাপট। তারা যে তাদের ব্যাটসম্যান ব্যাটিঙয়ের জন্য বিখ্যাত ,তা না বললেও চলবে।সেটা হোল অস্ট্রেলিয়ান সিংহর থাবা।আর তারা বিখ্যাত তাদের ফিল্ডিঙয়ের জন্য। সব জড়িয়ে অস্ট্রেলীয়তার জন্য।

অস্ট্রেলীয়তার লক্ষণ আবার জানানো যাক।ইংরেজরা সে বস্তর স্বভাবনির্ধারণে অধিকারী,কারণ হাড়ে হাড়ে তাকে চিনেছে।–

“অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌ মানে হোল জয়লাভের জন্য কঠিন স্থির সংরাম,আইনের মধ্যে থেকেই সে সংগ্রাম,কিন্ত যদি প্রয়োজন হয়,আইনের সুযোগ নিয়ে সে সংগ্রাম।অসম্ভব যেখানে মানুষের শারীবসামর্থ্যের মধ্যেই বাস করছে।এমন অস্ট্রেলিয়ান আছেন যারা বিশ্বাস করেন,ঐ অসম্ভব বস্তটা তাঁরা ঘটাতে পারেন-এবং সত্যই এত বেশিবার তাঁরা সে জিনিস ঘটিয়েছেন যে,আমরা সবিস্ময়ে ভাবি,এদের কাছে সত্যিই অসম্ভব বলে কিছু আছে কিনা।অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌ কথার অর্থ-অস্ট্রেলিয়ানরা কখনো একটি ম্যাচ হারেনি-বিশেষত টেস্ট ম্যাচে-যে পর্যন্ত না তাদের শেষ রানটি খাতায় লেখা হয়েছে কিংবা তাদের শেষ উইকেটটি পড়েছে।”

জন আর্লটের ঐ কথাগুলো মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ ১৯৫৮ সালে স্যার লিওনার্ড হাটনের লিখিত আর্তনাদ। লেন হাটন বিশ বছরের উপর যথার্থ গৌরবের সঙ্গে ব্যাট ধরে মাঠে কাটিয়েছেন। জীবনে বহু ভাল খেলা দেখেছেন,-আশ্চর্য ব্যাটিং-বোলিং এর মতই দেখেছেন বহু অবিশ্বাস্য ফিল্ডিং। তবু ১৯৫৮-৫৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে অস্ট্রেলিয়ানদের কান্ড দেখে তাঁকে ভাল করে চোখ রগড়ে নিতে হয়েছিল। তাঁর বিস্ময়ের আর্তনাদ আমার মনে পড়ছে। এরা কি অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু রাখবে না? নিখুঁত লেগ গ্লাসকেও চান্সে পরিণত করে সুযোগ সন্ধানীর মত তাকে গ্রহণ করবে। শ্রীযুক্ত হাটন রঞ্জিকে পর্যন্ত সাবধান করে দিয়েছিলেন-এই সব ছোকরা অস্ট্রেলিয়ানদের পাল্লায় পড়লে তোমাকে আর লেগ গ্লান্সের মহাশিল্পীর গৌরব জোগাড় করতে হোত না।

ভারতের মাঠে ১৯৫৯-৬০ মরশুমে অস্ট্রেলিয়ানরা নিয়মিত ক্যাচ ফসকাচ্ছেন। বিশেষত হার্ভে।

অথচ দুহাত যার সমানে চলে এমন মানুষের দৃষ্টান্ত এতদিন জানতাম প্রাচীন ভারতে সব্যসাচী অর্জুন, আধুনিক ভারতে অফিস কর্মচারী এবং অস্ট্রেলিয়ায় শ্লিপ ফিল্ডসম্যান। অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যেও সেরা একজন-নীল হার্ভে।

