গুড শাউট, ব্যাড শাউট

সঞ্জয় পার্থ
ডিসেম্বর ১৭, ২০১৬
  ক্রিকেটের চিরন্তন দৃশ্যগুলোর একটি হল আউটের জন্য বোলার-ফিল্ডারদের সমস্বরে আবেদন।   ক্রিকেটের চিরন্তন দৃশ্যগুলোর একটি হল আউটের জন্য বোলার-ফিল্ডারদের সমস্বরে আবেদন।

ক্রিকেটের চিরন্তন দৃশ্যগুলোর একটি হল আউটের জন্য বোলার-ফিল্ডারদের সমস্বরে আবেদন। সলো আবেদন কিংবা কোরাস আবেদন দুই ধরণের আবেদনই দেখতে পাওয়া যায়, তবে অধিনায়কেরা সাধারণত কোরাস আবেদনকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এতে করে আম্পায়ারের উপর বেশি করে চাপ তৈরি করে যায়।

থিওরি বলে প্রতিটি আউটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আম্পায়ার এবং সেটা অবশ্যই ফিল্ডিং দলের আবেদনের পরে। কিন্তু বাস্তবে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত দেয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় কেবল কয়েকটি মাত্র আউটের ক্ষেত্রে, বাকিগুলোতে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই উদযাপন শুরু করে দেয় ফিল্ডিং দল।

ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে প্রকাশিত চার্লস ডেভিসের এই আর্টিকেলটি মূলত আউটের জন্য আবেদনের পরিসংখ্যান নিয়ে করা ছোট্ট একটি স্টাডি। স্টাডিটিতে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই শতকের টেস্ট ম্যাচের পরিসংখ্যানগুলোকে।

এই শতকের সবক’টি টেস্ট ম্যাচের ধারাবিবরণী দেখে প্রথমে কতগুলো আবেদন করা হয়েছে তার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এলবিডব্লিউ, কট বিহাইন্ড ও শর্ট লেগে ক্যাচ সবক্ষেত্রে করা আবেদনই নথিভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া স্ট্যাম্পিং, রান আউট ও অন্যান্য ডিসমিসালের জন্য করা আবেদন ও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এভাবে ৭ শতাধিক টেস্টের প্রায় ২৫ হাজার আবেদনের উপর ভিত্তি করে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

টেস্ট প্রতি গড়ে প্রায় ৪৪ টি আবেদনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৩ টি সফল আবেদন। অর্থাৎ প্রতি ২.৩ টি অসফল আবেদনের বিপরীতে ১ টি করে সফল আবেদন করেছে ফিল্ডিং দল।

মোট আবেদনের প্রায় ৭৭% ই ছিল লেগ বিফোরের জন্য, আর ১৩% ছিল কট বিহাইন্ডের জন্য। বাকি ১০% অন্য সব আউটের জন্য। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার এটাই ছিল যে শর্ট লেগে ক্যাচের জন্য আবেদন হয়েছে মাত্র ৩%, অথচ এইক্ষেত্রে আবেদন হতে পারত আরও অনেক বেশি। অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ডের জন্যও দুইবার আবেদন হয়েছে।

বলা বাহুল্য, দুইবারই অসফল আবেদন, কেননা ১৯৫১ সালের পরে টেস্ট ক্রিকেট আর অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ড আউট দেখেনি। আবেদনকারী বোলার দুজনও বেশ বিখ্যাত, তবে বোলার হিসেবে নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবে- রিকি পন্টিং আর ভিরাট কোহলি!

