বল টেম্পারিং আইন: ফাঁকও আছে, আছে দুর্বলতাও

সঞ্জয় পার্থ
ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬
  বর্তমান আইনে বল উজ্জ্বল করার জন্য সময় নষ্ট করা যাবেনা বলে যে বিধিটি রয়েছে, সেটা বলবৎ রাখা যেতে পারে।  বর্তমান আইনে বল উজ্জ্বল করার জন্য সময় নষ্ট করা যাবেনা বলে যে বিধিটি রয়েছে, সেটা বলবৎ রাখা যেতে পারে।

কিছুদিন আগেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে বল টেম্পারিং এর দায়ে সাজা পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস। ডু প্লেসিস এরপর বল টেম্পারিং এর আইন নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। এমসিসির ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটি এরপর পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানায়, ৪২.৩ ধারায়(বল টেম্পারিং সংক্রান্ত ধারা) কোন প্রকার পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

ডু প্লেসিসের ঘটনাটা অনেকটা রাহুল দ্রাবিড়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সাথে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়কেও সামনে এনে দেয়। ১) খেলোয়াড়েরা খেলার মাঝে অনেকবারই গ্যাটোরেড খেয়ে থাকেন। এই গ্যাটোরেড মিশ্রিত লালা আর মিন্ট মিশ্রিত লালার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? ২) এই ধরণের নিয়ম লঙ্ঘন প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়, কিন্তু তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনকেই কেবল শাস্তি দেয়া হয়। খেলার সময় খেলোয়াড়েরা খাবার, পানীয় ও চুইংগামের মত অনেক জিনিসই খেয়ে থাকে, তাদের গায়ে জামা-কাপড়ও থাকে। ফলে না চাইলেও এসব জিনিসের প্রভাব অনেক সময় বলের উপর পরে। আর ৩) সাক্ষ্য প্রমাণ হাজিরের ক্ষেত্রে সম্প্রচার কোম্পানির অস্পষ্টতা।

এমসিসির মতে, ৪২.৩ ধারায় কোন ত্রুটি নেই। ৪২.৩ ধারায় একজন ফিল্ডার বৈধভাবে বল নিয়ে কি করতে পারবেন সে সম্পর্কে বলা হয়েছে - একজন ফিল্ডার (ক) কোন কৃত্তিম বস্তু ব্যবহার না করে বল উজ্জ্বল করতে পারবেন, তবে বল উজ্জ্বল করার জন্য খেলার সময় নষ্ট করা যাবেনা, (খ) আম্পায়ারের তত্ত্বাবধানে বল থেকে কাদা পরিষ্কার করতে পারবেন এবং (গ) কাপরের টুকরো দিয়ে ভেজা বল শুকনো করতে পারবেন।

আইনে সবটাই পরিষ্কার করে বলা আছে, কিন্তু এর মধ্যেও অস্পষ্টতা আছে। ফিল্ডাররা রোদের হাত থেকে বাঁচতে প্রায়ই মুখে সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করে থাকেন। অ্যাডিলেডে তো ডে-নাইট টেস্টেও খেলোয়াড়েরা সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন! এখন এটা কি সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব যে ফিল্ডাররা তাদের ভ্রু থেকে বলে যে ঘাম ব্যবহার করেন তাতে একটুও সানস্ক্রিন ক্রিম মিশে থাকে না? ফিল্ডাররা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে বলে ক্রিম মাখান না, কিন্তু বলের অবস্থা পরিবর্তন ফিল্ডারের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না।

জন লেভারের ভ্যাসলিন কান্ড নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি। ওই সময় আইসিসির কোন কোড অফ কন্ডাক্ট ছিল না, আইসিসির রেফারি কিংবা নিরপেক্ষ আম্পায়ারও ছিলনা। আম্পায়ার জুদা রুবেন সর্বপ্রথম এই ভ্যাসলিন কান্ড দুই অধিনায়ক টনি গ্রেগ ও বিষেণ সিং বেদীর দৃষ্টিগোচর করেছিলেন। এরপর বিসিসিআইকে জানানো হয় ব্যাপারটা। বিসিসিআই এরপর বল ঠেলে দেয় এমসিসির কোর্টে।

