খেলার রাজা

খেলাধুলা ডেস্ক
অক্টোবর ১৩, ২০১৬
শঙ্করীপ্রসাদ বসু শঙ্করীপ্রসাদ বসু

রমণীয় ক্রিকেট

 
 

শঙ্করীপ্রসাদ বসু

প্রথম প্রকাশ: ১৯৬১

বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যের একেবারে সূচনালগ্নের একটি বই ‘রমনীয় ক্রিকেট’। দুষ্প্রাপ্য এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় চুম্বকের মতো টেনে ধরে, ক্রিকেটকে করে তোলে রোমান্টিক এক উপন্যাস। ‘বাংলার নেভিল কারডাস’ ডাকনামের শঙ্করীপ্রসাদ বসুর এই বইটি পড়ুন ধারাবাহিকভাবে

 

কিস্তি-২

শ্রীযুক্ত বিনয় মুখোপাধ্যায় যখন ক্রিকেট সম্বন্ধে ‘খেলার রাজা’ শব্দ দুটি ব্যবহার করলেন,তখন আমরা সে কথাগুলিকে অবিলম্বে স্বীকার ক’রে নিলাম।শ্রীযুক্ত মুখোপাধ্যায় King of games- এর অনুবাদ করেছিলেন।অথচ অনুবাদ মনে হয়নি কারণ ক্রিকেট ইতিমধ্যেই খেলার রাজারুপে আমাদের মনোজগতে আসন নিয়েছে।

  ক্রিকেট আগে ছিল ‘রাজার খেলা’। এখন হোল ‘খেলার রাজা’।

ক্রিকেট যতদিন রাজার খেলা ততদিন তাঁর সঙ্গে আমাদের বিরোধ।ভারতের মাটি ও মাঠ থেকে রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে আমরা প্রাণপণ করেছি।রাজার খেলাকে খাতির করব কেন?কিন্ত যদি খেলার রাজা হয়?

  সে ক্ষেত্রে অবশ্য রাজদর্শনের জন্য লোকে সাধনা করতে পারে,যেমন কাছে শীতের রাত্তিরে ইডেন নামক রাজসভাগৃহের চার-পাশে লাইন দিয়ে। যারা রাত জেগে বসে আছে, তাদের কাউকে লর্ড বলে সন্দেহ হয় না। ক্রিকেট বিলাসের সৃষ্টি,ধনীর সাধ্য,আলস্যের আশ্রয়,এইসব নন্দে আর কেউ শুনছে না।ক্রিকেট রাস্তায় নেমেছে।কানা গলিতে ইট সাজিয়ে তক্তা-কাঠের ব্যাটে,টেনিস বলে ক্ষুদে ব্রাডম্যানেরা ক্রিকেট খেলছে।তারা খেলছে,কখনো মিলারের ঔদ্ধত্যে,কখনো জয়সীমার ধৈর্যে।তারপর তারা খবরের কাগজে তাদের হিরোদের কাহিনী পড়ছে।লাইন দিচ্ছে সারারাত,এবং টিকেট না পেলে ভিড় করছে গাছের ডালে কিংবা ল্যাম্প পোস্টের মাথায়;কিংবা তাও সম্ভব না হলে ইংরেজি-বাংলা রেডিও শুনে বীরবিক্রমে লাফাচ্ছে।ক্রিকেট যে রাজা-খেলা তাঁর অখণ্ডনীয় প্রমাণ,আমাদের ঘরের রজকন্যারা কাঁচা ও তাজা উপন্যাস ছেড়ে দুপুরে শুনছে বাংলায় ধারাবিবরণী।

  আমার পাঠক এতেই সন্তষ্ট হবেন না।ক্রিকেটের পক্ষে আরো কিছু দাবি করবেন।তাঁদের অতি প্রিয় ফুটবল আছে,যাতে রক্ত গরম হয়ে ওঠে;আছে হকি,যাতে ভারত সবে অদ্বিতীয়ত্ব ত্যাগ ক’রে দ্বিতীয় হয়েছে,আছে রাগবি,ভলি,বাস্কেট,বক্সিং।নৌকা চড়া,সাঁতার কাটা,দৌড়ানো(মাঠে বা বরফে),লাফানো-খেলার কি ইয়ত্তা আছে।এদের সকলকে ত্যাগ ক’রে ক্রিকেটকে শিরোপা দেওয়া?

