খেলোয়াড় বিক্রিতে ওস্তাদ চেলসি!

সঞ্জয় পার্থ
ডিসেম্বর ১৮, ২০১৬
অস্কারকে চাইনিজ লিগের দল সাংহাই এসআইপিজিতে বিক্রি করাটা মোটামুটি চূড়ান্তই হয়ে গেছে। অস্কারকে চাইনিজ লিগের দল সাংহাই এসআইপিজিতে বিক্রি করাটা মোটামুটি চূড়ান্তই হয়ে গেছে।

বছর দশেক আগেও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে ফুটবলার কেনায় রোমান আব্রামোভিচের চেলসির জুড়ি মেলা ছিল ভার। যখন যাকে মনে ধরত, আগে পিছে না ভেবে তাঁকেই কিনে ফেলতেন চেলসির এই রুশ মালিক।

চেলসির এই স্বভাব এখনো কিছুটা আছে, তবে এখন শুধু খেলোয়াড় কেনায় নয়, খেলোয়াড় বেচার ক্ষেত্রেও দারুণ পারদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছে লন্ডনের এই ক্লাবটি। গত ৩ মৌসুম ধরে খেলোয়াড় বিক্রি করে আয়ের দিক থেকে প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে উপরের স্থানটি যে চেলসির!

৫২ মিলিয়ন পাউন্ডে ব্রাজিলিয়ান তারকা অস্কারকে চাইনিজ লিগের দল সাংহাই এসআইপিজিতে বিক্রি করাটা মোটামুটি চূড়ান্তই হয়ে গেছে, সামনের জানুয়ারির শীতকালীন দলবদলেই হয়ে যেতে পারে এই আলোচিত দলবদল। কিন্তু, শুধু অস্কার নন, ২০১৩ সালের জুনের পর থেকেই এরকম অনেক ফুটবলারকেই লাভজনক সব দামে বিক্রি করে আসছে চেলসি।

অস্কারের দলবদলটির দিকেই তাকান। ২০১২ সালে ইন্টারন্যাসিওনাল থেকে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে উদীয়মান তারকা অস্কারকে দলে ভিড়িয়েছিল ব্লুজ’রা। চার বছর পর সেই অস্কারকেই দ্বিগুণেরও বেশি অর্থের বিনিময়ে সাংহাইতে বিক্রি করছে তারা!

জুন ২০১৩ এর পর থেকে সর্বমোট ৩১৪.৪ মিলিয়ন পাউন্ড সমমূল্যের খেলোয়াড় বিক্রি করেছে চেলসি, গত তিন বছরের মধ্যে যা অন্য যেকোনো প্রিমিয়ার লিগ দলের চেয়ে বেশি। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খেলোয়াড় বিক্রি করে লাভের মুখই দেখেছে দলটি।

এর আগে আরেক ব্রাজিলিয়ান রামিরেসকে নিয়েও ভালই ‘ব্যবসা’ করেছে আব্রামোভিচের ক্লাব। ২০১০ সালে পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকা থেকে ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডে রামিরেসকে চেলসিতে নিয়ে আসেন তখনকার চেলসি বস কার্লো আনচেলোত্তি। আর এই বছরের জানুয়ারিতে চাইনিজ ক্লাব জিয়াংজু সুনিংয়ের কাছে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে রামিরেসকে ছেড়ে দিয়েছে চেলসি।

দলবদলের বাজারে দাও মারার জন্য আরেকটি বেশ ভালো উপায় বেছে নিয়েছে চেলসি- একাদশে অনিয়মিত হয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের ধারে বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে পাঠানো। আর চেলসির কপালও ভালো বলতে হবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধারে যাওয়া খেলোয়াড়েরা নতুন ক্লাবে এতো ভালো পারফর্ম করেছেন যে, ক্লাবগুলো সেই খেলোয়াড়কে স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেয়ার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থের প্রস্তাব করেছে চেলসিকে।

এই কৌশলে চেলসি সবচেয়ে ভালো ব্যবসাটা করেছে রোমেলু লুকাকুকে নিয়ে। ২০১১ এর আগস্টে বেলজিয়ান ক্লাব আন্ডারলেখট থেকে ১০ মিলিয়ন (বোনাস সহ ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের কাছাকাছি)  পাউন্ডে চেলসিতে আসেন এই বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড। প্রথম মৌসুমে দলে একেবারেই অনিয়মিত ছিলেন লুকাকু।