হার্ভে ক্যাচ ফসকেছেন এবং পঙ্কজ রায় বাউন্ডারীর পর বাউন্ডারী মেরেছেন অস্ট্রেলিয়ানদের মুখের সামনে ব্যাট চালিয়ে। কি বিচিত্র! ঐ মরশুমে দিল্লী টেস্টে ৯৯ রানের মাথায় পঙ্কজ বেনোড আউট করেছিলেন টিপিক্যাল অস্ট্রেলিয়ান ভঙ্গিতে, নিরেনব্বুইর অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ব্যাটের মুখে লোক দাঁড় করিয়ে। তারপর ১৯৬০ সালের ৫ই জানুয়ারি আসন্ন সন্ধ্যার আচ্ছন্ন আলোয় চশ্মাধারি পঙ্কজ রায় ৯৯ মিনিটে ৫৫ রান করেছেন এবং যখন বেনোড পঙ্কজের সামনে লোক টেনে আনলেন দৌরাত্মের সংস্কারবশে, তখন পঙ্কজ মেকিফের বলে জোরালো পুল করেছেন ফিল্ডসম্যানকে চমকে দিয়ে।

অস্ট্রেলিয়ানরা কিন্ত এত সহজে চমকান না। সেই কথা বলতেই এই লেখা। সিড বার্ণয় বললেন,-স্মিথ তোমাকে তো বলেছিলুম,আমাকে উড়িয়ে দিতে পারবে না।

স্মিথ হতভম্ব,বলটা সিড বার্ণসের হাতের মুঠোয়।

ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৪৮ সালের এক সোমবারে,ইংলন্ডে। এসেক্সের বিরুদ্ধে ব্রাডম্যানের অস্ট্রেলিয়া একদিনে করল ৭২১ রান, পৃথিবীর রেকর্ড। খেলতে নেমে মিলারের ভয়াবহ বোলিঙয়ে খাবি খেতে শুরু করল অচিরে।রে স্মিথ ব্যাট করতে এলেন, বোর্ডে পঞ্চাশ রানও ওঠেনি। সিলি সিড অনে বার্ন্স থাবা মেলে দাঁড়িয়ে-এত কাছে যে, স্মিথ ব্যাট বাড়ালে ও বার্ণস হাত বাড়ালে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যাবে।স্মিথ পরোয়া করার পাত্র নন।নেমেই বাউন্ডারী-বার্ণসের কানের পাশ দিয়ে বুলেট বেরিয়ে গেল।কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে বার্ণস বললেন-তুমি কিন্ত আমাকে উড়িয়ে দিতে পারবে না।

গম্ভীর,আত্মস্থ,কড়াচোখ বার্ণস দাঁড়িয়ে রইলেন পূর্বৎ।টোসাকের বলে স্মিথ একটা হাফ ভলিকে আবার চালালেন বার্ণসের পায়ের উপর-পায়ে ধাক্কা খেয়ে বল চলে গেল বাউন্ডারীতে।বার্ণস কথাটি বললেন না।স্মিথ ২৫ রান করেছেন-আবার পেলেন টোসাকের কাছ থেকে হাফ ভলি।এই সুযোগ-আত্মঘাতী ফিল্ডারটিকে ভাগাবার-অবাঞ্ছিত,বিরক্তিকর,আপত্তিকর লোকটা!স্মিথ ব্যাটের ডান্ডা ঘুরিয়ে সোজা বলটিকে চালিয়ে দিলেন বার্ণসের উপর।বার্ণস দুহাত দিয়ে বল আটকাতে গেলেন-হাত শুদ্ধ বল দুম করে বুকে ধাক্কা দিল-বুকে ধাক্কা খেয়ে বল ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে-বার্ণস ডান হাত বাড়িয়ে ছো মেরে খামচে ধরলেন বলটিকে।রে স্মিথ-কট বার্ণস-বোল্ড টোসাক-২৫।স্মিথ শুধু চেয়ে রইলেন।বার্ণস মধুর হেসে বললেন,-বলেছিলুম তো তোমাকে-।

  এর নাম অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌।

  ১৯৪৮ সালে একদিন লন্ডন সহরের ট্যাক্সিতে দুই বিখ্যাত ব্যাক্তির স্মরণীয় কথাবার্তা হয়েছিল।

  ব্রাডম্যানঃ বুঝলে সিড,হাটন হোল আমাদের পয়লা নম্বরের শত্রু।তাকে আমাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া যায় না,কি বল?

  সিড বার্ণসঃ না,তা তো নয়ই।

  ব্রাডম্যানঃ মনে হয় খুব কাছে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করলে তাঁর মনোনিবেশ নষ্ট করা যায়,তুমি তা পারবে কি?

  বার্ণসঃ মনে হয় পারব।

  ব্রাডম্যানঃ কত কাছে দাঁড়াতে হবে ভেবে দেখেছ কি?