  বলাবাহুল্য আপনারা সত্যই মারামারি-করা রাগবি,বলে ঘুষি-মারা ভলি কিংবা নাকে ঘুষি-মারা বক্সিং এর পক্ষে বেশী কিছু দাবি করছেন না। ‘নববাবুবিলাস’ টেনিস,বা ‘নববিবিবিলাস’ ব্যাডমিন্টনের সম্বন্ধেও বাড়াবাড়ি করা সম্ভব নয়।বাকি থাকছে হকি ও ফুটবল।হকিও বাদ দিন।ভারত খুব ভাল হকি খেলে এটা হকির সার্টিফিকেট হতে পারে না।ঐ কাঠিন্যটা ও লাঠিচালনা যখন জনচিত্ত হরণে অসমর্থ হয়েছে তখন ‘খেলার রাজা’ এই মহান উপাধি থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়াই ভাল।সুতরাং ফুটবল।ক্রিকেটের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী।ফুটবল সারা পৃথিবীর।জনপ্রিয়তায় ক্রিকেটের অগ্রগণ্য।ফুটবল মাতোয়ারা ক’রে তোলে।ফুটবল আগুন ছোটায়।খেলোয়াড়দের পায়ে আর গায়ে আগুন।সেই আগুন দর্শকদের বদনে ও বপুতে।

  পাঠক!এমন অগ্নিকান্ড ঘটায় যে-খেলা তাকে খেলার রাজা বলবেন?

  অন্যের নিন্দে থাক।বিপক্ষের বদ্‌গুণ অপেক্ষা স্বপক্ষের সদ্‌গুণের আলোচনায় বেশী ফললাভ।ক্রিকেট মহান খেলা কারণ ক্রিকেটের সাহিত্য আছে।সাহিত্যের মূলে থাকে জীবন।খেলার সাহিত্য যদি একমাত্র ক্রিকেটেরই থাকে,তাহলে বুঝতে হবে ক্রিকেটই সবচেয়ে জীবনময় খেলা।

  ফুটবলের চেয়েও?যে ফুটবল দমবন্ধ দৌড়ে প্রতি মুহুর্তে প্রমাণ করছে-আমি বেঁচে আছি। হাঁ। জীবন বলতে কেবল উত্তেজনা বোঝায় না।জীবন অনেক ব্যাপক।উত্তেজনা,আবেগ ও শান্তির নানারূপী বিন্যাস সেখানে। জীবনে আছে সূচনা ও সমাপ্তি। উভয়ের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনের তরঙ্গগতি।ক্রিকেট সেই খেলা।ক্রিকেট জীবনের ক্রীড়া-সংস্করণ।

  খুব সাহসী হয়ে মস্ত একটা দাবি উপস্থিত করেছি ক্রিকেটের সম্বন্ধে।প্রমাণ দিতে হবে। নিশ্চয়। ধরা যাক,এই খেলার ব্যাপ্তিকাল।কোন খেলাই এত বেশী সময় ধরে হয় না।সবচেয়ে কম ধরলে অন্তত অর্ধ দিন,বেশী ধরলে, খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। সাধারণ ভাবে তিন থেকে ছয় দিন। এই কাল দৈর্ঘ্য খেলাটিকে জীবন প্রকাশের উপযোগীরূপে প্রশস্ত করেছে।কিন্ত এই যে বেশকিছু সময়ের খেলা,এর মধ্যে কি স্থির বলে কিছু আছে?নিশ্চিন্ত কোনো সময়ে হওয়া যায়? ব্রাডম্যান ব্যাট ধরলে ‘ঘুমিয়ে নেওয়া যাক’ বলে চোখ বুজত যে বেরসিক ইংরেজ,-সেই ব্রাডম্যান শূন্য রানে বিদায় নিয়েছেন।কতবার শূন্য হাতে ফিরে গেছেন ডবলিউ জি গ্রেস। আবার অতিবড় আনাড়িও বারবার চান্স পেয়ে বড় স্কোর করেছে।হয়ত এক চুলের জন্য বল উইকেটে লাগেনি,বোলার মাথা চাপড়েছে।ব্যাটসম্যানের জামায় লেগে বল ঘুরে গিয়ে বল ‘বেল’ ফেলে চলে গেছে।এবার মাথা চাপড়েছে ব্যাটসম্যান।এরই নাম অনিশ্চয়তা।অপ্রত্যাশিতের অনুভূতির জন্য প্রস্তত মন নিয়ে বসে থাকতে হয় ক্রিকেট মাঠে।ক্রিকেটের প্রতিটি বল নতুন।