অযথা, বসিয়ে না রেখে লুকাকুকে ধারে পাঠানো হল ওয়েস্ট ব্রমউইচে। লুকাকুও নিজেকে মেলে ধরলেন সেখানে, ২০১২-১৩ মৌসুমে করলেন ১৭ গোল, প্রিমিয়ার লিগের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ গোলদাতাও হলেন।

২০১৩-১৪ মৌসুমের শুরুতে চেলসির হয়ে দুইটি ম্যাচ খেলেছিলেন, কিন্তু ওই মৌসুমের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের শেষ দিনে আবারো লুকাকুকে ধারে পাঠাল চেলসি, এবার এভারটনে।

প্রথম মৌসুমেই ৩১ ম্যাচে ১৫ গোল করে এভারটনকে পঞ্চম বানালেন, জানুয়ারি ২০১৪ তে গার্ডিয়ান পত্রিকা তো লুকাকুকে ইউরোপের সেরা ১০ উদীয়মান তারকার তালিকাতেও ঠাই করে দিল। এমন পারফরম্যান্সের পর লুকাকুকে স্থায়ীভাবে পাওয়ার জন্য চেলসিকে প্রস্তাব পাঠায় এভারটন। চেলসিও রাজি হয় যায়, ফলে নিজেদের নতুন ক্লাব রেকর্ড গড়ে ২৮ মিলিয়ন পাউন্ডে লুকাকুকে গুডিসন পার্কে নিয়ে আসে এভারটন, চেলসিও একাদশে অনিয়মিত এক খেলোয়াড়কে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের অর্থ কামিয়ে নেয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে চেলসি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ডেভিড লুইজের দলবদলে। ২০১১ এর জানুয়ারিতে বেনফিকা থেকে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে তখনকার সময়ের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডারকে দলে ভেরায় চেলসি। চেলসিতে এসে নিজেকে আরও শাণিত করেন এই ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার, বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারও বলা হচ্ছিল তাঁকে।

ফর্মের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ঝাঁকড়া চুলের এই ডিফেন্ডারের দিকে নজর পরে ইউরোপের অনেক খ্যাতনামা ক্লাবের। চেলসি সেই সুযোগটাই নেয়, ২০১৪ তে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে পিএসজির কাছে বিক্রি করে দেয় ব্লুজ’রা! একজন ডিফেন্ডারের জন্য এটাই সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি ছিল তখন।

লুইজকে নিয়ে ব্যবসা ফুরায়নি এখানেও। পিএসজিতে যখন লুইজ নিজের সেরাটা হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছিল, তখন আবার উলটো দান চালে চেলসি। এই বছরেরই আগস্টে ৩৪ মিলিয়ন পাউন্ডে আবারো লুইজকে চেলসিতে ফেরত আনেন অ্যান্টোনিও কন্তে।

আর পুরনো ক্লাবে ফিরেই নিজেকে আবারো ফিরে পেলেন লুইজ। এই মৌসুমে চেলসি যে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটছে, ৯ টি ক্লিন শিট রেখেছে, তার অনেকটা কৃতিত্বই লুইজ ও তাঁর রক্ষণভাগের সঙ্গীদের।

এছাড়া ২০১৪ তে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হুয়ান মাতাকে ৩৭.১ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে দেয় চেলসি, যাকে ২০১১ তে ভ্যালেন্সিয়া থেকে ২৩.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে চেলসিতে নিয়ে এসেছিলেন আব্রামোভিচ। মাতার ক্ষেত্রেও বেশ বড় অঙ্কের ব্যবসাই করেছে চেলসি।

তবে দুই একটা ক্ষেত্রে চেলসিও যে ভুল করেনি, সেটাও কিন্তু না। সবচেয়ে বড় ভুলটা সম্ভবত করেছে কেভিন ডি ব্রুইনকে মাত্র ১৬.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ছেড়ে দিয়ে।

ডি ব্রুইন এখন সিটির হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া ফিলিপে লুইসকে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ থেকে নিয়ে এসে এক মৌসুম পরেই আবার ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তটাও খুব একটা ভালো ছিলনা, কারণ ফিলিপে লুইস এখন অ্যাটলেটিকোর অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছেন।

মাঠের খেলায় এই মৌসুমে বাকিদের মাত করেই চলেছে কন্তের চেলসি, তবে মাঠের বাইরে আব্রামোভিচের চেলসিও যে ব্যবসার দিক থেকে বাকি সবাইকে মাত করে চলেছে, এই কথাটা স্বীকার করতেই হবে!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post