হারতে না জানা এক কিংবদন্তী

মুহাঃ মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদ
ডিসেম্বর ১৩, ২০১৬
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

দুঃখিনী এক মায়ের গর্ভে ছেলেটির জন্ম।

অভাবের সংসারে বোঝা বাড়াতে চাইলেন না মা, তাই গর্ভেই ছেলেটিকে পৃথিবীর আলো থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ডাক্তারের হস্তক্ষেপে এ যাত্রায় ছেলেটি বেঁচে যায়-সুন্দর এই পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখতে পায়।

ছেলেটার দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিলো-একদিন তারা অনেক বড় বাড়িতে থাকবে। বাবাকে একদিন স্বপ্নটার কথা বলে ফেললো, মাইকেল জ্যাকসনের মতো একদিন তাদেরও বড় একটা বাড়ি থাকবে। কিন্তু বাবা তার কথা শুনে হেসেই উড়িয়ে দিলেন, তাই কী হয়!

হয়, স্বপ্নটার পেছনে লেগে থাকতে পারলে হয়। স্বপ্নকে একটা মুহুর্তের জন্য ছেড়ে দিতে না পারলে হয়। স্বপ্নকে যে কোনো মূল্যে জিতে আনার ক্ষমতা থাকতে পারলে হয়।

হয় বলেই সেদিনের সেই অভাবী, গর্ভেই জীবন হারাতে বসা ছেলেটি আজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

মুঠো ভরে আজ তিনি লোকেদের বাড়ি গড়ে দিতে পারেন, আজ তিনি নিজেই গড়ে দিতে পারেন স্বপ্ন। একদিনের অভাবকে উড়িয়ে দিয়েছেন ওই স্বপ্নের পেছনে ছুটে। দুনিয়া জুড়ে লোকেরা যখন হাল ছাড়তে বলেছেন, তখনও নতুন করে লড়াই শুরু করে হয়ে উঠেছেন বিশ্বসেরা। চতুর্থবারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতে নিয়ে বুঝিয়েছেন, তিনি স্বপ্ন দেখতে পারেন; স্বপ্ন জিততে পারেন।

রোনালদোর জীবনের গল্পটাও এমন।

একসময় নিজ দেশের স্পোর্টিং লিসবন থেকে ফার্গির লাল দূর্গে আসলেন। শুরু করলেন নতুন করে লড়াই। কঠোর পরিশ্রম, একাগ্রতা, দলের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে জয় করলেন সমর্থকদের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। ছোঁয়া পেলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ, ব্যালন ডি অর সহ আরো বহু সাফল্যের।

কিশোর থেকে যুবক হলেন। ইংল্যান্ড থেকে পাড়ি জমালেন স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদে। শুরু হলো নতুন এক লড়াই, নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ সাথে মেসি নামের এক সিংহের সাথে লড়াই, শুরুতেই মুখোমুখি কঠিন এক সত্যের। ধীরে ধীরে এ ক্লাবের হয়েও জয় করলেন লীগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লীগের ট্রফি সহ ছোটবড় আরো বহু শিরোপা। দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন, ব্যাক্তিগত ভাবে একুশ শতকের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

পর্তুগালকেও শ্রেষ্ঠত্বের পথে নিয়ে চললেন।

পর্তুগাল নামক দেশটা একবারই আন্তর্জাতিক কোন ট্রফির খুব নিকটে গিয়েছিলো; তাও ২০০৪ সালে। সে আসরে দু গোল করা এই তরুন দলকে আরো একবার ফাইনালের নিকটে নিয়ে গিয়েছিলো। ২০১২ সালের ইউরোতে সেমিফাইনালে পর্তুগালের উঠার আসল কারিগর এই রোনালদো। তবে হার না মানা দৃঢ় মানসিকতার এই ছেলেটা ঠিকই ২০১৬ সালে জাতীয় দলকে প্রথম কোন আন্তর্জাতিক মেজর ট্রফির ছোঁয়া পাইয়ে দেন। গোটা টুর্নামেন্টে পর্তুগালের ৯ গোলে তার অবদান ৫ গোলে; গুরুত্বপূর্ণ ৩ খানা গোলই এই জাদুকরের পা থেকে আসে।

ফাইনালে অপ্রত্যাশিত ভাবে ইঞ্জুরিতে পড়ে লাখো ভক্ত কে কাঁদিয়ে মাঠ ছাড়লেও ঠিকই ডাগ-আউট থেকেই সত্যিকারের দলনেতার মতো দলকে জেতার ইন্ধন জুগিয়েছেন। ২০১৬ সাল টা নিজের ক্যারিয়ারের সেরা বছর মানা এই ছেলেটা এ বছরে জিতেছেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ আর উয়েফা সুপার কাপ।

গ্রহের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে একই বছরে ব্যালন ডি অর, ইউরো পটি, সাথে দলগত ভাবে ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপ, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ আর সুপার কাপ জিতেছেন। টানা ৭ আন্তর্জাতিক মেজর টুর্নামেন্টে কিংবা ৪ ইউরোতে গোল করা একমাত্র ফুটবলারও তিনি। ইউরো চ্যাম্পিয়নশীপের সর্বোচ্চ গোলদাতাও এই জাদুকর।

পর্তুগালের হয়ে এ বছরে ১৩ ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল, যা পর্তুগালের হয়ে ব্যাক্তিগতভাবে বছরের সেরা। আর ক্লাবের হয়ে ১৫-১৬ সিজনে ৪৮ ম্যাচে ৫১ গোলের পাশাপাশি ১৫ এসিস্ট, আর ১৬-১৭ সিজনে এ পর্যন্ত ১৭ ম্যাচে ১২ গোলের সাথে সতীর্থ দের দিয়ে গোল করিয়েছেন ৬ এসিস্ট।

ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেখানে ট্যাটু করা ফ্যাশন, সেখানে কেবল রক্ত দানের জন্যেই শরীরে ট্যাটু লাগাননি। অতিরিক্ত মদ্যপানের জন্যে প্রিয় বাবার মৃত্যুতে মদপানকে দেখতে পারেন না দু চোখে। এই রোনালদো হাল ছাড়তে জানেন না, একসময়ে বড় বাড়ির স্বপ্ন দেখা ছেলেটা আজ পৃথিবীর অনিন্দ সুন্দর এক বাড়ির মালিক, মাস শেষে বেতন গোনা ছেলেটা আজ জানে না তার ব্যাংক ব্যালেন্স কত?

তবে ব্যাংক ব্যালান্স, চ্যাম্পিয়নসলিগ, ইউরো কিংবা এই ব্যালন ডি’অর; কোনোটা দিয়েই রোনালদোকে চিনতে পারবেন না। সেটা চিনতে হলে আপনাকে জানতে হবে, তাকে এই লম্বা ক্যারিয়ার জুড়ে লড়তে হয়েছে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির সাথে।

চার চারবার মেসির থেকে একটু পিছিয়ে থেকেছেন এই ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে। হালটা ছাড়েননি। নিজেকে আরও উচুতে তুলে নিয়েছেন। মেসি নিজেকে যত বড় করেছেন, রোনালদো লড়াই করে আরেকটু বড় করেছেন নিজেকে।

এটাই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। যিনি হাল ছাড়েন না।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post