  বোলিং,ব্যাটিং,ফিল্ডিং,যে দিকেই তাকানো যাক না কেন,ঐ মহান অনিশ্চয়তাটা জ্বলজ্বল করছে।গুপ্তের বলে পরপর তিনটে ওভার-বাউন্ডারী হতে তাকে হাততালিতে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।আবার এমনও হয়েছে,ধরা যাক,দিনের শেষে তিন বলে তিনটে উইকেট পেয়েছেন।তখন খুশির হাততালিতে চেটোয় ফোস্‌কা।শিশিরভেজা মাঠে ফাদকার প্রথমবার বেল,দ্বিতীয়বার স্টাম্প ছিটকে ফেলে যে করতালির সংবর্ধনা পেয়েছেন,তা হাতেই শুকিয়ে গেছে যখন এক ওভারে ১৮ রান দিয়েছেন।মানকদকে না আনলে যত অধৈর্য,তেমনি আমাদের ইচ্ছামত উইকেট কুড়ুতে না পারলে সমান অসহিষ্ণু।ডলি ক্যাচ ফেলে যে খেলোয়াড় চাপা-দাঁতের গাল খেয়েছে,সে যখন রাশিয়ান সার্কাসের ডিগবাজি খেয়ে অবিশ্বাস্য ক্যাচ ধরেছে,তখনো পেয়েছে চাপা দাঁতের গাল,-তবে ভালবাসায় চর্বিত।তসে জিতেও যে ক্যাপ্টেন ব্যাটিং নেয়নি,প্রথম ওভারে ঝড়াঝড় দুটো উইকেট খসে পড়তে তাকে লাটের আসনে তুলেছি।কিন্তু তারপর যখন আর উইকেট না পড়ে দিনের শেষে দু’উইকেটে ৩২২ রান হয়েছে,তখন পারলে ক্যাপ্টেনকে ঠেঙিয়ে লাট ক’রে দিতুম।

  মাত্র অনিশ্চিত বললে ক্রিকেটের সম্বন্ধে সব কথা বলা হয় না।বেশ কিছু কমই বলা হয়।বলা হয় নাতকীয়।পরিবর্তন ও অনিশ্চয় নাটক সম্বন্ধে কিছু কথা।মূল কথা,গতি ও সংঘাতে চরিত্রের ও ঘটনার বিকাশ।তাঁর উপর নাটকে আছে নিয়তির প্রভাব।ক্রিকেটে সবই মিলবে।খেলাটি কোনো একটি স্থানে থেমে নেই। একেবারে সমাপ্ত নয় কখনো। সকল খেলায় একবারের জন্য একটি ইনিংস,ক্রিকেটে দুটি। ক্রিকেটের এখানে অদ্বিতীয়ত্ব।একজন ব্যাটসম্যান তার একটিমাত্র ভুলের জন্য বিদায় নিতে হতে পারে,অপরপক্ষে তেমনি গোটা দলটি আর একবার সুযোগ পায় সমবেত শক্তিপ্রমাণের।একদিকে অ-স্থিরতা,অন্যদিকে অতিরিক্ত সুযোগ।ফুটবল হোক,হকি হোক,যত খারাপই খেলুক,বসিয়ে দেয়া যায় না খেলোয়াড়কে,কিন্তু ব্যাটসম্যান খারাপ খেললেই সরে পড়তে হয় তাকে,এবং বোলার খারাপ বল দিলে অধিনায়ক তাকে সরিয়ে দেন বেড়ার ধারে।অথচ গোটা দল পাচ্ছে দ্বিতীয় ইনিংস,ব্যর্থতা সংশোধনের আর একটি সুযোগ।