  বার্ণসঃ হাটন আমাকে উড়িয়ে দিতে পারবে না।

  ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌কে ব্রাডম্যানই পুষ্ট ও পরিবর্ধিত করে গেছেন।১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বলতে ব্রাডম্যানের ক্রিকেট।বাকি সকলে এগারো জনের একজন।

  ডেনিস কম্পটনের সহযোগী বিল এড্রিচ বল্লেন,আমি ডন ব্রাডম্যানের মত অধিনায়কের বিরুদ্ধে খেলতে পছন্দ করি না।আমি এমন একজনের বিরুদ্ধে খেলতে ভালবাসি যিনি খেলাকে খেলা মনে করেন।আমি ডনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষবশে একথা বলছি না।ডন আমার দেখা শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান ও শ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন।কিন্ত তবু চাই না।এটা নিজস্ব রুচির ব্যাপার।

  এড্রিচ অবশ্য নিজ রুচির পক্ষে কারণ দেখিয়েছেন;বলেছেন,-অস্ট্রেলিয়ানরা বাইরে যতই স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি করুক,তারা ক্রিকেট খেলে না হালকা মনে।ক্রিকেটে ‘কঠিন মন’, ‘ভয়াবহ প্রতিযোগিতা’ এবং আপোষহীন জিগীষা তারা এনেছে।আর এই তিক্ততার মূলে রয়েছে ডন ব্রাডম্যানের বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।এ রকম হতে বাধ্য।ডন ব্রাডম্যানের মত চূড়ান্তভাবে বিরাট ব্যাটসম্যান,যিনি প্রতিভায় সমসাময়িকদের প্রভূত উর্দ্ধে,যিনি প্রত্যেক টেস্ট বোলারের লক্ষ্যস্থল,প্রত্যেক ফিল্ডারের বিবেচনার বস্ত,প্রত্যেক ক্যামেরার বিষয়দৃশ্য,প্রতি ক্রিকেট সমালোচকের আকর্ষনকেন্দ্র,মাঠে বা মাঠের বাইরে যার মুখ নির্গত প্রতিটি শব্দ শোনা হবে,শোনানো হবে,বাড়ানো,বাঁকানো,এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বানানো পর্যন্ত হবে,-তিনি যদি কিছু চতুর,আত্মসচেতন,স্পর্শচকিত হয়ে ওঠেন,তাতে আশ্চর্যের কিছু থাকে না।এ সকল কথাই উদারভাবে স্বীকার করেছেন বিল এড্রিচ।তবু ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন,যে কোন দেশের তুলনায় ১৯৪৫ সালের পরে অস্ট্রেলিয়া জয়লাভের জন্য অনেক বেশী পরিমাণে নির্মমতা ও নিরাবেগ জয়লিপ্সা দেখিয়েছে-পারস্পরিক সুস্থ সুখী সম্পর্কের প্রতি তারা কোনোরূপ আগ্রহ দেখায়নি।

  অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌ রূপ নির্ধারণ করতে ব্রাডম্যান প্রসঙ্গ এসে গিয়েছিল স্বতঃই,কারণ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ পঁচিশ বছরের বছরের একছত্র অধিপতি ছিলেন এই ব্রাডম্যান।অস্ট্রেলিয়ান মনোভাবের গুণ-দোষের দায়িত্ব ব্রাডম্যানকে নিতেই হবে।টেস্টম্যাচ যে খেলার যুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তাতে সন্দেহ কোথায়?আমরা চিন্তিত মনে চিন্তা করছি কোনটা পরিমাণে বেশী-খেলাটা না যুদ্ধটা?ক্রিকেটের যথার্থ কুরুক্ষেত্র ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে।দীর্ঘায়ত তা উদ্যোগ পর্ব্ব।অস্ট্রেলিয়া থেকে ইংল্যান্ড লোক যাচ্ছে এবং ইংল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়ায়।ব্যবসায়ী,রাজকর্মচারী,ছাত্র,ভ্রমণকারী।সকলে এসে হেডকোয়ার্টারে সংবাদ দিচ্ছে।অস্ট্রেলিয়ায় খবর পৌঁছল-অমুক কাউন্টির অমুক ছোকরা এখন উঠতি।ওধারে ইংল্যান্ড কানখাড়া করে শুনল-শেফিল্ড শিল্ডে যে খেলা খেলছে সেই ঢ্যাঙা ছেলেটি!বসে গেল পাকা মাথা গোল হয়ে গোলটেবিলের চারিধারে।সামনে ছড়ানো সংবাদের টুকরো,স্কোরবুকের পাতা।পরিকল্পনা রচিত হয়ে চলল।যার মূল কথা,অমুক ছোকরার ভ্রমরের প্রাণ অমুক দুর্বলতায়,সেখানে চাপ দাও;অমুক খোকার একিলিসের গোড়ালি অমুক লোভে,সেখানে খোঁচাও।ের নাম টেস্ট ক্রিকেট।এ ব্যাপারে ইংল্যান্ড কিছু পিছিয়ে নেই অস্ট্রেলিয়ার থেকে।তবু যেহেতু ইংল্যান্ড পেরে উঠছে না,তাই গাল দিয়ে বলছে,ও বস্ত অস্ট্রেলিয়ার সৃষ্টি-ঐ,যার নাম অস্ট্রেলীয়তা।

