ফুটবল মাঠের মুক্তিসেনা

উদয় সিনা
ডিসেম্বর ১৬, ২০১৬
  তাদের একটি আক্ষেপও রয়েছে।  তাদের একটি আক্ষেপও রয়েছে।

'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'- বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের পর অসংখ্যা বাঙ্গালির মত পাকিস্তানের বিপক্ষে সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। কিন্তু পরবর্তীতে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলামের আহবানে সাড়া দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়ার পরিবর্তে একটি ফুটবল দলে যোগ দেন তিনি যার নাম ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছিলো লাখো কোটি বাঙ্গালি ঠিক তখন গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। অস্ত্র বা গ্রেনেড হাতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে নয়; মাঠে ফুটবল খেলার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। একটি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কোন ফুটবল দলের অংশগ্রহণ করার এমন ঘটনা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধের ময়দানে নেমেছিল অনেক ফুটবলার। কেউ কেউ আবার আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের পশ্চিম বাংলা ও আগরতলায়। সেসময় মুজিবনগরে গঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি যার সেক্রেটারি ছিলেন লুৎফর রহমান। তখন যুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে তৈরি করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। পশ্চিম বাংলা ও আগরতলায় ছড়িয়ে থাকা ফুটবলারাও ছিলেন সেই দলে।

সাবেক মন্ত্রি শামসুল হককে প্রথম সভাপতি, আশরাফ আলী চৌধুরীকে দ্বিতীয় সভাপতি, এম এম চৌধুরী কালুকে তৃতীয় সভাপতি, তানভির মাজহার ইসলাম তান্নাকে ম্যানেজার, ননি বসাককে কোচ, প্রতাপ শংকর হাযরাকে সহ-অধিনায়ক ও জাকারিয়া পিন্টুকে অধিনায়ক করে গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতে গিয়ে মোট ১৬ টি প্রীতি ম্যাচ খেলে।

সেখান থেকে অর্জিত পাঁচ লাখ রুপির পুরোটাই তখন দিয়ে দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে। বলা হয়ে থাকে এই টাকা দেয়ার আগ পর্যন্ত নাকি ফান্ড শূণ্য ছিল। পরবর্তীতে টাকাগুলো দিয়ে যুদ্ধাস্ত্র কিনতে কাজে লাগানো হয়।

১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই কৃষ্ণনগরে নদীয়া একাদশের বিপক্ষে প্রথম আনুষ্ঠানিক ম্যাচ খেলেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল। তবে ম্যাচটির একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। কারণ এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মত বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল যার পেছনে রয়েছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বিশেষ অবদান।

ম্যাচ শুরুর আগে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনে কতৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানালে জাকারিয়া পিন্টুরা সাফ জানিয়ে দেন যে পতাকা না উঠলে তাঁরা ম্যাচটা খেলবেন না। কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। নদিয়া একাদশের আগে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল আরো একটি ম্যাচ খেললেও সে ম্যাচের স্বীকৃতি মেলেনি। ভারতে মোট ১৬টি ম্যাচের মধ্যে ১২টি জয়, তিনটি ড্র ও একটি হার ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের।

ভারতে মাঠে লড়াই করার পাশাপাশি মাঠের বাইরেও লড়াই কর‍তে হয়েছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রতিটি খেলোয়াড়কে। তাঁরা রীতিমত সংগ্রাম করেছিলেন সেখানে টিকে থাকতে। সেখানে সকল খেলোয়াড়দের জন্য একটি ও অফিশিয়ালদের জন্য একটি রুম বরাদ্দ ছিল।

প্রায় একত্রিশ জন ফুটবলার থাকতেন এক রুমে, ব্যবহার করতেন একটি বাথরুম। তিনবেলা খাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত খাবারও পেতেন না তাঁরা। দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার খেয়েও কঠোর অনুশীলনে কোন খামতি রাখতেন না ফুটবলাররা। শুধু দেশের প্রতি সীমাহীন ভালবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে হাসিমুখে তাঁরা সহ্য করেছিলেন সকল সমস্যা।

যুদ্ধ জয়ের পর ৪৫ বছর পেরিয়ে গেল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা রাখতে পারায় গর্ব করেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যরা। সেইসাথে তাদের একটি আক্ষেপও রয়েছে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও দলগতভাবে রাষ্ট্রীয় কোন সম্মাননা না পাওয়ার আক্ষেপ।

এ আক্ষেপ নিয়ে ইতোমধ্যে আলি ইমাম, নুরুন্নবি, লালু, মাহমুদ ও আইয়ুব আলি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। জানি না  তাদের এই আক্ষেপ আদৌ ঘুচবে কিনা। তবে তাঁরা দেশের জন্য যা করেছেন সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

Category : ফিচার
Share this post