ব্রিটিশ মিডিয়া ঐক্যবদ্ধভাবে বলে উঠল, সিরিজে পিছিয়ে থাকায় বেদী খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছেন। ইংল্যান্ড ম্যানেজার গ্রেগ ও কেন বেরিংটনের দেয়া ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে আইসিসিও লেভারের বিরুদ্ধে কোন প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করল না, অথচ বলে ভ্যাসলিনের উপস্থিতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। আর এখন ডু প্লেসিসের বেলায় এমসিসি বলছে ডু প্লেসিস ‘অসৎভাবে আইন লঙ্ঘন’ করেছেন।

২০১০ সালের আরেকটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা যায় এই প্রসঙ্গে। কেপটাউন টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকা কয়েকটি ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে স্টুয়ার্ট ব্রডের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ব্রড তাঁর স্পাইক দিয়ে বলের অবস্থার পরিবর্তন করছিলেন। এবিডি ভিলিয়ার্স আর অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের বক্তব্যের তফাৎটা খেয়াল করুন একবার। ডি ভিলিয়ার্সের ভাষ্যমতে ব্রড ইচ্ছাকৃতভাবে বলের উপর পা দিয়েছিলেন। আর ফ্লাওয়ারের দাবি লম্বা ফাস্ট বোলারেরা পা দিয়ে বল থামিয়ে থাকেন, ব্রডও সেটাই করছিলেন। গোটা ব্যাপারটাতে তিনি কোন ক্ষতিকর কিছু দেখেননি বলেও মন্তব্য করেছিলেন ফ্লাওয়ার।

এর আগে জেমস অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধেও একবার বলের চামড়া খোঁটানোর অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু ব্রড বা অ্যান্ডারসন কাউকেই আইসিসি দোষী সাব্যস্ত করেনি, কারণ আম্পায়ারেরা ছবি ও ভিডিও ফুটেজকে প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট মনে করেননি।

সাবেক দুই ইংলিশ অধিনায়ক মাইকেল ভন ও নাসের হুসেইনের মতে ব্রড ও অ্যান্ডারসন দুজনেই দোষী ছিলেন। হুসেইন বলেছিলেন, ‘যদি বাইরের দেশের কোন খেলোয়াড় এটা করত, তাহলে আমরা বলতাম সে চিটিং করেছে।’ আর ভন বলেছিলেন, ‘ইংল্যান্ড ধরা পরেছে।’

এসবকিছুই প্রমাণ করে, বল টেম্পারিং আইনের প্রয়োগ নানা কারণে অধারাবাহিক। ধারাবাহিকভাবে এই আইনের প্রয়োগ ঘটানো একপ্রকার অসম্ভব। আর খেলোয়াড়েরা বারবারই বলে আসছেন, আইনের অধারাবাহিক প্রয়োগই এই ধরণের ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে দায়ী।

এমসিসি কমিটির সদস্য রমিজ রাজা অবশ্য আইনের পক্ষেই কথা বলেছেন, ‘আমার মনে হয়না সম্প্রচারকেরা এই ধরণের ঘটনা প্রচারের জন্য মুখিয়ে থাকে। কেউই খেলাটাকে বিতর্কিত করতে চায় না। কোন কাজটা ঠিক এটা বোঝার মত খেলোয়াড়েরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ বলে আমার ধারণা। যে সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তার মধ্যেই থাকা উচিত। আমার মনে হয় বল টেম্পারিং আইন যেমন আছে তেমনটাই থাকতে দেয়া উচিত।’ এমসিসি কমিটির সদস্য হয়ে যে রমিজ রাজা যে আইনের পক্ষেই কথা বলবেন, এ আর অস্বাভাবিক কি!

এবার ডু প্লেসিসের পরিস্থিতিটা একবার দেখা যাক। দক্ষিণ আফ্রিকা এরই মধ্যে সিরিজে ২-০ তে এগিয়ে, এরকম একটা ‘ডেড রাবার’ টেস্টে তিনি কেন বল টেম্পারিং করতে যাবেন? তবে ঘটনাটা জানাজানি হওয়া ও ডু প্লেসিসের শাস্তি পাওয়া- দুটোর সাথেই এই টেস্টের ‘ডেড রাবার’ হওয়ার একটা সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। এরকম একটা ‘অর্থহীন’ টেস্টের প্রতি দর্শক আগ্রহ কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। দর্শকদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা আর আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় আর কিছু হতে পারত না সম্প্রচারকদের কাছে, ফলে তারা ফোকাস করল ডু প্লেসিসের ওই ঘটনার প্রতি। ফলস্বরূপ টিআরপি গেল বেড়ে।