  ইংল্যান্ডের অস্ট্রেলীয়তার দৃষ্টান্ত প্রচুর দেওয়া যায়।বিদগ্ধ পাঠকের নিশ্চয় মনে পড়বে ক্রিকেটের বিখ্যাততমের চক্রান্তের কথা।আমি বডিলাইন-মতলবের কথাই বলছি।সেই চক্রবাহ্যের নির্মান ও পরিণাম ক্রিকেটের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়।সে সব কথা এখন বাদ থাকতে পারে।অস্ট্রেলিয়ার প্রসঙ্গে নিবন্ধ থাকাই ভাল।ঠিক বর্তমানে আমাদের মনে পড়ছে ব্রাডম্যানের দুটি ধমক,একটি কটাক্ষ এবং একটি চীৎকারের কথা।

  ওল্ডফিল্ডকে ধমক দিলেন ব্রাডম্যান ১৯২৯ সালে।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উইকেটকিপার ওল্ডফিল্ড তখনি বিখ্যাত খেলোয়াড়।ব্রাডম্যান হলেন বাউলারের এক আনকোরা ১৯ বছরের ছোকরা।এডিলেডে চতুর্থ টেস্টের ঘটনা।তাঁর আগে অস্ট্রেলিয়া পর পর তিনটি হেরেছে।প্রথম টেস্টের পর ব্রাডম্যান দল থেকে বাদ পড়ে আবার এই টেস্টে দল্ভুক্ত হয়েছেন।খেলায় শেষের দিকে অবস্থা দাঁড়াল,যদি চতুর্থ ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া তিনশোর উপর রান করতে পারে তাহলে জিতবে।জ্যাকসন রাইডার কিপ্যাক্স আউট।তরুণ ব্রাডম্যান অদ্ভুতভাবে নিজের দলকে টেনে তুলেছেন;৫৮ রান করেছেন;বোলিং সম্পূর্ন আয়ত্তে।তাঁর সহযোগী অভিজ্ঞ ওল্ডফিল্ডও সুন্দর খেলছেন।এহেন সময়ে ওল্ডফিল্ড ওভারের শেষ বলে বেশী ব্যস্ত হয়ে রান নেবার জন্য ডাক দিলেন।প্রাণপণে দৌড়েও ফুটখানেকের জন্য ব্রাডম্যান রান আউট হয়ে গেলেন।পরের উইকেটগুলো পড়ে গেল অল্পে।ইংল্যান্ড জিতল ১২ রানের ব্যবধানে।ওল্ডফিল্ড নট আউট ফিরলেন ড্রেসিংরুমে।সকলের মুক্ত অভিনন্দনের বর্ষণ হচ্ছে ওল্ডফিল্ডের উপর;এমন সময় একটা তীক্ষ্ম কণ্ঠ শোনা গেল-ও মারটায় কোন রান ছিল না;বিশেষত ওভারের শেষ বল।আপনার উচিত ছিল আত্মরক্ষা করে আমাকে খেলতে দেওয়া।