আউটের ধরণ অনুযায়ী আবেদনের সফলতার হার উঠানামা করেছে। মাত্র ১৯% লেগ বিফোরের আবেদনে আম্পায়ারেরা আঙুল তুলেছেন, অথচ কট বিহাইন্ডের ক্ষেত্রে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১% এ। বাকি যে ৩৯% কট বিহাইন্ডের আবেদনের ক্ষেত্রে আম্পায়ার সাড়া দেননি, সেগুলোর অনেক কয়টাতে বোলাররা ঠিকভাবে আবেদনই করেননি! স্ট্যাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০% আবেদনে ব্যাটসম্যানকে আউট ঘোষণা করা হয়েছে। লেগ বিফোরের সফলতার হার এত কম হওয়ার কারণ হতে পারে কিছু বোলারের অত্যুৎসাহী আবেদন ও লেগ বিফোরের নিয়মের জটিলতা। এমনকি ডিআরএস সিস্টেম চালু হওয়ার পরেও মাত্র ২০% লেগ বিফোরের সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে।

এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, ২০১০ এর পর থেকে আবেদন করার হার ১০-২০% কমে গেছে। এর পেছনে ডিআরএসের কোন ভূমিকা আছে কিনা সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। এই ইংল্যান্ড সিরিজের আগে ভারত ডিআরএস প্রযুক্তি ব্যবহার করত না, তারপরেও ভারতের বোলারদের আবেদন করার হারও কমেছে এই সময়ে।

আপনার মনে যদি প্রশ্ন জেগে থাকে স্পিনার না পেসার কাদের আবেদন করার প্রবণতা বেশি, তাহলে আপনার প্রশ্নের উত্তর হয়ে আসবে নিচের ছকটি।

দেখা যাচ্ছে উইকেট প্রতি আবেদনের দিক থেকে স্পিনাররা এগিয়ে থাকলেও সফলতার হারের দিক থেকে আবার পেসারেরা এগিয়ে। স্পিনারদের ক্ষেত্রে লেগ বিফোর, স্ট্যাম্পিং ও শর্ট লেগে ক্যাচের জন্য সাধারণত বেশি আবেদন হয় বলেই অনুপাতে এগিয়ে স্পিনারেরা।

তবে আবেদন করলেই যে আম্পায়ারেরা স্পিনারদের প্রতি সদয় হয়ে আঙুল তুলে দেন না সেটা তো ছকের উপাত্তই বলছে। স্পিনারদের আবেদনের মাত্র ১৭% এ ব্যাটসম্যানদের ড্রেসিংরুমে ফেরত যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আম্পায়ারেরা! মিডিয়াম ও পেস বোলারদের ক্ষেত্রে অনুপাত যেখানে ২১%। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে সফল লেগ বিফোরের আবেদনের হার ১৮.৮%, ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে সেটা ১৯.৪%। বাঁহাতি বোলারেরা সফল লেগ বিফোরের আবেদন করেছেন ১৯.৬%, আর ডানহাতি বোলারেরা ১৮.৬%।

সফল আবেদনের দিক থেকে তালিকার শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া, আর সবার নিচে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অবশ্য একা না, সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে পাকিস্তানকেও। অস্ট্রেলিয়ার সফল আবেদনের হার ৩৫%, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ২৪%। উপমহাদেশীয় আরেক জায়ান্ট ভারত আছে ঠিক বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উপরেই, সফল আবেদনের হার ২৫%। আর ভারতের উপরে আছে শ্রীলঙ্কা, ২৭%। তালিকার নিচের চারটি দেশই এশিয়ান হওয়ার কারণটাও পরিষ্কার, এই দেশগুলোর বেশিরভাগ আবেদনই আসে স্পিনারদের থেকে, আর স্পিনারদের সফল আবেদনের হার যে কম সেটা তো দেখানোই হল।

এবার একটু দেখা যাক আবেদন করার দিক থেকে কোন বোলারদের ‘সুখ্যাতি’ রয়েছে। সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেটের মত টেস্টে সর্বোচ্চ আবেদনের দিক থেকেও শীর্ষে মুরালিধরণ। তালিকার সেরা ১০ এ অবশ্য স্পিনারদেরই প্রাধান্য, ৭ জন আছেন স্পিনার, ৪ জন পেসার (১০ম স্থানে যৌথভাবে আছেন স্টুয়ার্ট ব্রড ও চামিন্ডা ভাস)।