  কেবল কি একটি খেলায় দুটি ইনিংস? দলকে আরও সুযোগ দেয় ক্রিকেট।টেস্ট ম্যাচ সিরিজ হিসাবে খেলা হয়।সিরিজের ফলাফলে ফলাফল।আজকের দিনে প্রচলিত পাঁচ টেস্টের সিরিজকে পঞ্চাঙ্ক নাটকের সঙ্গে তুলনা করা যায় সহজে।এখানেই শেষ নয়,এক মরশুমের একটি সিরিজের জন্য সাময়িকভাবে দর্শকে ব্যস্ত হলেও তার কাছে ক্রিকেটের শেষ হিসেব সব সিরিজ জড়িয়ে।ক্রিকেটের রেকর্ড।রেকর্ড ছাড়া ক্রিকেট নেই।ইতিহাসের পটভূমিকায় সব কিছুর বিচার হয় ক্রিকেটে। যেমনি বলব,এই দলটি শ্রেষ্ঠ,অমনি কথা উঠবে,এ ছাড়াও অনেক শ্রেষ্ঠ ছিল।যদি বলি এইটা সেরা খেলা,ইতিহাসের পাতা উল্টে রেকর্ড-রসিক জানাবেন,অমুক অমুক খেলার সম্বন্ধেও হাজির করা হয়েছিল একই দাবি।আপনি হয়ত বলে ফেললেন,এমন খেলোয়াড় হয়নি,অমনি কথা উঠল,সে কি কথা,ঐ ঐ খেলোয়াড়ের কথা মনে নেই বলেই এমন কথা বলতে পারছ।অর্থাৎ ব্রাডম্যানের ১৯৪৮ সালের অস্ট্রেলিয়ান দলকে শ্রেষ্ঠ বললে ১৮৯৮ ও ১৯০২ সালের ডার্লিং-এর দল,বা ১৯২১ সালের আর্মস্ট্রং-এর দলের যোগ্যাতার বিচার না করলে খুবই অন্যায় করব।১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসের অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রিসবেন টেস্টকে উচ্ছ্বাসের মাথায় সর্ব-কালের সেরা টেস্ট বলা চলে,কিন্ত ঠাণ্ডা মাথায় বলতে হলে অনেক কিছুকে হিসাবের মধ্যে আনতে হবে,অন্তত ‘গ্রেটেস্ট টেস্ট ম্যাচ’ রূপে বহুকথিত ১৮৮২ সালের ইঙ্গ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচের কথা ভোলা চলে না।তুমি বলছ মরিস বাঁ হাতের সেরা ব্যাটসম্যান,সে ক্ষেত্রে হার্ভের কথা তোমার নিশ্চয় মনে নেই।নিশ্চয় তুমি ফ্রাঙ্ক উলীর বাঁ গারফিল্ড সোবার্সের কথা কিছু সময়ের জন্য বিস্মৃত হয়েছ।