  ১৯৪৮ সালের লীডসের ড্রেসিংরুমে ব্রাডম্যানের ধমক খেল ১৮ বছরের বাচ্ছা ব্যাটসম্যান নীল হার্ভে।সেঞ্চুরি করে হার্ভে ফিরেছেন।অস্ট্রেলিয়াকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন হার্ভে।আনন্দে গর্বে গৌরবে টগবগ করছে ছেলেটি,-অধিনায়ক ব্রাডম্যান বললেন,-বাজেভাবে মেরে তোমার আউট হওয়া উচিত হয়নি।আমাদের এখনও রান দরকার।

  এ বছরই লর্ডসে মিলারের দিকে একবার কড়া চোখে তাকালেন ব্রাডম্যান।তারপর বলটা তুলে দিলেন জন্সটনের হাতে।ব্রাডম্যান দেওয়া সত্ত্বেও মিলার বল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

  করবার কারণ ছিল।প্রথম টেস্টে লিন্ডওয়াল আহত থাকায় দু ইনিংসে মোট ৬৩ ওভার বল করতে হয়েছিল মিলারকে,ফাস্ট বোলারের পক্ষে ভয়াবহ কাজ।ফলে ব্যাটিংয়ে গোল্লা করলেন প্রথম ইনিংসে;যা সবচেয়ে অপছন্দ করেন।দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করার প্রয়োজন হয়নি।পরের টেস্টে আবার নাগাড় বোলিং। ক্লান্ত বিরক্ত মিলার বিদ্রোহ করে বল ফিরিয়ে দিলেন স্কিপারের হাতে।ব্রাডম্যান শুধু স্থিরভাবে চেয়েছিলেন।

   ফিরিয়ে দেওয়া বল মিলারকে নিজে চেয়ে নিতে হয়েছিল।

   স্কিপার ব্রাডম্যান গালি থেকে দুহাত তুলে বিকট হাঁক পাড়লেন-হাউজ্‌ দ্যাট?এল বি আবেদন!১৯৪৬-৪৭ সালের টেস্ট মরশুম।কম্পটন ব্যাট করছিলেন।লেগ স্ট্যাম্পের অন্তত ৬ ইঞ্চি বাইরে পিচ খেয়েছে যে বল,তাতে এল বীর আবেদন করল সারা মাঠ,ব্রাডম্যানও বাদ গেলেন না।

  এড্রিচ ছিলেন অপরপ্রান্তে।ওভারের শেষে ব্রাডম্যানের কাছে গিয়ে বললেন,-‘আবেদন জানাবার উপযুক্ত জায়গায় তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে বটে।’

  ব্রাডম্যান একগাল হেসে বললেন,-‘বিল,আমি কিন্ত ভেবেছিলাম নির্ঘাত আউট’।

  অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটকে দুহাতে মানুষ করেছেন এই ব্রাডম্যান।অস্ট্রেলিয়ানরা লড়তে ভালবাসে,জিততে ভালবাসে,হারতে ঘৃণা করে।আইনের সব সুযোগ এরা নেয়।মাঠের এগারো জন খেলোয়াড়ের দ্বারা এলবি আবেদন নিষিদ্ধ নয়,সুতরাং একসঙ্গে পিলে চমকানোর বিচারের আর্জি জানায়।বলা বাহুল্য এইভাবে তা করার উদ্দেশ্য আম্পায়ারকে প্রভাবিত করা।

   কিন্ত কাদা থেকে কামান তৈরি হয় না।যা ছিল না তাকে ব্রাডম্যানও তৈরি করতে পারেন না।অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিন ধরে সুসংঘটিত সৈন্যদলরূপে তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।অস্ট্রেলিয়ানরা যখন বিদেশ যান তখন তাঁরা রাষ্ট্র-প্রতিনিধি নিশ্চয়ই,কিন্ত কেবল পান-ভোজন-করমর্দনের রাষ্ট্রদূত নন।১৯৩৪ সালে স্কুল মাষ্টার উডফুল ছিলেন ইংল্যান্ডে সফরকারী অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক।কদর্য বডিলাইন সিরিজের পরের সিরিজ সেটি।সামাজিকতার ব্যাপারে উডফুলকে সাবধান হতে হয়েছিল।এমন সাবধান হয়েছিলেন যে,তাঁর ‘সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ’ এবং ‘প্রকাশের জন্য নয়’ নীতি বিখ্যাত হয়ে আছে।স্কুল মাষ্টারের নিশ্ছিদ্র কঠোরতা নিয়ে উডফুল দলের সদস্যদের পাহারা দিতেন,এবং কড়াভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন,বাইরের কারো কাছে মুখটি খুলবে না।একদা স্বয়ং মহামান্য পঞ্চম জর্জ করমর্দন করার পরে জনৈক ছোকরা অস্ট্রেলিয়ানকে কিছু প্রশ্ন করলেন।বিব্রত বালকটি আমতা আমতা করে বলল,-আজ্ঞে স্যার,যা বলছি তা কিন্ত প্রকাশের জন্য নয়।