উদাহরণস্বরূপ, যদি ক্যামেরা সর্বক্ষণ ডেভিড ওয়ার্নারের সানস্ক্রীন ক্রিম মাখানো মুখের দিকে তাক করা থাকত, তাহলে অন্তত একবার হলেও দেখা যেত যে ওয়ার্নার সানস্ক্রীন ক্রিম মিশ্রিত ঘাম বলে মুছছেন। তখন কি তাহলে আইসিসি ওয়ার্নারের বিরুদ্ধেও তদন্তে নামত? দর্শক আগ্রহ যখন কম থাকে তখন সম্প্রচারকারীরা একটু বিতর্ক উসকে দিতে অক্ষম- রমিজ রাজার মত করে এভাবে ভাবতে আসলে একধরণের ‘বিশেষ’ সরলতা লাগে।

আসল সমস্যা হচ্ছে, ডু প্লেসিস যে তিনটি পয়েন্টের দিকে আঙুল তুলেছেন তার সবকয়টিই ওই ৪২.৩ ধারা থেকেই উদ্ভূত। আইনটি স্পষ্ট, কিন্তু এর বর্তমান রূপে একে সার্বক্ষণিক ভাবে মেনে চলাটাও সম্ভব না।

এর পরিষ্কার সমাধানও কিন্তু সহজলভ্য। আইসিসির উচিত প্রতি সিরিজের আগে ক্রিকেট মাঠে কোন কোন জিনিসের ব্যবহার বৈধ হবে তার একটি তালিকা করার জন্য অধিনায়ক, আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারিদের নির্দেশনা দেয়া। ফুটবলে যেমন মাঠে ঘড়ি বা যেকোনো ধরণের অলংকার সামগ্রী ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফুটবলারদের বুটের স্পাইকও পরীক্ষা করে দেখা হয়। ক্রিকেটে ফিল্ডিং টিমের ক্ষেত্রেও এমনটা প্রয়োগ করা যেতে পারে। তালিকায় নেই এমন কোন বস্তু মাঠে ব্যবহার করতে দেখা গেলেই ওই খেলোয়াড় ৪২.৩ ধারা ভঙ্গ করেছেন ধরে নেয়া যেতে পারে।

এখন অধিনায়কেরা যদি মাঠে এনার্জি ড্রিঙ্ক, চুইংগাম, সানস্ক্রীন ক্রিমের ব্যবহারের বিষয়ে সম্মত হন, তাহলে বলে এদের ব্যবহারকেও বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই উপায়ে আইনের প্রয়োগও নিশ্চিত করা যাবে, আবার কোন খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে বল টেম্পারিং করেছেন, এমন অভিযোগের সংখ্যাও অনেকটা কমে আসবে। তবে বর্তমান আইনে বল উজ্জ্বল করার জন্য সময় নষ্ট করা যাবেনা বলে যে বিধিটি রয়েছে, সেটা বলবৎ রাখা যেতে পারে।

একজন ফিল্ডার যদি পানি বিরতিতে কোলা খান, সেটাকে গিলে ফেলার আগে মুখের মধ্যে কিছুক্ষণ ধরে ঘূর্ণি খাওয়ান, এবং তারপর বলে লালা লাগান, তাহলেও কিন্তু একদিক থেকে তিনি ৪২.৩ ধারার অবমাননা করছেন। এগুলোই এই আইনের দুর্বলতা, যে কারণে দ্রাবিড়, ট্রেসকোথিক কিংবা ডু প্লেসিসদের বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ গায়ে মাখতে হচ্ছে।

আইনের সংশোধন করা হলে দুইটি জিনিস হবে- ১) লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় থাকবে, আর ২) সম্প্রচার কোম্পানি ও স্বাগতিক মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব করার প্রবণতা বাতিল হবে।

বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আমলে নেয়ার সময় সম্প্রচারকদের ফুটেজের উপর নির্ভর করা উচিত নয় আইসিসির। কেবল চার আম্পায়ারের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই টেম্পারিং হয়েছে কি হয়নি সেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তবে এটা আশা করাটাও হয়তো একপ্রকার বাড়াবাড়িই। এমনটা করলে যে সম্প্রচারকদের আধিপত্য খর্ব হবে, আর আজকের এই বাণিজ্যের যুগে কি সম্প্রচারকদের আধিপত্য খর্ব করা যায় নাকি!

- ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Category : ফিচার
Share this post