  ক্রিকেটকে তাই পর্যবেক্ষণ করতে হয় বৃহত্তর পটভূমিকায়। এর অন্য বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দেয়া যাক।পারিপার্শ্বিকের উপর এমন নির্ভরশীল খেলা আর নেই।তা না হয়ে হতে পারে না,যেহেতু ঘণ্টার পর ঘণ্টা,দিনের পর দিন খেলা হয়ে থাকে।খেলোয়াড়কে সচেতন থাকতে হয় দর্শক,মাঠ,আবহাওয়া,সব কিছু সম্বন্ধে।দর্শকেরও বিশেষ ভূমিকা আছে এই খেলায়।সে চেঁচিয়ে লাফিয়ে ব্যাটসম্যানকে ঘায়েল করতে পারে।এবং সে সর্বক্ষণ মানসিকভাবে সক্রিয় থাকে।ফুটবলের মত,খেলায় দর্শক উত্তেজনায় অবিরত নাচে,কিন্তু ক্রিকেট,যেখানে বোলার ধীর চিন্তা করছে আক্রমণের,ব্যাটসম্যান তৎপর হয়ে দ্রুত আত্মরক্ষা করছে,সেখানে খেলোয়াড়দের সঙ্গে দর্শকও চিন্তা করছে।উচিত অনুচিত সম্বন্ধে তারও একটা বক্তব্য আছে।উত্তেজনার কথা যদি বলতে হয়,ফুটবলাদির সঙ্গে ক্রিকেটের উত্তেজনার জাতের তফাৎ।যখন ঝটাপট উইকেট পড়ছে,বা রান উঠছে ঝড়ের বেগে,তখন চাঞ্চল্য ফুটবলের সমতুল কিন্ত সংঘাতে সংঘাতে এগিয়ে যখন খেলাটি চরমে পৌঁছয় তখনকার সে উদ্বেলতা ও উদ্বেগের একমাত্র তুলনা শ্রেষ্ঠ নাটকের শেষাঙ্কের সঙ্গে যেখানে অসহ্য আবেগে মথিত হয় দর্শকচিত্ত।ইতিহাসের দৃষ্টান্তের প্রয়োজন নেই,ক্রিকেট-দর্শক মাত্রেই অল্পাধিক পরিমাণে এ জিনিস দেখেছেন।

  ক্রিকেটের আরও কত বৈশিষ্ট্য,যেমন টস্‌।টস্‌ এখানে সত্যই টস্‌-টসে জেতার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে এবং এখানে অধিনায়ক সত্যই অধিনায়ক,ফুটবলের অধিনায়কের মত নিজ দলের খেলোয়াড়দের সহযোগী শান্তি-সেনা নয়।আবহাওয়ার এখানে বিশেষ বিবেচনা।বৃষ্টি বাঁ না-বৃষ্টি,জোর না ধীর বাতাস,রোদ চড়া,না কড়া ঠাণ্ডা-হাজার হিসেব।ভিজে বা শুখনো ছাড়াও মাঠে ঘাস আছে কি নেই,মাঠ শক্ত কি নরম,ভাঙা কি গোটা,ধুলো না বালি,-তার বিবেচনা।ক্রিকেটের আর একটি অসাধারণ জিনিস-ডিক্লারেশন।অসাধারণ একটি অধিকার।এই অধিকার পেয়ে অধিনায়ক তাঁর উপাধির যোগ্য হয়েছেন।টসে জিতে ব্যাটিং নেব কি ফিল্ডিং করব,কাকে কোথায় দাঁড় করাব,বল করবে কে,কখন,ও কি ধরণের,ব্যাটিং করতে নামবে ‘কেবা আগে কেবা পিছে’,-এ সব তো আছেই,-আরও আছে ঐ অপূর্ব অধিকারটি-ইচ্ছামত আমি আমার দলের খেলা শেষ করে দিতে পারি।খেলার মাত্রা প্রসারণ ও সংবরণের মারাত্মক দায়িত্ব।এ বস্ত যে কি চমকপ্রদ হতে পারে তার বহুল দৃষ্টান্তের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত মনে পড়েছে।১৯৩৪ সালের ইংলন্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজ টেস্ট ‘ছাড়াছাড়ির লড়াই’ নামে বিখ্যাত।ইংলন্ডের অধিনায়ক বব ওয়াট টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জঘন্য মাঠে ব্যাট করতে পাঠালেন।ওয়েস্ট ইন্ডিজ করল ১০২ রান।ইতিমধ্যে পিচ আরও খারাপ।ওয়াল্টার হ্যামন্ডের মত খেলোয়াড়(সর্বশ্রেণীর পিচে যাঁকে ব্রাডম্যানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলেন ইংরেজরা) বললেন-“আমার জীবনে এত খারাপ পিচ দেখিনি।কেউ বলতে পারবে না বল কোথায় যাবে।”ইংলন্ড খেলতে নামল।হ্যামন্ড তাঁর জীবনের “কঠিনতম ইনিংস” খেলে যখন ৪৫ রান করলেন,তখন তাঁর মনে হল “ইতিমধ্যে শত শত রান করেছি।”দলের যখন ৭ উইকেটে ৮১,ওয়াট ডিক্লেয়ার করলেন।ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক গ্রান্ট দ্বিতীয় ইনিংসে দলের খেলোয়াড়দের যথেচ্ছ পেটাতে বললেন।

  যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ করেছে ৬ উইকেটে ৫১,দান ছেড়ে দিলেন-ইংলন্ডের জয়ের জন্য ‘উদ্ভট রকমের সামান্য’ ৭১ রানের ব্যবধান রেখে।ইংলন্ড কি পারবে?পেরেছিল।“খুঁচিয়ে,ঠেকিয়ে,কঁকিয়ে,কুঁতিয়ে” শেষ পর্যন্ত ইংলন্ড জিতেছিল চার উইকেটে।

  ক্রিকেটের মহিমার আরও প্রমাণ দেয়া যায়।প্রধান প্রমাণ,এই হোল একমাত্র খেলা যেখানে ব্যক্তিনৈপুণ্য ও দলনৈপুণ্যের সমান সমান সমাদর।ফুটবল বা হকিতে দলনৈপুণ্য।কোন এক জন বা দু’জন খেলোয়াড় হকি-ফুটবলে জেতাতে পারে না।বাঁচাতেও পারে না।চান্সের কথা বাদ দিচ্ছি।সামাদ হয়ত একার প্রতিভায় একটি অসামান্য গোল দিতে পারেন,কিন্ত তার আগেই তাঁর দল চারটি গোল খেয়ে বসে আছে।ক্রিকেটও দলের খেলা এবং শেষ পর্যন্ত দলেরই জয়।কিন্ত অন্যদিকে ব্যক্তির কার্যকারিতা প্রমাণের এমন উপযোগী খেলাও নেই।একজন খেলোয়াড় হারাতে বা জেতাতে পারে ক্রিকেটে।তেমন অজস্র দৃষ্টান্ত আছে ক্রিকেট-ইতিহাসে।

  ক্রিকেটে ব্যক্তি-বিকাশের রূপ লক্ষ্য করা যাক।ব্যাটিং-পক্ষে মাত্র দুজন মাঠে হাজির।তারা লড়াই ক’রে যাচ্ছেন।কখনো তাঁদের ব্যাঘ্রবিক্রম,কখনো কূর্মপ্রস্থান।কখনো কলাপবিস্তার,কখনো গো-সহিষ্ণুতা।ভিজে মাঠে যে ঠেকা দিয়ে গেল,শুখন্ত মাঠে একবারও ব্যাট তুলল না,মরা মাঠে তার বেয়াড়া মারমুখী বীর্য।গতকাল সন্ধ্যার ঝোঁকে যে অন্তত আট বার কম আলোর আবেদন জানিয়েছে,আজ তেমনি বা ততোধিক আচ্ছন্ন আলোয় নিজের ২৮৮ রানের মাথায় সেই খেলোয়াড়ই ক্রীজ ছেড়ে লাফিয়ে ওভার বাউন্ডারী করেছে।ক্রিকেট-ম্যাচের তিন থেকে ছয় দিনে অনেক প্রাতের আবুহোসেনকে রাতের বাদশা,এবং পরবর্তী প্রাতে পুনশ্চ আবুহোসেন হতে দেখা গেছে।