  রাজা জর্জ অট্টহাস্য করে অবস্থা সামলেছিলেন।

 অস্ত্রেলিয়ানিজমে কিন্ত ব্রাডম্যানের সময়েই ফাটল ধরেছিল।১৯৩৮ সালের ওরিলি ব্যাটের ডগায় দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করতে চাননি ব্রাডম্যানের আদেশ সত্ত্বেও।১৯৪৮ সালে মিলার ব্রাডম্যানকে বল ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।মিলার বেপরোয়া বুনো ঘোড়া।মিলারকে বশে রাখতে প্রখর বুদ্ধি,ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভাযুক্ত ব্রাডম্যানকে পর্যন্ত বেগ পেতে হয়েছিল,শেষ পর্যন্ত একমাত্র ব্রাডম্যানই পেরেছিলেন,যতটা পারা সম্ভব।মিলার ছিলেন ব্রাডম্যানের হাতের অস্ত্র।কিন্ত অস্ত্রের নিজস্ব একটা মন ছিল।মিলার আত্মনিবেদিত প্রতিভা নন।১৯৪৮ সালে অধিনায়ক ব্রাডম্যান চেয়েছিলেন,অপরাজিত থাকব।কেবল অপরাজিত থাকার মধ্যে মিলার কোন গৌরব খুঁজে পাননি।ব্রাডম্যান চেয়েছিলেন,যতগুলো খেলায় পারি জিতব।মিলারের কাছে জিতলে চমতকার,হারলে-হারলেই বা;খেলাটাই মজা।মিলার চেয়েছিলেন ব্যাট করতে,ব্রাডম্যানের থেকেও ভালভাবে।ব্রাডম্যান চাইলেন মিলার বল করে যাক।খেলার সময় প্রতিপক্ষ সম্বন্ধে ব্রাডম্যানের কোন দয়াধর্ম ছিল না,ছোট বড় সকলকেই চূড়ান্তভাবে হারাতে হবে।মিলার ছিলেন শক্তের শত্রু এবং দুর্বলের প্রতি অনুকম্পাসম্পন্ন।

  এসেক্সের সঙ্গে যে খেলাটির কথা আগে বলেছি,যাতে অস্ট্রেলিয়া ৬ ঘণ্টায় ৭২১ রান,গর্বের সঙ্গে সে খেলার বিবরণ দিতে গিয়ে ব্রাডম্যান ঈষৎ দুঃখ জানিয়েছেন-হায়!তবু মিলার সে খেলায় কিছু করতে পারেনি,যে মিলার রানের ঝড় তুলতে পারে।

  ঘটনাটা হয়েছিল এই রকম।লাঞ্চের ঘন্টাখানেক পর অস্ট্রেলিয়ার হোল ২-৩৬৪।মিলারের ব্যাট করার ডাক এল।মিলার তখন ভাত ঘুমে আছেন।বললেন,আমি এখন যাচ্ছি না,যথেষ্ট রান হয়েছে,অন্য লোক যাক।–কি,যেতে হবে?আচ্ছা চল যাচ্ছি।ব্যাট কাঁধে তুলে হেলতে দুলতে মিলার চললেন;হেলাভরে উইকেটের সামনে দাঁড়ালেন;গার্ড পর্যন্ত নিলেন না।বেইলির প্রথম বল-বোল্ড।ফিরে গেলেন ব্যাট কাঁধে করে প্যাভিলিয়নে,বোধ হয় ঘুমের আমেজ ফিরিয়ে আনতে।