২০০০-২০১৬ সালে টেস্টে সর্বোচ্চ আবেদনকারী বোলারদের তালিকা:

এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি অসফল আবেদনের রেকর্ডটিও মুরালির দখলেই। ২০০২ সালে লাহোরে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বোচ্চ ২৯ টি অসফল আবেদন করেছিলেন মুরালি। এই ম্যাচে ৮ উইকেট পেয়েছিলেন মুরালি। একবার নয়, ২৯ টি অসফল আবেদনের ঘটনা আরও একবার ঘটিয়েছিলেন মুরালি, ২০০৬ সালে ক্রাইস্টচার্চে। ওই ম্যাচে মুরালি পান ৭ উইকেট। কারণে অকারণে আবেদন করতে ভালোবাসতেন মুরালি তার সপক্ষে আরেকটি ছোট তথ্য, এক ম্যাচে ২৫ টির বেশি অসফল আবেদনের ৬ টি ঘটনার ৫ টিই ঘটিয়েছেন মুরালি!

আবেদন করার দিক থেকে অন্যতম চতুর বোলার ছিলেন শেন ওয়ার্ন। কোন সিদ্ধান্ত দেয়াটা আম্পায়ারের জন্য কঠিন হতে পারে সেটা অনুধাবন করতে পারার খুব ভালো ক্ষমতা ছিল ওয়ার্নির। ওয়ার্ন নিজের সেরা আবেদনগুলো জমিয়ে রাখতেন ওই কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর জন্যেই। ওয়ার্নের সাথে উচ্চস্বরে চিৎকাররত অজি ফিল্ডারদের আবেদনে অনেক সময়ই সিদ্ধান্ত দিতে ভড়কে জেতেন আম্পায়ারেরা।

বোলারদের মধ্যে সফল আবেদনের হার সবচেয়ে বেশি গ্লেন ম্যাকগ্রা আর ডেল স্টেইনের। দুজনেরই সফল আবেদনের হার ৪৬%। আর সফল আবেদনের হার সবচেয়ে কম অ্যাশলি জাইলসের, মাত্র ১৪%।

এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি আবেদনের ঘটনা দেখেছে নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার ২০০১ অকল্যান্ড টেস্টে। দুদলের সেই টেস্টে মোট আবেদন হয়েছিল ১০৮ টি! সবচেয়ে বেশি আবেদন করেছিলেন সাকলায়েন মুশতাক।

এতক্ষণ খেলোয়াড়দের নিয়ে কথা হল, এবার আবেদনের অন্যতম প্রধান চরিত্র আম্পায়ারদের সম্পর্কেও কিছু তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করা যাক। ২০১১-১৬ সালের মধ্যে আইসিসির এলিট প্যানেলের শীর্ষ আম্পায়রদের আবেদনে সাড়া দেয়ার একটা চিত্র পাওয়া গেছে।

ডিআরএস প্রযুক্তি আসার পর থেকে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত রিভিউ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে অধিনায়কদের। কিন্তু তাতে আহামরি কোন পরিবর্তন আসেনি, মাত্র ২৮% সিদ্ধান্তই বদল করতে হয়েছে আম্পায়ারদের। সবচেয়ে কম সিদ্ধান্ত বদল করতে হয়েছে ব্রুস অক্সেনফোর্ডকে, ১৮%।

বেশি বেশি আবেদন মানেই বেশি বেশি আউট, এই ধারণা তাই আর খাটছে না। কম আবেদন করেও বেশি আউট করার নজির যেমন আছে, তেমনি বেশি আবেদন করেও আউট না পাওয়ার নজিরও যথেষ্ট আছে। অযথা আবেদন করে এনার্জি নষ্ট না করে সেই এনার্জি বোলিংয়ে ব্যবহার করার কথা তাই ভাবতেই পারেন বোলারেরা!

- ইএসপিএন ক্রিকইনফো’র ক্রিকেট মান্থলি অবলম্বনে  

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post