  আবার যদি দলের খেলা রূপে ক্রিকেটকে দেখি। দেখব,কোন ভিমু মানকদ কিছু ক’রে উঠতে পারছেন না কারণ গোলাম আমেদ ও রুসী মোদীরা অবিরত ক্যাচ ছাড়ছেন।খেলায় ক্যাচ ফসকাবেই,তা অবধারিত,যেহেতু ক্যাচ পতনশীল,কিন্তু যদি ২৫ রানের মাথায় ব্রাডম্যানের ক্যাচ পড়ে?তাহলে দর্শকেরা নিশ্চিন্ত সেদিন।সেরা ক্রিকেট দেখা দর্শক ও ফিল্ডস্‌ম্যানের ললাটস্য লিখন।

  একটা ক্যাচ একটা ম্যাচের বরাত তৈরি ক’রে দিতে পারে।কয়েকটা ক্যাচ যেখানে এক হাত থেকে পড়ে,সেখানে ফিল্ডারের সাধকলক্ষণ,-হাতে জল থাকছে না।সে ক্ষেত্রে তাঁর ক্রিকেট খেলা ছেড়ে হিমালয়ে প্রস্থান করাই উচিত।

  ক্রিকেটে তাই কথা আছে-রান করে যদি রান না করতে পারো,রান বাঁচিয়ে তোমার দান পূরণ করে দাও।

  আবার জানেন কি,ক্যাচ ছেড়ে ফিল্ডার গৌরবভাজন হতে পারে?১৯২৬ সালে লীডস্‌ টেস্টে ম্যাকার্টনির যখন ২ রান,তখন আর্থারকার তাঁর ক্যাচ ছেড়েছিলেন।ইংলন্ডের ক্রিকেটের ধারাবাহিক দুর্দিন চলছে তখন।দর্শক এসেছে দলে দলে ইংলন্ডের জয়কামনা ক’রে।সেই পরিস্থিতিতে ক্যাচ ছাড়ার সৌভাগ্যে মুগ্ধ ম্যাকার্টনি লাঞ্চের মধ্যে সেঞ্চুরী করলেন মধ্যাহ্নবিরতির সময় চাঁই চাঁই কিংরেজ দর্শককে বলতে শোনা গেল-ঈশ্বরকে ধন্যবাদ,কার ঐ ক্যাচটি ছেড়েছিলেন!নইলে এ খেলা দেখতে পেতুম না!

  এ গেল ফিল্ডিং –পক্ষের কথা।ওদিকে যে দু’জন ব্যাটসম্যানকে মাঠে পাঠানো হয়েছে,তারা কি প্যাভিলিয়ন ছাড়ামাত্র স্বাধীন সন্তান?ধরা যাক মিলার-লিন্ডওয়াল বল করছেন।পূর্ব ইনিংসে তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু বাম্পার ছাড়া হয়েছিল।দু’জনে তাঁর প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর।এ হেন অবস্থায় যে-ছোকরা ক্যাপ্টেনের নির্দেশ,ম্যানেজারের আর্শীবাদ,দর্শকের করতালি বহন ক’রে মাঠে নামল,সে কি পাঁচ উইকেটে ৩৫ রানের পরেও ‘কার কি’ ভঙ্গিতে দর্শকদের এন্টারটেইনের দায়িত্ব নেবে,যেমন নিতেন মুস্তাক আলী বাঙালী দর্শকদের বৈপ্লবিক হাততালির মর্যাদা রাখতে প্রথম বলেই বাউন্ডারীর চেষ্টা করে?