  চুলের কেশর ফুলিয়ে,কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে যে মিলার প্রতি বলের সঙ্গে সাবধান শব্দটি ছুঁড়ে দিতেন ব্যাটসম্যানদের দিকে,যে মিলার ছিলেন ব্রাডম্যানের অস্ত্রশালার অস্ত্রশ্রেষ্ঠ,সে মিলার অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌কে মানতে পারেননি মনের সঙ্গে।আর পারেননি ব্রাডম্যানের অনুগত সেবক নম্রস্বভাব পরবর্তী অধিনায়ক লিন্ডসে হ্যাসেট।১৯৩২ সালের দেহভেদী লারউডকে ব্রাডম্যান জাগিয়ে ছিলেন ১৯৪৮ সালে মিলার-লিন্ডওয়ালের মধ্যে।ঐ বছর ওভালের শেষ টেস্ট।হাটন-কম্পটন পার্টনারশিপ চলছে।লিন্ডওয়ালের বাম্পার কম্পটনের মাথা ফাটাতে লাফিয়ে উঠল।প্রাণ বাঁচাতে কম্পটন হাত উঁচু করলেন।হাতের ব্যাট ছিটকে বেরিয়ে গেল,বল বেরিয়ে গেল শ্লিপের পাশ দিয়ে।হাটন অপরপ্রান্ত থেকে রানের ডাক দিয়ে কম্পটনের প্রান্তে এসে উপস্থিত।বিভ্রান্ত কম্পটন বুঝতে পারেননি ঠিক কি ঘটেছে।যখন বুঝে ব্যাট কুড়িয়ে নিলেন তখন হাটন ও কম্পটন একদিকে দাঁড়িয়ে,অপর প্রান্ত শূন্য এবং থার্ডম্যান হ্যাসেটের হাতে বল।হ্যাসেট বল ছুঁড়লেন না।কম্পটন অপরদিকে দৌড়ে চলে গেলেন।

  বাউন্সারের বিরুদ্ধে হ্যাসেটের নীরব প্রতিবাদ।

  এহেন হ্যাসেট এবং মিলার ব্রাডম্যান উত্তর যুগে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের দায়িত্ব নিলেন।গড়ে ওঠা জিনিস ধ্বংস হতে যতটুকু সময় লাগে,অস্ট্রেলিয়ার অধঃপতনের জন্য ঠিক ততটুকু সময় লেগেছিল।অস্ট্রেলিয়ানিজমের বিলাপসঙ্গীত গেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটার সিড বার্ণস।

  ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার শেষ টেস্ট ম্যাচ।আগের চারটে টেস্ট ফলহীন গেছে।পঞ্চম টেস্টের উপর সবকিছু নির্ভর।অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রানসঙ্খ্যার কাছে পৌঁছে গেছে ইংল্যান্ড।মস্ত একটা মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতের ক্ষণ।সমান হতে মাত্র তিন রান বাকি।এই সময় বেডসার জন্সটনের বল জোরে পেটালেন।মিলার ঠিকমত বলটা ধরতে পারলেন না।বলের গতি কিন্ত কমে গেল এবং গড়িয়ে যেতে লাগলো বাউন্ডারির দিকে।সে বলটা বাঁচানো যেত সহজে।মিলার সে চেষ্টা না করে সেদিকে ফিরে কোমরে দু’হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।ইতিমধ্যে মাঠ ফেটে পড়ল দর্শকের চিৎকারে।বেডসার দৌড়ে ৪ রান নিলেন।ইংল্যান্ড পেরিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রানসংখ্যা।

  দলের সংকটমুহূর্তে মিলার ভঙ্গি করে কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন।গভীর বিরাগে সিড বার্ণস বলেছেন-ও জিনিস মিলারকে তো করতেই হবে,কারণ মিলারের নাম যে থোড়াই-কেয়ার-মিলার।মিলার তো মাঠে খেলেন না,খেলেন গ্যালারিতে।

  পঞ্চম টেস্টের শেষ দিনে কম্পটনের পুশ করা একটা বল কুড়িয়ে নিয়ে ড্রপ কিক করে মিলার পাঠিয়ে দিলেন অধিনায়ক হ্যাসেটের দিকে।বলের কি গতি হোল ফিরেও তাকিয়ে দেখলেন না।অধিনায়ক হ্যাসেটকে কুড়িয়ে নিতে হোল বলটি।

  মিলার এবং হ্যাসেট-পৃথিবীর দুই শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়-অস্ট্রেলিয়ানিজমের শেষ করলেন ইংল্যান্ডের মাঠে।ইংল্যান্ডের পেশাদার অধিনায়ক হাটন দু’হাত তুলে চেঁচালেন,-বিশ বছরের লজ্জার শেষ!

