শহীদ মুশতাক: ক্রিকেট পাগল এক সংগঠক

সঞ্জয় পার্থ
ডিসেম্বর ১৬, ২০১৬
 আজাদ ক্লাব থেকেই উঠে এসেছিলেন জুয়েলের মত অসম্ভব প্রতিভাবান সব ক্রিকেটাররা। আজাদ ক্লাব থেকেই উঠে এসেছিলেন জুয়েলের মত অসম্ভব প্রতিভাবান সব ক্রিকেটাররা।

বিজয়ের ৪৫ বছর পর আজও আমরা বিনম্র চিত্তে স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা যোদ্ধাদের, শ্রদ্ধায় মাথা নত করি তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা যোদ্ধাদেরই নয়, আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেই সকল যোদ্ধাদের, যারা কলম হাতে যুদ্ধ করেছেন, মাইক হাতে যুদ্ধ করেছেন, ফুটবল পায়ে যুদ্ধ করেছেন, ব্যাট হাতে যুদ্ধ করেছেন ও পর্দার আড়ালে থেকে সেই সকল যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বিজয়ের এই দিনে খেলাধুলা ডট কম স্মরণ করছে তেমনই এক স্বাধীনতা যোদ্ধা, স্বনামধন্য ক্রিকেট সংগঠক শহীদ মুশতাককে।

স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একজন ছিলেন আবদুল হালিম চৌধুরী, সবার কাছে যিনি জুয়েল নামেই পরিচিত ছিলেন। উইকেটকিপার এই ব্যাটসম্যান ব্যাট হাতে উইকেটে নামা মাত্রই দারুণ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ব্যাট করা শুরু করতেন। তাঁর ট্রেডমার্ক হয়ে যাওয়া স্লগ সুইপ শটটা এখনো সেই সময়ের দর্শকদের মনে অমলিন হয়ে আছে।

সেই সময়ের পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম সেরা প্রতিভা হওয়া সত্ত্বেও জুয়েল কখনো পাকিস্তান জাতীয় দলের হয়ে ব্যাট হাতে নামতে পারেননি, কারণ তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল তিনি বাঙালি।

শুধু জুয়েল না, তাঁর মত এমন অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার সেই সময়ে বঞ্চিত হয়েছেন কেবল বাঙালি হওয়ার ‘অপরাধে’। এতসব বঞ্চনার পরেও হাল ছেড়ে দেননি একজন মানুষ, তিনি শহীদ মুশতাক।

কিছুটা পাগলাটে বলে পরিচিতি ছিল মুশতাকের, তবে এই পাগলামি যে সে পাগলামি না, ক্রিকেটের প্রতি পাগলামি। ক্রিকেটই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। আর এই পাগলামির ফসল হিসেবেই জন্ম নিয়েছিল আজাদ বয়েজ ক্লাব। ক্লাবটাকে নিজের সন্তানের মত করে লালন-পালন করেছিলেন মুশতাক।

এই আজাদ ক্লাব থেকেই উঠে এসেছিলেন জুয়েলের মত অসম্ভব প্রতিভাবান সব ক্রিকেটাররা। বাঙ্গালিরা যখন ক্রিকেটকে সিরিয়াসলি নেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারছিল না, তখন মুশতাকের মত ক্রীড়া সংগঠকেরাই এগিয়ে এসেছেন, নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন এদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো।

কিন্তু, ক্রিকেট পাগল এই মানুষটিকে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা গেল না, বাঁচতে দিল না ওই হানাদার পাক বাহিনী। ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন মুশতাক। বন্ধু জুয়েল তাঁকে অনেক খুঁজেছেন, কিন্তু কোথাও পাচ্ছিলেন না। ২৭ মার্চ বর্তমান এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) প্রধান সৈয়দ আশরাফুল হককে নিয়ে ঢাকা জেলা ক্রীড়া পরিষদের সামনে এসে থমকে যান জুয়েল।

চোখের সামনে প্রিয় বন্ধু মুশতাকের প্রাণহীন নিথর দেহটাকে পরে থাকতে দেখলেন জুয়েল। হাত দুটি উপুড় করা, বুলেটের আঘাতে ঝাঁজরা হয়ে গেছে গোটা শরীর। ক্রিকেট নিয়েই বাঁচতে শেখা মানুষটিকে কী নির্মম যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, বুঝতে বাকি থাকে না জুয়েলের।

বন্ধুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পরেন জুয়েল, দেশকে মুক্ত করার দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে মোকাবেলা করলেন শত্রুর। জুয়েলের সেই প্রত্যয় বৃথা যায়নি, স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে ঠিকই মুশতাকের মৃত্যুর বদলা নিয়েছেন বাংলার দামাল ছেলেরা। যদিও জুয়েল নিজ চোখে তা দেখে যেতে পারেননি, স্বাধীনতার মাত্র ১ দিন আগে শত্রুর হাতে নিহত হন তিনি।

দেশের ক্রীড়াজগতের অন্যতম সেরা এই দুই সেনানীকে আজও বিনম্র শ্রধায় স্মরণ করা হয় গোটা ক্রীড়াঙ্গনে। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের দুইটি স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ জুয়েল ও শহীদ মুশতাকের নামে। আজও প্রতি বিজয় দিবসে তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয় প্রীতি ম্যাচের, যেখানে সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটারেরা খেলেন শহীদ জুয়েল ও শহীদ মুশতাক একাদশের হয়ে।

বিজয়ের এই দিনে আরও একবার নতমস্তকে শ্রদ্ধা জানাই এই বীরদের প্রতি। পরপারে ভালো থাকবেন শহীদ মুশতাক। যতদিন এদেশে ক্রীড়াঙ্গন জীবিত আছে, ততদিন আপনিও জীবিত থাকবেন আমাদের মাঝে। 

Category : ফিচার
Share this post