  সেটা ক্রিকেট নয়।ক্রিকেট হবে না।ক্রিকেট যা-খুশী ব্যক্তিত্বের অপহারক,যা-প্রয়োজন ব্যক্তিত্বের ধারক।মানুষ যেমন সমাজবদ্ধ প্রাণী,সমাজে যেমন সে পাঁচ জনের একজন,খেলার মাঠে তেমনি ক্রিকেটার এগারো জনের একজন।

  ক্রিকেটের পক্ষে অনেক কথাই বললাম।তবু কিছুই বলা হল না।বলা হয়নি এই খেলায় স্টাইলের মূল্যের কথা।রেকর্ডের যেখানে এত সমাদর,সেখানে ‘স্কোরবোর্ড একটা গাধা’ বলবার মত রসিকতার সামর্থ্যের কথা।ক্রিকেটের পক্ষে এমনি পাতার পর পাতা লিখে যাওয়া যায়।সে সব কথা আর লিখব না,কারণ মেয়েদের মন,পুরুষের ভাগ্য ও ক্রিকেটের চরিত্র দেবতাও জানেন না,মানুষ তো ছার।বিভিন্ন জাতি এই খেলাকে বিভিন্ন ভাবে ভালবাসে।ইংরেজ বলে,-এ খেলা ‘টিপিক্যালি ইংলিশ’।অন্য কারো পক্ষে এর পূর্ণ রস পাওয়া সম্ভব নয়।ভারতীয়রা জানে ইংরেজরা কী অগভীর।ভারতে না জন্মেও ক্রিকেট ভারতের একান্ত মনের খেলা।উপভোগের এমন ঢালাও রূপ আর কোন খেলায় নেই।রাগ-সঙ্গীতকে খেলার ভাষায় অনুবাদ করলে ক্রিকেট হয়ে দাঁড়ায়।ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা জানে,ইংলন্ড ক্রিকেটের জন্মদাতা হতে পারে কিন্ত ক্রিকেট না ফুটবল কোনটি ইংলন্ডের জাতীয় খেলা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে,কিন্ত কোন সন্দেহ নেই একটি বিষয়ে-ক্রিকেট এবং একমাত্র ক্রিকেটই ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাতীয় খেলা।অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে ক্রিকেট আপসের ও অবসরের যুদ্ধ এবং যে-কোন অস্ট্রেলিয়ান এই যুদ্ধে নিজ পতাকার সম্মানরক্ষার জন্য গোটা ৬ দিনে রণাঙ্গনে কাটাতে প্রস্তত আছে।সত্যই বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শ্রেষ্ঠ দান ক্রিকেট এবং সাম্রাজ্যবাদ দগ্ধ হবার সঙ্গে সঙ্গে সে দান বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে।ওয়েস্ট ইন্ডিজের কৃষ্ণকায় প্রতিভার নীল দ্যুতিতে পৃথিবী সমাচ্ছন্ন।‘ভারত শুধু পিছায়ে রয়’-এও চিরদিনের জন্য সত্য না হতে পারে।হয়ত একদিন উলট পুরাণটা সত্যি হয়ে উঠবে।সেদিন পরাধীন ইংলন্ডের মহাকবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন,হায়,ভারতবর্ষ এডমণ্ড বার্কের বদলে ডেনিস কম্পটনকে নিয়ে ব্যাস্ত!একথা সেই দ্বীপবাসী মহাকবি বলতেই পারেন,কারণ একদিন পরাধীন ভারতের মহাকবি বলেছিলেন দুঃখ ক’রে,-কী দুর্ভাগ্য,ইংরেজরা রামমোহনের বদলে রণজিকে নিয়ে প্রমত্ত।

  এসব কথাও ভুলে যান।মনে রাখুন একটি শীতের অপরাহ্নকে।সোনালী রোদের মদ।সবুজ মাঠ।সুতপ্ত সুতৃপ্ত অবসর।আপনি সেই অবসরের অধীশ্বর।আপনার ইচ্ছার সম্মানে সাদা ফ্লানেলে ঢাকা ব্যাটবল হাতে কয়েকটি অভিনেতা।আপনি রাজা,সত্যই রাজা,রূপকথাগুলো এখনো বাজেয়াপ্ত হয়নি,-স্বপ্নে ও কামনায় একটি নিতান্ত রাজা।

  রাজা হয়ে বসে আপনি খেলা দেখছেন-দেখছেন খেলার রাজাকে।

  আমরা সবাই রাজা আমাদের এই খেলার রাজত্বে।

Category : বই
Share on your Facebook
Share this post