  বিশ বছর পরে ইংল্যান্ড এসেজ উদ্ধার করল।

  অস্ট্রেলিয়া তলাতে তলাতে-একেবারে তলায়।

  রিচি বেনোড আবার অস্ট্রেলিয়াকে টেনে তুলেছেন।প্রতিভার তরুণ ঝলক হার্ভে এখন পরিণত হয়েছেন।ডন ব্রাডম্যানের ছায়া দেখা যাচ্ছে নর্ম্যান ও’নীলের মধ্যে।অস্ট্রেলিয়ানিজম্‌ মাথা তুলছে।লেন হাটনের আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ছে সংবাদপত্রের পাতায়।

  অস্ট্রেলিয়ার এই অস্ট্রেলীয়ত্বের মত ক্রিকেটে ভারতের নাকি ভারতীয়ত্ব নামে একটা জিনিস ছিল।যেমন ছিল হকিতে,যেমন ছিল ফুটবলে।ধ্যানচাঁদ ও সামাদের হাতের ও পায়ের লাঠি অচল হবার পরে ভারতের হকি ও ফুটবল তাঁর প্রাচ্য রহস্যময়তা হারিয়ে ফেলেছে,যেমন রঞ্জি-দলিপ-সি-কে-মুস্তাকের পরে ভারতীয় ক্রিকেট।রাজার দ্বারা পুষ্ট ভারতীয় ক্রিকেটে আগে ছিল রাজকীয় দানশীলতা ,অনেক সময়ে আত্মঘাতীও বটে,আজ সেখানে কাজ চালানো যোগ্যতার পায়ে প্রতিভা মাথা খুঁড়ছে।

  ক্রিকেটের ইন্ডিয়ানত্ব চলে গেছে,জেগে উঠেছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানত্ব।সারা পৃথিবী স্বীকার করেছে তাঁর মহিমা।ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা পেয়েছে ওয়েস্টের সংগ্রামশীলতা এবং ইন্ডিয়ার নিগূড় শক্তি।বিচিত্র এই খেলোয়াড় দেশটি,সে যে কখন নীচে এবং কখন উপরে তা বিধাতাও বাজি রেখে বলতে পারবেন না।তাঁরা এই মুহূর্তে হাসছে তো পর মুহূর্তে রাগছে।একই আবেগে তাঁরা গাল দিতে ও গান গাইতে পারে।

  আদিম জননী পৃথিবীর কয়েকটি আনন্দময় সন্তান ১৯৬০-৬১ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রান্তরভরা হৃদয়কে লুঠ করে নিয়েছে।ক্রিকেট শুরু হবার বহু বছর পরে ১৯৬০ সালে ব্রিসবেন মাঠে গ্রেটেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয়েছে।

  পৃথিবীর ক্রিকেটের সেই শুক্লপক্ষের ইতিহাস  এখন স্থগিত থাক।কৃষ্ণপক্ষের কথাই আলোচিত হোক।কতকগুলো কালো লোক তার স্রষ্টা।অস্ট্রেলিয়া কালোর আলো দেখেছে।ইংল্যান্ড দেখেছে কালোর কালো।

  কেন এমন হয়?কেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একরকম এবং সম্পুর্ন ভিন্ন রকম অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে?অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই নিরীহ নয়।নিষ্ঠুর আঘাতে তার জুড়ি নেই।তবু মনে হয়,অস্ট্রেলিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলায় যে স্পোর্টস আছে তা থাকে না ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলায়।দুই শক্তিশালী অমার্জিত প্রতিদ্বন্দ্বী ভয়াবহ লড়াইয়ের পরে হাতে হাতে মেলাতে পারে,অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারে বুকে,-সুসভ্যেরা সেক্ষেত্রে করমর্দন হয়ত করে কিন্ত দৃশ্য বা অদৃশ্য গ্লাভসটা হাতে পরেই তা করে।এরই নাম ক্রিকেট শব্দ কয়টি ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যে ব্যবধান উঁচু করে রেখেছে।ব্যবধানের কারণ আরও অনেক কিছু।বহু ব্যাপারে দুদেশের সম্পর্ক তিক্ত,সেটা ক্রমেই বেড়েছে।

Category : বই
Share on your Facebook
Share this post